১.
“কিছু মানুষ থাকে অবলোকনে তারা খুব সাধারণ,কিন্ত তাদের মুখে অবয়বে কিছু একটা থাকে অসাধারণ। সেটাকে বলতে পারো ‘সরলতার দীপ্তি ও প্রভা’। কিংবা ‘অন্তরঙ্গতার সজীব স্নিগ্ধতা’।
হয়তো এটাকেই বলা হয়েছে ‘মুখের অবয়বে হৃদয়ের পবিত্রতার প্রলেপ’। প্রথম দেখাতেই তারা আপন হয়ে যায় এবং হৃদয়ে তাদের ছবি চিরকালেরর জন্য আঁকা হয়ে যায়।”
সেই তাঁদেরই একজন আমাদের প্রিয় এই মানুষ ।প্রিয় এই শিক্ষক । যার নাম ফয়জুল্লাহ। আমরা যাকে ডাকি ‘নায়েব সাহেব’ বলে।
২.
চিরাচরিত সেই সুরত আর পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে তিনি সবসময় দরসে হাজির হন। তাকে প্রতিদিনই দেখি। তথাপি তার সাদা পোশাকের শুভ্রতায়, সোনাবরণ ফ্রেমের চশমায়, গায়ের গৌরি- সুন্দর মায়া- আভায়, সুরত-চেহারার স্নিগ্ধ সজীবতায় এ দু’চোখ তাকে বরাবরই দেখতে চায়!
প্রতিভা পরিশ্রম আর প্রাপ্তির ঐশ্বর্যে মহিমান্বিত তার জীবন। খোদা প্রদত্ত অসামান্য মেধায় তিনি দিয়েছেন দীর্ঘমেয়াদি মেহনতের অগ্নিস্পর্শ। ফলে তিনি হয়ে উঠেছেন খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি এক স্বর্ণ-মনিষা। তাই তার জীবন এক মহাজীবন!মহৎজীবন! তার সেই জীবনের ইতিহাস অর্জন প্রাপ্তি আর গৌরবের ইতিহাস! তার জীবনের পুরোটাই অবিশ্বাস্য সাফল্যের, অসামান্য অর্জন আর কৃতিত্বের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
৩.
আরোপিত সীমাবদ্ধতা আর বিষয় নির্দিষ্টতার কারনে আজ এখানে তাঁর জীবনের অন্যান্য দিক নয়। বরং একজন ‘প্রিয় শিক্ষক’ হিসেবে শুধুমাত্র তার শিক্ষকজীবনের, তার শিক্ষকতার এবং প্রসঙ্গত তার ইলমিব্যক্তিত্ব ও জ্ঞানসত্বার ‘নির্বাচিত কিছু দিক’ আমার দেখা ও স্মৃতি থেকে এখানে তুলে ধরবো।
তাঁর ইলম ও ইলমি ব্যক্তিত্বে যে ‘অনন্য স্বাতন্ত্র্য’ বিদ্যমান অন্যান্য আহলে ইলমের তুলনায় তা হলো, সাধারণত আলেমগনের মাঝে ‘ইস্তিদাদী ইলম’ পাওয়া যায় অর্থাৎ তাদের জ্ঞানসত্তায় এ যোগ্যতাটি উপস্থিত যে তারা যদি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিতাবপত্র ঘাটাঘাটি করে তবে উক্ত মাসআলার সম্যক অবগতি লাভে সমর্থ হতে পারে।পক্ষান্তরে তাঁর ইলম ‘হুজুরির সাথে সম্পৃক্ত’ অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মৌলিক এবং প্রাসঙ্গিক উপযুক্ত তথ্য ও তত্বজ্ঞান সম্বন্ধে তার স্মৃতিশক্তির সঞ্চয় চিরসমৃদ্ধ -উপস্থিৎ সমাধানে তাঁর ইলম সদাসক্রিয়!
নাহু সরফ ফিকহ মানতিক হিকমত ফালসাফাহ, হাদিস তাফসীর বিষয়ক যখন যে জটিল মাসআলা দরসে -বয়ানে তার সামনে আসতো- এমন জামিইয়্যত ও ‘আমফাহম আন্দাযে তথা কোনকান্ মেরে এবং সহজ করে বলতেন যে, মনে হতো সংশ্লিষ্ট সেইসব কিতাবাদি তার সামনে উম্মুক্ত। আর মনে হতো, এ মাসআলাটা নতুনভাবে শুনেছি এবং নতুনকরে বুঝেছি!
আমরা ভেবে ভেবে অবাক হতাম,কৈ তাকে তো তেমন করে ‘কুতুববিনীতে’ দেখা যায়না এবং এর জন্যে উল্লেখযোগ্য কোন সময সুযোগও তার হাতে নেই। তবুও ইলম ও মালুমাতের এমন আজীমুশশান অবস্থান! সুবহানাল্লাহ!
এখানে এসে ‘শাহ সাহেবের’ কথা মনে পড়ে। অবশ্য তিনি ছিলেন এক ভ্রাহ্মমান লাইব্রেরী! ইনি হবেন কিতাবাদির একটা ভ্রাহ্মমান আলমারী! নিদান পক্ষে হলেও।
৪.
সার্থকতা ও সৌন্দর্যে ভরা তার…
ছাত্র জীবনের মতো তার শিক্ষক জীবনও সৌন্দর্য ও স্বার্থকতায় উজ্জ্বল ও অনন্য। একজন আদর্শ অভিজ্ঞ শিক্ষক,একজন শফীক ওস্তাদের জন্যে যে যে সিফাত যে যে কামালাতের একান্ত প্রয়োজন সেসব তাব মাঝে শতভাগ বর্তমান।
এ বিষয়ে সামান্য আলোকপাত করি। যেভাবে দেখেছি…
তার শিক্ষকতার উল্লেখযোগ্য একটি স্বার্থক, সুন্দর ও সফল দিক হলো “পাঠদান পদ্ধতির সার্বজনীন উপযোগিতা ও কার্যকরিতা”। অর্থাৎ এমন সহজবোধ্য ও আয়ত্তসাধ্য যে সকল ছাত্র- সে যে মানের হোক, যে মনের হোক- অনায়াসে বুঝে নিতে পারে। উপস্থাপনের কুশলতা, বর্ণনাভঙ্গির আকর্ষণীয়তা,সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাহ্যিক তথ্য উপাত্তের ব্যাপকতা, ভাষার সাবলীলতা মুশকিল মাসআলা আর জটিল মতনকে পানির মত সরল করে দেয়!
সত্যি সত্যি কোন মতন -মাসআলা যদি অপেক্ষাকৃত দুর্বোধ্য হয় তখন তিনি ধরিয়েই কিতাবে ঢুকে পড়েননা বরং প্রথমে হালকা আলাপচারিতাধর্মী খোশগল্প শুরু করেন। আপাত বিবেচনায় যা শুধুই ‘গল্পকথা’ অথচ এরই মধ্য দিয়ে তিনি হঠাৎ মুল মাসআলায় ঢুকে পড়েন যে, ছাত্রদের ‘গল্পময় হাঁসি-উল্লাস আর কিতাবের বুঝ ও মর্ম-উদ্ধার’ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়! তখন কেউ কেউ বলে উঠে, উহ! এই কথাটিই কি বুৃঝানো হয়েছে এ-মতনে! এত সহজ কথা!!
তার ‘সর্বজন গ্রহণীয়তার এ যোগ্যতা ও কুশলতা’র উৎস কি যদি বলি, তা হলে বলব–এটা প্রথমত: ফজলে এলাহী তথা আল্লাহর একান্ত দান।
দ্বিতীয়ত: তিনি মনে প্রাণে এ দর্শন লালন করেন এবং বিশ্বাস করেন যে,”শিক্ষকের স্বার্থকতা শিক্ষাদান করায় নয়, বরং শিক্ষার্থীকে তা অর্জন করতে সক্ষম করায়!”
বলি,
এখানে এসে তার শাফাকাতের, মাহাব্বাতের বিষয়টি স্পট হয়ে উঠে যে–
তিনি যেকরে হোক প্রত্যেকটি ছাত্রকে কিতাবের মর্ম বুঝাতে মরিয়া হয়ে উঠেন। প্রত্যেকের ‘মেধা এবং মানসিকতা’কে সামনে রেখে প্রয়োজনে স্বতন্ত্র সিস্টেম অবলম্বন করে সন্তোষজনক একটা বুঝ
তাকে দিতে সমর্থ হন। এবং তার থেকে সে পড়াটুকু অন্তত ‘তার মত করে হলেও’ বুঝে নেন। ‘না বুঝে দিয়ে আর না বুঝে নিয়ে’ পাঠদানে তিনি আদৌ প্রস্তুত নন।
কেউ একান্ত না বুঝতে চাইলে তাকে তিনি একেবারে পাশে বসিয়ে, তার মাথায় হাত বুলিয়ে,মুখে মুখে বলিয়ে বলিয়ে তা বুঝিয়ে ছাড়েন! এমনকি এমনও হয় যে নিজের হাতের চায়ের কাপটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন আগে চা পান করে নাও ইনশাআল্লাহ! এক্ষুনি বুঝে যাবে। সুবহানাল্লাহ! এমন শাফাকাতের কি কোন তুলনা আছে? এমন শফীক ওস্তাদের কি কোন উপমা আছে? অন্তত একালে!
তাইতো তিনি সমস্ত তালাবার একান্ত আপন, অন্তরঙ্গ শ্রদ্ধাভাজন। সকলের মুখে মুখে তার গুনগান। সর্বত্র তার জয়গান। তার দরসে বসতে সকলেই উৎসুক। যারপরনাই উম্মুখ। সময়ের দীর্ঘতা কিংবা পারিপার্শ্বিক বিঘ্নতা কারো নিমগ্নতাকে বিচ্যুত করতে পারেনা। কারো মনোযোগকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনা। ‘সুর্যমুখী ফুলের মত’ সকলেই অপলক তাকিয়ে থাকে তার দিকে অনুক্ষণ! সত্যিই তার স্নেহসিক্ত হাঁসি- সুন্দর মুখ-চেহারা কী এক মধুর আকর্ষণে মুগ্ধ করে রাখে সকলের নয়নমন!
তিনি যখন কারো প্রতি শাসনের প্রয়োজনে কঠোরতা প্রদর্শন করেন সেখানেও থাকে কোমলতার স্নিগ্ধ আবহ। থাকে শাসনের মাঝে স্নেহের শীতল পরশ। যাই বলেন আর যতই বকেন উপস্থিত কাফ্ফারা হয়ে যায় সেসবের তার হাঁসিময় আবেগজাত অভিব্যাক্তি! কৌতুকীয় কান্ড-কীর্তি! যত অভিমান মুহূর্তেই কেটে যায় বাষ্পেরর মত।যত বিরক্তি বিরাগ কিংবা বৈরিভাব উড়ে যায় কর্পূরের মত। কখনো বা কাছে টেনে হাত ধরে পাশে নিয়ে বসান।গায়ে মাথায় সান্তনার হাত বুলান। কখনো বা তার কাছে করজোড়ে ক্ষমা চান!
৫.
দরসের ইমতিয়াজী খুসুসিয়্যাত…
দরসে এসে প্রথমে তিনি উড়ালদৃষ্টিতে দেখে নেন উপস্থিত সবাইকে।বাদ পড়েনা তার সেই বাজদৃষ্টি থেকে কেউই। কারো গায়রে হাজিরি সহজেই টের পেয়ে যান। প্রয়োজনে সামান্য সময় হালপুরসি করেন। এরপর হালকাচালের হাস্যরস করে ছাত্রদের সাথে একেবারেই ‘হালকা’ হয়ে যান। আলাপ-কল্পনায় মিশে যান সকলের সাথে। হয়ে উঠেন একাকার একাত্ম !এখন আর কোন রু’অব্ কিংবা ভয় নাই!দুরত্ব কিংবা উচুত্ব নাই!!এবার পাঠদান শুরু। ছাত্ররা উজ্জীবিত,উৎসাহিত। সচেতন সজাগ মন -মানস
নিয়ে, সুধীর- সুস্থির হয়ে শ্রবন করে যাচ্ছে তার দরস -তাদরিস…
“কাআন্না আলা রুউসিহিম আততাইরা”!
৬.
গাম্ভীর্য আর সারল্যের যুগপৎ অবস্থান…
তার পরিমিত পদক্ষেপ, অঙ্গ- সঞ্চালন,শারীরিক সংযম, সংহত উপবেশন, দৃষ্টির নিক্ষেপণ তার ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য- গায়রতের পরিচয় বহন করে। অপরদিকে তার বিনীত আচরন, নমিত উচ্চারণ, অন্তরঙ্গ আলাপন, স্বপ্রণোদিত আলিঙ্গন দেখে তাকে মনে হয় একেবারেই সরল সাধারণ!
‘উসআতে ক্বলবী, উদার আন্তরিকতা , বে তাকাল্লুফ বিনয়-নম্রতা,আত্মপ্রচারে অনুৎসাহ, ঈছার- অগ্রাধিকার নির্মোহ দয়া-দরদ, বে-নফস্ মায়া-মাহাব্বাত ইত্যাকার মহৎ গুণমহিমা তার ব্যক্তিসত্তায় সতত উদ্ভাসিত। নিত্য উৎসারিত।
সত্যি বলতে কি, ‘রাব্বে যুল জালাল’ তার ব্যক্তিত্বের মাঝে দিয়েছেন আশ্চর্য রু’অব ও জালাল। তা সত্তে ও তার শান সেই ‘ইবাদুর রাহমানের’ জীবন্ত নিশান! যার সংজ্ঞা ও সন্ধান দিয়েছে পবিত্র কুরআন।
তিনি ছোট -বড় বিশেষ -সাধারণ সকলের সাথে চুড়ান্ত বিনয়ের সাথে পেশ হন। বিনয়ের এমন পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন যে, তাকে যারা চিনে তারা তার এমন বিনীত ব্যবহারে লজ্জায় নত হয়ে যায়! আর যারা তাকে জানেনা তারা দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে যায়! তার আদব এহতেরাম এমন, একজন মুরিদ তার শায়খের সাথে যেমন!
ছোটদের- ছাত্রদের থেকে শিখতেও সামান্য কুণ্ঠাবোধ করেননা তিনি। এমনকি ছাত্রদের থেকে নিয়মিত মাফি মার্জনা পর্যন্ত তলব করেন। কী, এমন উদারমনতার কি কোন তুলনা হতে পারে!
” فروتنی ست دلیل رسیدگان کمال”
তার বা -কামাল ব্যাক্তিসত্তার মাঝে অন্যান্য অসাধারন গুণ -বৈশিষ্টের পাশাপাশি হাসি- বাৎসল্য ও বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতারও আছে প্রমিত ও নন্দিত সমাহার। যা তার ‘জ্যোতির্ময়’ ব্যাক্তিত্বকে আরো ‘আকর্ষণীয়’ করে তুলেছে!
হালকায়ে দরসে, মাহফিলে- মাজলিসে,সর্বত্রই তার অধরে লেগে থাকে ‘তাবাসসুমের’ মৃদু- মিষ্টি হাঁসি। তাবাসসুম- মাখা সেই মুখ -চেহারা ফিরিয়ে তিনি যখন ‘খাস নজরে’ দৃষ্টিপাত করেন। অন্তর আত্মায় তখন অন্যরকম এক আবেগ উচ্ছাসের জোয়ারেরা এসে অবিরত আছড়ে পড়ে! আহা! কী আশ্চর্য কোমল সে চোখের তারা! কী স্নিগ্ধ মধুর সে মুখের তাবাসসুম!! কতনা দরদে ভরা সে দৃষ্টি ! কতনা মায়ায় ভরা সে মুচকি হাঁসি!! সত্যিই এমন ‘হাঁসিময় মানুষ’ কভু দেখেনি এ দু ‘চোখে!
শেষ কথা…
জীবনের যেখানে যখন যার কাছে পেয়েছি এবং পাবো স্নেহ -প্রীতি, মায়া- মমতা, মাহাব্বাত- ভালোবাসা, সহানুভূতি-শান্তনা- স্বীকার করি, এই তিনিই হবেন ‘চির-কৃতজ্ঞতার’ প্রথম হকদার!
মনে প্রাণে নয়,নয় হৃদয়ের গহীনে ; তিনি অঙ্কিত থাকবেন চিরকাল ‘আত্মার একান্ত মণিকোঠায়’। বোধ করি,এ অনুভূতি, এ অভিব্যাক্তি আমি একের নয়,অন্য অনেকের!
মেশকাত, জামেয়া রশীদিয়া লষ্করহাট, ফেনী
০১৭৮৪ ৫৩০২৭৬, ০১৮৭২ ৪৫৫৭৪১

