ভারত ভ্রমণের ভালো-মন্দ

সংখ্যা:

 

ভারত ভ্রমণে কখনোই আমার ইচ্ছা ছিল না, বরং কেউ ভারত ঘুরতে যাওয়ার কথা বললে উল্টো বিরক্ত হতাম। কিন্তু সেদিন যখন রফিক ভাই জানালেন, ‘আপনার জন্য টিকেট কেটে ফেলেছি’, তখন বুঝে নিলাম, এবার যেতেই হচ্ছে সেখানে। আমার অফিসের সহকর্মী এবং পিতাসম বয়সী রফিক ভাই চিকিৎসার উদ্দেশে ভারত যাবেন, সঙ্গে আমাকে নিয়ে যেতে চান। ব্যক্তি হিসেবে তিনি ভালোমানুষ, কাজেই তার অনুরোধের ঢেঁকি আমাকে গিলতে হলো। তাছাড়া বিনে পয়সায় ভারত দর্শনের প্রস্তাব লুফে নেওয়ার মতো না হলেও মেনে নেওয়ার মতো বিষয় বটে।

প্রস্তাবে রাজি হওয়ার পরও ভারতে যাওয়ার জন্য আমি এক কদম দৌড়ঝাপ করিনি। রফিক ভাই কীভাবে কার মাধ্যমে ভিসা করিয়ে যাত্রার দিনক্ষণ ঠিক করলেন। এরপর নির্ধারিত দিন দুপুরে কাতারের দোহায় হামাদ বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। আমাদের ভারতযাত্রা ইন্ডিগো বিমানসংস্থার একটি ‘উপোস’ ফ্লাইটে। আগেই জেনে নিয়েছিলাম, এই প্লেনে যাত্রীদের জন্য কেবল বিনামূল্যে পানি পরিবেশন করা হবে, আর কিছু নয়। ফলে বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে পুরনো সালাতা এলাকায় একটি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ থেকে দু প্যাকেট ভুনা খিচুরি সঙ্গে নিলাম। ভারতের প্লেনে আকাশযাত্রায় বাংলার খিচুরি ভোজন, দেশপ্রেমের বেশ চমৎকার নিদর্শন।

ভারতে যেতে আমার অনাগ্রহের মূল কয়েকটি কারণের অন্যতম হলো বাংলাদেশিদের প্রতি ভারতীয়দের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। বিষয়টি হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া শুরু হলো কাতারের হামাদ বিমানবন্দর থেকে। যাত্রীদের সারিতে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন আমাদের লাগেজ জমা দেওয়ার পালা এলো, তখন ইন্ডিগোর ভারতীয় কর্মকর্তা আমাদের পাসপোর্ট ভিসা দেখে চোখ উঁচু করে তাকালেন। তাঁর বক্তব্য, ‘আপনাদের কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, আমি আপনাদের ভিসার তথ্য আমাদের দপ্তরে পাঠাচ্ছি, তারা চেক করে দেখবেন, এরপর আপনাদের ডাকা হবে, ততক্ষণ অপেক্ষা করুন’।

রাগে এবং ঘেন্নায় আমার গা জ্বলে উঠলো। বেচারা রফিক ভাইয়ের বিষণ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে আপাতত গা জ্বলার যন্ত্রণা নিজের ভেতর চেপে রাখলাম। শুধু বললাম, এদের সামনে দাঁড়িয়ে আমি অপেক্ষা করতে পারবো না। আমরা চোর-ডাকাত বা সন্দেহভাজন কেউ নই। আপনি বরং দাঁড়ান, আমি এদিক ওদিক ঘুরে আসি। কাজ হলে আমাকে ডাকবেন। ওই সময়টুকুতে রাগ হচ্ছিল নিজেরই দেশের প্রতি, এতো ভারতমৈত্রী করেও আমরা বাংলাদেশের নাগরিকরা কেন ভারতীয়দের কাছে অস্পৃশ্য!!

কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি শেষে এসে দেখি, ভারতীয় কর্মকর্তা আমাদের লাগেজপত্তর বুকিংয়ে দিচ্ছেন। বোর্ডিং পাস বুঝে নিয়ে আমরা ইমিগ্রেশনের দিকে পা বাড়ালাম। যথাসময়ে প্লেনটি আকাশে উড়লো, যাত্রা শুরু হলো দোহা থেকে ভারতের চেন্নাই শহরের উদ্দেশে।

প্লেনে যাত্রীরা মোটামুটি তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত। এক শ্রেণির যাত্রী নাক ডাকতে ডাকতে ঘুমিয়ে পড়েছেন, কেউ ঘুমে পাশের জনের গায়ে ঢলে পড়ছেন। আরেক শ্রেণির যাত্রী পাশে বসা সহযাত্রীর সঙ্গে কথা বলছেন। আরেক শেণির যাত্রী মলিনমুখে চুপচাপ বসে আছেন। আমি কিছুক্ষণ পর ব্যাগ থেকে খিচুরির প্যাকেট বের করলাম। রফিক ভাইয়ের সাথে কথা বলতে বলতে মনের আনন্দে খেয়ে নিলাম।

প্লেনের ভেতর সূর্যের আলো ঢুকছে। আলোময় এই সময়ে তাই ঘুমের কোনো সম্ভাবনা নেই আমার। প্লেনের ভেতর বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে অডিও শোনা কিংবা ভিডিও দেখার সুযোগ নেই। এই অলস সময়ে আপাতত বই পড়া ছাড়া কোনো কাজ নেই আমারও। সদ্য কেনা ইরাকের যুদ্ধপরবর্তী জীবনের গল্প নিয়ে লেখা একটি উপন্যাসের ভেতর হারিয়ে গেলাম আমি।

নির্ধারিত সময়ে আমরা যখন চেন্নাই বিমানবন্দরে নামলাম, তখন সন্ধ্যা পেরিয়েছে। বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে বেরিয়ে এলাম সড়কে। রফিক ভাইয়ের পরিচিত একজন ভারতীয় তার পরিবারের জন্য জিনিসপত্র দিয়েছেন, সেটা বুঝিয়ে দিতে আমরা অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষণ পর একজন তরুণ ও তার মা এলেন। আমরা তাদের হাতে জিনিসপত্র বুঝিয়ে দিলাম। রফিক ভাই বলেছিলেন, ওই তরুণ গাড়ি নিয়ে আসবে এবং আমাদেরকে নির্ধারিত জায়গায় নামিয়ে দেবে। কিস্তু সেটা আর হলো না। তরুণ ও তার মা বাসে চড়ে এসেছেন সুদূর গ্রাম থেকে, আবার এই রাতেই তারা বাসে বাড়ির পথ ধরবেন। এই যখন অবস্থা, তখন ট্যাক্সিই আপাতত ভরসা।

ভারত সফরে মোবাইলে ‘উবার’ অ্যাপ ছিল আমার সার্বক্ষণিক সহযোগী। ‘উবার’ ছাড়া অন্য সব অ্যাপে  পরিচালিত ট্যক্সির ভাড়া বেশ চড়া। উবারে পাওয়া এক ট্যাক্সিতে চড়ে আমরা রওনা হলাম নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশে। চেন্নাই শহরের পথঘাট প্রথম দর্শনে আমাদের বেশ স্বস্তি দিল। সড়কে যানজট নেই, সবাই ট্রাফিক নির্দেশনা মেনে গাড়ি চালাচ্ছে, বড় বড় উড়ালসেতুতে ছেয়ে আছে পুরো শহর।

চিকিৎসার জন্য যারা চেন্নাই যেতে আগ্রহী, তারা যদি আগেভাগে খোঁজখবর না জেনে সেখানে গিয়ে আচমকা হাজির হন, তবে দালালের খপ্পরে পড়া খুবই স্বাভাবিক। চেন্নাইতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি রোগী চিকিৎসার উদ্দেশে যান, সেজন্য সেখানকার অনেক স্থানীয় দালাল কিছু বাংলা শিখে রেখেছেন।

রাতে আমরা যখন শহরের নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছি, তখন এক দালাল দৌড়ে এসে হাজির। তার মুখে বাংলা ভাষার দশা দেখে আমি বুঝে নিলাম, দালালির জন্যই কেবল তার এই বাংলা শেখা। কথার মারপ্যাচে সে আমাদের নিয়ে তুলল এমন এক আবাসিক হোটেলে, যেখানে তিনদিনের কম বুকিং দেওয়া যাবে না। হোটেলটিও আমাদের পছন্দ হচ্ছিল না। তবুও দালালের কথায় কান না দিয়ে আমরা সেই হোটেল ছেড়ে চলে আসি। আমাদেরকে গছিয়ে দিতে পারলে হোটেলকর্তার কাছ থেকে দু ঢোক ভোদকার জন্য কিছু কড়ি বখশিশ পেত দালাল ছোকরা, কিন্তু আপাতত সেই আশার গুড়ে বালি।

আমরা কিছুদূর এগিয়ে একটি বেবিট্যাক্সি ডেকে সেটায় চড়ে বসলাম। রাত যত গভীর হোক, ভালো হোটেল না পেলে ঘুরে ঘুরে রাত কাটিয়ে দেব, রফিক ভাইকে সেকথা বললাম। তিনি বললেন,  পেটে ক্ষুধা, একটু খেতে পারলে এরপর আপনার যা খুশি করেন, তাতে আমার আপত্তি নেই। আমি বললাম, চলেন তবে আগে রেস্তোরাঁ খুজে খেয়ে নিই।

ভারত ভ্রমণে গেলে বাংলাদেশি হিসেবে এবং মুসলিম হিসেবে খাওয়া দাওয়ায় যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়, সেটা আরও আগে উল্লেখ করা উচিত ছিল। তেল আর নারকেলে ভরা তামিলনাড়ু রাজ্যে একটু সাদা ভাত, ভর্তা, ডাল কিংবা মাছ-মাংস খুজে পাওয়া বেশ কঠিন। চেন্নাইয়েও দেখেছি, বাংলা খাবার লেখা সাইনবোর্ড দেখে রেস্তোরাঁয় ঢুকে দেখি, তাতে ভাত নেই, কিন্তু বিরিয়ানি আর রুটি-ডাল আছে, তবে এগুলোরও যে বিদঘুটে স্বাদ, তা খেয়ে পস্তানোর চেয়ে উপোস থাকা ভালো।

আমরা বেবিট্যাক্সিতে চড়ে কিছুদূর যেতেই মোটামুটি ভালো মানের হোটেল পেয়ে যাই। আপাতত সেখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই আমরা। রফিক ভাই গেলেন খাবার কিনতে, আমি ততক্ষণে হোটেল বয়কে বললাম, ব্যাগপত্তর রুমে পৌঁছে দিতে। বেশ কিছুক্ষণ পর রফিক ভাই যে ভেজিটেবল বিরিয়ানি আর পরোটা আনলেন, এর স্বাদের বর্ণনা দিলে তাতে খাবারের যেমন অপমান হবে, তেমনিভাবে পাঠকেরও অরুচি দেখা দেবে।

পাঠকের জ্ঞাতার্থে: তামিলনাড়ু ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের ২৯টি রাজ্যের অন্যতম একটি রাজ্য। এর রাজধানী চেন্নাই। ভারত উপদ্বীপের সর্বদক্ষিণে এর অবস্থান। জনসংখ্যার বিচারে এটি ভারতের সপ্তম বৃহত্তম এবং আয়তনের বিচারে একাদশ।

রাজধানী চেন্নাইয়ের পূর্বনাম মাদ্রাজ। এটি বঙ্গোপসাগরের করমন্ডল উপকূলে অবস্থিত। শহরটির বয়স ৩৬৮ বছর। এখানে জনসংখ্যা ৭০-৮০ লাখ। চেন্নাইকে ভারতের মোটরগাড়ি শিল্পের রাজধানী বলা হয়ে থাকে। ভারতে উৎপাদিত গাড়ির প্রধান অংশ এখানে তৈরি হয়।

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১