কী যে কাল এলো, বা একটু আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে, এই হচ্ছে কলি কাল বুঝলেন; ইত্যাদি নানানভাবে আমরা বড়দের আক্ষেপ করতে শুনি৷ অধুনার ছেলেপেলে যে সব উচ্ছন্নে গেছে, তাতে তাদের বিন্দুমাত্র কোন সন্দেহ নেই৷ এই আক্ষেপটা একটা সণ্ডা মার্কা পাহাড়ের মতো ঝুলতে থাকে শিক্ষকদের কাপাল হয়ে৷ পেন্ডুলামের মতো৷ তাদের মুখে প্রায়শই আমরা শুনতে পাবো, আমরা যখন ছাত্র ছিলাম; তখন শিক্ষকদের কতো সম্মান করতাম! আর এখন তো শ্রদ্ধাবোধ প্রায় লোপ পেয়েই গেছে৷
সমাজের হালচাল দেখে তাদের কথা একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়৷ আমাদের সমাজের শিক্ষকগণ সবচে’ বেশি অপমানিত হচ্ছেন তাদের ছাত্রদের হাতেই৷ খ্যাতিমান শিক্ষকদেরও রেহাই নেই এক্ষেত্রে৷ পাশাপাশি একথাটাও সত্যি, যে, বিগত যুগের মতো স্নেহশীল, বাৎসল্যপরায়ণ শিক্ষকও এখন অবলুপ্তপ্রায়৷ ছাত্র শিক্ষকের মধ্যে এখন একটা দূরত্ব তৈরী হযে়ছে৷ টাকাই এখন ছাত্র শিক্ষকের সম্পর্কের ভিত৷ মুদ্রার লেনদেন ব্যতীত শিক্ষকরা এখন ছাত্রদের একটা অক্ষর বুঝাতেও রাজি নন৷
অতীতকালে প্রায় সকলেরই একজন করে প্রিয় শিক্ষক থাকতেন৷ আমৃত্যু যার স্মৃতি রোমন্থন করতেন তারা৷ ইদানিং হাতেগোনা শুধু ক’জনেরই প্রিয় শিক্ষক থাকেন৷ সবার ভাগ্য অতোটা সুপ্রসন্ন এখন আর নেই৷ তবে আমার কপালে জুটেছেন একজন প্রিয় শিক্ষক৷ আন্তরিক একজন পথপ্রদর্শক৷ যার মোহনীয় আচরণ আকর্ষণ করবে যে কাউকেই৷ আমিও আকৃষ্ট হয়েছিলাম তার প্রদীপ্ত চেতনায়৷ এক মোহগ্রস্থতা আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল তার দুয়ারে৷
হেফজ শেষ করে সবে মাত্র কিতাবখানায় উঠেছি৷ মাদরাসাতুল হুদা, বাসাবো, ঢাকা৷
মাযে়র গর্ভ থেকে এই বিশাল পৃথিবীতে এসে শিশুরা যেমন চমকে যায়৷ তেমনই হকচকিয়ে গিয়েছিলাম আমিও৷ পরিবেশ-প্রতিবেশ, নিয়ম-কানুন ও কিতাবাদি দেখে আমি প্রায় দিকভ্রান্ত৷ মানিয়ে নিতে সময় লাগল খানিকটা৷
ধাতস্থ হলেও আমি ছিলাম চুপচাপ৷ তবে মাদরাসায় একটা জিনিস নজর কাড়ল খুব৷ প্রায় সকল পুরাতন ছাত্রকেই দেখতাম একজন শিক্ষকের পিছনে ছুটতে৷ তিনি মাদরাসায় এলেই একটা ছন্দ দোলা দিয়ে উঠত৷ প্রাণ চাঞ্চল্য ছডি়যে় পড়ত পুরো মাদরাসা জুডে়৷ আমি শুধু তাকিয়ে দেখতাম৷ তার কাছে যাওয়ার সুযোগ মেলেনি তখনো৷ কারণ প্রথমবর্ষে তার কোন দরস ছিল না৷
দ্বিতীয় বর্ষে এসে তার দরস পেলাম৷ আব্দুল হাই হুজুরের দরস নেওয়ার জন্যে রীতিমত একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলত৷ না পেলে অফিসে আবেদনও দাখিল হতো৷ খুব আশ্চর্য হয়ে আবিস্কার করলাম, হুজুরের দরসই সবচে’ আনন্দময় ছিল৷ তিনি আমাদের শেষ ক্লাসটা নিতেন৷ সারাদিন ক্লাস করে একটা ঝিমুনি চেপে বসত৷ কিন্তু তিনি দরসে আসতেই চাগিয়ে যেত শরীর৷ তার কথার মধ্যে একটা যাদু ছিল৷ তিনি যখন আরবিতে বক্তৃতা করতেন তখন চারদিকে নেমে আসত পিনপতন নীরবতা৷ সবাই স্তব্ধ হযে় শুনত তার লেকচার৷ আমি যন্ত্রচালিতের মতো তাকে অনুসরণ করতে শুরু করলাম৷ বক্তৃতা করতে চাইতাম তার মতো৷ তার মতো করে হাত নাড়তাম৷ এমনকি রুমালটাও গাযে় জড়াতাম তার অনুকরণে৷
ধীরে ধীরে তার কাছে এলাম৷ কী না কী বলবেন, এই ভেবে অজস্র সময় ঝরিযে়ছি৷ কিন্তু কাছে যেতেই, আমাকে একেবারে অবাক করে দিয়ে, বাৎসল্যের ডানা মেলে তিনি গ্রহণ করলেন আমাকে৷ আমার হৃদযে়র আকুতি শুনলেন৷ তিনি এমনভাবে কথা বলতে শুরু করলেন যেনো আমার হৃদযে়র সম্পূর্ণ উত্তাপটুকু শুষে নিয়েছেন৷ এবং মোক্ষক পথ্যটাই বাতলে দিচ্ছেন৷ শান্ত-সমাহিত কণ্ঠে ঐ শব্দগুলোই বলে যাচ্ছেন যা আমি খুঁজছিলাম এতোকাল৷ তার প্রতিটা বাক্য আমার হৃদযে়র কুঞ্জে বইযে় দিল সবুজ সমীরণ৷ তাকে আমার পথপ্রদর্শক বানানোর সিদ্ধান্ত নিযে় ফেললাম৷ এবং এক রাতে জীবন গড়ার দীক্ষা গ্রহণ করলাম তার হাতে৷
সেই রাতের পর আর ঘুরতে হয়নি তার পিছুপিছু৷ বরং তিনিই বারবার খোঁজ রেখেছেন আমার৷ প্রায় প্রতিদিনই তিনি খোঁজ নিতেন৷ পড়ালেখা কেমন চলছে৷ কোন সমস্যা আছে কি না৷ নতুন নতুন বিষযে় নতুন নতুন বই পড়ার তাগিদ দিতেন৷ তার কাছে থাকা বাংলাদেশে প্রায় দুষ্প্রাপ্য বইও নির্ধিদ্বায় পড়তে দিতেন৷ আমি হয়তো নষ্ট করে ফেলতে পারি, বা হারিযে় যেতে পারে; তার মুখে এমন কিছুর ছাপ থাকত না৷ একেবারে আপন করে নিযে়ছিলেন আমাকে৷ একটা মানুষকে যে মুহূর্তেই এতোটা আপন করে নেয়া যায়, তা আব্দুল হাই হুজুরকে না দেখলে জানতেও পারতাম কি না সন্দেহ৷
আমার জীবনে তার অবদান এতো এতো যে, যদ্যপি আমার গুরুর মতো একখানা বই লিখে ফেলা যায়৷ সে বই পড়ে আব্দুল হাই হুজুর নিজেও অবাক হয়ে যাবেন৷ আমি যে তার প্রতিটা পদক্ষেপ এতোটা সূক্ষ্মভাবে অনুসরণ করেছি তা স্বয়ং তিনিও অবগত নন৷ তার সবগুলো অবদানকে একটি পাটাতনে ফেললে বলতে হয়, তিনি আমাকে স্বপ্ন দেখাতে শিখিযে়ছেন৷ বড় হবার জন্য যে একটা স্বপ্ন দেখত হয়, তা আমি প্রথম জেনেছি আব্দুল হাই হুজুরের মুখ থেকেই৷ এখনো যখনই তার কাছে যাই বুকের মাঝে লুকিয়ে থাকা স্বপ্ন-চারাটা সিঞ্চিত হয়৷ পত্র-পল্লবে তা সজীব হয়ে ওঠে৷ নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস বুকে করে ফিরে আসি৷
তিনি আমার জীবনে দেখা একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক৷ যার হাতের ছোঁয়ায় পাল্টে যায় ছাত্রের জীবন৷ যেমনটা পাল্টেছে আমার৷ এমন একজন গুরুর সন্নিধান আমার জীবনের বড় পাওয়া৷ মহান আল্লাহর দরবারে যার শুকরিয়া করে শেষ করার নয়৷ তাকে গুরু বলার মতো মুখ এখনো হয়নি আমার৷ সুতরাং এই লেখাটা একরকম ধৃষ্টতার পর্যাযে়ই পড়ে৷ আল্লাহর দরবারে অনুনয়-ঝরা ফরিয়াদ, হে রব! আমার জীবনের ওপর দীর্ঘাযি়ত করো এই বটবৃক্ষের ছায়া ৷
সিকদারপাড়া রোড, উজিরপুর, বরিশাল। মোবাইল ০১৯৮৭৯৪৭৪৫৪

