(পঞ্চতন্ত্র সৈয়দ মুজতবা আলীর অন্যতম একটি গ্রন্থ। হাস্যরসের খোরাকে ভরপুর বইটির প্রতিটি পাতা। নবধ্বনি’র পাঠকদের জন্য সেখান থেকে কয়েকটি চুটকি গল্প উদ্ধার করে আনা হলো।)
পঞ্চতন্ত্রের বর্ষা নামক নিবন্ধ থেকে জানা যায়, মিশরের কায়রোতে বৃষ্টি খুব কম হয়। লেখকের ভাষ্য : ‘কাইরোতে বছরে ক’ইঞ্চি বৃষ্টি পড়ে এতদিন বাদে সে কথা আমার স্মরণ নেই। আধা হতে পারে সিকিও হতে পারে।’ এটুকু পাঠ করেই বোঝা যাচ্ছে কায়রোতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কেমন। তো, কায়রোতে লেখকের চোখের সামনেই একদিন বৃষ্টি এল। এই বৃষ্টি নিয়েই সুদানের এক ছেলে একটি গল্প বলল। গল্পটি এ রকম : ‘সুদানের একটি ছেলের সঙ্গে আলাপ হ’ল। সে বললে, তার দেশে নাকি ষাট বছরের পর একদিন হঠাৎ কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি নেবেছিল। মেয়েরা, কাচ্চা-বাচ্চারা, এমনকি গোটা কয়েক জোয়ান-মদ্দরা পর্যন্ত হাউমাউ করে কান্নাকাটি জুড়েছিল, “আকাশ টুকরো টুকরো হয়ে আমাদের ঘাড়ে ভেঙ্গে পড়লো গো। আমরা যাব কোথায়? কিয়ামতের (মহাপ্রলয়ের) দিন এসে গেছে। সব পাপের তওবা (ক্ষমা-ভিক্ষা) মাঙবার সময় পেলুম না, সবাইকে যেতে হবে নরকে।” গাঁও-বুড়োরা নাকি তখন সান্ত¦না দিয়ে বলেছিলেন, ‘এতে ভয় পাবার কিছু নেই। আকাশ টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে না। এ যা নাবছে সে জিনিস জল। এর নাম মতর (অর্থাৎ বৃষ্টি)।’ সুদানি ছেলেটি আমায় বুঝিয়ে বললে, ‘আরবি ভাষায় মতর (বৃষ্টি) শব্দ আছে; কারণ আরব দেশে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়, কিন্তু সুদানে যে আরবী ভাষা প্রচলিত সে-ভাষায় মতর শব্দ কখনো ব্যবহৃত হয়নি বলে সে শব্দটি সুদানি মেয়েছেলেদের সম্পূর্ণ অজানা।’
‘বেদে’ নামক নিবন্ধে লেখক প্রথমেই একটু ভূমিকা টেনেছেন। সেখানে ‘রাসেল পাশা’র একটি বইয়ের কথা বলেছেন। এ বইয়ে রাসেল পাশা মন্তব্য করেছেন, পৃথিবীর সকল বেদের (জিপসী) ভাষা আদতে ভারতীয়। মুজতবা আলী এটা বিশ্বাস করতে চাননি। সন্দেহ পোষণ করেছেন এভাবে : ‘পণ্ডিত নই, তাই চট করে বিশ্বাস করতে প্রবৃত্তি হয় না। ইউরোপীয় বেদেরা ফর্সায় প্রায় ইংরেজের সামিল, সিংহলের বেদে ঘনশ্যাম। আচার-ব্যবহারেও বিস্তর পার্থক্য, বৃহৎ ফারাক। আরবিস্তানের বেদেরা কথায় কথায় ছোরা বের করে, জর্মনীর বেদেরা ঘুষি ওঁচায় বটে, কিন্তু শেষটায় বখেড়ার ফৈসালা হয় বিয়ারের বোতল টেনে। চীন দেশের বেদেরা নাকি রুপালি ঝরণাতলায় সোনালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চুকুস চুকুস করে সবুজ চা চাখে।’
কিন্তু নিজের জীবনের একটি ঘটনার শেষে তিনি বিশ্বাস না করে পারলেন না। তখন তিনি জার্মানির রাজধানীতে। বয়স ২৫/২৬। একদিন কলেজের পাশের ক্যাফেতে বসে কফি খাচ্ছিলেন। তখন এক বেদেনী তাকে ‘যবনিকা’ ভাষায় কি জানি বলতে লাগল। ‘সে ভাষা আমার চেনা-অচেনা কোনো ভাষারই চৌহদ্দি মাড়ায় না, কিন্তু শোনালো তারই মুখের মত-মিষ্টি।’ পরে ক্যাফে মালিক মুজতবা আলীর অনুরোধের প্রেক্ষিতে যখন বললেন যে তিনি ভারতীয়, তখন মেয়েটা হুঙ্কার দিয়ে ক্যাফেওয়ালাকে বলল, ‘সেই কথাই তো হচ্ছে। আমরা বেদে, ভারতবর্ষ আমাদের আদিম ভূমি। এও ভারতীয়। আমার জাতভাই। ভদ্রলোক সেজেছে, তাই আমার সঙ্গে কথা কইতে চায় না।’ পরে মুজতবা আলীর সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল, এরা বেদে, কিন্তু পড়াশোনা করে না। তারা ভাবতেও পারে না, কোনো বেদে কখনও পড়াশোনার চৌহদ্দি মাড়িয়েছে।
‘“বুঝতে পেরেছি বাপু, বুঝতে পেরেছি; বাপ তোমার দু’পয়সা রেখে গিয়েছে—হঠাৎ নবাব হয়েছ। এখন আর বেদে পরিচয় দিতে চাও না! হাতে আবার খাতাপত্র—কলেজ যাও বুঝি? ভদ্রলোক সাজার শখ চেপেছে, না?’ আমি বললুম, “ফ্রালাইন, তুমি ভুল বুঝেছ। আমার সাতপুরুষ লেখাপড়া করেছে। আমিও তাই করছি। ভদ্রলোক সাজা না সাজার কোনো কথাই উঠছে না।” মেয়েটি এমনভাবে তাকালো যার সোজা অর্থ “গাঁজা গুল”। জিজ্ঞেস করল, “তুমি ভারতীয় নও?” আমি বললুম, “আলবৎ!”
আনন্দের হাসি হেসে বলল, “ভারতীয়েরা সব বেদে।”
আমি বললুম, “সুন্দরী, তোমরা ভারতবর্ষ ছেড়েছ, দু হাজার বছর কিংবা তারও পূর্বে। বাদবাকী ভারতীয়রা এখন গেরস্থালি করে।”’
মুজতবা আলীর বক্তব্য মেয়েটা কিছুতেই বিশ্বাস করেনি। পরে জানাল শহরের বাইরে তাদের সার্কাসের গাড়ি রাখা আছে। তার বাবা-মার সঙ্গে তর্ক করার আমন্ত্রণ করল। বলল, “বাবা সব জানে। কাচের গোলার দিকে তাকিয়ে সব বাৎলে দেবে।”
ভাষাতত্ত্ব নিবন্ধের একটি রসিকতা : ‘ফরাসী ভাষাটা সব সময় ঠিক বুঝতে পারি কি-না বলা একটু কঠিন। এই মনে করুন, কোনো সুন্দরী যখন প্রেমের আভাস দিয়ে কিছু বলেন, তখন ঠিক বুঝতে পারি আবার যখন ল্যান্ডলেডি ভাড়ার জন্য তাগাদা দেন তখন হঠাৎ আমার তাবৎ ফরাসী ভাষাজ্ঞান বিলকুল লোপ পায়।’
দাম্পত্যজীবন নামক নিবন্ধে তিনটি সংস্কৃতির দাম্পত্যজীবন নিয়ে কাহিনি আছে। মুজতবা আলীর একজন চীনা বন্ধু ছিল। তারা দুজনে অফিস ফাঁকি দিয়ে প্রায়ই ক্লাবে এসে আড্ডা দিতেন। ক্লাবের এক কোণে নিমগাছের তলায় বসে তাঁরা গল্পগুজবে মজে যেতেন। সঙ্গে একজন ইংরেজ ছিলেন। কথায় কথায় তাঁদের মধ্যে একটি বিবাহিত জীবন নিয়ে আলোচনা শুরু হল। প্রথমে ইংরেজের গল্প। তাঁর গল্পটি এরকম। ‘লন্ডনে একবার স্বামীদের বিরাট প্রতিবাদ সভা হচ্ছিল। মিছিল মিটিং চলছে। প্রসেশনের মাথায় ছিল এক পাঁচ ফুট টিঙটিঙে হাড্ডি-সার ছোকরা। হঠাৎ বলা নেই, কওয়া নেই ছ’ফুট লম্বা ইয়া লাশ এক ঔরৎ দুমদুম করে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিয়ে বললে, “তুমি এখানে কেন? তুমি তো আমাকে ডরাও না। চলো বাড়ি।” সুড়সুড় করে ছোকরা চলে গেল সেই খাণ্ডার বউয়ের পিছনে পিছনে।’
এবার চীনা বন্ধুর গল্প। চীনা গুণী আচার্য সূ রচিত শাস্ত্রে এই ঘটনার উল্লেখ আছে। ‘একবার পেপিং শহরে অত্যাচার-জর্জরিত স্বামীরা এক প্রতিবাদসভার আয়োজন করেছিল। কীভাবে স্বামীদের খাণ্ডার গৃহিণীদের হাত থেকে উদ্ধার করা যায় সেই বিষয়ের আলোচনাসভার প্রধান উদ্দেশ্য। সভাপতি ছিলেন ষাট বছর ধরে দজ্জাল গিন্নীর হাতে নিপীড়িত এক দাড়িওয়ালা অধ্যাপক। সভায় বক্তারা নিজ নিজ অভিজ্ঞতা বলে গেলেন, “স্ত্রীলোকের অত্যাচারে দেশ গেল, ঐতিহ্য গেল, ধর্ম গেল, সব গেল, চীন দেশ হটেনটটের মুলুকে পরিণত হতে চলল, এর একটা প্রতিকার করতেই হবে। ধন-প্রাণ, সর্ব দিয়ে এ অত্যাচার ঠেকাতে হবে” ইত্যাদি ইত্যাদি। এমন সময় দারোয়ান হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে জানাল এ সভার খবর পেয়ে গিন্নীরা ঝাঁটা, ছেড়া জুতো, ভাঙা ছাতা ইত্যাদি নিয়ে তেড়ে আসছে। এ কথা শুনে তো সবাই পড়িমড়ি করে পালিয়ে গেল। শুধু সভাপতি তার আসনে শান্ত গম্ভীর মুখ নিয়ে বসে আছেন। দারোয়ান কাছে গিয়ে বলল, “হুজুর যে সাহস দেখাচ্ছেন তাঁর সামনে চেঙ্গিস খান তসলীম ঠুকতেন, কিন্তু এ তো সাহস নয়, এ হচ্ছে আত্মহত্যার শামিল। গৃহিণীদের প্রসেশনে সক্কলের পয়লা রয়েছেন আপনারই স্ত্রী। এখনো সময় আছে। আমি আপনাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি। সভাপতি তবু চুপ। তখন দারোয়ান তাঁকে তুলে ধরতে গিয়ে দেখে তাঁর সর্বাঙ্গ ঠাণ্ডা। হার্টফেল করে মারা গিয়েছেন।’
এবার মুজতবা আলীর পালা। গল্পটি অবশ্য পরিচিত। ‘রাজা নিজ বৌয়ের (রাণীর) অত্যাচারে মন খারাপ করে বসে আছেন। মন্ত্রী কারণ জানতে চাইলে বললেন, “ঐ রাণীটা—ওঃ কি দজ্জাল, কি খাণ্ডার। বাপরে বাপ! দেখলেই বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে।”
মন্ত্রী বললেন, ‘এ আর কী ব্যাপার, বউকে তো সবাই ডরায়। এ জন্য মন খারাপ করে বসে থাকতে হবে নাকি? রাজা বিশ্বাস না করলে মন্ত্রী জনসমাবেশের ব্যবস্থা করলেন। সেখানে বলা হলো, যারা বউকে ভয় পায় না তারা একদিকে আর যারা ভয় পায় তারা পাহাড়ের দিকে যেন যায়। মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ের দিকটা ভর্তি হয়ে গেল। একজন শুধু ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। তখন মন্ত্রী তাকে ডেকে বললেন, “তুমি যে বড় ওদিকে দাঁড়িয়ে? বউকে ডরাও না বুঝি?”
লোকটা কাঁপতে কাঁপতে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললে, “অত শত বুঝি নে, হুজুর। এখানে আসবার সময় বউ আমাকে ধমক দিয়ে বলেছিল, “যেদিকে ভিড় সেখানে যেয়ো না।” তাই আমি ওদিকে যাইনি।”’

