আমি লঞ্চডুবিতে মারা যাব।
খুব মৃত্যুভাবনা হয়। আমি হয়তো আজকাল যেকোনো সময় টুপ করে খুব নীরব কোনো এক দুপুরে মিলিয়ে যাব ভোরের শিশির লাগা মাকড়সার জাল যেমন মিলিয়ে যায় হাওয়ায়। ভয়ের কথা, মৃত্যুর আগেই নাকি মানুষের মনে হতে থাকে যে, সে মারা যাবে মারা যাবে…।
লঞ্চে আমাকে উঠতেই হবে, ফিরতে হলে আমাকে জলের স্মরণ নিতেই যে হবে, আমি সাঁতার না জানা শহুরে, আরও শঙ্কার কথা, আমার অবচেতনে প্রায়ই গুঞ্জরিত হয়, আমি লঞ্চডুবিতে মারা যাব।
দ্বিতীয় তলার ডেক পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে,আমি কোথায় বের হব কোথায় পালাব এই অফুরন্ত জলের রাজ্যে, পানির প্রকাণ্ড চাপ আমাকে গিলে নিচ্ছে, শ্যাওলাগন্ধী নিবিড় অন্ধকার আমি প্রায়ই স্বপ্নে দেখি।
আমার ভাবনা শুনে মিলু ভাই অট্ট হাসলেন এবং অন্যদের হাসালেন। মিজু ভাই কপট ফিসফাস করে বলে গোপন কথার ভঙ্গিতে, ‘নদী কিন্তু সবার কথা কান পেতে শোনে। কোনো কথা যদি হঠাৎ সে কবুল করে ফেলে!’
কুয়াকাটা এসে বন্ধু জুটে গেছে কয়েকজন। মিলুদা এদের মধ্যে রীতিমতো গুরু বনেছেন—আমরা, বাচ্চা বাচ্চা তরুণপালের বড়ভাই বনে যেতে অন্য সবার তুলনায় তার ভার-ভারিক্কি চেহারা, আর গলার স্বরের প্রাপ্তবয়স্কতা, তবুও বড়াই বড়ত্বের সবকিছুই তার ভেতর বহাল তবিয়তে বর্তমান। বললেন, ‘এই ভরা শীতের মৌসুমে, নদী যখন ক্ষীরের মতো জমে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে, দুইপাড়ে পানির স্তর বাঁধের দেয়ালের শেষ ইট ছাড়িয়েও ক্রমেই নিচে নামছে নিচে নামছে, লঞ্চ যখন প্রায়ই চরে আটকাচ্ছে জলের অভাবে, এই সময়ে তুই কিনা মরবি জলে ডুবে!’
অন্যেরাও তাল ধরে সায় দেয়, এই মৌসুমে লঞ্চ কি, কোনো কোষা নৌকাও ডুবতে কখনো শোনেনি তারা কেউ।
আকাশ কুসুম বাজে কল্পনা, দুচ্ছাই, বিরক্ত মাহি গিটারে টুংটাং শুরু করতেই অন্য একটা পরিবেশ রঙ চড়িয়ে ফেলল আমাদের আয়েশি মজমায়, কুয়াকাটার সমুদ্রতীরে, এই হেমন্তের মায়াবী সন্ধ্যায়।
এই এখন, কবিতার পেছনে ছোটার তুমুল ব্যস্ততা, নদীর সঙ্গে, পানির নীলাভ সাদা ফুলের সঙ্গে, নির্জন তীরে বাঁধা পুরনো নৌকার সঙ্গে, ধানশালিক-দোয়েলের সাদাকালো হলুদ রঙের সঙ্গে, যখন-তখন বেরিয়ে পড়ার মধ্যে মৃত্যু নিয়ে মনখারাপ অভিমানের ফুরসত কোথায়!
অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা, গরুর চোখের মতো অবুঝ সরল চাহনিতে জীবন চেয়ে আছে আমার দিকে।
দুই
ঘুম যখন ভাঙল, দেখি মাথার ওপর কারুকাজ করা সিলিং, এসি সুড়সুড় করে হাওয়া দিচ্ছে, আমার গায়ে দারুণ ওম ভরা একটি কম্বল, মাথার নিচে বালিশ নয় ওটা, যেন একদলা তুলার মাখন, নীলচে একটা আলো-আঁধারি, জানালা দিয়ে জোসনা ঢুকে ফুলঝুরি সাজিয়েছে মেঝেতে।
কোথায় এলাম আমি! কুয়াকাটায় আমরা ক্যাম্পেইন করেছিলাম, সাদামাটা এক তাঁবু থেকে আমি এ কোথায় এলাম, কীভাবে এলাম, কী আশ্চর্য, স্বপ্ন নাকি ভোজবাজি! দেয়ালে কান পেতে শুনতে পেলাম কেমন একটা গমগম শব্দ হচ্ছে, ততক্ষণে ঘুমের ঘোর কেটে সজাগ হলাম। উঠে বসলাম। দেখি পাশের খাটে মিলুদা জাগ্রত, শুয়ে আছে, ডানের ওপর বাঁ পা-টা তোলা, স্মার্টফোনের ঝাপসা আলোয় মুখ আবছা।
জানালা দিয়ে দেখি মরা নদীর পানি ঝিকমিক করছে পূর্ণ চাঁদের আলোয়, এটা কোনো জলযান, জলরাশি কেটে ছুটছে।
মনে পড়ল, ফেরার দিন আমি চেয়েছিলাম ঘুরপথে সড়কপথে ঢাকা ফিরব। হাত কচলে মাথা চুলকে আমতা আমতা বলেছিলাম, ‘আমি আজ ঢাকা যাব না ।’
‘কেন রে?’
‘ভয় করছে।’
প্রস্তাব শুনতেই সবাই হইহই করে উঠল, ‘একসঙ্গে এসেছি, ট্যুর করেছি, একসঙ্গেই সবাই আনন্দ করতে করতে ফিরব, মাঝখানে একজন আলাদা হলে উল্লাসের রেশ শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাবে, তাও নিতান্তই অবান্তর এক ভাবনার কারণে, অসম্ভব!’
এমন সময় যেই ঘটনাটি ঘটল, মাহদি হাসতে হাসতে, আমার ব্যাগপত্র হেঁচকা টানে তুলে নিল ওর কাঁধে, ওদের সঙ্গে লঞ্চযাত্রা নিশ্চিত করতে, আমার কী হলো, দেখি ও মাটিতে বসে কোঁকাচ্ছে, ভূতগ্রস্তের মতো ঠাস করে কখন একটা চড় বসিয়ে দিয়েছি, জানি না। ঘাটে আশপাশে লোকেরা এসে আমাকে ধরল, বন্ধুরা সবাই মাহদির দিকে ছুটে গেল আমার দিকে অবিশ্বাস ভরা দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে। কী বিব্রতকর পরিস্থিতি। লজ্জায় ঘেমে যাচ্ছি। সবাই কেমন দূরে সরে আছে। আড়চোখে তাকাচ্ছে কি তাকাচ্ছে না। নিজেকে কেমন নিঃস্ব, ভরপুর লোকারণ্যেও কেমন নিঃসঙ্গ লাগছিল।
ভাগ্যিস কি খোদার কুদরত, সুবন্ত ভাই তাঁর দারুণ নেতৃত্বগুণে—আমি চমকে মুগ্ধ হয়েছিলাম সেদিন—পুরো পরিস্থিতি আগের মতো স্বাভাবিক করে ফেলার ক্ষমতা দক্ষতায়।
সেদিনের মতো আমাদের যাত্রা স্থগিত হলো, কুয়াকাটা ভ্রমণে আরেকটি সুন্দর, এমনকি অন্যসব দিনের চেয়েও মনে হয় উপভোগ্য একটি দিন যুক্ত হলো।
‘একসঙ্গে কেবিন নিয়েছি, ভাবলাম, তোকে নিয়ে সাঁতরাব নদীতে, কই তোর লঞ্চ তো ডুবলো না, ঢাকা সদরঘাট এসে গেল প্রায়, দেখ বুড়িগঙ্গার দ্বিতীয় সেতু পার হচ্ছি আমরা।’
‘আমি এখানে এলাম কীভাবে! কখন কী ঘটল?’
সুবন্ত’দা খাট থেকে নেমে জুতোজোড়া পায়ে দিতে দিতে বললেন, ‘আসতি তো না। নিয়ে আসতে হলো। রাতে খোলা সমুদ্রের প্রান্তরেখায় বারবিকিউ পার্টির পর সেই যে ঘুমোলি, আসলে জানিস কি, আমি তো ফার্মাসিস্ট, কিছু তুকতাক আর শেকড়বাকড়ের রস সবসময় সঙ্গে থাকে আমার প্রাথমিক চিকিৎসা-থলিতে, সবাই সে রাতে ঘুমিয়ে গেলে পর একটু ক্লোরোফর্ম তোর নাকের কাছে ডলে দিলাম, সেই এক ডলায় জাগলি এসে ঢাকায়।’
আমি বজ্রাহতের মত থ হয়ে রইলাম। কেমন রাগ হতে লাগল। কিন্তু সেই রাগ কেন কার ওপর তাও আন্দাজ করতে না পেরে অব্যক্ত একটা জিদে কথা সরে না মুখে, সুবন্ত ভাই চোখ টিপ দিয়ে বললেন, ‘আমার গা জ্বলে গেল যেন, নে সব গোজগাছ করে ছাদে আয়, দেখবি কী বাতাস, ভাসিয়ে নেবে যেন, সবাই আছে।’
এই লোকটার কি মানুষের মানসিক পরিস্থিতি-বিচার করে কথা বলার জ্ঞানটুকুও নেই! তবুও, লোহার পেরেকের জং ধরা ধারালো মাথার মতো একটা দুর্ভাবনা মগজে খোঁচা দিচ্ছিল বারবার। হঠাৎ খুব শান্তি শান্তি লাগতে থাকে। কেমন কৃতজ্ঞ বোধ করি মিলুদার প্রতি, ঘুমে ঘুমে সুস্থিরভাবে ফেরাটা হলো, আমার উদ্ভট পাগলামিটা তারা কী ধৈর্যের সঙ্গে বহন করে দারুণ এক মোলায়েম কৌশলে আমার ভয়কে জয় করালেন।
কিসের মৃত্যু আর কিসের লঞ্চ ডোবা! কী নির্বোধ প্রশান্ত এক নদী, তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে, রৌদ্রের আলোয় ঝিকমিক করে সুবোধ জল, লঞ্চের সঙ্গে খেলতে খেলতে ঢাকার পথে যাচ্ছে মৃদু মৃদু ঢেউ, একটু দূরেই দুইপাশে দেখা যাচ্ছে তীর, শ্যামল গ্রাম, ধানক্ষেত, ইটভাটা, কলকারখানা, শহর।
ব্যাগপত্র হাতে-কাঁধে গুছিয়ে লঞ্চের ছাদে উঠে আসতেই সবাই বলে উঠল, ‘কী, মরলে না তো!’
আমি দারুণ হেসে উঠলাম। মুখে ঝুলে রইল টুকরো লজ্জা। ছাদে একটি অচেনা মেয়ে ওদের সঙ্গে, আমি আগে দেখিনি, হয়তো লঞ্চেই কোনোভাবে কারও সঙ্গে পরিচয় হয়ে এখানে বা নেহাতই অপরিচিত মেয়ে কোনো, ছাদে হাওয়া নিচ্ছিল, অতি মায়াবতী, মন্তব্য করে লাজুক বাচ্চাটির মতো ঘাড় ফেরালো—এত সুন্দর যার হাসি, এই হাসির মায়ায় তো মালাকুল মওতও ভুলে যাবে তাঁর জান কবজের দায়িত্ব!
আমার সবকিছু ভালো লাগছিল। সবকিছু কত প্রাঞ্জল, জীবনের এত এত সৌন্দর্য! সব না দেখে আমি মরব না, নিশ্চিত।
ঘাটের সঙ্গে লঞ্চের মাথাটা আস্তে একটা গোঁত্তা মেরে থেমে গেল। চূড়ান্তই, শেষ হলো আমাদের কুয়াকাটা ভ্রমণ। এখন যে যার পথে যাবে, সবাই পরস্পর বিদায়ের ভদ্রতা সারছে। এক ফাঁকে দেখলাম মিলুদার মুখটি অন্ধকার। জিজ্ঞেস করাতে চিন্তিত কণ্ঠে জানালেন, হ্যান্ডব্যাগটা তার খুঁজে পাচ্ছেন না। হেথায় খুঁজে হোথায় খুঁজে সারা লঞ্চ, চট করে একজনের মনে পড়ল, ফতুল্লা ঘাটে কিছুক্ষণ লঞ্চ থামালে সবাই নেমেছিল, এক চা-সিগ্রেটের দোকানে ভুলে কি তার হ্যান্ডব্যাগ ফেলে এসেছেন মিলুদা?
সেই ব্যাগে আমারও দুটো স্মার্টফোন, হেডফোন, চার্জার, সেই ফোনে ছ’হাজার টাকা, আর আসছে বইমেলায় প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থটির চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি। সেইসময় ঘাটে একটা লঞ্চ শেষ ভেঁপু বাজাচ্ছিল, নোঙর তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল খালাসিরা, টিকিটমাস্টার শেষ সময়ের হাঁকডাকের ফর্মালিটি সারছিলেন, ফতুল্লা ঘাট হয়ে পটুয়াখালী যাবে এই লঞ্চটি।
মিলুদার সঙ্গে আমিও ফতুল্লা যেতে চাইলাম, পাণ্ডুলিপি ও ফোনের ব্যাপার তো রইলই, তাছাড়া আমি লঞ্চভীতি ও সন্দেহের রেশ সদ্য কাটিয়ে ওঠা; সেইসঙ্গে একটা বিশ্বাস, একটা উপভোগ্য নদীযাত্রা হোক।
হাজার হাজার লঞ্চ দৈনিক যাওয়া আসা করে নদীপথে, কালেভদ্র কখনো—ওসব সড়কপথেও হয়—বাদে লঞ্চে যে কিছুই হয় না, এই সাধারণ বোধটা অবচেতনে স্থির করার একটা রোখ চেপেছে, মিলুদা সবাইকে বিদায় দিয়ে পুনর্বার লঞ্চে উঠলে আমিও তার সঙ্গ নিলাম, ফতুল্লা পর্যন্ত আরেকটি নদীযাত্রায় থাকি।
‘ধুস!’ মিলুদা ঘাড়ে একটা চাটি মারলেন, এতক্ষণ পেছনে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন খসখস করে কী লিখছি খাতায়। কবিতা কীভাবে তৈরি হয়, কেমন দেখায় তখন শুদ্ধতম কবির মুখ—আমরা দেখতে চাই উনি যখন কবিতা লিখেন, তখন বুঝি দেখতে দেন বড়!
লেখাটা এখানে আপাতত বন্ধ রাখি, মিলুদা আমাকে টিকিট কাটার জন্য পাঠাচ্ছে, নির্ধারিত আসন নিশ্চিতও করতে হবে।
তিন
লঞ্চ ছেড়ে দিয়েছে। বলে না, মাটির মানুষ? কথাটার শেকড় কত গভীরে, টের পাওয়া যায়, যখন মাটি থেকে মানুষের দূরত্ব বাড়তে থাকে। মাটি ও মাটির ওপরে গড়া শহর, মানুষ যত দূরে সরতে থাকে, কেমন এক অসহায় বিচ্ছেদবোধ ক্রমেই গ্রাস করে নিতে থাকে। লঞ্চের এখানে ওখানে লোকেরা নিজেরা নিজেরা জটলা করে নিজেদের বলয় বানিয়ে বসে আছে, গল্পস্বল্প করছে, খাচ্ছে, একটি বিছানো তোষকে স্বামী-স্ত্রী মুখোমুখি বসে লুডুস্টার গেমস খেলছে মোবাইলে, কত রঙের জীবন, এদের সবারই জীবনের গল্প কত বৈচিত্র, আমার মনে চায়, সমস্ত মানুষের আলাদা আলাদা জীবনগুলো, তাদের নানান বর্ণের গল্পের জগতগুলোতে নিবিড় করে দীর্ঘ সময় নিয়ে, প্রাণমূলের স্পর্শ ছুঁয়ে ছুঁয়েও বেড়িয়ে আসি।
এসব দেখেটেখে এসে আসনে ফিরে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম, ঘুম ভাঙল মৃদু দুলুনির ঝাঁকিতে। প্রচণ্ড ভয়ে থরথর করে কাঁপা বৃদ্ধের দেহের মতো কাঁপছে লঞ্চটি। মামুলি ব্যাপার। এমন ঝাঁকুনি কিছু তো হয়ই। ভয়ের কোনো কারণ নাই। আমি জানি একটুপরই স্বাভাবিক হয়ে যাবে সব। এই তো আর বিশ গজ দূরেই দেখা যাচ্ছে লঞ্চঘাট, মাটি, শহর, শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, লঞ্চ ঘাটে ভিড়লেই উঠে পড়বে সঙ্গেসঙ্গে, দেরি করলে জায়গা পাওয়া যাবে না।
চার
এখানেই, গল্পের এই পর্যায়েই হয়তো গল্পটার শেষ, হয়তোবা শুরু। গল্পের এই পর্বে এসে পাঠকের জ্ঞাতার্থে একটি জরুরি খবর বলছি যে, গল্পের তৃতীয় পরিচ্ছেদেই আপনাদের সবার অগোচরে লেখকের নীরব বদল ঘটে গেছে। গল্পের বাকি শব্দমালা বসছে অন্য কারও কলমে, অন্য কারও খাতায়। লেখকের জবানেই লেখকের একটুও নিজস্বতা ঢালছি না—লেখকের বাকি গল্পটা বলছিলাম আমি জীবনানন্দ দাশ, লেখক যাকে আপনাদের সঙ্গে আগেই পরিচয় করিয়ে দিয়ে গেছেন মিলুদা বলে। গল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় পরিচ্ছদটুকুর পর দীর্ঘ একবছর তাতে আর কোনো অক্ষরপাত হয়নি।
আমি এই গল্পের প্রথম দুই অংশ পেয়েছিলাম সালমান সাদের স্পঞ্জের মতো ফুলে ভেসে ওঠা লাশের সঙ্গে, পলিথিনে মোড়া একটা খাতায়, বুকের কাছটি থেকে। এখন ১০ বছর পর গল্পের বাকি অংশ লিখিত হলো, পুরনো ট্রাঙ্ক ঝাড়পোছ করতে গিয়ে পাই জীর্ণ পলিথিনে মোড়া এই খাতাটি, হঠাৎ স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি এবং আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করি, আজই লেখকের দশম মৃত্যুবার্ষিকী; গত ১০টি বছর সে আমার মনেই ছিল না।
লিখলাম, একজন গুমনাম গল্পকথকের একটি অন্তত কাজ তাঁর হয়ে অমর থাকুক।
নগরবাসী সেদিনের পত্রিকায় অদ্ভুত যেই সংবাদটি পড়েন, তা পিলে চমকে দেয়। ফতুল্লা ঘাটের মাত্র ২০ গজ দূরে, লঞ্চের গতি যখন থামো থামো, ততোমধ্যে অনেক যাত্রী নৌকা করে নেমেও গেছে, কেউ জানে না কী কারণে হঠাৎই গাঙচিল-৭ লঞ্চটি ডান কাত হয়ে উলটে পড়ে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো সেই লঞ্চের একটি যাত্রীও বাঁচতে পারেনি। শুধু একমাত্র আমি বেঁচে ফিরতে পেরেছিলাম, কে জানে, হয়তো গল্পের সমাপ্তিটুকু টানবার জন্যই, অসমাপ্ত গল্পের পাণ্ডুলিপি বহনের জন্যই।
জগতে কত অদ্ভুত কিছুই তো ঘটে। মানুষের আর কতটুক সাধ্যি, প্রকৃতির রহস্য কোন মন্ত্রে সে খুলবে?
সালমান সাদ : ১৫৬, ডাক্তারগলি, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭
জানুয়ারি 2019

