শীতের রাতে বৃষ্টির স্মৃতি রোমন্থন

সংখ্যা:

 

প্রচণ্ড শীত পড়েছে। রাত তখন খুব গভীর না হলেও আমাদের গ্রাম জুড়ে নেমে এসেছে নিঝুম নিস্তব্ধতা। পাড়া-গাঁয়ের মানুষ দিনমান পরিশ্রম করে, সন্ধ্যা ফুরোতেই চারটে খেয়ে ঘুমের ঘরে চলে যায়। বিছানায় কম্বলের নিচে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছি। সাত-পাঁচ নানা চিন্তা ঘোরপাক খাচ্ছে মাথায়। ঘুম আসছে না। তুমুল এই শীতে বৃষ্টির দিনের কথা মনে পড়ছে। আর মনে পড়ছে দুরন্ত শৈশবের স্মৃতি।

তখন বর্ষার আকাশ। সকালে বিকালে—যেকোনো সময় হঠাৎ নেমে আসত ঝমঝম বৃষ্টি। দুপুরের খাঁ খাঁ রোদ তাড়িয়ে যখন আকাশ ফুটো করে নামত আষাঢ় শ্রাবণের থৈ থৈ জল-বৃষ্টি। একটানা বর্ষণে আমরা ঘরের মধ্যে ঝিম মেরে বসে থাকতাম। ভাইয়া বিছানার ওপর আম্মার নিজ হাতে বোনা নকশি কাঁথা গায়ে মুড়িয়ে শুয়ে পড়ত। আম্মা রান্না ঘরে পাকশাকে ব্যস্ত থাকতেন। আমাদের দো’চালা টিনের ঘর। এজন্য চালের উপর বৃষ্টি পড়লে ‘ঝমঝম’ আওয়াজের একটা চমৎকার শব্দ কানে বাজত। উঠানে চোখ মেলে তাকালে দেখতাম, পুরো উঠান বৃষ্টিতে টাপুরটুপুর করছে।

বোশেখ মাসে বৃষ্টি পড়া ছিল তুমুল শিহরণ জাগানিয়া। আকাশ তখন অহর্নিশি গুড়ুম গুড়ুম গর্জন করত। পশ্চিমের বাঁশঝাড়ে পাতায় পাতায় শন শন শব্দ হতো। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গিয়ে পুরো ঘর হয়ে যেত নিঝুম অন্ধকার। মিনিট খানেক পর পর আকাশ-ফাটা গর্জনের সঙ্গে আমাদের ঘরের বেড়ার ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে বিদ্যুৎ চমকানোর আলো ভেতরে ভয় পাইয়ে দিত। ঠিক তখনই আম্মা-ভাইয়া এসে আমাকে জড়িয়ে ধরতেন, যাতে আমি ভয় না পাই। আবার কখনো সখনো বৃষ্টি পড়লে আমি দরজার সামনে টুলের মধ্যে বসে থাকতাম। বর্ষাকালে একটা বিষয় খুব খারাপ লাগত। সেটি ছিল বাইরে কোথাও গিয়ে খেলা করা যেত না। তাই বৃষ্টি পড়ার সবটুকু সময় এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকতাম আকাশের দিকে। নিবিষ্ট চিত্তে দৃষ্টি উড়াতাম চতুর্দিকে। আকাশের গা তখন দেখা যেত মেঘলা আবরণে ঢাকা। ধবধবে সাদা কুয়াশার মতো মেঘলা চাদর টাঙানো। আকাশ থেকে এই বৃষ্টি পড়া একদিনে থামত না। কখনো বৃষ্টি পড়ত একদিন-দু’দিন, কখনো তিন-চার দিন এমনকি সপ্তাহ পর্যন্তও গড়াত।

এই টানা বর্ষণে সৃষ্টি হতো আরও এক শঙ্কা। আমাদের বাড়ির পুর্বের জলাশয়টা বৃষ্টিতে একেবারে ভরে যেত। এভাবে অনবরত বৃষ্টির প্রকোপে সমস্ত ডোবা, খাল-বিল, পুকুর-নালা আর আমাদের গ্রামের গা স্পর্শ করে নীরবে বয়ে চলা পলক নদীটাও বর্ষার ঝুম বৃষ্টিতে কানায় কানায় ভরে যেত। বিকেলে ভরা নদীর পাশ দিয়ে হাঁটতে গেলে দেখতাম, নদীর দু’ধারে বাহারি রঙয়ের শাপলা ফুল। এ সময় নদীর জলে বিকেলের স্নান সেরে উড়তে দেখতাম ছোট-বড় হরেক রকম পাখি। এসব পাখির মধ্যে গাঙচিল, সাদা আর বকের ডানা ঝাপটানো প্রায়ই নজরে পড়ত। প্রতিদিন রাতে বৃষ্টি পড়লে যেই ঘুমাতাম, সকালে উঠে দেখতাম প্রকৃতির সবুজ-সবুজ বর্ণিল মহড়া। উপরে নীল গগণ। আর আমার সেই প্রভাতকাল থেকে দেখে আসা পথের ধারে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা কৃঞ্চচূড়ার বৃক্ষটি বর্ষার শীতল বৃষ্টিতে স্নান করে সকালে অদ্ভূতরকম রূপ ছড়াত! এ ছাড়াও কচুগাছ, লতাপাতা আর জলাশয়ের মধ্যে কচুরিপনারা ভিজে একদম ফুরফুরে হয়ে থাকত। আবার প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে দোয়েল, শালিক, ময়না ইত্যাদি পাখির ছানা বাঁশ ঝাড়ের নিচে মুমূর্ষু অবস্থায় পাওয়া যেত।

আমি তখন ছিলাম বড্ড শিকার-বিলাসী। সারাদিন গুলাই সঙ্গে নিয়ে পাখির পিছু পিছু ছুটতাম। পাখিরা কোথাও বসা দেখলেই গুলাই তাক করতাম। কিন্ত শিকার-বিলাসী মনে সারাদিন পাখির পেছনে ঘুরেও কোনো পাখি শিকার করতে পেরেছি বলে মনে পড়ে না।

এক রাতের বৃষ্টির কথা এখনো মনে পড়ে। সেদিন রাতে শুধু বৃষ্টিই হচ্ছিল না, বৃষ্টির সঙ্গে ছিল তুমুল ঝড়ো দুফান। হিম হিম বাতাস। সারা বিকেল জুড়ে আকাশে মেঘের সাঝ ছিল। চারদিক ছেয়ে গিয়েছিল মেঘলা আঁধারে। সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হতে থাকে হিম হিম বাতাস আর ঝড়ো তুফান। রাতে এশার পর আমরা খাবার খেতে বসি। তুফানের প্রখরতায় সে রাতে বিদ্যুৎ ছিল না। বাতাসের এক তড়পায় কেরোসিনের ল্যাম্প নিভু নিভু। আম্মা আমাদেরকে তাড়াতাড়ি খেয়ে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়তে বললেন। কারণ, ল্যাম্পে কেরোসিন নেই। কখন কেরোসিন শেষ হয়ে ল্যাম্প নিভে যাবে, বলা যায় না! পাকঘরে আমি, আম্মা, ভাইয়া বসে খাচ্ছি। বৃষ্টির বেগ ক্রমে ক্রমে বাড়ছে। বাইরে জোরালো তুফান। ঝড়ো হাওয়ার বড় বড় ধাক্কা এসে ঘরের লাগে। আমার কচি মনে তখন কী যে ভয়! আম্মা আমাদের রীতিমতই সাহস যোগান দিতে থাকেন, ‘ভয় পেও না, বৃষ্টি কমে যাবে’।

হঠাৎ ভাতের প্লেট থেকে আমাদের হাত আপসেআপ উঠে যায়। খাবার প্লেট থেকে ভাত মুখে তুলে আর পুরা হয় না। প্রচণ্ড তুফান এসে আমাদের দোচালা ঘরের একটি চাল উড়িয়ে নিয়ে যায়। সারা ঘর জুড়ে ঝমঝম বৃষ্টি পড়তে থাকে। বৃষ্টিতে ভিজে যায় ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র। টেবিলের উপর আমার বইয়ের ব্যগ, কলম, খাতা, কুরআন শরিফ, রেহাল আর নিত্য ব্যবহারের শার্ট—প্যান্টগুলো—বৃষ্টিতে একাকার। আম্মা-ভাইয়া তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন! আর আমি খবারের প্লেট থেকে উঠে গিয়ে আমার বইয়ের ব্যগ গোছাতে গোছাতে চিৎকার করে বলছিলাম, আম্মা, ভাইয়া, বৃষ্টিতে স-ব ভিজে যাচ্ছে…।

 

জামেয়া গহরপুর সিলেটে’র শিক্ষার্থী

জানুয়ারি 2019

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১