বিপ্লব আমার পেছনে হাঁটে

সংখ্যা:

 

কবি মুহিব খান। নতুন করে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মতো কিছু নেই। সবার কাছে ‘জাগ্রত কবি’ হিসেবে পরিচিত এই মানুষটি দীর্ঘ এক দশক ধরে আমাকে চেনেন, স্নেহ করেন। বহুমুখী প্রতিভার এই গুণী ব্যক্তিত্ব এখন কী নিয়ে ব্যস্ত—সেটি নিয়ে আমার জানার আগ্রহ ছিল। কাতারে থাকার সুবাদে এসব নিয়ে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করার সুযোগ হয়ে ওঠে না। গত জানুয়ারিতে আমি বাংলাদেশে যাওয়ার পর একদিন তাকে ফোন করে বলি, আমি আসতে চাই। তিনি সরাসরি বললেন, চলে আসো। এরপর মধ্য ফেব্রুয়ারির এক সকালে ঢাকায় গোলাপবাগে তাঁর বাসায় গিয়ে হাজির হই আমি। তিনি হাসিমুখে স্বাগত জানালেন, আমার খোঁজখবর নিলেন। নানা বিষয়ে নিজের স্বপ্ন, পরিকল্পনা ও চিন্তার কথা জানালেন। সবচেয়ে বেশি সময় ধরে কথা বললেন তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা, দল ও ভবিষ্যত নিয়ে। প্রায় এক ঘন্টাব্যাপী সাক্ষাতকারের কিছু অংশ নবধ্বনির পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হচ্ছে এই সংখ্যায়।

বছরের ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস কবি মুহিব খান বেশ ব্যস্ত থাকেন। দেশজুড়ে ঘুরে বেড়ান ও বিভিন্ন মাহফিলে অংশ নেন। কথা শুরু হলো তাঁর এই ব্যস্ততা দিয়েই। জানতে চাইলাম, কী নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন? মুহিব খান জানালেন, এখন মাসে ৩০ দিনের মধ্যে ১৫-২০ দিন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিই। তিন মাসে ৫০টির মতো অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছি। ফলে মূলত এখন ‘স্টেজ শো’ নিয়ে ব্যস্ততা। আগে শুধু কনসার্ট আকারে প্রোগ্রাম হতো, এখন দেশের বড় বড় মাহফিলে ওলামায়ে কেরাম আমাকে চান। গত দু বছর ধরে কনসার্ট কম হচ্ছে, মাহফিল বেশি হচ্ছে।

জানতে চাইলাম, গত দু বছর ধরে কনসার্ট কম হওয়ার কারণ কী?

মুহিব খান বললেন, গত কয়েক বছরে আমার বয়স ও ব্যক্তিত্বে একটা পরিবর্তন এসেছে। ২০০১ সাল থেকে আমি প্রকাশ্যে সঙ্গীত সফর করি। তখন যারা আমার শ্রোতা ছিল, তারা মাদরাসায় নিচের জামাতে পড়াশোনা করত। তারা এখন বিভিন্ন মাদরাসার প্রিন্সিপাল, বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, তারা সারাদেশে ছড়িয়ে আছেন, তারা তাদের প্রতিষ্ঠানের মাহফিলগুলোতে আমাকে নিতে চান।

তাছাড়া এখন সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর চেয়ে মাহফিলের আয়োজন সহজ। আমি মাহফিলগুলোকেও গুরুত্ব দিই। কারণ, এখানে গণমানুষের জমায়েত থাকে। পাশাপাশি ব্যাপকভাবে উলামায়ে কেরামের উপস্থিতি থাকে, যেটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে থাকে না। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে নির্দিষ্ট বয়সের ও নির্দিষ্ট রুচির বাইরে অন্যরা থাকেন না। আগেও মাহফিলে আমার চাহিদা ছিল, তখন যেতাম না। কিন্তু এখন মাহফিলগুলোতে সময় দিই। মাহফিলগুলোতে যেহেতু প্রচুর সাধারণ মানুষ আসে, তাদের সামনেও আমার কিছু বলার আছে।

এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন ছিল, এই মুহূর্তে নিজেকে কোন পরিচয়ে দেখতে চান মুহিব খান?

তিনি বললেন, আমি শিল্পী নই, কখনো শিল্পী ছিলাম না। আমি বক্তাই ছিলাম। বক্তৃতাটা সঙ্গীতের মতো করে দিতাম, যেহেতু আমি কবি। এখনো সেই কাজটাই করি। প্রয়োজনীয় যে কথাগুলো বলার, সেগুলো বলি এবং সঙ্গে প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ অনুযায়ী আমি আমার সঙ্গীতগুলোকে সামনে নিয়ে আসি।

তামীম রায়হান: সর্বশেষ কবে সঙ্গীত লিখেছেন?

মুহিব খান: এই মাসেই (ফেব্রুয়ারি) তো লিখলাম।

তামীম রায়হান: এই মুহূর্তে সঙ্গীত নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

মুহিব খান: এটা চলতে থাকবে। ভেতর থেকে এমনিতেই বের হবে। আমার কাজগুলো আমি যা করি, খুব একটা পরিকল্পনা নিয়ে করি না। যখন যেটা প্রয়োজন, যতটুকু আমার দ্বারা সম্ভব, আল্লাহ করিয়ে নেন। এটাই বাস্তবতা। সংগীত আমার শক্তি। এটা চলতে থাকবে।

তামীম রায়হান: অনেকদিন ধরে আপনার কোনো অ্যালবাম নেই…

মুহিব খান: অ্যালবাম তো এখন কেউ করে না। সিঙ্গেল সংগীত ইউটিউবে চলে আসে, এটাই নিয়ম। ১০-১২টা গান একসঙ্গে করে অ্যালবাম প্রকাশের রেওয়াজ তো এখন আর নেই।

তামীম রায়হান: আপনার সর্বশেষ অ্যালবাম কবে ছিল?

মুহিব খান: ২০১৫ সালে। ‘নতুন ইশতেহার আসছে’ শিরোনামে। ১০টি গানের সিডি ছিল সেটি। আরেকটি ছিল ‘দাস্তানে মুহাম্মদ’। এ দুটো প্রকাশ করেছিল হলি মিডিয়া। এর পর থেকে একটি করে গান আসছে। যখন যেটা তৈরি হচ্ছে, সেটা বাজারে চলে আসছে।

এবার পেছনে ফেরা যাক। ২০০২ সালে ‘সীমান্ত খুলে দাও’ দিয়ে অ্যালবাম প্রকাশের যাত্রা শুরু করেন কবি মুহিব খান। এটি প্রকাশ করেছিল প্রত্যয় প্রোডাক্টস। সে সময় এই অ্যালবামের বিনিময়ে কোনো সম্মানি পাননি তিনি।

মুহিব খান বললেন, এর কারণ, তারা আমার অ্যালবাম বের করে কতটা ব্যবসায় সফল হয়েছেন, তা আমি খোঁজ নিইনি। তাছাড়া সম্মানি চাওয়ার মতো মানসিকতাও তখন আমার ছিল না।

এরপর ২০০৩ সালে প্রকাশিত হলো ‘দিন বদলের দিন এসেছে’। এটি প্রকাশ করেছিল সাউন্ড মিডিয়া। এর কর্ণধার ছিলেন শাহ ইফতেখার তারিক, গাজী আতাউর রহমান এবং মুহিব খান। এ প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘আমরা কেউ এ ব্যবসায় পটু ছিলাম না। ফলে দেখা গেছে, বৃহত্তর চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অসাধু ব্যবসায়ীরা এর নকল কপি বের করেছিল। ফলে তারা আমাদেরকে ব্যবসাটা করতে দেয়নি।’

২০০৪ সালে প্রকাশিত হলো ইঞ্চি ইঞ্চি মাটি। সাউন্ড মিডিয়া এটি প্রকাশ করে। এরপর নিজেই প্রতিষ্ঠা করলেন ‘হলি মিডিয়া’। সেখান থেকে বের হলো ‘ইয়ে মেরা ওয়াতান’। এরপর ‘আবার যুদ্ধ হবে’, ২০১০ সালে এটি প্রকাশিত হলো।

কবি মুহিব খান সরল স্বীকারোক্তিতে জানালেন, ‘২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বেশ বড় একটা বিরতি, এ সময়ে আমার কোনো অ্যালবাম প্রকাশিত হয়নি।’ কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে, ‘আমি কখনো অ্যালবাম করার জন্য গান লিখতাম না। মার্কেট ধরে রাখার প্রবণতাও আমার ছিল না। ২০১০-২০১৫, এই পাঁচ বছর ধরে মানুষ আমার আগের গানগুলোই শুনছিল। আর এই পাঁচ বছরে আমি কুরআনের কাব্য অনুবাদ করেছিলাম। তাছাড়া এক সময় লিখনীতে খুব ব্যস্ত ছিলাম। সবমিলিয়ে গত ১৮ বছরে আমার অ্যালবামের সংখ্যা ছয়টি। আবার আমি বইও লিখেছি ছয়-সাতটি।

তামীম রায়হান: অল্প কথায় গত দেড় দশকে আপনার যা অর্জন—সেটাকে কীভাবে দেখেন?

মুহিব খান: অর্জন বা সাফল্যের হিসাব আমি অন্যভাবে করি। আমার যে চিন্তাভাবনা ও লক্ষ্য উদ্দেশ্য- সেই তুলনায় দশভাগ সাফল্য আমি অর্জন করেছি। গত দেড় যুগের বেশি সময়ে আমার ছয়টি বই ও ছয়টি অ্যালবাম—আমি জানি না, অন্যরা কী নজরে দেখেন। তবে আমি গুণগত মানকে গুরুত্ব দিয়েছি, সংখ্যাকে নয়। জোর করে কিছু করতে চাইনি। তবে এই দীর্ঘ সময়জুড়ে আমি আমার গতিপথেই ছিলাম, অন্য কোনো কাজে জড়াইনি। ২০০০ বা ২০০১ সালে আমার স্বপ্ন ছিল, আমি তরুণদেরকে শুধুই বিনোদিত করার জন্য কাজ করব না। আমার মনে হতো যে, আমার পেছনে বিপ্লব হাঁটে। আমার সঙ্গীত রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গীত।

মুহিব খান ফিরে গেলেন আরও পেছনে। তিনি বললেন, ১৯৯৮-১৯৯৯ সালে আমি যখন গান লিখি, যেগুলো ২০০০ সালের পর বাজারে আসে, আমি কিন্তু তখন লতা-পাতা ফুল নিয়ে লেখি নাই। তখন আমার একান্ত তারুণ্য ছিল। তখন আমি যা ভেবেছিলাম, তা এখন সবাই বলেন। কিন্তু তখন সবাই এভাবে ভাবেনও নাই, ভাবলেও বলেন নাই। তখন আমি এ প্রসঙ্গে লিখেছিলাম। বাংলাদেশের সাথে ইসলামের সম্পর্ক, ইসলামী অঙ্গনে তরুণদের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলা—এমন নির্দিষ্ট চিন্তাধারার উপর আমি আমার সঙ্গীত রচনা করতাম।

তামীম রায়হান: কিন্তু আপনি তো সেসময় পরিস্থিতির প্রভাবে ছিলেন। তখনকার দেশ ও বিশ্বের পরিস্থিতি সেরকম ছিল বলেই আপনি সেরকম কিছু লিখতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তাই নয় কি?

মুহিব খান: বিশ্ব পরিস্থিতির প্রভাব তো থাকবেই, শুধু প্রভাব না এটা তো দায়িত্বও। একজন কবির দায়িত্ববোধটা কী? কবি তো সাধারণ মানুষকে শুধু কল্পনায় ভাসালে হবে না, বরং মানুষ যে পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে তার করণীয় বা সে বিষয়ে তার বক্তব্য তুলে ধরাই তো কবির সাফল্য।

তামীম রায়হান: আপনি সবসময় একা একা কাজগুলো করেন..

মুহিব খান: একলা চলাটা অস্বাভাবিক নয়, এটা স্বাভাবিক। আমি একাই চলি। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কবি নজরুল ইসলাম, তাদের তো কোনো শিল্পীগোষ্ঠী বা সাহিত্য সংগঠন ছিল না। তারা একা ছিলেন, ভাবুক বা সাধক ধরণের মানুষ ছিলেন, নিজের কাজ করে গেছেন। আমি সেরকমই একজন। আমি তাদের পর্যায়ের কেউ না, কিন্তু আমার ডিজাইনটা এরকমই। সবাই কিন্তু সাংগঠনিক যোগ্যতাও রাখেন না।

তামীম রায়হান: কিন্তু আপনি তো দল গঠন করলেন..

মুহিব খান: একটা হচ্ছে সাংস্কৃতিক সংগঠন, আরেকটা হচ্ছে রাজনৈতিক প্লাটফর্ম। রাজনৈতিক চিন্তা এবং লক্ষ্য আমার শুরু থেকেই ছিল। এটা তারুণ্য থেকে আমার ভেতরে ছিল, আমি সেদিকেই এগিয়েছি। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দীর্ঘ সময় ধরে আমার যে কাজকর্ম, তা মূলত আমার রাজনৈতিক পথেই এগিয়ে যাওয়া। আমার এই দীর্ঘ সাংষ্কৃতিক পথ পরিক্রমায় যে বিপুলসংখ্যক মানুষ আমার সঙ্গে শ্রোতা হিসেবে, সমর্থক হিসেবে এবং অনুসারী হিসেবে এবং ভক্ত হিসেবে যুক্ত হয়েছেন, যাদের অনেকে এখন কৈশোর ও তারুণ্য পেরিয়ে যৌবনে রয়েছেন, তারা সঙ্গীতের পাশাপাশি আমার রাজনৈতিক দর্শন ও চেতনাটাও পেয়েছেন।

এবার মুহিব খান বেশ কিছুক্ষণ সময় নিজের রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনাল মুভমেন্ট’ নিয়ে কথা বললেন। তাঁর ভাষায়, ‘একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে আমি আমার দল গঠন করেছি। এটা খুব তাড়াহুড়োর বিষয় না। কারণ, আমাদের দেশ, জাতি, বিশ্ব পরিস্থিতি, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, ভারতের সঙ্গে আমাদের অবস্থান, আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত, ্এই দেশের গণমানুষের প্রকৃতি ও মুসলমানদের বৈশিষ্ট্য ও অবস্থান এবং করণীয় ও ভবিষ্যত—আমাকে এসব নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। এই ভাবনা দু-চার বছরের বিষয় না।

২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর এই দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। আত্মপ্রকাশ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তখন ছিল। এরপর দীর্ঘ সময় নিরব থাকারও দরকার ছিল। আমার নিরবতা আমার রাজনৈতিক কর্মসূচীর অংশ। ধীরে ধীরে এখন এই নিরবতা ভাঙতে থাকবে এবং আমার সংগঠন সক্রিয় হতে থাকবে।

এই নিরব থেকে আমি যা পেলাম, তা হলো—যে কথাটা সভা-সেমিনার করে লোকজনকে বুঝাতে হতো, যে আমরা এখন কোন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সামনে আমাদের কী হতে পারে, না হতে পারে, আশঙ্কা এবং সেখান থেকে উত্তরণের ধারণা বা তাগিদ মানুষের মধ্যে তৈরি করা, যাতে তারা এই সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় এবং এটিকে মুক্তির পথ মনে করে, সেটা আমার নিরবতা থেকে হয়ে গেছে। বাংলাদেশের চলমান অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাইরের হস্তক্ষেপ এবং প্রভাব মানুষ এখন এমনিতেই বুঝতে পারছে। যদি আমি এটা বুঝাতে চাইতাম এবং তখন সেটা বুঝাতে চেষ্টা করতাম, তবে সেভাবে হয়তো মানুষ বুঝত না। যেহেতু মানুষ কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তারা নিজেদের দলের কথাটাই বুঝেন, বাইরের কারো কথা তারা নিতে চান না।

দল গঠনের পর আমি ১৬ কোটি মানুষের জন্য ১৬ দফা দিয়েছিলাম। এই ১৬ দফায় সবিস্তারে দেশের ব্যাপারে আমার চিন্তা ও পরিকল্পনা যাদের কাছে পৌঁছেছে, তারা হয়তো পরবর্তী দু বছরে অনুভব করতে পারছেন, দু বছর আগে বিষয়টি বুঝতে কষ্ট হলেও এখন আমরা বুঝতে পারছি যে, এরকমই একটি পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত।

তামীম রায়হান: মানুষের, আপনার আশেপাশের লোকদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল সেসময়?

মুহিব খান: দলের আত্মপ্রকাশ ঘোষণা করার পর আমি কিছু ঘোলাটে প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলো গভীরভাবে বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেনি। তারা হয়তো ভেবেছে, দেশে আরেকটি ইসলামি দল হচ্ছে। ইসলামপন্থী কবি ও আলেম ব্যক্তি হিসেবে তারা আমার কাছে আশা করেছিলেন, অন্য কোনো দলের সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত হবো। তা না করে আমি ইসলামি দল করেছি; অথচ আমার এই দল ইসলামি দল না।

আরা যারা আমার দলটিকে ইসলামি দল মনে করেননি, বরং গণভিত্তিক দল ভেবেছেন, তাদের মনে তিন ধরণের প্রশ্ন এসেছে। কারণ, বাংলাদেশে বৃহৎ কোনো রাজনৈতিক শক্তির বাইরে নতুন কোনো থিমের উপর নতুন আরো একটি  রাজনৈতিক দল গঠন করা সম্ভব নয়। বড় বড় অনেক নেতা চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পারেননি। আমাদের এখন যে নেতারা সক্রিয় আছেন, যেমন ড.কামাল, বি চৌধুরী, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী—তারাও পারছেন না। এখনো একটা গোলটেবিল বৈঠক করতে গেলে লোক ভাড়া করে আনতে হয় তাদের।

ফলে একজন কবি মানুষ বা গায়ক শিল্পী আমাকে যারা মনে করেন (যদিও আমি গায়ক বা শিল্পী নই) তারা ভাবছেন, সংস্কৃতি থেকে এসে আমি রাজনীতিতে কী অবদান রাখব? কতোটুকুই বা কী করতে পারব? আমি হয়তো রাজনীতিটা বুঝি না।

আবার অনেকেই ভাবছেন, আমি হয়তো উনার সাংস্কৃতিক ভক্ত অনুরাগীদের স্রোত দেখে নিজেকে ‘লিডার’ ভাবতে শুরু করেছি। আমি হয়তো মনে করছি, এখন রাজনীতির নেতৃত্ব দিতে পারবো।

আসলে এই তিনটার কোনোটিই আমি কখনো ভাবিনি। প্রথমত, আমার ‘ন্যাশনাল মুভমেন্ট’ কোনো ইসলাম বা ধর্মভিত্তিক দল না। দ্বিতীয়ত, এটা গণভিত্তিক দল।

আমি তো রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। আমার লেখাপড়া রাজনীতিতে, আমার সংগীতজীবন যদি ধরি, তাহলে আমার সংগীতজীবনের থিম ছিলো দর্শন ও রাজনীতি। যারা সংগীতগুলো শুনেছেন, তারা বুঝেছেন এটা শুধু একটা গান না। কাজেই আমার ব্যাপক কাজ হয়েছে। আমি তো আসলে ‘হোমওর্য়াক’ করেছি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত প্রতিটা গ্রামে এবং পাড়ায় অল্প কয়েকজন লোক হলেও আমাকে ভালোবেসে চেনেন। তারা আমার অনুসারী। একজন কবি পারবেন কী পারবেন না, বা একজন কবি হলেই যে রাজনীতি অযোগ্য, বিষয়টা এমন না।

বেশ দীর্ঘ এই রাজনৈতিক বয়ান শেষে এবার কবি মুহিব খানের কাছে কিছু অন্য বিষয়ে জানতে চাইলাম।

তামীম রায়হান: আপনার ব্যস্ততার একটা জায়গা ছিলো সাপ্তাহিক লিখনী। এককথায় যদি জানতে চাই, লিখনী বন্ধ হবার পেছনে কী কারণ ছিলো?

মুহিব খান: দুইটা কারণ ছিলো। আসলে এখানে সময়ের ভালো ভালো সম্পাদক, লেখক, সাহিত্যিক ও অনেকে ছিলেন। কিন্তু কোনো দক্ষ ব্যাবস্থাপক ছিলেন না।

তামীম রায়হান: আপনি কেন হাল ধরলেন না?

মুহিব খান: আমি দক্ষ ব্যবস্থাপক নই, দক্ষ সম্পাদক। আমি লেখক ও সম্পাদক এবং আমি আমার দায়িত্ব ভালো করেই পালন করেছি। আরো যারা ছিলেন পরিচিত মুখ, তারাও ভালো লেখক-সম্পাদক, কিন্তু আমাদের মাঝে কোনো লিডারশিপ ছিলো না।

আরেকটা কারণ হলো অর্থসংকট, হয়তোবা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার জন্যই অর্থসংকট হয়েছিলো। একটা পত্রিকা দু-তিন বছর চলার পর আসলে অর্থসংকট থাকার কথা ছিলো না।

তামীম রায়হান: আপনার প্রতিষ্ঠিত হলি মিডিয়ার বর্তমান অবস্থা কী?

মুহিব খান: ২০০৭ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ১২ বছর হয়েছে। হলি মিডিয়ার আগামী অল্পকিছু দিনের মাঝে একটা অনলাইন পত্রিকা করার ইচ্ছা আছে। যার নাম হবে ‘হলি মিডিয়া ডট নিউজ’। ‘হলি মিডিয়া’ নামে একটা অনলাইর টিভি করারও ইচ্ছা আছে।

তামীম রায়হান: হলি মিডিয়া কি মুহিব খান ছাড়া অন্য কারো এ্যালবাম করে না?

মুহিব খান: হলি মিডিয়া আসলে আমার নিজের সৃষ্টিশীল কাজগুলো মানুষের মাঝে প্রচার করার একটা মাধ্যম মাত্র।

তামীম রায়হান: হলি মিডিয়া নিয়ে এত কিছু করার কথা বললেন, কিন্তু এতে কে বিনিয়োগ করবে? আপনার তো অর্থসংকটের একটা বাজে অভিজ্ঞতা আছে। ইসলামি ও সাধারণ ধারার সব মিডিয়া এই অর্থসংকটের মধ্যে পড়ে। আপনি এটা কিভাবে কাটাবেন?

মুহিব খান: এটা এখনো আমার প্রক্রিয়াধীন ও বিবেচনাধীন প্রকল্প।

তামীম রায়হান: ইসলামিক কালচারাল ইনস্টিটিউট নামে যে ট্রেনিং সেন্টার করেছিলেন, সেটি কেন বন্ধ হয়ে গেলো?

মুহিব খান: আমি সেটাও ২০০৭ সালে শুরু করেছিলাম। তার বয়স প্রায় ১ যুগ হতে চলেছে। ইসলামিক কালচারাল ইনস্টিটিউট (আইসিআই) পল্টনে কার্যক্রম পরিচালনা করতো। ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলার পর আসলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে এর কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলাম ও  ইসলামি দলগুলোর অফিস পল্টনে হওয়ার কারণে তারা শুক্রবার বিভিন্ন সভা-সমাবেশ করতো। বিশেষ করে শুক্রবারে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার ছেলেদের জন্য পল্টন নিরাপদ জায়গা ছিলো না। সে কারণেই আমি আমার এই কালচারাল সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হই।

তামীম রায়হান: লিখনী থেকে শুরু করে আইসিআই, এই যে আপনার তারুণ্যের সময়ের বিভিন্ন উদ্যোগ যেগুলো থেমে আছে, এর কারণে কি আপনি হতাশ হন? এই বিষয়গুলো নিয়ে কি আপনি প্রশ্নের সম্মুখীন হন? নিজের কাছে বা অন্যদের কাছে?

মুহিব খান: মানুষের মনে বিভিন্ন প্রশ্ন থাকতে পারে এবং অনেকেই এসব প্রশ্ন করেন, তবে আমি আমার কোনো কাজ নিয়ে হতাশ নই।

তামীম রায়হান: কিন্তু আপনি সবার জন্য কিছু শুরু করার পর সেটা তো শুধু আপনার থাকে না, অনেকে এর সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

মুহিব খান: হ্যাঁ, সেটা তখন সবার হয়ে যায়। আশা করি সেটা আবারো হবে। ২০১৯ সালের ভিতরে ইনশাআল্লাহ আমার ইসলামিক কালচারাল ইনস্টিটিউটকে নতুন ইউনিক নামে নিয়ে আসছি ইসলামিক ইনস্টিটিউট। এটার দুটি শাখা থাকবে। একটা ইসলামিক কালচারাল ইনস্টিটিউট। অন্যটা ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট। আশা করি এটা রমজানের পর থেকে চালু হবে। আমি এটাকে খুব সমৃদ্ধ একটা প্রতিষ্ঠান করতে চাচ্ছি। সেই লক্ষ্য ও পদ্ধতি নিয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছি।

তামীম রায়হান: এই ইনস্টিটিউট চালাতে কি দক্ষ জনশক্তি পাবেন, নাকি তৈরি করে নেবেন?

মুহিব খান: ইনশাআল্লাহ, পাবো।

তামীম রায়হান: আপনি কি মনে করেন, ইসলামি ঘরনায় এমন ইনস্টিটিউটে পড়ানো বা চালানোর লোকবল আছে?

মুহিব খান: আছে। যখন আমি  ইসলামিক কালচারাল ইনস্টিটিউটে ১২ থেকে ১৬টি বিষয়ে পাঠদান শুরু করেছিলাম তখন অর্থাৎ ২০০৭-২০০৮ সালে আমাদের মাঝে আসলে তেমন যোগ্য লোক ছিলো না। বিশেষ করে ক্যালিগ্রাফি বা চিত্রকল্প শিখাবেন, এমন লোক ইসলামি ঘরনায় ছিলো না। এখন লেখক-সাংবাদিক, সাহিত্যিক অনেক তৈরি হয়েছে। গত কয়েক বছরে হয়েছে। আশা করি এখন সব বিষয়ে যোগ্য লোকের অভাব হবে না। আমার রিসার্চ ইনস্টিটিউটে দাওরা, কামিল, ইসলামিক স্টাডিজে অর্নাস ও মাস্টার্স শেষ করে একটা ছেলে আবাসিক সুবিধাসহ ১ বছরের একটা কোর্স করে নিজেকে আরো যোগ্য করে তুলতে পারবে।

তামীম রায়হান: অনুমোদিত একাডেমিক ধারার পড়ালেখার বাইরে সরকারি অনুমোদনবিহীন এমন কোর্সের আসলে কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে?

মুহিব খান: আমি মনে করি, যোগ্যতা থাকে। গ্রহণযোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক, একটা ছেলে মাদরাসা থেকে দাওরা শেষ করে ইমাম বা মুআজ্জিন হওয়ার কথা ছিলো, সে এখন এই কোর্স করে অনেকগুলো বিষয়ের উপর মৌলিক ধারণা ও দক্ষতা অর্জন করবে। আমি বাংলাদেশে এই ধরনের কোর্স কাউকে করতে বা প্রকাশ করতে বা বাস্তবায়ন করতে দেখিনি।

তামীম রায়হান: আশেপাশে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে কোনো দেশে দেখেছেন?

মুহিব খান: আশেপাশের দেশে এমন প্রতিষ্ঠান আছে কিনা, তা নিয়ে আমি খুব একটা গবেষণা করি নাই। আমার জানা নেই, ভারত বা পাকিস্তানে এমন ইনস্টিটিউট আছে কিনা। এই জন্য আমি ‘উপমহাদেশে অন্যতম বাংলাদেশে প্রথম’ কথাটি আমার প্রচারপত্রে লেখার সাহস পেয়েছি।

এই ইনস্টিটিউটে যেসব বিষয় শেখানো হবে, এর মধ্যে রয়েছে: কোরআন ও উলুমুল কোরআন, হাদিস ও উলুমুল হাদিস, ফিক্হ ও উলুমুল ফিক্হ, সিয়ার ওয়া তাওয়ারিখ, ভূগোল ও বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সংস্কৃতি, সমাজ রাষ্ট্র ও রাজনীতি বিজ্ঞান, আইন ও বিচারব্যবস্থা, দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা, অর্থনীতি ও বাণিজ্য, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, ভাষা সাহিত্য ও সাংবাদিকতা।

তামীম রায়হান: আজকের এই আধুনিক সময়ে আপনি কি মনে করেন যে, দীর্ঘ অনেকগুলো বছর পড়াশোনা করার পর আবার একজন মানুষের এই সবগুলো বিষয় শেখার প্রয়োজনীয়তা আছে?

মুহিব খান: আসলে এটাকে আমি প্রয়োজন বলছি না, বলছি একটা সুযোগ।

তামীম রায়হান: এক বছরের মাঝে এতগুলো বিষয়ে ধারণা নেওয়া কি সম্ভব?

মুহিব খান: আপনার সামনে বিভিন্ন বিষয় আছে। আপনার ইচ্ছামতো বিষয়ে আপনি দক্ষ হতে পারবেন। আপনি যদি দক্ষ হতে চান তাহরে ১২টা বিষয় থেকে বেছে আপনি চাইলে ৪টা বিষয়েও দক্ষ হতে পারেন। আমি মনে করি, একজন মানুষের এই বিষয়গুলোতে মৌলিক ধারণা থাকা দরকার যদি সে সমাজকে নেতৃত্ব দিতে চায়। কারণ, আমি যে বিষয়গুলো দিয়েছি, কেউ যদি অমনোযোগী ছাত্র হিসাবে কিছুটাও গ্রহণ করতে পারে, তাহলে বাস্তব জগতে সে গ্রহণযোগ্য হবে। তার আলাদা একটা গুরুত্ব থাকবে। তার শক্তি, সাহস, সামর্থ্য, দৃষ্টিকোণ ও মানসিকতায় অনেক পরিবর্তন আসবে। একজন মানুষ আলেম হওয়ার পর কিছুতেই যেন হীনম্মন্যতায় না ভুগে। সে যখন দেখবে সব বিষয়ে তার ধারণা আছে তখন তার নিজের মাঝে আলাদা একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে।

তামীম রায়হান: আপনার ভক্তদের বিরাট একটা অংশ কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থী। আপনি কি অনুভব করেন যে এই ছেলেরা একটা বিরাট নেতৃত্বশূন্যতায় ভুগছে?

মুহিব খান: হ্যাঁ, অবশ্যই আমি এটা মনে করি। আমি আমার কাজের প্রথম থেকেই এটা অনুভব করছি। আমার কাজের বয়স ১৮ বছর। এই ১৮ বছর ধরেই জানি যে এই তরুণরা নেতৃত্বহীনতায় ভুগছে। তাদের মধ্যে কেউ বুঝে, অনেকে তাও বুঝে না। অনেকে না বুঝে অযোগ্য নেতৃত্বের পেছনে পড়ে আছে।

তামীম রায়হান: কেন এই নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না?

মুহিব খান: একটু সময় তো লাগবেই।

তামীম রায়হান: আপনার সামনে গত দেড় দশকের বেশি সময়ে একটা সমাজ নেতৃত্ব তৈরি করতে পারলো না, এটা কেমন করে দেখেন? বা অনেকে আপনাকে সেই জায়গায় কল্পনা করতো, আপনি কি সেটা টের পেতেন?

মুহিব খান: হ্যাঁ, জানি।

তামীম রায়হান: আমি যদি বলি, আপনি এখন সেই অবস্থানে নেই। আপনার ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তনের কারণে কিংবা কখনো আপনি সরব কখনো নিরব, আবার কখনো প্রকাশ্যে কখনো অপ্রকাশ্যে; এসব কারণে—আরও স্পষ্ট করে যদি বলি, আপনার রুটিরুজি বা ব্যাক্তিগত উপার্জনের তাগিদে আপনি বারবার সরে গেছেন?

মুহিব খান: না, আমি সেটা মনে করি না।

তামীম রায়হান: ২০০০ সালে কবি মুহিব খান যে ভালোবাসা পেতেন, এই ২০১৯ সালে এসে কবি মুহিব খানকে আজকের তরুণরা সেই ভালোবাসাটা দেয়?

মুহিব খান: আমি মনে করি, আমাকে আগের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি ভালোবাসা দেয় আজকের তরুণ প্রজন্ম। আমি এটা বাস্তবে পাই, এটা আমার কল্পনা না।

তামীম রায়হান: কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন কথা বলে। তখন আপনার এতো সৃষ্টি প্রকাশিত হতো বা এতো ব্যস্ততা থাকতো, সে কর্মব্যস্ততা এখন আর নেই আপনার।

মুহিব খান: আসলে ২০০০ সালে আমাকে মানুষ ভালোবাসতো গায়ক বা শিল্পী হিসাবে। আমার গান শুনতে ভালো লাগে এই জন্য। আর এখন তারা শুধু আমাকে শোনে না, আমাকে ভাবে। তারা আমাকে চিন্তা করে। তারা তাদের কোনো একটা আশা-আকাঙ্ক্ষার জায়গায় আমাকে বসায় এবং সেই অপেক্ষায় তারা আছে। তাদের মাঝে সেই বিশ্বাস আছে, আমি সেই পথেই এগিয়ে যাবো। আর তারা আমাকে সেই পথেই পাবে। আমি সেটা বিশ্বাস করি।

তামীম রায়হান: আপনার আগামী কয়েক বছরের পরিকল্পনা কী?

মুহিব খান: ইসলামিক ইনস্টিটিউট চালু করা। হলি মিডিয়াকে কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসাবে নতুন করে চালু করা। আর আমার রাজনৈতিক যে চিন্তাটা আছে সেটাকে এখন দৃশ্যমান করা এবং দেশব্যাপী এর প্রচার করা।

তামীম রায়হান: এই সময় আর সমাজ আপনার রাজনৈতিক চিন্তা প্রতিকূলে নাকি অনুকূলে?

মুহিব খান: আমি মনে করি, সময় ও সমাজ আমার পক্ষে থাকবে। কারণ, এখানে বিষয় হলো, আমি যাদের জন্য কাজ করবো, যাদেরকে নিয়ে কাজ করবো তারা কাজের প্রয়োজন কতটা অনুভব করছেন—এটাও একটা বড় নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ। একজন নেতার চ্যালেঞ্জ থাকে। নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ কী? যে জাতির জন্য সে কাজ করবে, তারা এখন কী কী সমস্যায় আছে, তাদের আসলে কেমন থাকার কথা ছিলো অথচ নেই, সেটা হওয়া যে দরকার এবং এই অবস্থা থেকে তাদের মুক্তি দরকার—সেটা কিভাবে সম্ভব, এই বিষয়গুলো জাতিকে বুঝাতে তার ৮০% শক্তি সার্মথ্য ও সময় চলে যায়। এটা মানুষকে বুঝাতে পারার পর বাকি ২০% কাজ মানুষ নিজে থেকে তাকে সঙ্গ দেয়, বলে দেয় কী করতে হবে।

তামীম রায়হান: আপনি আপনার ভক্তদের সাথে কিভাবে যোগাযোগ করেন?

মুহিব খান: আমি এখন সরাসরি গণসংযোগ করছি। তাছাড়া সামাজিক মাধ্যম ও আমার বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেও যোগাযোগ করছি।

তামীম রায়হান: এসব অনুষ্ঠানে আপনি কথা বলেন, কিন্তু আপনি তো সবার কথা শুনতে পারেন না, সবাই আপনার কথা শুধু শোনে।

মুহিব খান: ভক্তদের কথা আমি সামাজিকমাধ্যমের মারফতে জানতে পারি। ব্যাক্তিগতভাবে যারা প্রতিনিধিত্ব করে, প্রতিনিধিত্বশীল তরুণরা কোটি কোটি না, লাখ লাখ না। তারা শত শত, বড়জোড় হাজার; তারা নিজেরা আমার সাথে যোগাযোগ রাখে এবং সারা বাংলাদেশে প্রতিটা জেলায় এবং থানায় রাজধানীর প্রবেশ ও নির্গমন পথের যে ৪ দিক আছে সেখানকার অনেকেই আমার সংগঠনে যুক্ত হবার জন্য সংগঠনকে কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া জন্য তৈরি হয়ে আছে। তারা ওলামা, তারা জনতা, তারা সাধারণ শিক্ষিত, তারা তরুণ—তারা সবাই প্রস্তুত হয়ে আছে। তারা আমাকে তাগিদ দিচ্ছে, কবে থেকে এর কার্যক্রম শুরু হবে, সেই অপেক্ষায় আছে।

তামীম রায়হান: এই রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় কাকে আপনি আদর্শ হিসাবে ধারণ করেন?

মুহিব খান: আমি আসলে একটা বিকল্প রাষ্ট্র চিন্তা দিতে চাচ্ছি। আমি শুধু রাজনৈতিক দল দিতে চাচ্ছি না। কাজেই আমার হোমওর্য়াক অনেক। আমার অনেক গবেষণা করতে হবে। আশা করি সামনে এগুলো বই আকারে বের করতে পারবো।

তামীম রায়হান: আপনি যে রাষ্ট্রচিন্তা তুলে ধরতে চাইছেন, সেটা আপনার সংগীতে বা লেখালেখিতে দেওয়াটা যথেষ্ট ছিল না?

মুহিব খান: আমি যথেষ্ট মনে করি, না।

তামীম রায়হান: উদাহরণ হিসেবে যদি বলি, কবি ইকবাল কি তার রাষ্ট্রচিন্তা জানানোর জন্য দল করেছিলেন?

মুহিব খান: না, তিনি দল করেননি। তবে এর মানে এই নয় যে, তার দল করা নিষেধ ছিলো।

তামীম রায়হান: কিন্তু তিনি দল না করেও তাঁর সৃষ্টি ও কর্মে সফল হয়ে আছেন। দল করলে কী তিনি  একটি দেশের কবি বা একটি জাতির কবি হিসেবে আজকের অবস্থানে থাকতে পারতেন বলে মনে করেন?

মুহিব খান: বিষয়টা হলো, কবি ইকবালের রাষ্ট্রচিন্তা বাস্তবায়ন করতে পারবেন—এমন নেতৃত্ব তার সামনে ছিল বা তার তেমন লোক জানা ছিল। কিন্তু আমার মনে হয়, আমার কাজ আমাকেই এগিয়ে নিতে হবে। বর্তমানের রাজনৈতিক নেতারা আমার রাষ্ট্রচিন্তা বুঝবেন বা সফল করতে এগিয়ে আসবেন, এমন আস্থাশীল নেতৃত্ব আমি দেখছি না।

তামীম রায়হান: আপনার বর্তমান বয়স কত?

মুহিব খান: ৪০ হতে চলেছে।

তামীম রায়হান: এই চার দশকের কোনো একটি দশককে যদি আপনি আবার ফেরত পেতে চান, তবে সেটি কোন দশক?

মুহিব খান: আমি আসলে অতীত থেকে কিছুই ফিরে পেতে চাই না। আমার মনে হয় না, আমি পিছনে গেলে এখনকার চেয়ে আরো ভালো কিছু করে আসতে পারতাম। আমি আমার বোধ ও মেজাজ মোতাবেক আমার সময়টুকু পার করেছি। আমার ভুল হয়েছে বা আমি কম কাজ করেছি কিংবা আরো বেশি কিছু করতে পারতাম—এমন কখনো মনে হয় না। আমি আমার কাজটা বুঝে শুনে করছি। যখন আমি নিরব থাকি, আমি তখনো কাজ করি। নিরব থাকাটাও আমার একটা কাজ। আমি যখন কাজ করি না, সেটাও আমার একটা কাজ। ইচ্ছা করেই আমি তখন কাজ করি না এবং সেটার ফলাফলও আমি পাই।

তামীম রায়হান: যারা এখন কওমি মাদরাসায় পড়ালেখা করছে, তাদের উদ্দেশ্য কী বলবেন? বিশেষ করে যাদের বয়স ২০-২৫ বা যারা প্রায় পড়াশোনার শেষের দিকে কিংবা কর্মজীবনে প্রবেশ করতে চাচ্ছেন?

মুহিব খান: তাদের উদ্দেশ্য বলব, নিজেদের পথ ও পরিকল্পনা বুঝে নেওয়ার মতো বয়স হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আমাদের অঙ্গনের যে বাস্তবতা, এসব বিষয়ে খুলে বলার মতো খুব একটা প্রয়োজন নেই। তারা অনেক কিছু দেখছেন এবং বুঝছেন। এখন তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার—আমরা কী দেখলাম, আমাদের কী করা দরকার।

তামীম রায়হান: এই সিদ্ধান্তটা কী হতে পারে?

মুহিব খান: আমি আসলে এতোটা খোলামেলা বলবো না। তবে এটাই বলবো, নেতৃত্ব বুঝে নিতে হবে। এটা ইসলাম ও জাতীয় স্বার্থের জন্য বুঝে নিতে হবে। যদি রাজনীতির কথা বলি, তাহলে রাজনীতিতে নেতৃত্ব বুঝে নিতে হবে। আবেগ ও হুজুগ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মন মস্তিষ্ক ও দৃষ্টিভঙ্গিকে উদার করতে হবে। আধুনিক চিন্তা-চেতনা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে সুসর্ম্পক গড়ে তুলতে হবে। গণমানুষের সাথে সখ্যতা ও আত্মীয়তা গড়ে তুলতে হবে। নিজেদেরকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন শ্রেণী হিসেবে আলাদা করে রেখে জাতীয় চিন্তা করার কোনো সুযোগ নাই। আসলে তা থাকেও না। আজকে হোটেল শ্রমিকরা তাদের আন্দোলন করছে, ট্রাকচালকরা আন্দোলন করছে, আলেমরা আন্দোলন করছে, এটাকে আমরা শ্রেণি সংগ্রাম বলতে পারি। বাংলাদেশের ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোকে—যদিও আমি সবাইকে খাটো করছি না—তবে অধিকাংশেরই অবস্থান এমন যে, এটা শ্রেণী সংগ্রাম। এটিকে জাতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বলা যায় না।  জাতীয় রাজনৈতিক দলও বলা যায় না। শ্রেণী সংগ্রাম, গোষ্ঠী সংগ্রাম আর জাতীয় রাজনীতির মধ্যে অনেক তফাত।

তামীম রায়হান: এর অর্থ হলো, আপনি বুঝাতে চাইছেন, বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতি একটা শ্রেণী সংগ্রামের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছে?

মুহিব খান: হ্যাঁ, অনেকাংশেই।

তামীম রায়হান: এতক্ষণ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মুহিব খান: তোমাকেও ধন্যবাদ।

 

মার্চ 2018

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১