যে মুহিব খানকে চিনি এবং যাকে চিনি না

সংখ্যা:

 

মুহিব খানের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো রাজধানী মিরপুরের ৬ নং ব্লক, মাদ্রাসায়ে দারুল উলূম মিরপুর-এ। এটা ২০০৩ সালের কথা। আমি তখন পড়াশোনার জন্য ধামরাইয়ের মফস্বল ছেড়ে কেবলই পা রাখলাম রাজধানী শহরে। বুকে ভয়, চোখে স্বপ্ন। যা দেখি তা-ই অবাক লাগে। সবচে অবাক করা বিষয় ছিল দারুল উলূম মিরপুরের প্রিন্সিপাল। মুহিব খানের আব্বা মাওলানা আতাউর রহমান খান রহ.। তিনি সে বছর কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদিয়া ছেড়ে দারুল উলূমের প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেছেন।

অবাক বলা যাবে না, তাঁকে দেখে আমি একদম অভিভূত হয়ে গেলাম। কী রাশভারী মানুষ! অশতীপর লম্বা ব্যক্তিত্ববান পুরুষ, সাদা চুল-দাড়ি। সাদা পাঞ্জাবি, সঙ্গে ঘিয়ে রঙের সদরিয়া; ঢোলা পাজামা আর মাথায় কিস্তি টুপি। প্রথম দেখায় আমার মনে যে খটকাটা লাগলো—তাঁকে দেখতে আর দশজন কওমি হুজুরের মতো লাগছে না। তিনি তাদের চেয়ে চলনে বলনে, চিন্তা আর মননে সম্পূর্ণ আলাদা। কথা বলেন আস্তে আস্তে, কিশোরগঞ্জের টান থাকে সে কথায়।

প্রথম ছয় মাস হুজুরকে দেখে মুগ্ধতায় কেটে গেল। এর মধ্যে একবারও হুজুরের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়নি। মনে প্রবল ইচ্ছা—একদিন হুজুরের সঙ্গে কিছু একটা কথা হবে। তিনি কিছু একটা জিজ্ঞেস করবেন, আমি জবাব দিবো। তিনি কিছু একটা চাইবেন, আমি সামনে এগিয়ে দেবো। এমন একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম।

আমাদের ক্লাসে পড়তো কিশোরগঞ্জের আতাউল্লাহ সাদী। সে হুজুরের একান্ত খাদেম, ব্যক্তিগত সহকারীর মতো। একদিন এসে বললো, তোমার তো লেখালেখির অভ্যাস আছে। হুজুর কিছু একটা লেখাবেন। চলো, আমার সঙ্গে হুজুরের বাসায়।

আমি তো খুশিতে আটখানা। ধোপদুরস্ত হয়ে সাদীর সঙ্গে হুজুরের বাসায় গেলাম। মাদরাসার কাছেই হুজুরের বাসা। হুজুর কোন একটা দৈনিকের জন্য যেন কলাম লিখেছেন, সেটা কপি করে নতুন কাগজে লিখতে হবে। আমি মহানন্দে কপি করতে শুরু করলাম। এর মাঝে কিছু কথা হুজুর নতুন করে বলতেন, সেগুলোও জায়গা বিশেষে লিখে দিতাম।

এভাবেই হুজুরের বাসায় মুহিব খানের সঙ্গে পরিচয়। বিয়ে টিয়ে করেননি, আব্বার সঙ্গে থাকেন। দাওরা শেষ করে মিরপুর বাংলা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করছেন। ওদিকে  তিনি তখন কওমি অঙ্গনের নতুন ক্রেজ। বছরখানেক আগে তাঁর গানের প্রথম অ্যালবাম বেরিয়েছে—‘সীমান্ত খুলে দাও’। ইসলামি সংগীতকে সম্পূর্ণ নতুন একটা আবহে তিনি তরুণদের সামনে তুলে ধরেছেন। ইসলামি সংগীত যে এভাবে গাওয়া যায়, কেউ এতদিন কল্পনাই করেনি। তিনি ইসলামি সংগীতাঙ্গনে সেই কল্পনাতীত ব্যাপার ঘটিয়ে তুলকালাম করে চলেছেন।

এরপর হুজুরের বাসায় অনেকবার যাওয়া হয়েছে। কখনো হুজুরের কাজে, কখনোবা মুহিব ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা দিতে। তিনি দারুণ আড্ডাবাজ মানুষ। তাঁর সেন্স অব হিউমার তীক্ষ্ম। বাসায় মুহিব ভাইয়ের বড়ভাই তামীম ভাইও থাকতেন। তাঁর আড্ডার দক্ষতা আরেক কাঠি সরেস। কথায় কথায় ছন্দ মিলানোতে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। আড্ডা জমাতে আর কিছু লাগতো না। বিশ্বরাজনীতি থেকে শুরু করে ভবিষ্যত পৃথিবী—এন্তার আলোচনা চলতো। মূলত মুহিব ভাই-ই বলতেন বেশি, আমরা তো ছিলাম কেবলই দর্শত-শ্রোতা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথাবার্তা শুনতাম।

মুহিব ভাই তরুণদের নতুন ক্রেজ হলেও, তাঁকে নিয়ে সনাতন কওমি অঙ্গনে একটা নাক সিঁটকানো প্রথা গড়ে উঠেছিল তখন। অনেক প্রবীণই তাঁর আধুনিকতা এবং সীমানা পেরুনোকে সাদা চোখে দেখতেন না। একটা বাঁকা নজর সবসময় বজায় থাকতো তাঁর ওপর। তাঁর চুল এত লম্বা কেন, তাঁর দাড়ি এক মুষ্ঠি নয় কেন, টুপি পরেন না কেন, পাঞ্জাবি ছোট পরেন কেন? এমন নানা অভিযোগে জর্জরিত হতেন প্রায়শই। কিন্তু মুহিব ভাই ছিলেন এসবে ড্যামকেয়ার। তিনি বরং এসব শুনে আনন্দই পেতেন। একদিন তো বলেই বসলেন, লোকজন অনেকে আমাকে গোমরাহ বলে। চিন্তা করছি তোমাদের নিয়ে একটা ব্যান্ড গড়বো, ব্যান্ডের নাম হবে ‘গোমরাহ’। সেই ব্যান্ডের থিম সং হবে—‘তোমরা আমাদের বলো না গোমরাহ/আসল গোমরাহ হচ্ছো তোমরা…।’

মিরপুর থেকে মুহিব ভাইয়ের সঙ্গে যে পরিচয় হলো, সেটা আর কখনো জুদা হয়নি। সময়ের নানা ঝক্কিতে কখনো আলগা হয়েছে, কিন্তু একেবারে মুছে যায়নি কখনো।

 

দুই

কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক, কিছুটা আত্মগরিমায় মগ্ন থাকা এক ব্যক্তি, প্রতিভার পারদে প্রতিনিয়ত নিজেকে উচ্চকিত রাখতে সচেষ্ট একজন। আমার দৃষ্টিতে মুহিব খান এমনই। আপাত দৃষ্টিতে তাঁকে কী বলা যাবে? নিঃসঙ্গ শেরপা? নাকি নিজ স্বার্থের চতুর সারথি? যেভাবেই তাঁকে চিত্রিত করা হোক, তবু তিনি গত দুই যুগের বিনিদ্র নকিব, বাংলাভাষায় ইসলামি সংগীতের সবচেয়ে দামি ব্র্যান্ড।

কিন্তু যেভাবে তাঁকে আমরা ‘দামি ব্র্যান্ড’ বলে পরিচয় দিচ্ছি, তিনি কি সেই দামি ব্র্যান্ডের মূল্য পরিপূর্ণভাবে চুকিয়েছেন? ইসলামি চেতনা ও নবজাগরণের যে আওয়াজ তিনি তাঁর গান-কবিতায় উচ্চারণ করেন, সেই আওয়াজকে কতোটা তিনি তোয়াজ করেছেন—এ প্রশ্ন রয়েই যাবে।

এ কথা সত্য, ইসলামি চেতনা ও সংস্কৃতি বিতরণ করতে মুহিব খানের বেকারারি যে কোনো ইসলামপ্রিয় মানুষকে উদ্বেলিত করে থাকে। কিন্তু এই উদ্বেলিত মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের রুটিরুজি ছাড়া আর কতোটা আগুয়ান, এ চিন্তা আমি করি। এ চিন্তা তখনই আসে যখন একই মুহিব খানকে একই সঙ্গে আমি কবিতায় দেখতে পাই, দেখতে পাই ইসলামি গানের কনসার্টে, কখনো ওয়াজের মাহফিলে, কখনোবা রাজনীতির চতুর মঞ্চে, আবার কখনো ফেসবুকে জনপ্রিয়তা লাভের অযাচিত বাক্যবাগিশে। তিনি সবখানেই আছেন। সবখানেই পপুলারিটি আহরণ করে যাচ্ছেন। আমরা বোকা জনতা হয়রান হয়ে যাই—মুহিব খান আসলে কে? কোন মুহিব খানকে আমরা আইডল হিসেবে বরণ করবো?

এখানে আমার হিসাবটা খুব পরিষ্কার: আপনি যদি গায়ক হন তাহলে গায়কী নিয়ে কথা বলুন, গায়কীকে উচ্চকিত করুন। আপনি যদি নিজেকে কবি দাবি করেন তাহলে বিশ্ব কবিসভায় নিজেকে আধুনিক কবি হিসেবে উপস্থাপন করুন। আপনি যদি মাহফিল মাতানো ওয়ায়েজ হয়ে থাকেন, শীত মৌসুমে জমিয়ে পয়সা কামান। অথবা আপনি যদি মনে করেন রাজনীতিতে আপনি তামাম ভেল্কি দেখাতে পারবেন, তো, সর্বস্ব নিয়ে আসুন ময়দানে জংয়ে। আপনার জন্য তৈয়্যার হয়ে আছে জীবনবাজিতে মাতোয়ারা লাখো তরুণসংঘ।

কিন্তু সবার আগে আপনাকে ঠিক করতে হবে—আপনি কী! কে আপনি! সত্যিকারের মুহিব খান কোনজন! ‘লাল সাগরের ঢেউ’-এর কবি? ‘দিন বদলের দিন এসেছে’র মঞ্চকাঁপানো জাগরণী সংগীতশিল্পী? ওয়াজ-মাহফিলে স্লোগানতোলা ‘আল্লামা মুহিব খান’? নাকি রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে শুধুমাত্র নতুন কিছু ফাঁকা বুলি?

ইকবাল-নজরুল-ফররুখের প্রতিচ্ছবি বলে নিজেকে যতই হাজির করুন, দিনশেষে আপনাকে নির্দিষ্ট একটা পরিচয়ে আসতে হবে জনতার সামনে। এমন মাল্টি ট্যালেন্টেড ভূমিকা দিয়ে আপনি নিজের একক পরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন না। চুক্তি করে গান শোনাতে গিয়ে সেখানে আপনি ‘ন্যাশনাল মুভমেন্টের’ সূচিপত্র বয়ান করার অধিকার রাখেন না। ওয়াজ করতে গিয়ে মুফতে কিছু গান শুনিয়ে শ্রোতাদের উজ্জীবিত করার বাহুল্য টেকনিকও আপনাকে মানায় না।

হতে পারে এর সবকিছুই চেতনা জাগানিয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার রুটিরুজিরও একটা তরিকা। তাহলে আপনাকে ঠিক করতে হবে, আপনি কোন জিনিসটাকে আপনার জীবনের ব্রতী হিসেবে গ্রহণ করেছেন—চেতনা বিতরণের মাধ্যমে রুটিরুজি, নাকি স্রেফ রুটিরুজির জন্য চেতনার ফেরিওয়ালা।

 

তিন

একজন কবি ও গীতিকার হিসেবে মুহিব খান সার্বজনীন—এমন দাবি কখনোই তিনি করতে পারেন না। মুহিব খান যতো গান লিখেছেন সবই নিজের জন্য। তিনি অন্যের জন্য কখনো কোনো গান লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। অথবা তিন কারো গানে সুর করেছেন—এমন তথ্যও পাইনি। নজরুলের কিছু গান তিনি নতুন আঙ্গিকে গেয়েছেন, যেটাকে রিমেক বলা যায়; কিন্তু নতুন কারো গান বা কবিতায় তিনি সুরারোপ করেননি।

এখানে মুহিব খানের ভেতরে প্রতিভার যে অহমবোধ, তা সুস্পষ্ট। তিনি হয়তো মনে করেন, আমার লেখা গান আর কেউ গাইবার মতো শক্তি রাখে না; অথবা অন্য কারো গান গাওয়ার মতো ছোট আমি নই। মুহিব খানের ভেতরে এই ‘আমিত্ব’ সদাজাগ্রত। তিনি কখনোই নিজেকে আর দশজন সাধারণ শিল্পী বা মানুষের কাতারে নিজেকে কল্পনা করেন না। খোদাপ্রদত্ত প্রতিভা তাঁকে সবসময় আর সবার চেয়ে উন্নত বা এলিট হিসেবে ভাবতে বাধ্য করেছে। তিনি সেই যোগ্যতার ধারক বলেই তাঁর ভেতরে এমন আত্মগরিমা জাগরুক—এ কথাও অস্বীকারের জো নেই। গরিমাহীন, ব্যক্তিত্বহীন মুহিব খানও হয়তো দর্শক-শ্রোতাদের কাছে আনুখা মনে হতো। তিনি তাঁর মতোই মননে ও চলনে অদ্বিতীয়।

তবে রাজনীতির ক্ষেত্রে এই আত্মগরিমা মুহিব খানের সবচে বড় ব্যর্থতা হতে পারে বলে আমার ধারণা। একজন নেতা কখনোই তাঁর কর্মীদের চেয়ে নিজেকে দেবতাজ্ঞান করতে পারেন না। অলৌকিক ওহি যদি নেতার অন্তকরণে এলহাম হয়, তবে সে পথ ও পদ্ধতি কর্মীদেরও তালিম দেয়া উচিত। কর্মীদের কাঁধে হাত রেখে, গলায় গলা লাগিয়ে যদি একই সুর না তোলা যায়, তবে সে আন্দোলন মোটেও জনমানুষের আন্দোলন হিসেব ধর্তব্য নয়।

মুহিব খান তাঁর গানের ভক্ত বা গুণমুগ্ধ শ্রোতাদের ভাবেন তাঁর চিন্তা বা দলের একান্ত সমর্থক। এটা একটা বিনাশী ভুল। যে শ্রোতা তাঁর গান শুনে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠছে, সে কিন্তু আগামীকাল তাঁর পেছনে এসে তাঁর দলের ধ্বজা ধরে নারায়ে তাকবির বলবে না। তাদের কাছে মুহিব খানের গান কিছুটা চেতনা ঝালাইয়ের মশলা, অনেকখানি বিনোদনমাত্র। এ সত্য যদি মুহিব খান বুঝতে পারেন, তাহলে রাজনীতির মতো কুটিল রঙ্গমঞ্চে তাঁর অনুপস্থিতিই সর্বৈব সুফল বয়ে আনবে।

মুহিব খান জন্মান্তরের একজন কবি ও গায়ক। এটাই তাঁর আদি ও আসল পরিচয়। এই পৃথিবীকে কবিতা ও গানে তাঁর আরও অনেক অনেক কিছু দেবার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়ই বলতে হবে, তিনি সেসব প্রতিশ্রুত গান-কবিতা অন্য কোথাও স্বল্প দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন অকাতরে।

 

মার্চ 2018

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১