আমার জন্ম হয়েছিলো বর্ষার এক বাদলা দিনে। ঝুম বৃষ্টির দিনে নাকি আমি ওয়া ওয়া করে উঠেছিলাম। সবুজ প্রকৃতি বৃষ্টিতে ভিজে তার যৌবন-রূপ নিয়ে ফোটে। আমি আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে হয়তো বা তা অনুভবও করেছিলাম। এমনটাই বলেন আমার বাবা-মা-বন্ধু-পরিচিতরা। তাই বৃষ্টি-বর্ষা আমার আজন্মকালের ভালোলাগা। কারণ, সেই ছোট্টকাল থেকেই আমাকে টানে বৃষ্টি, বর্ষাকাল, সমুদ্র, পাহাড়, প্রকৃতি। টুপ টুপ বৃষ্টিতে আমি উপরে তাকিয়ে তাদের নেমে আসা দেখতাম। মুখ ভার করে মেঘ জমে থাকা দেখতাম বৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত। আকাশের নীল রড়ে মনঘুড়ি উড়াতাম সাতরঙা রঙধনু ভেদ করে। আহ্বান করতাম একঝাঁক বৃষ্টিকে। যেন একটু ভিজিয়ে যায়। বৃষ্টিতে হালকা বাতাসে সবুজ পাতাদের ঈষৎ কেঁপে ওঠা আমার বুকে অদ্ভূত শিহরণ তোলে। সবুজ আমাকে নিমন্ত্রণ করে তার বুকে। ক্লিওপেট্রার ভালোবাসা দিয়ে আমায় ডাকে বারবার। তাই কখনো ফুরসত পেলেই ছুটে যাই সবুজের দুনিয়ায়, কোনো বন-জঙ্গল অথবা পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা সবুজের স্বর্গে। নীল পাতাদের নড়ে ওঠা দেখি চোখ ধাঁধিয়ে।
এবারও বেশ কয়দিন যাবত মন বিষণ্নতায় ঢাকা ছিল। বিস্বাদের গরম হাওয়া আসা যাওয়া করছিল মনের উপর। মনের অস্থিরতার ছাপ পড়েছিল শরীরেও। একেবারেই কুঁকড়ে গিয়েছি। কিছুই ভাল্লাগে না। একটা হাহাকার বিরাজ করছিল চিন্তা-ভাবনা আর মনোজগতের শিরা-উপশিরায়। বুঝলাম এ বিস্বাদ কটাতে হবে গাছের ভীড়ে গিয়ে। প্রকৃতির মাঝে একটা বিশুদ্ধ বুকখোলা লম্বা নিশ্বাস নিলেই আমি সব বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠব। এ যে আমার পুরোনো দিনের অভ্যেস। তাই সবুজ স্বর্গের খোঁজ করছিলাম হন্য হয়ে।
কোথায় যাওয়া যায়! বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করি। কেউ বলে রাঙামাটি, কেউ বলে সুন্দরবন, কেউ বলে বিছনাকান্দি। কিন্তু এ স-ব জায়গাতেই আমার ভ্রমণের প্রেমস্মৃতি এখনো জলজ্যান্ত হয়ে আছে। সব ক’টা সবুজের প্রকৃতিরূপ আমি দেখে এসেছি বিগত দু’বছরে। এখন নতুন কোনো সবুজের সৌন্দর্য সুধাপানে মনটা আকুলি-বিকুলি করছে। পৃথিবীর সব ক’টা সবুজ স্বর্গেরই আলাদা আবেদন থাকে। আমার কাছে এমনটাই মনে হয়। তাই আমি নতুন নতুন প্রকৃতি-স্বর্গ খুঁজি বারবার। শেষ অবধি খুঁজে বের করলাম ‘সবুজের যৌবনা স্বর্গ বান্দরবন’কে। যেই ভাবা সেই কাজ। আর তর সইছে না। প্ল্যান তো আগে থেকেই করা ছিল। আমার দুই কাজিনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
ঈদের দ্বিতীয় দিন। স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ত পর্যটন কেন্দ্র এবং এর সংশ্লিষ্ট সকল জায়গা। তাই ঢাকার কল্যাণপুরের বাস কাউন্টারে গিয়েও কোনো ভালো বাস পেলাম না। একটু স্বাচ্ছন্দ্যমতো যেতে পারব এরকম সিটও মিলল না। অগত্যা কি আর করা-একটা দ্বিতীয় শ্রেণীর বাসে টিকিট কাটলাম আমরা দুজন। প্রকৃতি-প্রেম বলে কথা। মনটা যে প্রথম থেকেই পড়ে আছে নীলগিরির উপরে। ওটাকে নিয়ে আসতে হলেও যেতে হবে আমার।
রাত এগারোটায় আমাদের বাস ছাড়ার কথা। কিন্তু ওই যে দ্বিতীয় শ্রেণী! তাদের বৈশিষ্ট্য-আভিজাত্য (?) বজায় রাখার দায়িত্ব তো তাদেরই। ঘ্যানর ঘ্যানর করতে করতে বাস ছাড়ল রাত সাড়ে বারোটায়। পুরো বাস ভরা যাত্রী। প্রায় সবাই বান্দরবন যাচ্ছে ঘুরতে। সামনে পেছনে বসা পাঁচ-সাত জনের দুটো গ্রুপ বসেছে। বেশ রসিক। পরিচয়পর্ব সেরে ফেলা হয়েছে প্রথমেই। সবাই ট্যুরে বেরিয়েছে। আড্ডা মারতে মারতে কখন যে রাত তিনটে বেজে গেল, টেরই পাইনি কেউ। মাঝখানে হোটেল বিরতিতে আড্ডার সমাপ্তি ঘটল।
কোন হোটেলে যেন আমাদের যাত্রা বিরতি হয়েছিলো, নামটা এখন আর মনে পড়ছে না। সিমসাম সাজানো একটা হোটেল। খুব সুন্দর। দূরপাল্লার বাসগুলো সাধারণত এমন হোটেলগুলোতেই যাত্রা বিরতি করে। আমরা সবাই বাস থেকে নেমে পনের মিনিটের মধ্যে আমাদের প্রয়োজন শেষ করে বাসে উঠি। এবার আর তেমন কোনো আড্ডা জমে উঠেনি। সবাই সবার মতো করে ঘুমোনোর চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কেউ কানে হেডফোন লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে সিটে হেলান দিয়ে শুয়েছে। একটা চোখও খোলা নেই। শুধু আমি ছাড়া। সারা বাসজুড়ে ঘুমের নীরবতা নেমে এসেছে। আমার দুচোখেই শুধু নেই। ওইদিন ঘুমেরা আসেনি। রাতের শেষভাগ চলছে। আমি আলগোছে জানালা খুলি। রাতের নিঃসাড় অন্ধকার দেখি মুগ্ধ হয়ে। শেষ রাত্রির আবছা একাকিত্ব ভালোলাগার মাত্রাটা বাড়িয়ে তুলেছে কয়েক গুণ। নিস্তব্ধ আকাশে তারাদের জ্বলন এখনো স্থির। রাতের এ এক অপার্থিব চিত্র। আকাশের কৃষ্ণপক্ষের দ্বিখণ্ডিত চাঁদ এখনো নিভে যায়নি। তার আগুনজ্বলা আলো-আভা তরুশ্রেডুর মাথায় এখনো লেগে আছে।
এতোক্ষণে চিটাগাং-এর পথ বেয়ে ছুটে চলছে আমাদের বাস। ভোরের আজান হয় চারিদিকে। সুরে সুরে জেগে ওঠে প্রকৃতির মাঝে বেড়ে ওঠা প্রাণীরা। দু’চারটে পাখির ডাকে আমি জানালা দিয়েই মুখ বাড়াই। ভোরের আকাশে তখন মেঘলা আভা। রাস্তাঘাট পুরো ফাঁকা। সাঁ সাঁ করে গাড়ি চলছে। রাস্তার দু’পাশে ছোট ছোট পাহাড়গুলো অন্ধকারে টিলার মতো মনে হয়। আঁকাবাঁকা হাইওয়ে পথ। কখনো বড় পাহাড়ের স্থির দাঁড়িয়ে থাকা তাদের বড়ত্বের জানান দেয় বৃহদাকৃতিতে। পাহাড়ের গায়ে, রাস্তার ধারে বিশালাকৃতির গাছগুলো থেকে এখনো অন্ধকার ঝরে পড়ছে।
ভোরের হিম বাতাসে পাহাড়ি কলা গাছের দূর থেকে থেমে থেমে নড়ে ওঠা একটা কল্পিত ভৌতিক আনন্দ জাগায়। আকাশপট থেকে ধীরে ধীরে হালকা সাদা আলো নেমে আসছে প্রকৃতির ফাঁক গলে। ডায়েরি বের করে তখন একটা লাইন লিখে ফেলেছি- ‘সাদা-কালোর মিশেলে ভোর নামা আকাশটা কখনো দেখেছো?’
ভোর ছ’টা। আমরা বান্দরবন শহরে এসে পৌঁছলাম মাত্র। ব্যাগপত্র গুছিয়ে যে যার মতো নেমে পড়েছে বাস থেকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার মধ্যে একটি বান্দরবন। যেখানে রয়েছে ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস। প্রকৃতির নৈসর্গিকতা ভেতর থেকে অনুভব করার জায়গা। শহরের দু’পাশেই উঁচু পাহাড়। প্রাচীন সুরক্ষিত দূর্গের মতো মনে হলো আমার কাছে। আদিবাসীদের অনেকেই ভোরের বাজার ধরতে শহরে এসেছে। পর্যটকদের ঘুরে বেড়ানোর জন্য এখানে ‘চাঁদের গাড়ি’ নামে এক প্রকার লেগুনার মতো বাহন আছে। শৃঙ্খলা ও সুবিধার্থে এখানে গড়ে উঠেছে একটি চাঁদের গাড়ি মালিক পর্যটন সমিতি। গাড়ি থেকে নেমেই আমরা ওখানে গেলাম। গাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত তথ্য জেনে নিলাম তাদের কাছে। এ কাউন্টার থেকেই সকলকে গাড়ি ভাড়া করতে হয়। ওরাই ড্রাইভার সিলেক্ট করে দেয় গাড়ির জন্য। প্রত্যেকটা গাড়িতে তেরটা সিট আছে। তেরজন ম্যানেজ করে একেকটা দল ছুটছে পাহাড়ের বুকে। আমরা যেহেতু এক বাসে ঢাকা থেকে অনেকেই এসেছিলাম, সাথে রাতের পরিচয়পর্বটাও খুব দারুণ হয়েছে, কাকতালীয়ভাবেই আমাদের আড্ডার তিন গ্রুপের সদস্যও তের জন। তাই আমাদের আর তেমন বেগ পোহাতে হলো না অন্য যাত্রী খুঁজতে। পাঁচ হাজার টাকায় চাঁদের গাড়ি ভাড়া করা হলো। ড্রাইভারের সাথে কন্ট্রাক্ট করে দেয়া হয়েছে আমাদের নীলগিরি, শৈলপ্রপাত, চিম্বুক পাহাড়, আর রোমাবাজার স্পটগুলো ঘুরিয়ে আনবে। আমরা তাড়াতাড়ি কেক-রুটি দিয়ে সকালের নাশতা সেরে নিলাম। পাহাড়ে উঠতে বেশ এনার্জি দরকার পড়বে, এ বিষয়ে এক সিনিয়র ভাই আমাদের সতর্ক করলেন। তাই কিছু বাড়তি খাবারও সঙ্গে নিয়ে নিলাম।
প্রথমেই আমরা নীলগিরির দিকে ছুটলাম। নীলগিরি যাওয়ার পথেই দুটো স্পট। একটি শৈলপ্রপাত ঝর্ণা আরেকটি চিম্বুক পাহাড়। শেষ মাথায় স্বপ্নলোক নীলগিরি।
শৈলপ্রপাত
বান্দরবন শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে চিম্বুক বা নীলগিরি যাওয়ার পথে শৈলপ্রপাত। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট হিমশীতল এ ঝর্ণাটি। যেখান থেকে অবিরাম বয়ে চলেছে স্বচ্ছ পানি।স্রষ্টার অপার রহস্যে ঘেরা অনিন্দ্য সুন্দরের একটি হলো এ ঝর্ণাগুলো। অবিশ্রান্ত বয়ে চলা ঝর্ণার সৌন্দর্যরূপ বিমুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয় সুন্দরের পূজারী মনে। ভেতর থেকে অস্ফুট স্বরে বের হয় সৃষ্টিকর্তার গুণ-কীর্তন। শৈলপ্রপাত ঝর্ণাটি মুগ্ধতার সবটুকু নিয়ে নেমে এসেছে পাহাড়ের বুক চিরে। গাড়ি থেকে আমরা সোজা নেমে পড়ি রাস্তা থেকে নিচে বয়ে চলা ঝর্ণায়। হিমশীতল স্বচ্ছজলে ধুয়ে নিই হাত-মুখসহ গোটা শরীর। জল ছিটিয়ে আনন্দ ভাগ করি পরস্পর। যার শীতল ছোঁয়ায় নিমিষেই দূর হয়েছিল আমাদের রাতভর সফরের ক্লান্তি। স্মৃতির মিনার সমৃদ্ধ করার জন্য আমরা কয়েক গাদা ছবিও তুলে নিই।
শৈলপ্রপাতের পাশেই লক্ষ করা যায় স্থানীয় বম আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনধারা। পাওয়া যায় হাতের তৈরি বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যমাখা জিনিসপত্র। বিশেষ করে তাদের তৈরি পোশাকগুলো বেশ আকর্ষণীয় হয়। প্রিয়জনদের জন্য অনেকেই কিনে নেয় তাদের বোনা বিচিত্র কারুকার্যের পোশাক। তাদের জীবনধারা একদম সাদামাটা। মেয়েরা সাংসারিক কাজের পাশাপাশি পুরুষের সাথে পাহাড়ে যায় ক্ষেতের কাজে। শিশুদের কর্মব্যস্ততাও হৃদয়ছোঁয়া। ঝর্ণা থেকে একটু উপরে একটি আদিবাসী মেয়ে রঙ-বেরঙের আদিবাসী কাপড়ের পসরা সাজিয়ে বসেছে। সে দোকান করছে একমনে। ঠিক তার পাশেই ঝর্ণাতে তার ছোট্ট দুই ছেলে তাদের বাসন-কোসন ও বিছানার চাদর ধুচ্ছে হেসে হেসে।
প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট আমরা ঝর্ণার রুপে মোহাচ্ছন্ন ছিলাম। তারপর ছুটে চললাম ‘চিম্বুক পাহাড়’ দর্শনে। গাড়িতে ওঠার আগে আদিবাসীদের পাহাড়ে চাষ করা আনারস কিনলাম। বিক্রেতাদের অমায়িক ব্যবহার দেখে পর্যটকরা এমনিতেই ভালোলাগা থেকে কিনে নেয় দু-একটা।
প্রত্যেকটা আনারস দশ টাকা করে। কোনো প্রকার প্রক্রিয়াজাত করা ছাড়া একেবারে সতেজ নির্ভেজাল পাহাড়ি ফল। রসে টইটুম্বুর। প্রতি দুইটা আনারস থেকে কমপক্ষে হলেও পৌনে এককেজি রস খেয়েছি।
চিম্বুক পাহাড়
শৈলপ্রপাত ছেড়ে আমাদের গাড়ি চলতে লাগলো ‘চিম্বুকের’ পথে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পেঁচানো উঁচু-নিচু রাস্তা। দুধারে সবুজ রঙ। নাম না জানা হাজারো পরিচিত-অপরিচিত লতাগুল্মের প্রেম আহ্বান। সে এক অপার্থিব ভালো লাগা। জীবনের জঞ্জাল পেরিয়ে প্রকৃতির এ উদার সুখ দেয়া। জীবনের শান্তিছবি তো এখানেই আঁকা যায়! চাঁদের গাড়ির তরতর করে ওপরে ওঠে, যেন সিঁড়ি বেয়ে আকাশের পথে এগুচ্ছি। পাহাড়ের সাথে লাগানো পাহাড়। একটা থেকে অপরটা যেন আরেকটু উঁচু। পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় ঠিক আমাদের মতোই স্থানীয়রা চাষাবাদ করেছে। কোথাও ধান আবার কোথাও আলু। তবে সাধারণত ওদের জীবিকা নির্বাহ হয় সবচেয়ে বেশি জুম চাষের মাধ্যমে। তাই প্রায় সকলেই জুম চাষ করে এখানে। পাহাড়ের ওপর অথবা ঢালে তাদে ঘরবাড়ি নির্মিত।
আদিবাসীদদের ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস আমার চিন্তায় গভীর রেখাপাত করে। বড় কোনো ঝড় বা বৃষ্টিতে যেখানে মারাত্মক পাহাড় ধ্বস হওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা আছে। আর যেটা হয়েছেও কিছুদিন আগে। তাদের এ দুর্গম জনজীবনে সবচেয়ে অভাব ও প্রয়োজন যে জিনিসটার সেটা হলো পানি। সাধারণত পাহাড় থেকে কয়েকশো মিটার নিচে এসে তাদের পানি নিতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে যা অসাধ্যের চেয়েও কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরেও সবকিছু ছাপিয়ে এখানেই যুগ যুগ ধরে তাদের জীবন টিকে আছে। বংশপরম্পরা চালু আছে পুরোনো কাল থেকে। এখানে তাদের গোত্রীয় সৌহার্দ্যপ্রীতি বড়ই ঈর্ষণীয়। একসাথে সকল দুরুহ ও কঠিন কাজ আঞ্জাম দেয়া তাদের সাধারণ নৈমিত্তিক নীতি। এ কঠিন পাহাড়ি জনজীবনে তাদের টিকে থাকার সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি আমার কাছে মনে হয়েছে তা হলো : তারা কেউ কারো উপর নিজের কাজকে চাপিয়ে দিতে চায় না। কেউ কারো উপর নির্ভরশীল নয়। বরং প্রত্যেকেই স্বনির্ভর, আত্মনির্ভরশীল।
বাংলার দার্জিলিং নামে খ্যাত চিম্বুক পাহাড় বান্দরবনের সবচেয়ে পুরোনো পর্যটন স্পট। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এ পাহাড়ের পাশেই রয়েছে আদিবাসী ‘ম্রো’ সম্প্রদায়ের বসবাস। তাদের কঠিন ও জটিল জনজীবন সম্পর্কে ওপরে সামান্য ধারণা দিয়ে এসেছি।
বান্দরবন শহর হতে ২৬ কিলোমিটার দূরে মিলনছড়ি এবং শৈলপ্রপাতের পরেই এ সবুজাভ চিম্বুক পাহাড় । যার পরতে পরতে রয়েছে আলোমাখা নীল। এখানে পাহাড়ের চূড়ায় রেস্টুরেন্ট এবং একটি ওয়াচটাওয়ার আছে। বান্দরবন জেলার সবক’টি উপজেলার সঙ্গে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা রক্ষার জন্য এখানে বাংলাদেশ তার ও টেলিফোন বোর্ড একটি বেইজ স্টেশন ও টাওয়ার স্থাপন করেছে। পর্যটকদের দৃষ্টিতে যা খুবই আকর্ষণীয়। এছাড়া পাহাড়ের চূড়া থেকে চারদিকের সবুজ প্রকৃতির সৌন্দর্য্য প্রকৃতিপ্রেমীদের টেনে আনে সহজেই। ঘোরলাগা চোখে প্রকৃতিপ্রেমীরা দৃষ্টি রাখে দূরপথে। যার পুরোটা জুড়েই সবুজের রাস্তা বিছানো।
ঘন্টা খানেক সময় ধরে চিম্বুকের সুবিপুল সৌন্দর্য উপভোগ করার পর আমাদের গাড়ি ছুটলো স্বপ্নিল নীলগিরির দিকে।
নীলগিরি
সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ২২০০ ফুট উচ্চতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত এ নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্রটি পাহাড় এবং আকাশের মিতালির এক অপূর্ব নিদর্শন। পাহাড় ও আকাশের মোহমাখা প্রেমসখ্যতা। যেখান থেকে খালি চোখে সমুদ্র সৈকতের মোহনীয় অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করা যায়। বান্দরবন শহর থেকে ৫২ কি.মি. দূরে পর্যটন কেন্দ্র নৈসর্গ নীলগিরির অবস্থান।
ঠিক একই কায়দায় আমাদের গাড়ি ছুটছে। চাঁদের গাড়ি যেন মেঘের দেশে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। পাহাড়ের একই ধাঁচের আঁকাবাঁকা মোড়ানো রাস্তা। তবে যতই এগুচ্ছি আর উপরে উঠছি ততই বাঁধভাঙা উল্লাসি নাচন অনুভব করছি ভেতরে। সৌন্দর্য যেন তার কুমারিত্ব ভেঙে চারপাশের প্রকৃতিতে আছড়ে পড়েছে।
শাখায় শাখায় পাতাদের নিবিড় আলিঙ্গন প্রকৃতিপ্রেম উসকে দেয়। রাস্তা থেকে অনতি দূরে দৃষ্টির ঝাপসা সীমানায় পাহাড়ি কিষাণীর মাথায় বেতের টুপি আর পিঠের ঝোলা ভিন্ন মাত্রা যোগ করে সৌন্দর্যময়তায়। তাদের জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার প্রত্যয়ে পাহাড়ে অনবরত যে হেঁটে চলা, তা আমাদের থেকে আলসেমি ভাবটাকে দূরে নিক্ষেপ করে। পাহাড়ি চূড়ায় রাঙা ফুলের প্রশস্ত হয়ে মেলে দেয়া যে আকুলতা, কোথাও আবার জড়োসড়ো কুঞ্চিত হয়ে আধফোটা কলির নির্বিবাদ আবেদন, এ আমার জমিয়ে রাখা আদিকালের প্রেমে পুনর্জন্ম ফিরিয়ে আনে।
সবুজের বৈভব ছড়ানো প্রকৃতির নীল চাদরে মোড়া বান্দরবন। প্রকৃতি প্রেমের নিস্তেজ উপসর্গ নীলগিরির পথে বোরাকের মতো ছুটছে আমাদের চাঁদের গাড়ি। জামিন থেকে অনেক উপরে আমরা। হিম ঠাণ্ডা বাতাসের সুড়সুড়ি অনুভব করছি নাকের ডগায়। গালে জমছে দু’এক বিন্দু মেঘের ছোঁয়া। চোখ বুঝি স্বপ্নকে কল্পনা করতে ব্যস্ত এখন। দম বন্ধ করে আকাশ থেকে কেড়ে নেয়া প্রকৃতির নির্মল বাতাস হা করে গিলছি। এক স্বর্গীয় রূপ ছড়ানো চারপাশে। উপর থেকে নিচে তাকালে দিগন্ত বিস্তৃত শুধু সবুজের কোলাহল। দৃষ্টির শেষ সীমানাটুকুও নীল কার্পেটে মোড়া। মাঝখানে ছোট-বড় পাহাড়গুলো রূপ নিয়েছে পিরামিড আকারে। তবে মরুভূমির সে মেটে হলদে রঙের নয়। প্রকৃতির কোলজুড়ে বসে থাকা সবুজের পিরামিড। ভালোলাগা উজাড় হয়ে নিস্তব্ধ হয়ে জমে থাকে নীলগিরিতে।
এখানে পাহাড় আর মেঘের মিতালি চলে। মেঘ ছুঁই ছুঁই সে কি অধরা অনুভূতি! আকাশের বুকে যেন নিজের মাথাটাই লেগে যাবে এখনই। পৃথিবীর উপরে মেঘের দেশে ভাবনার জলকেলিতে বুদ হয়ে থাকি কতক্ষণ কে জানে! চিন্তার অলিগলিতে শুধু প্রকৃতির মেঘমাখা নির্ঝর আয়োজন। এ এক স্বপ্নিল সরোবর। বইয়ের পাতায়, ঘুমের ঘোরে, গল্পের মাথায় সেই কল্পনামাখা সবুজ স্বর্গোদ্যান। অবারিত সবুজের বিছিয়ে দেয়া প্রকৃতিরূপ। আটকে থাকা চোখের নির্লিপ্ত চাহনি। এটাই তো স্বর্গ। নীলের অপ্সরীদের আজন্মকাল ব্যাপী গল্পের চাষ এখানেই। বিলে ফোটা নীলপদ্মের গায়ের যে সবুজাভ, তার সাজসজ্জা বোধহয় এখান থেকেই। আমি বিস্ময়ের সীমানা ছেড়ে আকাশে তাকাই। দীর্ঘক্ষণ পর একটা প্রেমশ্বাস ছাড়ি প্রকৃতির বুকে।
ভেতরে প্রকৃতির প্রেমে জন্মায় কয়েকটা কবিতার লাইন। মৃদুস্বরে আনমনে আমি আবৃত্তি করি-
এখানে আকাশ নীল, মেঘের কোলাহল
নিচে সবুজের নীলাভ্র আবেদন!
আজ কোনো প্রেম নেই
শুধু মেঘের সম্ভোগে ক্লান্ত হব আমি!
তোরা যা!
আমি আছি অনন্ত সবুজের পথে!
তোরা ঘরে ফের!
আমি পথযাত্রী সাদা মেঘের কোলের।
নীলগিরির মেঘের সমুদ্র আর প্রকৃতির সবুজে ডুবেছিলাম অনেকক্ষণ। ঘোরলাগা চোখে নৈসর্গিক প্রেম নিয়ে নেমে আসি ফেরার পথে। ইচ্ছের বলিদান দিই এখানে আরো কিছুক্ষণ উপভোগ বাসনার। রেখে আসি রাত্রিটুকু উদযাপন করার জন্য মেঘসমুদ্রের কিছু দৃষ্টিনন্দন কটেজ। যেগুলোর নামকরণ করা হয়েছে গিরি মারমেট, মেঘদূত, নীলাঞ্জনা ইত্যাদি নামে।
নীলগিরি থেকে ফেরার পথে আমাদের মৌলিক প্ল্যান এলোমেলো হয়ে যায়। আমাদের প্ল্যান ছিল নীলগিরি থেকে আমরা সরাসরি রোমা বাজার যাব। ওখানে রাত কাটিয়ে পরদিন থেকে ট্র্যাকিং-এ বনের ভেতরে ঢুকব। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ মাঝখানে বাধ সাধে। মহাবিপত্তি হয়ে আমাদের সামনে আসে সে। তাই অগত্যা প্ল্যান চেঞ্জ করলাম আমরা। গ্রুপ মিটিং-এর নতুন প্ল্যান-এ গাড়িতেই আমরা শহরে ফিরব। ওখান থেকে আজকেই ওপাশের যে দুটো স্পট আছে ‘মেঘলা’ আর ‘নীলাচল’-ওখানে যাব। তারপর শহরে এসে এ গাড়ি ছেড়ে দেব। বিকেলের আগে অটো ভাড়া করে আমাদের শেষ স্পট ‘স্বর্নমন্দিরে’ যাব।
আরো দেড় হাজার টাকা বেশি দিয়ে আমরা চাঁদের গাড়ি ছুটালাম শহরের দিকে। যাওয়ার সময়ের সে উচ্ছলতা এখন আর নেই। ক্লান্ত শরীর নিয়ে সবাই নেতিয়ে পড়েছে গাড়ির ভেতর। একজন আরেকজনের উপর ক্লান্তিমাখা অবসন্ন দেহ ছেড়ে দিয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর আমরা বান্দরবন শহরে এসে নামলাম। শহরের পাশে এক হোটেলে দুপরের ভুড়িভোজ করলাম। ক্ষিদেয় পেট যেন বালুচর। পেটপুরে ইচ্ছেমতন খেলাম। তারপর অল্পসময় বিশ্রাম নেয়ার পর আবার ছুটলাম ‘মেঘলা’র দিকে।
মেঘলা
বান্দরবন শহর থেকে ৪ কি. মি. দূরে সুন্দর মনোরম পরিবেশে এ পর্যটন কেন্দ্রটি অবস্থিত। সুন্দরের আবীরমাখা কিছু উঁচু-নিচু পাহাড়। সবুজে সবুজে চারিধার ঘেরা। মাঝখানের লেকটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এ স্পটটি। চারিদিকে ঘন সবুজ বৃক্ষরাজি। পাতাদের থেমে থেমে হিল্লোল আর প্রাকৃতিক লেকের স্বচ্ছ জল যে কাউকেই প্রকৃতির কাছাকাছি টেনে নেয়।
লেকের জলে নিজের ছবি আল্পনায় আঁকে প্রকৃতিপ্রেমীরা। ভালোলাগার সমীকরণ এঁকে জল ছিটায় কপোত-কপোতী। কুসুম কুসুম মধুমাখা প্রেমের আবরণ ছড়ায় মেঘলার উপর। খুব জোরে প্রিয়তম নামটি ধরে ডাকা সবুজের শূন্যে, পাহাড়ে আঘাত খেয়ে সে নাম ফিরে আসে নিজের কানে। এ এক অদ্ভুত প্রেমানন্দ।
মেঘলার পুরোটা ঘুরিনি আমরা। নীলগিরির পর আর কোনো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনে প্রেমান্দোলন জাগায় না। এখানে স্পটের সৌন্দর্য বৃদ্ধির ভাবনায় পর্যটকদের মনোরঞ্জনে কিছু জিনিসের আয়োজন করা হয়েছে। যেমন : লেকে ভ্রমণ করতে রয়েছে ভাড়ায় চালিত প্যাডেল বোট আর নৌকা। এছাড়া মিনি চিড়িয়াখানা, শিশু পার্ক, সাফারি পার্ক, ঝুলন্ত ব্রিজ, পিকনিক স্পট এবং আকাশে ঝুলে আছে রোপওয়ে কার। যেখানে সবুজ প্রকৃতি, লেকের স্বচ্ছ পানি আর পাহাড়ের চূড়ায় চড়ে দেখা যাবে পাহাড়ি বান্দরবনের নজরকাড়া অভূতপূর্ব নয়নাভিরাম দৃশ্য।
অবকাশ যাপনের জন্য রয়েছে জেলা প্রশাসনের একটি সুন্দর রেস্ট হাউজ। রাত্রিযাপনের জন্য ৪টি কক্ষ রয়েছে। প্রতি কক্ষ দৈনিক ২০০০ টাকা ভাড়ায় পাওয়া যায়।
এখানে মোটামুটি কোনোরকম ঘুরে আমরা নীলাচলের পথে গাড়ি ঘুরালাম।
নীলাচল
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬শ’ ফুট উঁচু এই জায়গায় বর্ষা, শরৎ কি হেমন্ত-তিন ঋতুতে ছোঁয়া যায় মেঘ। মেঘের ছোঁয়া জলকণা গায়ে পড়ে মনকে আন্দোলিত করে। সারাক্ষণ প্রবাহিত হিম ঠাণ্ডা হওয়া ক্লান্তি ভাব দূর করে দেয় নিমিষেই। আকাশপটে লেগে থাকা মেঘ-সৌন্দর্য হৃদয়ঙ্গম হয় নিবিড়ভাবে। উৎফুল্লতা আর উদ্বেলতায় কেঁপে ওঠে ঠোঁট। ভালোলাগারা শেষ সীমান্ত হয়ে জড়োসড়ো প্রার্থনা করে আমার জন্য।
এছাড়া এখানে দাঁড়িয়ে দূর থেকে দেখা যায় বান্দরবন শহর আর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সাঙ্গু নদী। সাঙ্গু নদীর চুপচাপ নিরিবিলি বয়ে চলা, পর্যটকের মনকে করে তোলে ধীর-শান্ত। উত্তাল নদীর মতো কোনো ঢেউ-তরঙ্গ নেই সাঙ্গুর। সদ্য কিশোরীর মতো উচ্ছলতা ভাবও নেই তার মাঝে। কৈশোর পেরোনো ভারিক্কি ভাবের সুবোধ কপোতীর নিচু মুখ যেন সাঙ্গু। ধীরতা সাঙ্গুকে এনে দিয়েছে ভালোলাগার আবেশ।
বান্দরবন জেলা পরিষদের উদ্যোগে গড়ে তোলা মনোরম এই পর্যটন কেন্দ্রে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন যোগ করা হয়েছে একটি রিসোর্ট। তাই এখানে বেড়ানোর পাশাপাশি পর্যটকরা রাতযাপনের সুযোগ পাবেন। রাতের নির্জলা সুবোধ আকাশ দেখার জন্য এর চেয়ে উত্তম জায়গা মেলা ভার। তারাদের মিছিল এখান থেকে একেবারে সুস্পষ্ট। চাঁদটাকে মনে হয় কোনো সুন্দরী ললনার জ্বলজ্বল মুখ।
বান্দরবন শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে টাইগারপাড়া এলাকা। সেখানকার পাহাড়ের চূড়ায় বান্দরবন জেলা পরিষদ গড়ে তুলেছে আকর্ষণীয় এই পর্যটন কেন্দ্র। নাম দিয়েছে নীলাচল পর্যটক কমপ্লেক্স। এখানে পাহাড়ের গায়ে গায়ে পর্যটকদের জন্য আছে নানান ধরনের ব্যবস্থা।
নীলাচলের সৌন্দর্য বর্ধনে সম্প্রতি এখানেও কয়েকটি নতুন জায়গা বানানো হয়েছে পর্যটকদের জন্য। এখানকার টিকিট ঘরের পাশে ‘ঝুলন্ত নীলা’ থেকে শুরু করে ক্রমশ নিচের দিকে আরও কয়েকটি বিশ্রামাগার তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘নীহারিকা’ এবং ‘ভ্যালেন্টাইন’ পয়েন্ট।
পাহাড়ের ঢালে ঢালে দারুণ করে সাজানো হয়েছে এ জায়গাগুলো। একটি থেকে আরেকটি একেবারেই আলাদা। এখানের একেক জায়গা থেকে সামনের পাহাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্যও একেক রকম। রূপে চোখ জুড়ায় এক কথায়। মনের ভেতরে বেজে ওঠে প্রকৃতির গানের সুর।
তবে মূল নীলাচলের সৌন্দর্য অনির্বচনীয়। এখান থেকে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় আরও দারুণভাবে। গভীর আকুতি ভরে দুচোখ মেলে নির্ভার দাঁড়িয়ে থাকা যায় সবুজ পাহাড়ের অমীমাংসিত দিগন্তে। প্রকৃতির এ দৃশ্যের হৃদকল্পে আছড়ে পড়া রূপভার- সে এক অবর্ণনীয় চিত্র। জীবনের অতীত সুখ-বৈচিত্রের হিসেব শূন্যতে গিয়ে পৌঁছে প্রকৃতির এ ব্যাঞ্জনা মাখা সুন্দরে।
নীলাচল পর্যটন কেন্দ্রের একেবারে চূড়ায় পর্যটকদের জন্য আছে বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। নীলাচলের মূল পাহাড়ের শিখরের চারপাশেই মনোরম স্থাপনা-শৈলিতে নির্মাণ করা হয়েছে এসব কেন্দ্র। একটি থেকে আরেকটি একেবারেই আলাদা। সাথে পাহাড়ের অনিন্দ্য সুন্দর ছবিও ভিন্নরকম।
বর্ষা এবং বর্ষা পরবর্তী সময়ে এখানে চলে মেঘের খেলা। হুটহাট যেকোনো সময় পাহাড় ছেয়ে যায় মেঘে। প্রকৃতিকে ভিজিয়ে দিয়ে যায় মেঘদূতরা। ভেজা পাতায় সবুজের ঈশ্বর দানের অপূর্ব স্বর্গীয় রূপ ফুটে ওঠে তখন। নীল পাতা যেন স্বর্গত কুমারীর বেনীর ফুল।
কিছুক্ষণ পর পরই দূর পাহাড় থেকে মেঘের ভেলা ভেসে আসে নীলাচলের চূড়ায়। ছোপ ছোপ সাদা মেঘগুলো যেন কাশফুলের প্রেমসখা। চারপাশ ঢেকে ফেলে শীতল আর্দ্রতা মাখা নরম পরশে।
নীলাচলে বাড়তি আকর্ষণ হলো এখানকার রিসোর্ট। নাম নীলাচল স্কেপ রিসোর্ট। সাধারণ পর্যটকদের জন্য এ জায়গায় অবস্থান সূর্যাস্ত পর্যন্ত অনুমতি আছে। তবে রিসোর্টের অতিথিদের জন্য সর্বক্ষণই খোলা এ জায়গা। দিগন্তরেখায় রক্তিম হয়ে অস্তমিত সূর্যের ডুবে যাওয়া বেরসিক মনেও নিয়ে আসে আহ্লাদী প্রেমের কবিতা।
বান্দরবন শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্পট হল নীলাচল। শহর থেকে ৫ কি.মি. দূরে এর অবস্থান। এখান থেকে উপভোগ করা যায় মেঘমুক্ত নীলাকাশে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের অপূর্ব দৃশ্য। পাহাড় থেকে সমুদ্র-দৃশ্যের যে আত্মিক প্রশান্তি এটা শুধু দেখলেই অনুভব করা যায়। যেদিকে দুচোখ যায়, অবারিত সবুজের ঘন বন। উপচে পড়া সৌন্দর্যরূপে নীল আকাশের হাতছানি। মেঘ মেয়ের মৌনতা ভাঙে আকাশের নীলে। যেন আকাশের নীল আঁচল ছড়িয়ে দিয়েছে সবুজের জমিনে। মুহূর্তেই মন-প্রাণ ভরে ওঠে মুগ্ধতায়।
নীলাচল ছেড়ে শহরের পথে চাঁদের গাড়ি। নির্নিমেষ আবেশিত পূজ্য সুন্দর প্রকৃতির কারুকার্য চোখের পাতায় এখনো লেগে আছে। আকাশের গায়ে কালো কালো পেঁজা ভাজ করা মেঘের ধীর আনাগোনা। শহরে এসে চাঁদের গাড়ি ছেড়ে অটোরিকশা নিলাম আমরা। ছুটলাম বান্দরবনের ঐতিহ্য স্থাপত্য স্বর্ণ মন্দিরে।
বুদ্ধ ধাতু জাদি (স্বর্ণ মন্দির)
যাওয়ার পথে শহরে অবস্থিত প্রয়োজনীয় সকল সরকারি অফিস-বিল্ডিং ছোট ছোট করে গড়ে উঠেছে। প্রায় বিশ মিনিট পর আমরা মন্দিরের কাছে পৌঁছলাম। নির্দিষ্ট এলাকার পর গাড়ি ঢুকতে দেয়া হয় না। তাই মন্দিরের অদূরে রাস্তার মাথায় আমরা নেমে গেলাম। দূর থেকে যেন আকাশ স্পর্শ করছে মন্দিরের মাথা।
বুদ্ধ ধাতু জাদি সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় বান্দরবন-রাঙামাটি সড়কের বালাঘাটা নামক এলাকায় অবস্থিত। বান্দরবন শহর হতে ৪ কি.মি. দূরে এ উপাসনালয়টি আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের এক অনবদ্য নিদর্শন।
রাস্তা থেকে বেশ অনেকটা উঁচুতে মন্দির। দর্শনার্থীদের ওখানে উঠতে পাড়ি দিতে হয় বিশাল দীর্ঘ এক সিঁড়ি। উঠতে গেলে হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাওয়া যায় কত ধানে কত চাল! সাধারাণত ওঠার সময় মধ্যখানে একবার জিরিয়ে নেয় প্রত্যেকে। চারপাশে সবুজ পাহাড়ে ঘেরা ছবির মাঝে তৈরি করা হয়েছে এ বৌদ্ধ উপাসনালয়।
বর্তমানে বুদ্ধ ধাতু জাদি (স্বর্ণ মন্দির) দেশের একটি অন্যতম পর্যটন স্পট হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম এই বুদ্ধ ধাতু জাদি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটি উল্লেখযোগ্য উপাসনালয়। এটির নির্মাণশৈলী মায়ানমার, চীন ও থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ টেম্পলগুলোর স্থাপত্য নকশায় তৈরি। যেখানে রয়েছে একটি মিউজিয়াম, যা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রাচীন ইতিহাস জানা যায়। মন্দিরের উপর থেকে পুরো বান্দরবন শহর স্পষ্ট দেখা যায়। দর্শনার্থীদের প্রচণ্ড ভিড় মন্দিরে বসানো সোনালি প্রলেপমাখা মূর্তিগুলোর চারপাশে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য মূল মন্দিরের অভ্যন্তরে ঢুকে দর্শন ও প্রার্থনার ব্যবস্থা আছে। অন্য ধর্মাবলম্বীদের সেখানে ঢোকার কোনো অনুমতি নেই। সুশৃঙ্খল পরিবেশের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখানে পুলিশ মোতায়েন করা আছে। আধঘণ্টা মন্দিরের ভেতরে ও চারপাশে ঘোরার পর আমরা শহরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
সন্ধের আকাশে আস্তে আস্তে অন্ধকার নামে। ভাঁজ করা পেঁজা কালো-সাদা মেঘখ-গুলো ধুসর বর্ণে গুড়ি গুড়ি হয়ে পৃথিবীতে ঝরে পড়ছে। আশপাশের ঘিরে রাখা পাহাড়গুলো নীল অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। চোখের সামন দিয়ে একঝাঁক বন-পাখির ঘরে ফেরা ঝিরঝির বাতাসে এঁকে যাওয়া একটা চিত্র স্থাপন করে যায়। পাহাড়, আকাশ, অন্ধকার আর সবুজের সন্ধ্যেকালীন ছবি রাতের চাঁদ-আলোয় ভেজা প্রকৃতির বিচিত্র সৌন্দর্যরূপকে নিমন্ত্রণ করে। এতক্ষণে বৃষ্টির দৌর্বল্য অবসান ঘটিয়ে বজ্রপাতের সঙ্গে ঝরে পড়ছে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলি। গায়ের চামড়া ভেদ করা যেন একেকটা বৃষ্টির ফোঁটা। মন্দিরের ভেতরে বুদ্ধ প্রতিমার সামনে রাখা প্রায় স্তিমিত পূজা প্রদীপ রাস্তা থেকে স্পষ্ট।
অমীমাংসিত প্রকৃতি সৌন্দর্যের কোনো বর্ণনা আমার কল্পনা চিত্রে এখনো ফোটেনি। বিচিত্র প্রকৃতির ছায়ামাখা পেন্সিল-আর্ট সবুজ দিগন্তরেখা ছাড়িয়ে আকাশের নীলিমায় আবিস্কৃত গভীর প্রেমঘোর আমার চিত্তে এখনো বহমান। সবকিছু ছাপিয়ে বর্ণনাতীত হিমমাখা প্রেমের আর্দ্রতা নিয়ে আমি ফিরে এসেছি।
হোটেলের ইলেক্ট্রিক লাইটে জ্বলজ্বল করা আমার বদ্ধ রুমে ঘুমের আয়োজন চলছে এখন। আমি মনে মনে প্রার্থনায় বসেছি- প্রভু! আজ রাতেও তুমি আমাকে প্রকৃতির কোল ঘুরিয়ে এনো।

