কুড়িয়ে পাওয়া ডায়েরি এবং কিছু স্মৃতি

সংখ্যা:

 

‘মিম, এটা কিসের প্যাকেট রে?’

‘খুলেই দেখো না!’

প্যাকেটটা খুললাম এবং আনন্দে ও বিস্ময়ে অভিভূত হলাম। ভেতরে একটা খয়েরি রঙের ডায়েরি, সাদা রঙের পাথরের একজোড়া কানের দুল আর একটা গোলাপি রঙের রুমাল। তাতে আকাশি রঙের সুতোয় নকশা করে আমার হিফজ শেষ করার তারিখটি লেখা। জিনিসগুলো পাঠিয়েছে সাদিয়া। একসময় ওর সঙ্গে আমার সবক নিয়ে প্রতিযোগিতা চলত খুব। তবে ও অসুস্থতার কারণে অধিকাংশ সময় বাড়িতেই থাকত। এজন্য কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলো। আমার হিফজ শেষের খবর শুনে মিমের (তার ফুফাতো বোন) কাছে জিনিসগুলো পাঠিয়ে দিয়েছে।

রাতে ঘুমোনোর আগে ডায়েরিটা নিয়ে বসলাম। প্রথম দিকের কয়েক পৃষ্ঠায় আমাকে উদ্দেশ্য করে কিছু উপদেশবাণী লেখা আছে। ওগুলো পড়লাম। তারপর বেশ কিছুক্ষণ লেখার চেষ্টায় কলম কামড়া-কামড়ি করলাম। কিন্তু নাহ! একটা লাইনও লিখতে পারলাম না। ছোটবেলা থেকেই আমার ডায়েরির খুব শখ ছিলো। মাঝে মাঝে আম্মুকে দেখতাম, শক্ত মলাটে বাঁধা একটা লাইনটানা খাতায় কী যেন লিখতেন। যখন একটু বড় হলাম, জানলাম, ওটাকে ডায়েরি বলে। আমার ইচ্ছে করত আম্মু কী লিখছেন, দেখি। তবে তখনও শুধু দূর থেকেই দেখতাম। ওটা ছোঁয়ার অনুমতি ছিল না কখনও।

তারপর যখন আরও একটু বড় হলাম, একদিন ডায়েরিটা পড়ার অনুমতি পেয়ে গেলাম। আর অবাক বিস্ময়ে আমার চিরচেনা আম্মুকে আরো নতুন করে আবিষ্কার করলাম। ওটাতে যত্ন করে তুলে রাখা ছিলো আম্মুর না-বলা কষ্ট, আবেগ, ভালোলাগা, মন্দলাগা—সবকিছু। সেই সঙ্গে আমার শৈশবের আলো-ঝলমল দিনগুলোও।

ঠিক তখন থেকেই ইচ্ছে ছিল ওরকম একটা ডায়েরির মালিক হওয়ার। যেটা হবে আমার একান্তই নিজের একটা জগৎ। আমার ভালোলাগা মন্দলাগাগুলো মলাটবদ্ধ হবে সুন্দর একটা খাতায়। এর আগে আমার আর সাদিয়ার আলাদা করে একটা খাতা ছিল। দশ টাকা দামের সাদা একদিস্তা কাগজ সুতো দিয়ে সেলাই করা। ওটাতে আমরা কবিতা সংগ্রহ করতাম। আদর্শ নারী, কিশোর কন্ঠ—এ ধরনের পত্রিকার যে কবিতাগুলো পছন্দ হতো, টুকে রাখতাম।

ওর দেওয়া ডায়েরিটা হাতে পেয়ে অন্যকিছু লেখার কথা ভাবলাম। কিন্তু অনেক রাত অবধি জেগেও কিছু না-লিখতে পেরে সেদিনের মতো ডায়েরিটা তুলে রেখে ঘুমোতে গেলাম। ঠিক তার পরদিনই নতুন একটা জিনিস পেয়ে খুশিতে আটখানা হয়ে গেলাম। রুম ঝাড়ু দিয়ে ময়লা ফেলতে গিয়েছি মাদরাসার বড় ডাস্টবিনটাতে, হঠাৎ দেখি একপাশে স্তুপ করা কাগজের মধ্য থেকে মোটা একটা জীর্ণ-শীর্ণ খাতা উঁকি দিচ্ছে। হাতে নিয়ে বুঝলাম, ওটা একটা পরিত্যাক্ত ডায়েরি। ততক্ষণাৎ ময়লা সরিয়ে ঝেড়েমুছে ওটাকে বগলদাবা করলাম। কামরায় ফিরে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে ডায়েরিটা খুললাম। যদিও তখন জানতাম, কারও ব্যক্তিগত জিনিসে অনুমতি ছাড়া হাত দেয়া একদম উচিত নয়, তারপরও সেদিন কৌতূহলের কাছে হার মেনেছিলাম। ভেবেছিলাম, ফেলেই তো দিয়েছে। এখন এটা দেখলে কী এমন ক্ষতি হবে?

পড়া শুরু করলাম। পাতার পর পাতা উল্টাচ্ছি আর চোখদুটো গোলগোল হয়ে যাচ্ছে। আরে, এ সবই তো আমার মনের কথা! শেষের কয়েকটা পৃষ্ঠা পানি পড়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাই আর শেষ পর্যন্ত পড়া হয়নি। ডায়েরিটা ছিল দু’হাজার তিন-চার সালে লেখা। আর আমি পড়েছিলাম দু’হাজার দশে। শুধু পড়িইনি বরং সিমি আপুর অনুকরণে লিখতেও শুরু করেছিলাম। সিমি আপু হলো আমাদের বাড়িওয়ালার মেয়ে। মানে, যে বাসাটা ভাড়া নিয়ে আমাদের মাদরাসা করা হয়েছিল, তার মালিকের মেয়ে। নিচের দু’তলা মাদরাসা আর তিন তলায় সিমি আপুরা থাকত। ওদের সঙ্গে আমাদের খুব একটা দেখা হতো না। হঠাৎ দু-একদিন বাইরের গেটে দেখা হলেও কথা হতো না কখনো।

ডায়েরিটা লেখা সিমি আপু যখন ক্লাস নাইন-টেনে পড়ে তখনকার। আর আমি যখন পড়ি তখন আপু ঢাকায় ভার্সিটিতে পড়ত।

পরে অনেকবার ভেবেছি অনুমতি ছাড়া ডায়েরি পড়ায় সিমি আপুকে স্যরি বলব। কিন্তু তারপর আর কখনো দেখা হয়নি সেভাবে। আর দেখা হলেও বলার সাহস পাইনি। তারপর অনেকগুলো ডায়েরির মালিক হয়েছি আমি। ডায়েরির সাদা বুকে নিয়মিত আঁকিবুকিও করেছি অনেক। কিন্তু কুড়িয়ে পাওয়া সে ডায়েরির কথা কখনও ভুলতে পারিনি। ছাড়তেও পারিনি ওটাকে। যত্ন করে রেখে দিয়েছি বুক শেলফে। মাঝে মাঝে পুরোনো ডায়েরিটা খুলে পড়ি, আর মিটিমিটি হাসি। সিমি আপু হয়তো কখনো জানতেও পারবেন না যে তিনি এক কিশোরীর জীবনে ‘আনা ফ্রাঙ্ক’ হয়ে এসেছিলেন।

 

কামারগাড়ি, বগুড়া থেকে

 

ফেব্রুয়ারি 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১