টোকাইয়ের আত্মকথা

সংখ্যা:

আমি একটা টোকাই। যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের নিচে থাকি। সামনের ডাস্টবিনের চারপাশে ঘোরাঘুরি করি। সম্ভবত বিকাল, বুঝতে পারছি না। কারণ আমার কাছে ঘড়ি নেই। টোকাইদের কাছে তো ঘড়ি থাকে না। ফ্লাইওভারের নিচেই টানটান হয়ে শুয়ে আছি। দেখি, সবাই ডাস্টবিন পার হয়ে যাবার সময় হাত বা রুমাল দিয়ে নাক বন্ধ করে হেঁটে যাচ্ছে। কই, আমি তো কোনো গন্ধ পাচ্ছি না! গন্ধ নেয়ার চেষ্টা করছি তবুও পাচ্ছি না। ডাস্টবিনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষ গন্ধ পেলে আমি পাব না কেন। ওরাও মানুষ, আমিও মানুষ। ওরা যে নাক দিয়ে গন্ধ পাচ্ছে, আমারও তো সে রকমই নাক আছে। তাহলে কেন গন্ধটা আমার নাকে আসছে না? নাকি টোকাই হলে ডাস্টবিনের গন্ধ নাকে আসে না? গন্ধ নেয়ার শক্তিটা হয়তো থাকে না। হারিয়ে যায়। এটা কি সব টোকাইয়ের ক্ষেত্রে, নাকি শুধু আমার ক্ষেত্রে? সবার কথা জানি না, শুধু আমার ক্ষেত্রে। এখন এতটুকু জানি।

আমার দশ দিকেই হলুদ আর সাদা বর্ণের মাছিরা ভন ভান করে উড়ছে। আওয়াজটা চিরচেনা, বুঝতে শেখার পর থেকে একই আওয়াজ শুনে আসছি। এ আওয়াজটাই যেন আমাকে মায়ের আদরে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। আচ্ছা, মাছিরাও কি টোকাই? আমার মতো সব সময় ওরা এখানেই ওড়াউড়ি করে। আওয়াজ করাটাও থেমে থাকে না। ওরা কখনো ঘুমোয় না, সারারাত ধরে একই রকম ভন ভন করে শব্দ করতে থাকে। ওদের ভন ভন শব্দ না শুনলে এখন আর আমার ঘুম আসে না। আমার মতো কখনো ঘুম আসে না ওদের? মনে হয়েছিল এক দিন ওদের কাছে শোনা দরকার। কিন্তু সময় হয়ে ওঠেনি।

শরীরটা মেটে রঙ ধারণ করে আছে। এটা কি আমার আসল গায়ের রং নাকি অনেক দিন গোসল না করায় ময়লা জমে এমনটা হয়েছে, বুঝতে পারছি না। হাতের লম্বা নখ দিয়ে শরীর চিমটিয়ে দেখি ময়লায় নখ ভরে গেছে। কিন্তু গায়ের কালো রঙটা গেল না। কোমরের নিচ থেকে কেমন জানি না, দেখতে পাচ্ছি না। ছেঁড়া একটা প্যান্ট পরা। তাকিয়ে দেখি একটা মাছি প্যান্টে লেগে আছে, অন্যদিন লেগে থাকে কি-না জানি না, আজ বার বার চোখে পড়ছে। মাছিটা উড়ে ডাস্টবিনের দিকে চলে গেল। আর ফিরে এল না। ওর ভন ভন করে উড়ে যাওয়ার দিকেই তাকিয়ে আছি। দখিনা বাতাসটা বেশ জোরেই বইছে। বাতাসের তীব্রতায় বড় চুলগুলো মুখের উপরে এসে পড়ছে। চুলগুলো অনেক শক্ত, সম্ভবত ময়লার কারণে। কত দিন গোসল করি না, মনে নেই। টোকাইরা হয়তো গোসল করে না, করলে তো আমিও করতাম ।

মনে হচ্ছে ডাস্টবিনের চারপাশটায় আরেকবার ঘুরে আসি। সকালে গাড়ির শব্দে ঘুম ভাঙার পরে ৩-৪ বার ঘুরেছি। কিন্তু খাওয়ার মতো কিছুই পাইনি। অন্য দিনের তুলনায় আজ কাক-কুকুরও কম। অন্য দিন এমন সময় কাক-কুকুরে খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করতো। এখানে বসে বসে এ সব দেখি, মাঝে মাঝে যখন কাক উড়ে এসে কুকুরের গায়ে ঠোকা দেয়, কুকুর লেজ ঘুরিয়ে কাকের দিকে তাকিয়ে ঘেউ-ঘেউ করে ডেকে ওঠে। কিন্তু আজ কিছু দেখছি না।

পেটে একদমই কিছু নেই। এখন আর যেতে মন চাচ্ছে না। আজ পানিও খাওয়া হয়নি। পেটটা পিঠের সাথে লেগে আছে। তবুও যাওয়ার জন্য উঠতে চেষ্টা করলাম। পারলাম না। বোধহয় হাত পায়ে শক্তি পাচ্ছি না। আজ দুদিন ধরে পেটে কিছুই পড়েনি। ডাস্টবিনের উপর এবার একটু রাগ হলো। পাশ ফিরিয়ে শুলাম। দেখি সামনের দোকানগুলোতে অন্য দিনের মতোই মানুষে ভরপুর। তাকিয়ে আছি মানুষগুলোর দিকে। দেখি কেউ কিছু দেয় কি-না। আগে দিতো, আজ দুদিন ধরে কেউ এদিকে তাকিয়েও দেখে না।

অনিচ্ছা সত্বেও মুখ থেকে বেরিয়ে গেল- ‘আজও কি না খেয়ে থাকবো?’ শুয়ে শুয়ে এ সব কথা নিজের সাথেই বলছি। খাবারের জন্য আর ডাস্টবিনের দিকে যাওয়া হয়নি। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। চোখ বন্ধ করে ময়লা হাত দিয়েই চোখ দুটোকে মুছলাম। বোধহয় পানি পড়ছে।

হঠাৎ চোখে ঝাঁপসা দেখছি। না হলে এতো দ্রুত রাত হয়ে যাবে কেন। তাকিয়ে দেখি আগের মতোই। একটু পরে আজান কানে এল, সত্যিই মনে হয় সন্ধ্যা হয়ে আসছে।

বিকেলের তুলনায় মাছিগুলোও এখন ভন ভন শব্দ করে উড়ছে না। সেভাবেই চিত হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি।

বিশাল আকৃতির আকাশকে প্রশ্ন করলাম, তুমিও কি আমার মতো না খাওয়া? আকাশ কোনো কথা বলেনি।

তার দিকে তাকিয়ে বললাম, জানো আকাশ! মনে করেছিলাম বুঝতে শেখার পর কোনো একটা কাজ করব। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। এখন আমি অনেক বড়। আমার বয়স প্রায় ১২ ছুঁই ছুঁই। আমার মতো বয়সের অনেককেই দেখি কাজ করে। কিন্তু আমাকে কেউ কাজে নেয় না। আচ্ছা আকাশ, তুমিই বলো, টোকাই হলে কি কেউ কাজে নেয় না? প্রশ্নগুলোর কোনোই উত্তর পাচ্ছি না, তবু কেন যেন আজ বলতে ইচ্ছা করছে।

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে খাবারের খোঁজে ডাস্টবিনের চারপাশে ঘোরা, কোনো খাবার পেলে পশু-পাখির সাথে খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করে খাওয়া আর সন্ধ্যা হলে ফ্লাইওভারের নিচে শুয়ে পড়া- এভাবেই কেটে যাচ্ছে আমার প্রতিটি দিনরাত। মনে হয় চোখের কোণা দিয়ে পানি জাতীয় তরল কিছু গড়িয়ে পড়ছে। আস্তে আস্তে চোখ দুটো ঝাপসা হতে শুরু করল। রাস্তার টিউবলাইটের তীব্রতাও আস্তে আস্তে কমে আসছে। চোখের সামনে চাঁদের আলোটা ঝাপসা হয়ে ভেসে আছে। চোখের পানি বেড়েই চলছে, কপোল ভিজে উঠেছে। হাতের তালু দিয়ে মুছে নিলাম।

এদিকে ক্ষুধার যন্ত্রণায় চিত হয়ে শুয়ে থাকতেও কষ্ট হচ্ছে। পাশ ফিরিয়ে ডান কাত হয়ে ডাস্টবিনের দিকে মুখ করে শুলাম। একটু পরই মেঘ গুড়ুম গুড়ুম করে ডেকে উঠল, মনে হয় বৃষ্টির আগাম বার্তা বলে দিচ্ছে। সাথে বিদ্যুৎও চমকাচ্ছে। রাস্তার পাশের হলুদ টিউবলাইটগুলো জ্বলছে, তবুও বিদ্যুৎ চমকানো বুঝা যাচ্ছে। পুরো যাত্রাবাড়ি এলাকাটাকে যেন হাজার পাওয়ারের লক্ষাধিক টিউব লাইট দিয়ে সাজানো হয়েছে। বিদ্যুৎ চমকানোর তীব্রতায় রাস্তায় পড়ে থাকা ঝিক-ঝিক করা বালুর কতাও দেখা যাচ্ছে। একদম বাতাস কূন্য। বোধহয় বৃষ্টি শুরু হবে। একটু পরেই শুরু হলো মুশল ধারে বৃষ্টি। সারাদিন না খাওয়া পেট নিয়ে শুয়েছিলাম ঘুমোনোর আশায়। বৃষ্টিতে সেটা আর দিল কই? আজ বৃষ্টিও আঁড়ি দিলো আমার সাথে।

আচ্ছা আকাশ কেন কেঁদে তার পানি দিয়ে পৃথিবীকে ভেজায়? সে কি জানে না যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের নিচে থাকা এই টোকাইয়ের জন্য তার চোখের পানি থেকে আশ্রয় নেয়ার কোনো উপকরণ নেই? আকাশও কি টোকাই? আমার মতো তার মনেও কি কষ্ট? নাকি এটা আমার ধারণা? যদি ধারণাই হবে তাহলে সে এতো কাঁদে কেন? এটাই ভাবতে থাকলাম।

তবে বোধহয় আজ আর ঘুম হবে না। সারা শরীর ভিজে গেছে। গায়ে কিছু নেই, একটু শীত শীত অনুভব করছি। পানির পিপাসাও আগের তুলনায় বেড়ে গেল। বৃষ্টি থেমে গেছে। পাশেই মাটির পাত্রে খানিকটা বৃষ্টির পানি জমেছে। ফ্লাইওভারের নিচেই রাস্তাগুলোতে পানি জমে গেছে। মাটির পাত্রটা উঠিয়ে তাতে জমে থাকা পানিটুকু ঢক ঢক করে গিলে নিলাম। বৃষ্টি থেমে বাতাস বইতে শুরু করেছে, শীতও আস্তে আস্তে বেড়ে চলছে। হাত-পা এক জায়গায় করে বিড়ালের মতো গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লাম। আকাশের মেঘ কেটে এখন আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। মনে হয় আজ জোসনা রাত। জোসনা রাত দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। প্রতি জোসনা রাতে আমি ঘুমোই না। সারারাত জেগে জেগে জোসনাদের সাথে গল্প করি। আজও হয়তো ঘুম হবে না। তাকিয়ে আছি সদ্য ফোটা গোলাপের মতো নকনকে চাঁদের দিকে। তারাগুলো না জ্বললেও আকাশটা খুব পরিষ্কার, চাঁদের চারপাশে নীলাভ আকাশের উপর দিয়ে উড়ছে শুভ্র মেঘেরা। তার মাঝেই ভেসে উঠল আমার বয়েসি এক জনের চেহারা। দেখতে খুব ভালো লাগছে। আমার মতো কি-না জানি না, অনেক দিন হলো আয়না দেখি না। আমার নিজের চেহারাটাও ভুলে গেছি। আমি চাঁদের দিকেই তাকিয়ে আছি। আর ও তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এবার আমি ওর হাস্যজ্জল চেহারাটার দিকে তাকালাম। মনে হলো যেন ও অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। দাঁতগুলো বেরিয়ে গেল। সাদা দাঁতগুলো বিদ্যুৎ চমকানোর মতোই ঝিলিক মেরে উঠল। ওর যেন আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগছে। আগে কখনো এভাবে কারোর দিকে তাকাইনি। আমিও কোনো এক অজানা ভালোলাগায় তার দিকে তাকিয়ে আছি।

ভাসছি ভালোলাগার মুক্ত আকাশে।

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১