বারবার ডুকরে কেঁদে উঠছে মন…
গত কয়েক বছর ধরে প্রায় তিনি বলতেন, ‘আমার মৃত্যু হয়ে গেলে জানাজা ও দাফনে তোমরা কালক্ষেপণ করবে না। আর কাছাকাছি যেখানে সুযোগ হয়, সেখানেই দাফন করবে। আমার মৃত্যুর কথা প্রচার করার দরকার নাই। যে এমনিতে জানতে পারবে, ওটাই যথেষ্ট।’
এক বছর আগে…
গত এক বছর আগে নিজের ব্যক্তিগত কামরায় মাগরিবের নামাজের পরে একাকী আমাকে বলেছেন, ‘আমার এখন এ দুনিয়া আর ভালো লাগে না। আমি আখেরাতের যাত্রী হতে চাই। আমার চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে।’ আমি শুনে নির্বাক হয়ে গেলাম।
অন্তিম যাত্রার কিছুদিন আগে…
মৃত্যুর ঠিক এক সপ্তাহ আগে পরিবারের সদস্যদের ডেকে বললেন, ‘আমার চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। আর বেশিদিন বাঁঁচবো না। তোমাদের আমার কাছ থেকে যা বোঝার বুঝে নাও। তোমাদের বোঝার দরকার, আমার সময় হয়ে গেছে।’
এরপর…
মৃত্যুর চার দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে বিশ্রামে ছিলেন। ২০ জানুয়ারি শনিবার সকালবেলা তাঁর হার্টে অপারেশন হয়। অপারেশনের আগে নিয়ম অনুযায়ী পুরো শরীরের লোস ফেলে দেওয়া হয়। তখন তিনি গোসল করেন। এরপর দু রাকাত নামাজ আদায় করেন। এটাই ছিলো তাঁর বিদায়ী নামাজ।
নামাজ আদায়ের পর তিনি বলতে লাগলেন, ‘আমার সব কিছু করা হয়েছে। এখন শুধু আমার মৃত্যুটা বাকি!’
এ কথা শুনে আশেপাশে অবস্থানরত হাসপাতালের নার্স ও চিকিৎসকরা বললেন, ‘আংকেল, আপনি এ কথা বলছেন কেন? এ রকম শুনলে আমাদের কষ্ট লাগে।’
জবাবে তিনি কিছুই বললেন না। হয়তো বা মনে মনে তিনি প্রিয় মাওলার সান্নিধ্যের অপেক্ষা করছিলেন।
জীবনের অন্তিম মুহূর্তে…
অপারেশন থিয়েটারে তাঁকে প্রবেশ করানো হয় সকালে। সকাল ৯টায় অপারেশন শুরু হয়। সাত ঘন্টা অস্ত্রোপচারের পর বিকাল ৪টায় অপারেশন শেষ হয়। এরপর তাঁকে গভীর পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী ৭২ ঘন্টা পর জ্ঞান ফেরার কথা। কিন্তু উপরের ফয়সালা স্বাধীন সার্বভৌম ও সম্পূর্ণ নিখুঁত। উপরে মালিকুল মুলক দয়াময় রব্বে কারিমের পক্ষ থেকে পৃথিবীর বুকে তাঁর এক পরম প্রিয় বান্দার ব্যাপারে ভিন্ন ফয়সালা ততক্ষণে চূড়ান্ত।
হার্টবিট যেখানে তাঁর ৮০% গতিতে উঠানামা করছিলো, আধা ঘন্টার মধ্যে তা নেমে মাত্র ১৩%-এ দাঁড়ায়। এরপর ০%-এ গিয়ে সব হিসাবের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দেয়। অস্থির আবেগ, পৃথিবীর সীমিত বিদ্যা ও জাগতিক প্রচেষ্টাকে এড়িয়ে তিনি সব কিছুর ঊর্ধ্বে চলে যান।
সন্ধ্যা ৭ টার দিকে রবের ডাকে সাড়া দিয়ে অতি সন্তর্পণে পাড়ি জমান পরকালে।
তালিবুল ইলমের প্রতি তাঁর মুহাব্বতের আজীব বহিঃপ্রকাশ…
অপারেশনের সময় রক্তের প্রয়োজনের কথা আগেই বুঝতে পেরে পরিবারকে বলে দিয়েছিলেন, ‘আমি যথাসম্ভব বাইরের রক্ত নিজের শরীরে গ্রহণ করব না। এরপরেও প্রয়োজন হলে মাদরাসার তালিবুল ইলমের গায়ের রক্ত নিবে। বাইরের কারো না।’
অবশেষে রক্তের প্রয়োজন হলে রাজধানী ঢাকার মাদানীনগর মাদরাসার কয়েকজন তালিবুল ইলমের রক্ত নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম, চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিস্ময়কর নক্ষত্র হাকিম মাওলানা আব্দুল হামিদ কাসেমি গত ২০ জানুয়ারি ২০১৮, রোজ শনিবার সন্ধ্যা ৬২ বছর বয়সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।
সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও অমর কীর্তি
তিনি ছিলেন স্বভাব কবি। এ পর্যন্ত মোট ১১ হাজার গান ও কবিতা রচনা করেন তিনি। যা পা-ুলিপি আকারে সংরক্ষিত আছে। বেশির ভাগই এখনো অপ্রকাশিত। এ ছাড়া একাধিক নানা বিষয়ে বই রচনা করেছেন। যার কিছু প্রকাশিত হয়েছে। তবে তাঁর অমর কীর্তি হলো, পুরো কুরআনের কাব্যানুবাদ। যা ‘আল কুরআনের পুঁথি অনুবাদ’ নামে প্রকাশিত হয়েছে।
এ ছাড়া তিনি প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের পুরো জীবনী কবিতার ভাষায় রচনা করেন। ৪ খন্ডে প্রকাশিতব্য এ রচনা কর্মের ২ খন্ড কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয়েছে। অপর খন্ডগুলোও ইনশাআল্লাহ যথা সময়ে প্রকাশিত হবে।
এ ছাড়া ইসলামের চার খলিফার জীবনীও তিনি কবিতার ভাষায় রচনা করেছেন। যা আরো আগেই প্রকাশিত হয়েছে।
সাধারণ কাব্য প্রতিভার পাশাপাশি তাঁর পুরো কুরআনের কাব্যানুবাদ এবং চার খলিফা ও প্রিয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পূর্ণাঙ্গ জীবনী কবিতার ভাষায় রচনা করা বাংলাদেশের কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে একটা বিরল কীর্তি হয়ে থাকবে যুগ যুগ ধরে।
তরুণদের তিনি প্রাণ খুলে ভালোবাসতেন। বিশেষ করে তালিবুল ইলমদের জন্য তাঁর অকৃত্রিম মমতা ছিলো হৃদয় ছোঁয়ার মতো। তিনি ছিলেন সবার জন্যই প্রেরণাদায়ক। কখনোই তাঁর কাছে কেউ হতাশ হয়নি। বিশেষ করে যুবকদের উৎসাহ ও প্রেরণা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তাঁর স্বান্তনা দেওয়ার কথা শুনে মনের বিষণ্নতা যেন পলায়ন করতো।
কত রাত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনায় তার সাথে আমার কেটেছে, এর হিসাব নেই। প্রত্যেকবারের আলোচনায় আমি জ্ঞানের নিত্য নতুন খোরাক পেতাম। যা আমাকে জীবনে চলার পথে প্রতিনিয়ত চালিকাশক্তি জুগিয়ে চলেছে।
কখনো তিনি বলতেন আবার কখনো আবৃত্তি করতেন। প্রায় ৯০০০ নিজস্ব রচিত গান ও কবিতা ছিলো তাঁর মুখস্থ। তন্ময় হয়ে শুনতাম তাঁর আবৃত্তিমালা।
পঞ্চাশের দশকে এ বিরল প্রতিভা সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ থানার বাথুয়া ডাংগা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কিশোর বয়সে নিজ এলাকাতেই প্রাথমিক শিক্ষা শেষে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসায় চলে যান। সেখান থেকে দাওরায়ে হাদিস শেষ করে ভারতেরই তিব্বিয়া কলেজে মেডিক্যাল সাইন্সে ভর্তি হন।
পাঁচ বছরের দীর্ঘ গবেষণা শেষে বাংলাদেশের অন্যতম বুজুর্গ হজরত মাওলানা হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর নির্দেশে দেশে এসে কামরাঙ্গীরচর জামিয়া নুরিয়া মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন।
কয়েক বছর পর মাদরাসার তালিমাত বিভাগের পরামর্শ ও সবার পীড়াপীড়িতে তিনি ইলমে তিব্বের নিয়মে চিকিৎসা, গবেষণা ও রোগী দেখা শুরু করেন। এখান থেকেই তাঁর নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
১৯৯০ সন থেকে নিজস্ব প্রতিভাগুণে কুরআন-হাদিস নির্দেশিত ইসলামের আলোকে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানকে সবার সামনে বিস্ময়কর পদ্ধতিতে তুলে ধরেন। অবশ্য এ সম্পর্কে বাংলাদেশের আলেম সমাজের ধারণা তেমন একটা এখনো হয়ে ওঠেনি।
আজীবন তিনি একেবারেই প্রচারবিমুখ ছিলেন। এমনকি নিজের প্রতিষ্ঠিত থেরাপি হাসপাতালে কখনও সাইনবোর্ড লাগাতে রাজি হননি। আমাকে এ প্রসঙ্গে প্রায় বলতেন, ‘দেখো! তোমার প্রতিভা ও গুণই তোমাকে পরিচিত করে তুলবে। এর জন্য প্রচারণার দরকার নেই।’
দাওয়াত ইলাল্লাহ, তালিম-তারবিয়ত, জিহাদ ও সমসাময়িক আরো বিষয় সম্পর্কে তাঁর ভেতরে ইতেদালি চিন্তাধারা কাজ করতো। কোনো বিষয়ে বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ি কখনোই তাঁকে ঘায়েল করতে পারেনি। সুন্নতে নববির প্রতি আমি তাঁকে সর্বদাই আপোষহীন দেখেছি।
নিজ পয়সায় নিজের বই ছাপিয়ে আগত সবাইকে সেই বই হাদিয়া দিয়ে দিতেন। এভাবেই তাঁর অনেক বই ছাপানোর পরে হাদিয়া দিতে দিতে শেষ হয়ে যেতো। কখনই তিনি নিজের বই লিখে ব্যবসার চিন্তা করেননি।
তিনি ছিলেন আমার ঈমানের দীক্ষক! তিনি ছিলেন আমার শিক্ষক। বিশেষ করে ইলমে তিব্বের অজানা অনেক তথ্য আমি তাঁর কাছ থেকে রপ্ত করেছি। জীবন চলার পথে তিনি ছিলেন আমার মুশফিক রাহবার। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি আমার ছায়া ছিলেন। এখন আমি চিরতরে অমূল্যতুল্য এ ছায়াহীন হয়ে গেলাম।
প্রচারবিমুখ গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী এ ক্ষণজন্মা মনীষীকে দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তাঁর রহমতের পরম আশ্রয়ে সম্মানিত করুন। আমিন।
লেখক : মরহুম হজরতের জামাতা, মালয়েশিয়া থেকে

