স্বাগত কলাম

সংখ্যা:

 

শশুরবাড়ির পাশের মহিলা মাদরাসায় ওয়াজ মাহফিল চলছে। বাড়ির সবাই ওয়াজ শোনার জন্য নির্দিষ্ট প্যান্ডেলের নিচে গিয়ে বসেছে। সেখানে বসে নিবিষ্ট মনে ওয়াজ শুনছে। আমি যাইনি। বাড়িতে বসেই যদি ওয়াজ শোনা যায় তাহলে আর মাঠে গিয়ে ভিড় লাভ কী-মনে মনে এমনই একটা মনোভাব দানা বেঁধে ওঠছিল। নিজেকে কিছুটা কম্বলের নিচে সেঁধিয়ে দিয়ে কী কী যেন করছিলাম আর ওয়াজও শুনছিলাম।

দ্বিতীয় বক্তার ওয়াজ চলছে। দ্বিতীয় বক্তা আমার সুপরিচিত। দ্বিতীয় বক্তা এবং আমি এ গ্রামের ফোরকানিয়া হেফজখানায় একসঙ্গে হেফজ পড়েছি। আমার চেয়ে এক বছর আগে হাফেজ হয়েছে, কিন্তু আমাদের দুজনের বন্ধুত্ব

ছিল বেশ গাঢ়। হাফেজ হওয়ার পর দুজন একই মাদরাসায় প্রাথমিক ক্লাসগুলো পড়েছি। সে ছিল আমার এক বছরের সিনিয়র, তখনও বন্ধুত্ব অটুট ছিল।

প্রাথমিক এ মাদরাসায় পড়াকালীন প্রতি বৃহস্পতিবার বক্তৃতার মশক হতো। মাসে-দু মাসে একবার প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা হতো। কখনো কখনো আন্তঃমাদরাসা প্রতিযোগিতার ব্যবস্থাও হতো। আশপাশের বিশ-পঁচিশটা মাদরাসা থেকে ডাকাবুকো ছাত্র-বক্তারা এসে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতো। আমার ওই বন্ধুর একবার ইচ্ছা হলো, সে বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে।

বেশ, ভালো কথা। কিন্তু বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হলে লিখিত যে স্ক্রিপ্ট দেখে বক্তৃতা মুখস্থ করতে হবে, সেই স্ক্রিপ্টটা তাকে কে লিখে দেবে? বন্ধু আমার শরণাপণ্ন হলো। স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে ততোদিনে আমার বেশ নামডাক ছড়িয়ে পড়েছে মাদরাসায়। সুতরাং সেটা লিখতে আমার তেমন বেগ পেতে হলো না। বন্ধুও আমার লিখিত স্ক্রিপ্ট পড়ে প্রতিযোগিতার দিন কায়দামতো গলার আওয়াজটা চড়িয়ে দারুণ জোশে বক্তৃতা ডেলিভারি দিয়ে প্রথম পুরস্কারটা হাতিয়ে নিলো।

এরপর প্রতিযোগিতা এলেই বন্ধু ধর্ণা দিতো আমার কাছে, আমি বক্তৃতার স্ক্রিপ্ট লিখে দিতাম। কিছুদিন পর মফস্বলের সে মাদরাসা ছেড়ে আমি ঢাকার মিরপুর ৬ নং মাদরাসায় ভর্তি হলাম, বন্ধুও দু-এক বছর পর ভর্তি হলো

আজরাবাদ মাদরাসায়। কিন্তু বন্ধুর সেই বক্তৃতার স্ক্রিপ্ট লেখার ফরমায়েশ তবু আমাকে ছাড়লো না। প্রতিযোগিতা এলেই বন্ধু খাতা-কলম নিয়ে ঠিক হাজির হয়ে যায় বক্তৃতা লিখে নেবার জন্য। আমি লিখে দেই, বন্ধু তার নিজস্ব

স্টাইল ও জোশের কারিশমায় ঠিকই পুরস্কার বগলদাবা করে নিয়ে আসে।

সেই বন্ধু এখন এলাকার পরিচিত বক্তা। শশুরবাড়ির পাশের মহিলা মাদরাসার মাহফিলে দ্বিতীয় বক্তা হিসেবে তার বয়ান পেশ করছে। সুতরাং তার বয়ান শোনা তো আমার জন্য অপরিহার্য।

 

দুই

ওয়াজ চলছে মা-বাবার প্রতি সন্তানের কর্তব্য বিষয়ে। এটা একটা কমন বিষয়। আকছার ওয়ায়েজ তাদের বক্তৃতায় এই বিষয়টা নিয়ে ওয়াজ করে থাকেন। মা-বাবার প্রতি কর্তব্যবোধের বিষয়ে বলতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই ওয়ায়েজরা আবদুল কাদির জিলানি রহ.-এর ঘটনা বর্ণনা করেন। আমার বন্ধুও তার ব্যত্যয় নয়। সেও জিলানির ঘটনা বর্ণনা করে বেশ একটা কানড়বাময় পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

আমি ওয়ায়েজদের এ ব্যাপারে দোষ দিচ্ছি না। বরং বর্তমান পরিস্থিতে এটা জরুরি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আধুনিক পরিবারগুলোতে যৌথ পরিবারপ্রথা বিলুপ্তির পথে। মা-বাবার প্রতি ছেলেমেয়েদের কর্তব্যও যেন কেবল প্রা আর দিবসের মধ্যে আটকে গেছে। এর বাইরে মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব নেহাতই কম দেখা যায়। সে তুলনায় গ্রামের মানুষদের মধ্যে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ববোধ অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়। এই ওয়ায়েজ এবং গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেবদের কি তাতে কোনো প্রভাব নেই? অবশ্যই আছে। এ জন্য তারা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।

বন্ধু ওয়াজ করছে একদম সাধারণ গ্রাম্য ভাষায়। একে তো সে এই গ্রামের মাদরাসায় আগে পড়েছে, আবার তার বাড়িও পাশের গ্রামে-এ কারণে তার মধ্যে লৌকিকতার কোনো বাধ্যকতা নেই। তাই নির্দিষ্ট বয়ান শেষ করে যখন সে মহিলা মাদরাসার জন্য কালেকশন শুরু করলো, তখন এক প্রকার জোর করেই মানুষের কাছ থেকে দান আদায় করে ছাড়লো। প্রমে দশ হাজারী দাতা, এরপর পাঁচ হাজারী, এরপর এক হাজারী, এরপর যে যা পারেন দিয়ে যান-এই মূলনীতিতে চললো দীর্ঘক্ষণ কালেকশন। কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবককে পাঠানো হলো মহিলাদের প্যান্ডেলে। সেখান থেকেও সংগ্রহ করা হলো নানা রকম দানের প্যান্ডোরা।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তা প্রায় ঘণ্টাখানেক হয়ে গেছে বন্ধুটি আমার কালেকশন করেই যাচ্ছে। তখন আমার মনে প্রশড়ব জাগলো-বন্ধুকে তো আমি কখনো কালেকশনের ব্যাপারে কোনো স্ক্রিপ্ট কখনো লিখে দেইনি। তাহলে সে কালেকশনের এমন সুদীর্ঘ বয়ান শিখলো কোথা থেকে? পরক্ষণেই ভাবলাম, যদ্দেশে যদাচার-অভিজ্ঞতাই মানুষের বড় শিক্ষক। ওয়াজ করতে করতেই হয়তো শিখে গেছে ওয়াজ এবং কালেকশনের এই বাংলাদেশি তরিকা। এ দেশে কতো কিছুই তো কতো কিছুর নামে দেদার চলছে। সেখানে আমার বন্ধুটি তো সামান্য একজন ওয়ায়েজ মাত্র, ওয়াজের নামে কালেকশনই তো করছে! তাতে কি-ই বা এসে যায়!

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১