ডায়েরি মানে স্মৃতির সাতকাহন। ডায়েরি মানে ঐতিহাসিকের বিশ্বস্ত ভূমিকা। জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর সুখ-দুঃখ কিংবা বেদনার আখ্যান মানেই ডায়েরি। একজন ডায়েরি-লেখক নিজের জীবনবৃত্তান্ত নথিবদ্ধ করতে করতে, দৈনিকের কাহিনিগুচ্ছ লিখতে লিখতে এক সময় মনের অজান্তেই মস্ত লেখক হয়ে ওঠেন। পৃথিবীতে মনে হয় এমন কোনো লেখক পাওয়া যাবে না, যিনি এক সময় ডায়েরি লিখেননি। বিখ্যাত সব লেখকের জীবনকাহিনি পড়তে, তাঁদের লেখা স্মৃতিগদ্য আওড়াতে বড় ভালোই লাগে। এদেশের কওমি ঘরানার বর্ষীয়ান লেখক মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ। তাঁর জীবনের প্রথম রোজনামচা পড়েছি। তিনি নিজেই এক জায়গায় লিখেছেন, তিনি মাটির কলসিতে টাকা জমাতেন। একরাতে স্বপ্নে দেখেন, চোর এসে সবক’টা টাকা কলসিসুদ্ধ নিয়ে যাচ্ছে। তিনি চোরকে নিষেধ করলে চোর বেচারা কলসিটা রেখে চলে যায়। এই স্বপ্নটাকে তিনি লিখেছেন, ‘চোর আসল, আমার জমানো টাকায় হাত দিল। নিয়ে যেতে লাগল। আমি বললাম নিয়েন না। সে রেখে চলে গেল।’
তখন তো তিনি ভালো লিখতে পারতেন না। নিতান্ত ছোট ছিলেন। কিন্তু কথা কয়টা পরে যখন ডায়েরি খুলে দেখতে পেলেন, কত খুশি লেগেছে তাঁর কাছে!
আমার নিজের কথাই বলি। তখন দু হাজার সাত কি আট সাল। পড়ালেখা সবেমাত্র শুরু করেছি। রাজধানীতে। সাথীসঙ্গী সকলে রোজনামচা লেখে। দৈনিক অভিধান ঘাঁটে, শব্দ শেখে, রাত দশটার পর সমালোচনায় বসে। তাদের সঙ্গে আমিও যোগ দিলাম এসব কর্মযজ্ঞে। সেই সুবাদে ডায়েরি লেখার সূচনা। প্রতিদিন ডায়েরি লিখি। লেখা শেষ হলে মনের ভেতরে একটা আনন্দের উদ্রেক হয়। মনোজগতজুড়ে উল্লাস খেলা করে। কী যেন আবিষ্কার করতে পেরেছি—এমন লাগে। পরম পুলকিত হই। পরের দিনের লেখার অপেক্ষায় থাকি। দৈনন্দিনের ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা, কারও সাথে বাদানুবাদ হলে, হুজুর প্রহার করলে—সব ডায়েরিতে তুলে ধরি আর পরম তৃপ্তিবোধ করি। এভাবে চলতে থাকে দীর্ঘদিন। হতে হতে আজকে ১০ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। এর মধ্যে চার পাঁচটা ডায়েরি সমাপ্ত হয়ে গেছে।
নবধ্বনির ফেসবুক পেজে দেখলাম, ফেব্রুয়ারি সংখ্যার প্রতিপাদ্য বিষয় ডায়েরি। আলমারি থেকে তালাশ করে প্রথম লেখা ডায়েরিটা বের করলাম। এতদিনে ডায়েরিগুলোর কোনোটা দেখলাম উঁইপোকা খেয়ে ফেলেছে, কোনোটার পাতাগুলো জেল কালি দিয়ে লেখার দরুণ কালো হয়ে গেছে, পড়ার জো নেই। প্রত্নতত্ত্ববিদদের দিয়ে গবেষণা করালে হয়তো বোঝা যেতে পারে কী লিখেছিলাম। কমদামি ডায়েরি হওয়ায় কোনোটার দুই পৃষ্ঠা এক সাথে লেগে গেছে। কলমের কালি আর্দ্র হয়ে একাকার হয়ে গেছে।
পুরোনো ডায়েরিগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে একটা রোজনামচা চোখে পড়ল। মোটামুটি পড়া যায়। আমার সবচেয়ে আনন্দমাখা দিনিলিপি ছিল এটা। হুবহু তুলে দিচ্ছি—
‘হিফজখানায় পড়া শেষ। আনুষ্ঠানিক পাগড়ি দেয়া হচ্ছে না। কারণ, মাদরাসার মাহফিল হয় না অনেক বছর। তাই সভাপতির আয়োজনে কমিটিবৃন্দের উপস্থিতিতে পাগড়ি প্রদান করা হচ্ছে। সে দিনের আনন্দ এবং হিফজ সমাপ্তির উচ্ছ্বাস আমার আর ধরছিল না। এর কারণ হলো, হিফজখানা একটা বন্দীখানার নামান্তর। জোর করে পড়ানো, ইচ্ছার বাইরে কিছু করতে না পারা, ভোর রাতে ঘুম ভেঙে ওঠা—এসব আজকে থেকে হবে না। এসব কিছু থেকে রেহাই পাচ্ছি। আমার পাগড়ির আনন্দ কেবল এজন্যই। এর চেয়ে বেশি কিছু পাগড়ির মর্ম তখন আমি বুঝতাম না।’
এটা হলো আমার ডায়েরিতে লেখা সবচেয়ে আনন্দময় রোজনামচা। সেই ডায়েরিটার অনেকাংশ উঁইপোকা খেয়ে ফেলেছে। কয়েক পাতা দেখলাম ছিঁড়েও গেছে। হাতে তুলে প্রিয় ডায়েরিটায় চুমু খেলাম। আহ, কাগজের পাতা এভাবেই বুঝি স্মৃতিকে আটকে রাখে! ঐতিহাসিকতাকে জিইয়ে রাখে!
কটিয়াদী, কিশোরগঞ্জ থেকে
ফেব্রুয়ারি 2019

