বিখ্যাত কিছু ডায়েরির গল্প

সংখ্যা:

কিছু কথা কাউকেই বলা যায় না। এমনকি নিজের প্রিয় মানুষদেরও না। মনের গোপন কুঠুরিতে থাকা সেসব কথা মনের ভেতরেই গুমরে মরে। কিন্তু মনের কথা আটকে রাখতে পারে না মানুষ। কাউকে না কাউকে জানাতে হয়। না জানিয়ে শান্তি নেই। কাউকে বলে কোনো লাভ হোক বা না-হোক, বললেই যেন স্বস্তি পাওয়া যায়। কিন্তু যখন চারপাশের সবাইকে অবিশ্বস্ত মনে হয় এবং মনের কথা বলার মতো কাউকেই পাওয়া যায় না তখন একমাত্র কাগজই হয়ে ওঠে মানুষের বিশ্বস্ত বন্ধু।

এভাবেই হয়েছে ডায়েরি লেখার সূচনা। কিন্তু সূচনাটা ঠিক কবে থেকে, তার সঠিক তথ্য জানা সম্ভব না। কারণ ডায়েরি নিতান্ত গোপনীয় বিষয়। তাই প্রথম কবে থেকে ডায়েরি লেখা শুরু হয়—সে কথা কে বলতে পারে। তবে ঠিক ডায়েরি না-হলেও ডায়েরির মতো করে প্রাচীন যুগ থেকে অনেক কিছু লেখা হয়েছে। আগের দিনে রাজা-বাদশাহদের দরবারে পণ্ডিতরা থাকতেন, নানা ঘটনা তাঁরা লিখে রাখতেন। সেসব আজ ইতিহাসের অন্যতম সূত্র। এইসব দিনপঞ্জিতে ডায়েরির মতো তারিখ নিখুঁতভাবে উল্লেখ করা হতো না। তবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তারিখ লেখা হতো। এসব দিনপঞ্জিকেও আজকের ডায়েরির প্রাচীন সংস্করণ বলা যায়।

ডায়েরি ও আত্মজীবনী খুব কাছাকাছি। ডায়েরিতে সন-তারিখ দিয়ে দিনের ঘটনা দিনে লেখা হয়। আত্মজীবনীতে লেখা হয় স্মৃতির ডায়েরি থেকে। সেখানে দিন-তারিখ উল্লেখ থাকে না। তবে দুটোই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বাস্তব আখ্যান।

সুলতান মাহমুদ গজনবির দরবারের বিখ্যাত পণ্ডিত ছিলেন ফারিশতা। সুলতান মাহমুদের নানা বিজয়ের আখ্যান তিনি লিখে গেছেন ডায়েরির মতো করে। কাজি বাহাউদ্দিন শাদ্দাদ লিখেছিলেন সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির বিজয়গাথাসমূহ।

অনুমতি ছাড়া কারও ডায়েরি পড়তে নেই—এই শিষ্টাচার ভদ্র কারও অজানা থাকে না। লক করে রাখা যায় এমন ডায়েরিও পাওয়া যায় বাজারে। কেউ গোপনে যেন পড়তে না পারে—সে-কথা ভেবেই এমন ডায়েরি তৈরি করা হয়।

 

কখন মানুষ ডায়েরি লেখে?

এই প্রশ্নের অনেক উত্তর। তবে সহজ একটা উত্তর হলো যখন তার মধ্যে আবেগ উথলে ওঠে। সে আবেগের কথা কাউকে খুব বলতে ইচ্ছে করে। প্রেমে পড়ার মতো বিষয় হলে সে-কথা কাউকে বলাও যায় না। তখন ডায়েরি হয়ে ওঠে মানুষের বিশ্বস্ত বন্ধু। আবার কখনো বলার মতো কাউকে পাওয়া যায় না। তাই মানুষ ডায়েরির আশ্রয় নেয়।

ডায়েরি যতই গোপন ও ব্যক্তিগত বিষয় হোক না কেন, কখনো কখনো ডায়েরি ব্যক্তির গণ্ডি থেকে বেরিয়ে সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি বিশ্ব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। অতি গোপন ডায়েরি হয়ে ওঠে সাহিত্যিকদের অন্যতম রচনা। পৃথিবীর বহু বিখ্যাত মানুষ এমনকি অনেক অখ্যাত ব্যক্তির বিখ্যাত হয়ে যাওয়া কিছু ডায়েরির কথা তুলে ধরা হলো নবধ্বনির পাঠকদের জন্য।

 

কারাগারের রোজনামচা

কারাগার নিঃসঙ্গ জায়গা। কথা বলার মতো মানুষ সেখানে নেই। থাকলেও কথা বলার সুযোগ নেই। এই দুঃসময়ে অনেকেই ডায়েরি লিখতে শুরু করেন। কারা-কর্তৃপক্ষ সদয় না হলে কারও সে সৌভাগ্যও হয় না। কেউ লিখতে পারেন কিন্তু সেই লেখা বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। সেদিক থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারাগারের রোজনামচাকে অলৌকিক বলা যায়।

বঙ্গবন্ধুর যে রোজনামচা আমরা পাই সেগুলো তিনি লিখেছিলেন বঙ্গবন্ধু হওয়ার অনেক আগে। ১৯৪৮ সাল থেকে বিভিন্ন মেয়াদে বারবার তাঁকে জেলে থাকতে হয়েছে। কারাগারের রোজনামচা নামে যে বইটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে তা ১৯৬৬-৬৮ সালের দিকে লেখা। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ এবং এরপর নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এই ডায়েরি যেভাবে আমাদের কাছে পৌঁছেছে সেজন্য তাকে অবশ্যই অলৌকিক বলা যায়।

বঙ্গবন্ধু রোজনামচা লিখতেন ডায়েরিতে নয়, খাতায়। জেলে পরিবার সাক্ষাৎ করতে গেলে খাতাগুলো দিয়ে দিতেন। তাঁর বেশিরভাগ খাতা নানা উপায়ে পরিবারের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। তবে কারাগারের রোজনামচা বইটির লেখা পাকিস্তান সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। কেউ কোনোদিন আশা করেনি এই লেখা কখনো খুঁজে পাওয়া যাবে। আলোর মুখ দেখবে ছোট রাফখাতায় লেখা এক রাজবন্দীর কথামালা। বঙ্গবন্ধু মৃত্যুবরণ করার প্রায় ৪০ বছর পর, তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন দেশে তাঁর কন্যা যখন প্রধানমন্ত্রী, তখন গোয়েন্দা বিভাগের গুদাম ঘেঁটে উদ্ধার করা হয় এই অলৌকিক রোজনামচা। আজ তা বাংলাভাষায় অন্যতম পাঠাগ্রহের বিষয়।

 

আ লং ওয়াক টু ফ্রিডম

এই গল্পটাও বঙ্গবন্ধুর মতো এক অবিসংবাদিত নেতার। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকারী অকুতোভয় যোদ্ধা নেলসন ম্যান্ডেলা প্রায় ৩০ বছর ছিলেন কারাগারে। ৪৬৬৬৪ নাম্বার কক্ষটি বিখ্যাত হয়েছে তাঁর সৌজন্যে। জেলের দীর্ঘ নিঃসঙ্গতায় তিনিও লিখতে শুরু করেছিলেন তাঁর সংগ্রামমুখর জীবনের গল্প।

লেখা তো লিখেছিলেন কিন্তু পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেই লেখা কীভাবে জেলের বাইরে এলো এবং হয়ে উঠল এক কিংবদন্তির আখ্যান, সে গল্প বেশ রোমাঞ্চকর।

দীর্ঘ বন্দীজীবনের মুক্তির সূর্য উদিত হয় ম্যান্ডেলার জীবন-আকাশে। তবে তিনি জানতেন না ঠিক কবে তাঁকে মুক্তি দেয়া হবে। একদিন হঠাৎ করে সকালবেলা তাঁকে ডেকে নেয়া হয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। জানানো হয়, তাঁর মুক্তি হয়ে গেছে। তাঁকে জেলের বাইরে নেয়া হবে। কারা-কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞাসাবাদের কক্ষ থেকেই তাঁকে বাইরে নিতে চেয়েছিল। তারা ভেবেছিল, কারা-প্রকোষ্ঠে তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই যে তা গোছাতে হবে। কিন্তু ম্যান্ডেলা জানেন মহামূল্যবান লেখাগুলো রয়ে গেছে সেখানে। এগুলো সাথে নিতে না-পারলে দীর্ঘ কারাজীবনই তাঁর বৃথা মনে হবে। ম্যান্ডেলা জিজ্ঞাসাবাদের কক্ষ থেকে সরাসরি জেলের বাইরে যেতে অস্বীকৃতি জানান। কারা-কর্তৃপক্ষ সন্দেহ করে বসলে আর উপায় নেই। লেখার অপরাধে আবার মামলা দিয়ে তাঁকে জেলে পুরে রাখা হবে।

ম্যান্ডেলা বললেন, আমার কিছু বইপত্র সেখানে আছে। সেগুলো জেলের লাইব্রেরিতে পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন। এই অজুহাতও কারা-কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে চায়নি। ম্যান্ডেলা তখন কৌশলের আশ্রয় নেন। তাদের জানান, সহবন্দীদের থেকে নেয়া কিছু বইপত্র তাদের ফিরিয়ে দিতে হবে। এ কথা বলার পর তাঁকে যেতে দেয়া হয়। এভাবে তিনি তাঁর মূল্যবান লেখাগুলো সংরক্ষণ করেন।

বইটি খণ্ড খণ্ড করে কৌশলে জেলের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হতো। একবার ধরাও পড়েছিলেন কারা-কর্তৃপক্ষের কাছে। অবশ্য সে পাণ্ডুলিপির কপি আগেই বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। সে-যাত্রায় তাই লেখা হারাতে হয়নি তাঁকে। এভাবে সংরক্ষিত হয়েছিল এই কিংবদন্তির জীবনের গল্প।

 

যুদ্ধ দিনের কথা : আনা ফ্রাংক ও জাহানারা ইমাম

আনা ফ্রাঙ্ক নামের কিশোরী মেয়েটিকে কে না চেনে? শুধু ডায়েরি লিখে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে তার খ্যাতি। আমস্টারডামে নাৎসি বাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ থাকাবস্থায় ডায়েরি লিখেছিল ফ্রাঙ্ক। ১৯৪৫ সালে জার্মান বাহিনীর নির্মমতায় প্রাণ হারাতে হয় তাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া তার বাবা তাদের বাড়ির ধ্বংস্তুপ থেকে আনার ডায়েরিটি বের করে প্রকাশ করেন। যুদ্ধের বিভীষিকাময় সময়ে লেখা আনার এই দিনলিপি বিশ্বে সর্বাধিক অনূদিত ও পঠিত বইয়ের একটি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ডামাডোল সময়ে দিনলিপি লিখেছিলেন এক মুক্তিযোদ্ধার মা সংগ্রামী নারী জাহানারা ইমাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকায় কেটেছে তাঁর দিনগুলো। একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার নানা চিত্র ফুটে উঠেছে তাঁর দিনলিপিতে। তাঁর ব্যাক্তিগত দিনলিপি হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের দলিলের অন্যতম অংশ।

 

বাংলায় লেখা কিছু বিখ্যাত ডায়েরি

বাংলা সাহিত্যের প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথ ‘পশ্চিমের ডায়েরি’ নামে একটি বই লিখেছেন। এটি তাঁর ইউরোপের ভ্রমণকাহিনি। এতে দিন-তারিখ দেওয়া নেই। তবু রবীন্দ্রনাথ এর নাম রেখেছেন ডায়েরি।

এ ছাড়াও বাংলাভাষার অনেক বিখ্যাত লেখকের ডায়েরি প্রকাশিত হয়েছে। আহমদ ছফার ডায়েরি পড়লে তাঁর চিরকুমার জীবনের এলোমেলো ভাব ও বিষণ্নতার ছাপ ¯পষ্ট বোঝা যায়। সৈয়দ আলী আহসান নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। ‘১৯৭৫ সাল’ নামে তাঁর দিনলিপির একটি বইও পাওয়া যায়। সরদার ফজলুল করিমও তাঁর দিনলিপি প্রকাশ করেছেন। বাদ যাননি সৈয়দ মুজতবা আলীও। তাঁর দিনলিপিতে আবহাওয়া কেমন ছিল, রাতে মশার কামড় কেমন খেয়েছিলেন—রসময় ভঙ্গিতে সেসবেরও বিস্তারিত উল্লেখ আছে।

সবশেষে ডায়েরি নিয়ে বলতে গেলে স্যামুয়েল পেপির ডায়েরির কথা না বললেই নয়। ১৭ শতকের লেখা এই ডায়েরি পৃথিবীর প্রাচীনতম ডায়েরির একটি। পেপি ছিলেন বৃটিশ নৌবাহিনীর একজন অফিসার। তাঁর ডায়েরিতে তিনি সেসময়ের নানা কথা লিখে গেছেন। তাঁর ডায়েরির মাধ্যমে সে সময়ের অনেক অজানা তথ্য জানতে পেরেছে আজকের আধুনিক পৃথিবী।

 

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী

 

ফেব্রুয়ারি 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১