আমার প্রিয়জন

সংখ্যা:

আমি মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার বিষয়টা বংশপরম্পরা হিসেবে নয়। কেননা পরিবারের কেউই মাদরাসাপড়ুয়া নন। একমাত্র আমার আব্বুর মনোবাসনা যে, আমার ছেলে হবে জগদ্বিখ্যাত আলেম। পরিবারের সবার ইচ্ছে ছিল, আমি হব জগদ্বরেণ্য ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু সন্তানকে নিয়ে বাবার ইচ্ছাটাই প্রণিধানযোগ্য। তাই আব্বু তাঁর মনোবাসনা পূরণের লক্ষে সেই ছোটবেলা থেকেই মসজিদ-মাদরাসার প্রতি আমার আগ্রহ সৃষ্টির জন্যে যথাসম্ভব চেষ্টা করেছিলেন। যার দরুন তাঁর বিশেষ মেহনতের ফলে স্কুলে পড়া অবস্থাতেই আমার মক্তবের পড়াশোনা শেষ হয়ে নাজেরাও কিছুটা চালু হয়ে গিয়েছিল। স্কুলে প্রাইমারি শিক্ষার পরেই আমাকে মাদরাসায় ভর্তি করাই ছিল আব্বুর প্রধান পরিকল্পনা। তাই স্কুলে প্রাইমারি শিক্ষার শেষ বছরে আমার ভেতর মাদরাসার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য বিশেষ মেহনত চালাচ্ছিলেন আব্বু। অনেক কিছু বলে বলে বুঝানোর চেষ্টা করছিলেন আমাকে।

“দেখো বাবা! মাদরাসার হুজুররা খুব ভালো, অনেক আদর করেন। তাছাড়া তোমার সবচে’ প্রিয় জায়গা দাদুবাড়িও তো মাদরাসার খুব কাছে। প্রতিদিন আসা-যাওয়া করতে পারবে।”…

এ ধরনের আরো কতরকমের কথা বলেছিলেন, তার ইয়ত্তা নেই। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। স্কুলজীবন বিদায় জানালাম। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আম্মু কাঁদছিলেন। অথচ আমি ছিলাম বেশ খুশি। আম্মুর কান্নার কারণ বুঝিনি আমি। দ্রুত মাদরাসায় যাওয়ার জন্য মনটা আকুপাকু করতে লাগল। যতটা পথ আমাকে দেখা যাচ্ছিল, আম্মু ততটা পথ তাকিয়েছিলেন। একসময় আম্মুর মায়াভরা চাহনি আমার চোখ থেকে আড়াল হলো। হঠাৎ আমার মনটাও পরিবর্তন হওয়া শুরু হলো। অবুঝ মনের আকাশটায় কালো করে মেঘ জমা শুরু হলো। মাদরাসায় ঢোকার সাথে সাথেই চোখ থেকে অঝোরে ঝরতে লাগল অশ্রু। কান্না জুড়ে দিলাম একেবারে হাউমাউ করে। আব্বু সান্তনা দিতে থাকলেন। আমাদের নেগরান শিক্ষক মাওলানা আবদুর রহমান সাহেব (দা. বা.) দৌড়িয়ে আসলেন। আমাকে কাছে টেনে নিয়ে আদর করতে লাগলেন। এদিকে আমার কান্না আর মন পোড়া থামেই না। হুজুর আব্বুকে বললেন, “জনাব! আপনি চলে যান। ও ঠিক হয়ে যাবে। আমি তো আছিই। চিন্তা করবেন না। শুধু দোয়া করবেন আপনারা।”

আব্বু চলে গেলেন। হঠাৎ হুজুর আমাকে ধাক্কা দিলেন! রক্তচক্ষু করে চিৎকার দিয়ে বললেন, “চুপ! একদম চুপ!! কান্না করলে খবর আছে! পিঠের চামড়া উঠিয়ে ফেলব! যাও, অজু করে এসো!”

হুজুরের এমন আচরণে আমি খুব অবাক হলাম। ভয়ে চুপসে গেলাম। ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করছিলাম।

যেহেতু মক্তবের পড়া শেষ হয়ে আমার কিছুটা নাজেরাও হয়েছিল, তাই হিফজ বিভাগে থেকেই নাজেরার সাথে সাথে অল্প অল্প করে হিফজ করতাম। নেগরান শিক্ষকই ছিলেন আমার পড়াশোনার শিক্ষক। সবসময় রাগারাগি করতেন আমার সাথে। বকাবাজি করতেন। খুব পিটুনি দিতেন আমাকে। হাতে পায়ে ধরলেও পিটুনি থামাতেন না। তখন আমার কাছে পুরো পৃথিবীতে জল্লাদ আর ভয়ংকর ব্যক্তি বলতে তিনিই ছিলেন। তাঁর ভয়ে দুষ্টুমি করতাম না। ঠিকমত পড়াশোনা করার চেষ্টা করতাম। না করে উপায় কী! নইলে কপালে শনি আছে! হুজুরকে সারাদিন নিজে নিজে খুব করে গালাগালি করতাম। গালাগালি করাটা সহপাঠীদের সাথেও ভাগাভাগি করতাম। সবসময় মনে হতো, হুজুর আমাদেরকে মানুষ মনে করেন না। হুজুর ছিলেন আমার সবচে’ অপ্রিয় ব্যক্তি। হুজুর কবে বাড়ি যাবেন সে অপেক্ষায় থাকতাম আমরা। হুজুর বাড়ি গেলে আমাদের খুশির সীমা থাকত না।

এক বিকেলে রাস্তায় হুজুরের সাথে দেখা হওয়ার পর সালাম দিইনি বলে, মাদরাসায় এসে পিটুনি দিয়েছিলেন আমাকে। আমি কেঁদেছিলাম। মনে মনে গালাগালি করেছিলাম। এরপর থেকে বড়দের দেখলে আপনাআপনি মুখ থেকে সালাম বের হয়ে আসে আমার।

আমার মাদরাসাজীবনের প্রায় এক বছর কেটে যায়। ততদিনে আমি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলাম মাদরাসার সাথে। হুজুরের ভয়ে ভয়ে আমার দিন-রাত কেটে যেত। সারাদিন হুজুরকে পাহারা দিতাম আমরা।

একরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে দেখি, হুজুর আমাদের টয়লেট আর বাথরুমগুলোর দিকে যাচ্ছেন। আমি অবাক হলাম। কেননা হুজুরের জন্য নির্দিষ্ট বিশেষ বাথরুম রয়েছে। তারপরও হুজুর কেন আমাদের বাথরুমগুলোর দিকে যাবেন! আমার মনে কিসের যেন সন্দেহ ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পরে আমি আস্তে আস্তে বাথরুমগুলোর দিকে গেলাম— হুজুর কী করছেন, দেখার জন্য। যেয়ে আড়াল থেকে দেখি, হায় আল্লাহ! হুজুরের হাতে টয়লেট পরিষ্কার করার ব্রাশ! হুজুর আমাদের টয়লেটগুলো নিজ হাতে পরিষ্কার করছেন! খুব আশ্চর্যান্বিত হলাম। লজ্জাবোধ হচ্ছিল আমার ভেতর। হুজুর আমাদের টয়লেট পরিষ্কার করছেন!… ছি! ছি!

হুজুর আমার উপস্থিতি আঁচ করতে পারলেন। তিনি দ্রুত একটি টয়লেটে ঢুকে, দরজা বন্ধ করে দিলেন।

আরেক রাতে টয়লেটে যাওয়ার জন্য উঠলাম। উঠে দেখি, হুজুর জায়নামাজে। দোয়ায় মগ্ন। আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম, হুজুর আমাদের জন্য দোয়া করছেন। যাতে আমাদের জেহেন-জাকাওয়াত বেড়ে যায়। অনেকের নাম ধরে ধরে দোয়া করছেন তিনি। একসময় আমার নাম ধরেও দোয়া করলেন। আমি মুচকি হেসে, অবজ্ঞা করলাম। হুহ!…

শীতকালে আরেক রাতের কথা। ঘুমের মধ্যেই অনুভব করছি আমার শীত শীত লাগছে। হঠাৎ আমার পাতানো বিছানায় কারো পা পড়ার উপস্থিতি টের পেলাম। ঘুমের চোখ টেনে একটু মেলতেই দেখলাম, হুজুর আমার বিছানায় এসেছেন। ঘুমের মধ্যে নড়াচড়া করার কারণে আমার শরীর থেকে সরে যাওয়া কম্বলটি তিনি আমার গায়ে ভালো করে জড়িয়ে দিলেন। এমন করে যার যার শরীর থেকে কম্বল/লেপ সরে গিয়েছে, তিনি কাছে গিয়ে গিয়ে তাদের গায়ে ভালো করে জড়িয়ে দিচ্ছিলেন। যাতে করে শীতের কারণে কারো কষ্ট না হয়। আমরা যেন আরামে ঘুমুতে পারি।

এতকিছুর পরেও হুজুরকে আমি বুঝতে পারিনি। সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম, যে রাতে হঠাৎ করে আমার অ্যাপেন্ডিসাইটিসের প্রচণ্ড ব্যথা উঠেছিল। ব্যথার তীব্রতায় আমি চিৎকার করছিলাম। হুজুর আমাকে কোলে করে দ্রুত হাসপাতালে গিয়েছিলেন। সারারাত জেগে বসেছিলেন আমার পাশে। এরপর থেকে স্বেচ্ছায় হুজুরের খাদেম হয়েছিলাম আমি।

হুজুর কখনোই বুঝতে দিতেন না আমাদের প্রতি তাঁর মায়া-মমতা। কেননা আমরা ঠিকমত পড়াশোনা করব না। হুজুর বাড়ি থেকে আসলেই বুঝতে পারতাম আমাদের পড়াশোনার নাজেহাল অবস্থা। হুজুরের উপস্থিতিই ছিল আমাদের জন্য নীরব শাসক। আমাদের জন্য হুজুরের ত্যাগগুলো এখন উপলব্ধি করি। খুব মনে পড়ে। চোখ ভিজে আসে। দোয়া করি। হুজুরের বিনিময় মহান আল্লাহর কাছে। আমার জীবনের মোড় ঘুরানোর ক্ষেত্রে সবচে’ বেশি অবদান রেখেছে হুজুরের শাসনগুলো। তাঁর শাসনগুলোই হয়েছে আমার জীবনের পাথেয়। আমার মতো অভাজনের কলম তাঁকে উপস্থাপনের কোনো যোগ্যতাই রাখে না। এখন বুঝি, তিনিই আমার সবচে’ প্রিয়জন।

 

কদমতলী, ঢাকা- ১৩৬২

মোবাইল : ০১৬২৩ ২০ ৫০ ৮০ / ০১৬ ৭০ ১৮ ১২ ৯৪

ই-মেইল:- mahdikhanazon@gmail.com

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১