হজের মওসুম অতিক্রান্ত হচ্ছে। মুমিনের হৃদয় প্রণয়ের জোয়ারে ভাসছে। আল্লাহর ঘর দেখার তামান্না তার মনকে ব্যাকুল করে তুলছে। সে চোখের অশ্রু দিয়ে স্রষ্টার কাছে আকুল আবেদন করছে। কেঁদে জারজার হয়ে নিজ সত্তাকে নিবেদন করছে কাবার মালিকের সমীপে। মুমিনের তো সবকিছু সর্বদা আল্লাহর জন্যই নিবেদত। কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব, তাও আল্লাহর জন্য; কারও সঙ্গে শত্রুতা, তাও আল্লাহর জন্য। তারপরও হজের মৌসুম এলেই সে নিজেকে উজাড় করে সঁপে দেয় স্রষ্টার সমীপে। উদ্দেশ্য একটাই—কালো গিলাফের মাধুর্য দেখা! সবুজ গম্বুজের সৌন্দর্য অবলোকন করা! মনের আকুতি ওই একটাই! আল্লাহর ঘরের অতিথি হওয়া, প্রিয়তমের
দুয়ারে তালবিয়া পড়া—‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক! হাজির হে আল্লাহ! তোমার এই অধম আশেক হাজির তোমার ঘরে।’ মুমিন বান্দারা এখন যেভাবে কাঁদছে, প্রতি বছর হজের মাস এলে এভাবে অশ্রু ঝরাতেই থাকবে। যার ভালোবাসার অশ্রু কবুল হবে, যার মিনতি অক্লান্ত হবে, তাঁর জন্যই দাওয়াতনামা লেখা হবে। কী চমৎকার হজের এই বিধান! আল্লাহ হবেন মেজবান, হাজি সাহেবরা মেহমান! প্রতিটা মুমিন আল্লাহর মেহমান হওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকে দিনরাত। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষে অশ্রু ঝরায় প্রতি রাত। আল্লাহকে ডাকতে থাকে বারবার। কিন্তু কারও জন্য আল্লাহর ডাক আসে না একবারও। কারো আসে একবার। আর কেউ কেউ পায় বারবার, প্রতিবার। তবুও তিন দলই সফলকাম, সকলেই যে আল্লাহর তাবেদার। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করবেন নিজের ঘরের মেহমান করে তাকে নিয়ে যাবেন। বাইতুল্লাহর ছায়ার শীতলতা দেবেন। জমজমের পানি দ্বারা তৃষ্ণা মেটাবেন। সবুজ গম্বুজের সৌন্দর্য দেখাবেন। প্রিয় নবির রওজায় প্রেম নিবেদনের সুযোগ দেবেন। একজন মুমিনের কাছে এর চেয়ে বড় আপ্যায়ন আর কি হতে পারে!
বলতে পারেন, আচ্ছা, মেজবানের ঘর থেকে কি খালি হাতে ফিরবে মেহমান? না, তা কেন হবে! ইহরামের শুভ্রতায় যে পবিত্রতা ধারন করে আল্লাহর ঘরে আল্লাহর মেহমানরা যায়, সেই পবিত্রতাকে আল্লাহ আরও বাড়িয়ে দিয়ে নিষ্পাপ বানিয়ে তাকে বিদায় দেন। সে হয়ে যায় সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো। নুরের সৃষ্টি ফেরেশতার মতো। ভালোবাসার সত্তার কাছ থেকে এরূপ ভালোবাসা পাওয়ার জন্য যে কোনো প্রেমিক নিজের জীবন দিতে রাজি! প্রভুর পক্ষ থেকে এমন আতিথেয়তা পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে যে কোনো মুমিন সবকিছু কুরবান করতে প্রস্তুত।
মুমিন মানেই তো তার হৃদয়ে এই আকুতি সর্বদা জাগরুক থাকবে—হে আল্লাহ একবার দেখার সুযোগ দাও তোমার ঘর। কিন্তু একবার দেখালে সে আবার দেখতে চায়। আবারও দিদার লাভের মিনতি জানায়। আল্লাহর ঘরের মেহমান হওয়ার জন্য বারবার ফরিয়াদ জানায়। হয়তো আবার ডাক আসে, বারবার ডাক আসে। তবুও অন্তরের তৃষ্ণা মেটে না। বান্দার এই যে এত তৃষ্ণা, এত ভালোবাসা, হৃদয়ে হজ্জের তামান্না, স্রষ্টার সঙ্গে এই যে এত প্রণয়ের আকুতি, এত মায়া—এগুলো কি শুধু শুধু? না, কক্ষণও নয়!
স্রষ্টা তো বলেছেনই, ‘যাদের কলব আছে তারাই উপলব্ধি করতে পারে।’
এতকিছুর পরও যারা হজের এই বিধানের মধ্যে শুঁকতে থাকে স্বার্থের বদ-বু, দুর্গন্ধ-ময়লা, তারা নীচ ও হীন ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।
আল্লাহর সঙ্গে বান্দার এই সম্পর্ক নিয়ে যাদের থাকে আর্থিক হিসাব কষার প্রবণতা, মুখ থেকে বের হয় তাচ্ছিল্যের কথা, তারা পৃথিবীর কণ্টক ছাড়া আর কিছুই না। ইসলাম এবং মুসলমানকে আল্লাহ তায়ালা এই ধরনের নীচ লোক থেকে হেফাজত করুন এবং প্রত্যেক মুমিনকে বারবার জেয়ারতে বায়তুল্লাহ নসিব করুন।

