সৌদি আরবের বিতর্কিত যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানকে কিছুদিন আগ পর্যন্তও খুব কম লোকই চিনতেন। কিন্তু ভবিষ্যৎ সৌদি রাজা হিসেবে তাঁর অভিষেক, ধর্মপ্রাণ সৌদি সমাজকে সংস্কারের নামে দেশটিতে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুমোদন ও বিস্তার, ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ এবং সবশেষ জামাল খাসোগজি হত্যাকাণ্ড—এগুলোর সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে যাওয়ার কারণে সারা বিশ্বের নজর এখন তাঁর দিকে।
কিন্তু কীভাবে বেড়ে উঠেছিলেন এই প্রিন্স সালমান? তাঁর শৈশব সম্পর্কে লোকে কতটুকু জানে?
এর ওপরই খানিকটা আলোকপাত করেছেন বিবিসি আরবি বিভাগের সাংবাদিক রাশিদ সেক্কাই—যিনি শিশু প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমানের গৃহশিক্ষক ছিলেন, তাঁকে তিনি ইংরেজি শেখাতেন। তিনি জানিয়েছেন, মুহাম্মদ বিন সালমান ছোটবেলা থেকেই ছিলেন উদ্ধত এবং বেপরোয়া। যার কারণে অল্প দিন পড়িয়ে রাশেদ সেক্কাই এ চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
রাশেদ সেক্কাই সম্প্রতি বর্ণনা করেছেন তাঁর সেই সময়কার স্মৃতি। তাঁর ভাষায়, ‘তখন ১৯৯৬ সাল। আমি জেদ্দার নামকরা স্কুল আল-আনজালে পড়াই। তখন রিয়াদের গভর্নর ছিলেন তখনকার প্রিন্স, বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ, যিনি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের পিতা।
‘প্রিন্স সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ তখন সাময়িকভাবে তাঁর পরিবার নিয়ে জেদ্দায় এসেছেন, এবং তার দরকার হয়েছিল তাঁর সন্তানদের জন্য একজন ইংরেজির শিক্ষক।
‘তিনি যোগাযোগ করলেন আমি যে স্কুলে পড়াতাম সেই স্কুলের সঙ্গে। তখন আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো রাজকীয় প্রাসাদে। আমার ছাত্র হলেন তাঁর প্রথম বিয়ে থেকে জন্মানো কয়েকজন রাজপুত্র। প্রিন্স তুরকি, প্রিন্স নায়েফ, প্রিন্স খালিদ এবং প্রিন্স মুহাম্মদ।
‘আমি তখন জেদ্দার একটা উঠতি এলাকায় একটা ফ্ল্যাটে থাকি। প্রতিদিন সকাল বেলা—সাতটার সময় একজন শোফার (ড্রাইভার) এসে আমাকে আল-আনজাল স্কুলে নিয়ে যেত। বিকেলের দিকে স্কুল শেষ হলে এই ড্রাইভারই আবার এসে নিয়ে যেত রাজপ্রাসাদে।
‘প্রাসাদের গেটের কড়া পাহারা পার হয়ে যাবার পর গাড়িটি চোখ-ধাঁধানো অনেকগুলো বাগানওয়ালা ভিলা অতিক্রম করে রাজকীয় প্রাসাদের সামনে পৌঁছাত। সামনের নিখুঁতভাবে সাজানো বাগানের পরিচর্যা করে সাদা পোশাকপরা মালীরা।
‘সেখানে একটি কার পার্কিং ছিল। তাতে বিলাসবহুল অনেকগুলো গাড়ি দেখতাম পার্ক করা। একটা গাড়ি ছিল গোলাপি রঙের, ক্যাডিলাক গাড়ি। ওইখানেই প্রথম আমি নিজের চোখে ক্যাডিলাক দেখি।
‘প্রথমদিন রাজকীয় দুর্গে ঢোকার পর আমাকে স্বাগত জানান প্রাসাদের পরিচালক মানসুর আল-শাহরি। মধ্যবয়স্ক এই ব্যক্তি প্রিন্স মুহাম্মদের খুবই প্রিয় ছিলেন।
‘প্রিন্স মুহাম্মদকে মনে হলো আমার কাছে পড়ার চাইতে প্রাসাদের রক্ষীদের সঙ্গে সময় কাটানোর ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী। ভাইদের মধ্যে সে-ই বয়েস সবচেয়ে বড় হওয়ায় যা খুশি তাই করত। আমার প্রতি কোনো পরোয়াই ছিল না তার।
‘বয়সে ছোট যে প্রিন্সরা, আমি তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারতাম। কিন্তু মুহাম্মদ সেখানে হাজির হলেই পরিস্থিতি হয়ে যেত অন্য রকম।
‘আমার মনে আছে, আমার পাঠদানের সময় মুহাম্মদ একটা ওয়াকি-টকি ব্যবহার করত—যা সে রক্ষীদের কেউ একজনের কাছ থেকে ধার করেছিল। সে এটাকে ব্যবহার করতো আমাকে নিয়ে নানা রকম ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করার জন্য এবং তার ভাই ও প্রাসাদরক্ষীদেরকে এর দ্বারা জোক শোনানোর জন্য।
‘একদিন মুহাম্মদ বলল, তার মা তাকে বলেছেন যে, আমাকে দেখে নাকি ‘একজন সত্যিকারের ভদ্রলোক’ বলে মনে হয়। আমি এটা শুনে একটু থতমত খেয়ে গেলাম। কারণ, আমার মনে পড়ে না, কখনো আমি তাঁকে দেখেছি, যেহেতু সৌদি রাজপরিবারের মেয়েরা অপরিচিতদের সামনে আসে না। প্রাসাদে একমাত্র নারী, যাকে আমি দেখেছিলাম, সে একজন ফিলিপিনো আয়া।
‘আমাকে যে কেউ দেখছে, ব্যাপারটা এতদিন আমি বুঝতে পারিনি। সৌদি সিংহাসনের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী তখন আমাকে দেয়ালে লাগানো কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরা দেখাল। তার পর থেকে পড়ানোর সময় আমি আত্মসচেতন হয়ে গিয়েছিলাম।
‘কিছুদিনের মধ্যেই মুহাম্মদ ছাড়া তার ভাইদের আমার বেশ পছন্দ হয়ে গেল। তারা ছিল রাজপুত্র, এবং তাদের জগত ছিল অর্থ-বিত্ত-বিলাসে ভরা। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমার স্কুলের ছাত্রদের বিশেষ কোনো তফাৎ ছিল না। তাদের জানার আগ্রহ ছিল কিন্তু খেলাধুলা করতেই বেশি ভালোবাসত।
‘একদিন প্রাসাদের পরিচালক মানসুর আল-শাহরি আমাকে বললেন ‘ভবিষ্যৎ রাজা’র সঙ্গে দেখা করতে। কারণ তিনি তার সন্তানদের শিক্ষায় কতটা অগ্রগতি হলো, তা জানতে চান। ভাবলাম, প্রিন্স মুহাম্মদের দুষ্টামির ব্যাপারে কিছু করার এটা একটা সুযোগ। সুযোগটা কাজে লাগানো দরকার।
‘আমি প্রিন্স সালমানের অফিসের সামনে অপেক্ষা করছিলাম। আমার পাশে দাঁড়ানো ছিলেন যুবরাজদের অন্যান্য শিক্ষকরা। মনে হলো, প্রাসাদের আদব-কায়দা সম্পর্কে আমার চাইতে তাঁরা বেশি ওয়াকিবহাল।
‘প্রিন্স সালমান আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা উঠে দাঁড়ালেন, এবং আমি দেখতে লাগলাম কিভাবে তারা রিয়াদের গভর্নরের সামনে মাথা নত করলেন, তাঁর হাতে চুমু খেলেন, দ্রুতগতিতে প্রিন্সদের নিয়ে কিছু কথা বললেন এবং সামনে এগিয়ে গেলেন।
‘যখন আমার পালা এলো, আমি তাঁদের মতো মাথা নত করতে পারলাম না। আমি কখনো এটা করিনি। আমি আমার হাত বাড়িয়ে দিলাম এবং ভবিষ্যৎ রাজার সঙ্গে করমর্দন করলাম।
‘আমার মনে আছে প্রিন্স সালমানের মুখে ফুটে ওঠা বিস্ময়সূচক মৃদু হাসির কথা। কিন্তু তিনি ব্যাপারটা উপেক্ষা করেছিলেন।
‘আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় প্রিন্স মুহাম্মদের কথা তুলিনি। কারণ ততক্ষণে আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি যে, আমি এ কাজ ছেড়ে দেব এবং যুক্তরাজ্যে ফিরে যাব।
‘পরে মি. আল-শাহরি আমাকে রাজকীয় আদবকায়দা পালন করতে ব্যর্থ হবার জন্য অনেক বকাঝকা করেছিলেন।
‘আমার ছাত্রদের মধ্যে প্রিন্স মুহাম্মদ ছাড়া প্রিন্স খালিদ যুক্তরাষ্ট্র সৌদি রাষ্ট্রদূত হয়েছেন। তবে অন্য প্রিন্সরা জনসমক্ষে ততটা পরিচিত নন।
‘সৌদি রাজপুত্রদের শিক্ষাদানের এই সময়টা ছিল আমার জীবনের একটা অনন্য পর্ব।’
প্রতিবেদন-কৃতজ্ঞতা : বিবিসি
জানুয়ারি ২০১৯

