অপারেশন বোল্ড আউট কিংবা একটি রাতের গল্প

সংখ্যা:

এক.

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলাম। ঘুমিয়েছি ঠিক বলা যাচ্ছে না। শুয়েছি কিছুক্ষণ হলো, হালকা তন্দ্রাভাব এসেছিল আর কি! আর স্বপ্ন দেখছিলাম না ঠিক, সারাদিনের কল্পনাগুলি তন্দ্রার ভেতরে এসে এলোমেলোভাবে ধরা দিচ্ছিল।

আরো কিছু সময় অতিবাহিত হলে সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়তাম, স্বপ্নের দেখাও পেতাম বোধহয়। তখন এই কথাটুকু সত্যি হত- ‘ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলাম।’

বালিশের নিচে মোবাইল রেখেছিলাম, আমার তন্দ্রাভাব উবে গেছে মোবাইলের কাঁপুনিতে। কী তীব্রতর কাঁপুনি! মোবাইল ভাইব্রেশন মুডে ছিল, এইমাত্র কাঁপুনির তোড়ে টের পেলাম সেটা।

একটুখানি রাগ, একটুখানি বিরক্তি নিয়ে হাত চালালাম বালিশের নিচে। মোবাইল আমার হস্তগত হওয়ার পর দেখতে পেলাম, স্ক্রিনে ফারাজের নাম ভাসছে। আমার বিরক্তিলাগা আরো একটু বেড়ে গেল। মনে মনে বললাম, বদটা জানে আমি একটু সকাল সকাল ঘুমোতে যাই। গতরাতে এত করে বকে দিলাম, সন্ধ্যায় আড্ডা থেকে ফেরার পথে বলে দিলাম ‘রাতে কল দিস না, ঘুমামু।’ বদমাশটা তখন হুঁ হুঁ করল ঠিকই, কিন্তু এখন কথা রাখল না। একটা রামঝাড়ি দেয়ার পরিকল্পনা এঁটে কল রিসিভ করলাম, ‘হ্যালো।’

‘দোস্ত, ঘটনা ঘইটা গেছে।’

‘কী ঘটনা?’ -কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি। অবাক হলাম এই কারণেÑ ও কখনো শুরুতেই এরকম সিরিয়াস মুডে কথা শুরু করে না। কিছু একটা ঘটে গেল তাহলে? অবাক হয়েছি কিছুটা, তবে ওপাশ থেকে টের পেতে দিইনি।

‘তুই সাত নম্বর রোডের শেষ মাথায় আয়, নতুন বিল্ডিং হইছে যে, ওইখানে।’

ওপাশ থেকে একনাগাড়ে, একনিঃশ্বাসে কথাগুলি বলল ফারাজ। ওর বুক কাঁপছে! আমি এপাশ থেকে স্পষ্টই টের পেলাম। অবাক হওয়ার মাত্রা আরো বেড়ে গেল।

‘এতো রাতে বাইরে বের হব? কী পাগলের মতন বকতেছিস!’

‘আরে, আয় না দোস্ত, পিঁপড়ার বাসায় পা পড়েছে, এখন আর গতি নাই আমার। বাঁচা দোস্ত!’

‘পিঁপড়ার বাসা মানে?’

‘আসবি তুই?’

‘ওকে বেরোচ্ছি।’

‘সাত নম্বর রোড, শেষ মাথা, নতুন বিল্ডিং। ওকে?’

‘ওকে, ডান।’

আমি টের পেলাম ‘জনাব বিপদ চৌধুরী’ আমাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে! পিঁপড়ার বাসায় পা দিয়েছে বলে ফারাজ রূপক অর্থে কিছু একটা বুঝিয়েছে, সেটাও বুঝতে পেরেছি আমি। কিন্তু কী সেটা? এত ভাবাভাবির সময় নেই। ফারাজকে উদ্ধার করতে হবে এই ‘বিপদ চৌধুরী’র কাছ থেকে। কিন্তু কে এই ‘বিপদ চৌধুরী?’

‘সময় কম, জলদি কর। ফারাজ ধরা পড়ার আগেই কাজ সারতে হবে।’ কেউ যেন বলল আমাকে! আশেপাশে তাকিয়ে মনে হলো, আমি তো এখানে একা, কথা বলার মতো কে আছে, আমি ছাড়া? বুঝতে পারলাম নিজে নিজেই এসব কথা ভাবছি।

ফারাজ আমার খুব কাছের বন্ধু, আপন ভাইয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আমার কোনো ভাই নেই বলে ওকে আপন ভেবেছি অনেক আগে থেকেই। ওর বিপদ মানে আমারও বিপদ। আমার বিপদ আর ওর বিপদ মানে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ওর বিপদে আমার মন কেমন যেন উতলা হয়ে উঠল। এই আমি, যে কিনা বাবা-মায়ের চোখে একান্তবাধ্যগত সন্তান, শান্ত, বাচ্চাছেলে এবং হাবাগোবা হিসেবে বেড়ে উঠেছি, সেই আমিই এ রকম রাত বিরেতে বের হচ্ছি। সেটা শুধুই ফারাজের জন্য। ফারাজ বলে কথা!

 

দুই.

আকাশের হ্যাঙারে কেউ যেন থালার মতো চকচকে রুপোলি চাঁদটা ঝুলিয়ে দিয়েছে। ঝিরিঝিরি ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। সারাদিনের ভ্যাপসা গরমের পর এই ভেজা, ঠাণ্ডা বাতাস দেহ ও মনে শান্তির প্রলেপ বুলিয়ে দেয় যেন। রাত এবং চাঁদ, দুটোই ধীরেধীরে পূর্ণবয়স্ক হয়ে উঠছে। রুপোলিরঙা চন্দ্রালো এবং তুলার মতো উড়তে থাকা কালো মেঘের এই আলো-ছায়ার খেলায় নগরের পথঘাট বেশ চমৎকার দেখাচ্ছে।

মোবাইলে সময়টা দেখে নিলাম, দশের ঘর পেরিয়েছে ঘণ্টার কাঁটা। এটাকে নিশুতি রাত বলা যেতে পারে। চারদিকে সুনসান নীরবতা। দূর থেকে ভরাট আওয়াজে দুটো বেড়ালের ডাক শুনতে পেলাম, ঝগড়া করছে বোধহয়। এসবে ভ্রুক্ষেপ করছি না আমি। যত দ্রুত সম্ভব ফারাজের কাছে পৌঁছুতে হবে।

আমি এই মুহূর্তে প্রচুর ঘামছি, পরনের টি-শার্ট ভিজে একাকার। মাথায় ভোঁ ভোঁ করে শুধু তিনটা বাক্যই ঘুরছে আপাতত- সাত নম্বর রোড, শেষ মাথা, নতুন বিল্ডিং।

সাত নম্বর রোডে ঢুকতেই একটা স্বাস্থ্যবান লাল কুকুরের দেখা পেলাম। গলির মুখে কুণ্ডুলী পাকিয়ে শুয়েছিল, আমাকে হাঁটতে দেখে পিছু নিয়েছে।

আমার কুকুরভীতি নেই। তাই এই কুকুর নিয়ে আমার মাথাব্যাথাও নেই। আমি হাঁটার গতি আরো বাড়িয়ে দিয়েছি, এক প্রকার দৌড়োচ্ছি বলা যায়। যত দ্রুত সম্ভব ফারাজের কাছে পৌঁছুনো দরকার।

সাত নম্বর গলির শেষ মাথায় পৌঁছুতেই মোবাইলটা একবারের জন্য কেঁপে উঠল। ভাবলাম, মোবাইল অপারেটরদের কোনো ম্যাসেজ হয়ত। দেখব না ভেবেও কী মনে করে যেন পকেটে হাত দিয়ে ফেললাম। মোবাইলটা বের করে ম্যাসেজ ওপেন করে দেখি ফারাজের ম্যাসেজ- ‘যেখানে দাঁড়ানো আছিস, সেখানেই থেমে যা। পেছনে তাকিয়ে দেখ একটা আমগাছ আছে, নিজের নিরাপত্তার জন্য ওটার পেছনে দাঁড়া। তোকে দেখতে পেয়েছি। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সহজে বের হওয়া সম্ভব না, মোবাইলে কথা বলা তো নয়ই। বের হতে একটু সময় লাগতে পারে, সে পর্যন্ত অপেক্ষা কর।’

ম্যাসেজটা পড়ে আমার মনে হতে লাগল, বড়সড় একটা ঝামেলায় জড়িয়ে গেছি। কিভাবে কী করা যায়, ভেবে পাচ্ছি না।

দেখতে পেলাম, কুকুরটা আমার চারপাশে ঘুরছে। কিছুটা অশান্ত দেখাচ্ছে তাকে। কী যেন একটা বুঝাতে চাইছে আমাকে, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

আমার চারপাশে কয়েকটা চক্কর দিয়ে আমগাছটার পেছনে চলে গেল কুকুরটা। আমিও পিছু নিলাম। মোবাইলের ফ্ল্যাশটা অন করতে হলো, রাতের আঁধারে পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছিল না সবকিছু।

আমগাছটার পিছে যেতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম আমি। বরফের মতো জমে গেলাম একদম। আর এক পা সামনে এগোতে পারছি না, কেউ যেন এই জায়গায় গেঁথে দিয়েছে আমাকে। মহাপ্রলয়ের আগ পর্যন্ত বুঝি আমাকে এভাবেই থাকতে হবে এখানে!

আমি দেখতে পেলাম আমগাছটার পেছনে একটা মানুষ শুয়ে আছে, প্রাণ নেই! নীল-সাদা চেকশার্ট আর ধূসর রঙের গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট পরিহিত। বুকের দিকে ছুরির আঘাতের চিহ্ন। সম্ভবত ধারালো কোনো ছুরি দিয়ে মানুষটার বুকে আঘাত করা হয়েছে এবং এই আঘাতেই ইহজনম ত্যাগ করেছে এই হতভাগ্য।

কুকুরটা একবার আমার দিকে তাকাচ্ছে, আরেকবার মৃতদেহের দিকে। ঘড় ঘড় শব্দ তুলে কিছু একটা বুঝাতে চাইছে আমাকে।

আমি মৃতদেহটার আরো কাছে যাব কি-না ভাবছি। পেছন থেকে জুতোর আওয়াজ পেলাম। তাকিয়ে দেখি ফারাজ। আমি চমকে গেলাম কিছুটা, তবে সেটা বাইরে প্রকাশ করলাম না। বললামÑ ‘আমি তোর কথার আগামাথা কিচ্ছু বুঝতেছি না। একটু খুলে বলবি, প্লিজ!’

‘বলতেছি রে পাগলা, টেনশন নিস না। তবে কথা দে, ঘাবড়াবি না। আমি যা বলব তাই করবি, আমার সাথে থাকবি।’

‘ওকে, তাই হবে। এবার বলে ফেল।’

‘আমি খুন করেছি।’

কথাটুকু বলেই চুপসে গেল। উদাস ভঙ্গিতে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। একটু ভরাট গলায়, অল্প আওয়াজে, ধীরেসুস্থে কথাটা বলল সে। আমি একটুও চমকালাম না। মনে হলো যেন খুব স্বাভাবিক ব্যাপার এটা। একটা মানুষকে সে খুন করতেই পারে, আবার এটা অবলীলায় এভাবে বলতেই পারে!

 

একটু দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করলো ফারাজ- ‘এই যে, যাকে দেখতে পাচ্ছিস, সে একজন, আরেকজন উপরে পড়ে আছে।’

‘মানে দু-দুটো মানুষকে খুন করেছিস তুই!’

‘হু, তা ছাড়া উপায় ছিল না।’

‘উপরে বলতে?’

‘নতুন বিল্ডিংয়ে গেলেই বুঝবি।’

আমি এখন কোন কথাটা জিজ্ঞেস করব ফারাজকে, ভেবে পাচ্ছি না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। এখনো জানি না, আসলে কী ঘটে গেছে? কিসের জন্য এরকম রাত-বিরাতে ফারাজের মতো ভদ্র ছেলের হাতে খুন হয়ে গেল জলজ্যান্ত দু-দুটো মানুষ!

মশার উপদ্রব টের পেলাম। দেখতে পেলাম, কুকুরটা এখনো সেই আগের মতোই অশান্ত হয়ে আছে, খুব পেরেশান দেখা যাচ্ছে তাকে। ফারাজ বলল, ‘অপারেশনে নামব। তার আগে কিছু কথা জেনে রাখা দরকার তোর।’ বলতে শুরু করল ফারাজ। আমি নড়েচড়ে বসলাম।

 

তিন.

‘কোনো অন্যায় কাজে জড়াচ্ছি না আমরা। আমি দু-দুটো মানুষকে খুন করে ফেলেছি, এটাও কোনো অন্যায় না। বরং একটা পুণ্যের জন্য এরকম দু-চারটে পিচাশের লাশ ফেলে দিলেও বিধাতা ক্ষমার দৃষ্টিতেই দেখবেন বোধহয়! অন্তত আমি এটাই মনে করি।

যাই হোক, আসল কথায় আসি। রাস্তা থেকে একটা মেয়েকে তুলে এনেছিল এরা। আমি তখন তোদের সাথে আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। দূর থেকেই দেখতে পেলাম দৃশ্যটা। বিষয়টা কী হতে পারে, সেটা বিদ্যুৎ গতিতে আমার মাথায় খেলে গেল। দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, এদের পিছু নিতে হবে, মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে।

শেষমেশ যখন এদের অনুসরণ করতে লাগলাম, এরা প্রাইভেট কারে, আমি রিকশায়। দেখতে পেলাম, আমাদের এলাকায় এসে ঢুকছে। একই সঙ্গে কিছুটা অবাক এবং হতাশ হলাম। নিজের এলাকায় এসব হয়, অথচ নিজেই জানি না!

তারা যখন এই বিল্ডিংয়ে এসে থামল, দেখতে পেলাম বিল্ডিংয়ের ভেতর থেকে আরো কয়েকজন লোক নেমে এলো ঠিক তখনই। কুৎসিত সব গালি আর আশ্লীল অঙ্গভঙ্গি একদম বিনামূল্যে পরিবেশন করছে। মেয়েটাকে হিপনোটাইজ করে একটা ঘোরের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলা হয়েছে শুরুতেই। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা আর মাঝে মাঝে এদের কা- দেখে ফিক করে হেসে ওঠা ছাড়া কিছুই করছে না সে। আমার কাছে ব্যাপারটা স্বচ্ছ কাঁচের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল, এটাই এদের আস্তানা, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আমি কিছু দূরে থাকতেই রিকশা ছেড়ে দিয়েছি। বাকি পথটুকু হেঁটে এসে দেখতে পেলাম, এখানের নিরাপত্তাব্যবস্থা খুবই জোরালো এবং এটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। অবশ্যি, খালি চোখে এই নিশ্চিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা কারো চোখে পড়া সম্ভব নয়। দূর থেকে অন্য দশটা বাড়ির মতোই সাধারণ, স্বাভাবিক লাগে দেখতে।

 

প্রথম খুন

মেয়েটাকে ততক্ষণে ওরা উপরে নিয়ে চলে গেছে। আমি পথ খুঁজছি, কিভাবে উপরে যাওয়া যায়। আন্দাজ করলাম, বিল্ডিংয়ের প্রধান ফটকের নিরাপত্তারক্ষী কয়েকজন হবে। তবে, এই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত আছে একজন। বাকিরা খুব সম্ভব মেয়েটাকে নিয়ে উপরে যাওয়া লোকদের মধ্যে আছে।

আমি সুযোগ বুঝে টুপ করে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। নিরাপত্তারক্ষী চিন্তামগ্ন ছিল বোধহয়, আমাকে দেখেই হড়বড় হয়ে দাঁড়িয়ে গেল এবং মিলিটারি কায়দায় সালাম ঠুকে বসল! বুঝতে পারলাম, প্রথম দেখায় চিনতে পারেনি, কী ভেবেছে কে জানে!

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই হই চই শুরু করে দিল। বিপদ টের পেয়ে তর্জনি তাক করে তার দিকে তাকিয়ে বললাম, শাট আপ! এক পা নড়চড় হলে ওপারে পাঠিয়ে দেব। ঝাড়িতে কাজ হলো না। না হওয়ারই কথা, যাদের হররোজ ওঠাবসা ভারী অস্ত্রের সাথে, তাদেরকে ঝাড়ি দিয়ে দমিয়ে ফেলা অসম্ভব ব্যাপার।

দেখতে পেলাম, দৌড়ে সে একটা হলুদ রঙের সুইচের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, বিপদ বুঝতে পারলে বা অনাকাক্সিক্ষত কিছুর সাক্ষাত পেলে এসব নির্দিষ্ট সুইচ টেপা এখানের নিয়ম বোধহয়।

আমি বড়সড় দুটো লাফ দিয়ে তার কাছে গেলাম, এক মুহূর্ত দেরি না করে একটা ল্যাঙ মেরে বসলাম তাকে। দেখলাম কিছুই হয়নি তার, শুধু দৌড়ের গতি থেমেছে মাত্র। বুঝতে পারলাম, এরা কুংফু-কারাতে ভালো পারে। আমার এসব ছোটখাটো অ্যাটাকে তার কিছু হবার কথা নয়।

লোকটা খপ করে শার্টের কলার ধরে ফেলল আমার। দুই সেকেন্ড সময় নিয়ে ধুম করে তার পেটে ঘুষি দিয়ে বসলাম। দেখতে পেলাম, চোখ দুটো একটু বড় করে আমার দিকে চেয়ে আছে, শ্বাস একটু দ্রুত টানছে। চোট একটু হলেও লেগেছে। কালক্ষেপণ না করে আবার সপাটে ঘুষি চালালাম টার্গেটে, সেই আগের জায়গা। এবার সে আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে হাত রেখে টলতে টলতে মেঝেতে পড়ে গেল। ঘড়িতে সময় দেখলাম, এখানে ঢুকেছি প্রায় দেড় মিনিট হয়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তারক্ষীকে আমি টেনে হেঁচড়ে বাইরে নিয়ে এলাম।

আমগাছের এখানে এসে দেখি লোকটা প্যান্টের পকেট থেকে ছুরি বের করে এনেছে। নিরস্ত্র আমি ছুরি দেখে প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও সাথে সাথেই সামলে নিলাম নিজেকে। শরীরের সমস্ত ভার নিয়ে তার গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। লোকটা তাল সামলাতে না পেরে আমগাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। ছুরিটা ছিটকে পড়ল একটু দূরে। আমি দৌড়ে গিয়ে ছুরিটা হস্তগত করলাম। দেখতে পেলাম, চোখ বড়বড় করে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে লোকটা। কাছে এসে বললাম, ‘বাঁচতে চাইলে যা জানিস সব খুলে বল আমাকে, তোকে নিরাপদে রাখব, জীবন নিয়ে টেনশন করতে হবে না।’

‘হয় তুই মরবি, নয়ত আমি, এখানে আর দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নেই। ওসব ভিক্ষা করা করুণার জীবন নিয়ে বাঁচতে শিখিনি।’

আমি তার উত্তরে অবাক হয়ে গেলাম, বলে কি! দ্বিতীয় কোনো কথা বলার আগেই দুম করে ল্যাঙ মেরে আমাকে মাটিতে শুইয়ে দেয়া হলো।

আমি আর নিরাপত্তারক্ষী পাশাপাশি শুয়ে আছি এখন। আমার হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নেয়ার সর্বাত্মক চেষ্টায় মেতে উঠলো সে। আমি আবারও ঘুষি চালালাম তার পেট বরাবর। মাত্র তিন চার মিনিটের ভেতর তিনটে ঘুষি একই জায়গায়, কুলোতে পারল না লোকটা, ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ড সময় নীরবতায় কাটল।

তারপর, হঠাৎই লোকটা শোয়া থেকে উঠে দাঁড়াল। আমি আগেই বসে পড়েছিলাম। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আমার পিঠ ববারর দুটো লাথি কষল সে। লাথির চোট সামলাতে না পেরে আমি অল্প একটু সামনে চলে গেলাম। তখনও হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছি ছুরিটা। লোকটা তার ছুরি ফিরে পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেখতে পেলাম, আমার উপরে হামলে পড়ার জন্য খুব জোরেশোরে ধেয়ে আসছে।

আমি বসে আর সে দাঁড়িয়ে। কিভাবে কী করবো, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। দুই সেকেন্ডেরও কম সময় আছে আমার হাতে। লোকটা আমার খুব কাছে চলে এল। তড়িৎ গতিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম আমি। হাতের ছুরিটা খাড়াভাবে মেলে ধরলাম তার দিকে। কোৎ করে একটা শব্দ হলো, ছুরিটা নরম একটা কিছুর ভেতর আটকে গেছে মনে হলো। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম সঙ্গে সঙ্গে। দূরে কোথাও একটা কুকুর ভীতকণ্ঠে ঘেউ ঘেউ করে উঠল।

খুন! আমি খুন করে ফেলেছি! জলজ্যান্ত আস্ত এক জোয়ান পুরুষ! নিজের চোখ দুটোকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি চোখ মেলে অবিশ্বাস আর প্রায়শ্চিত্তের দৃষ্টিতে তাকালাম সদ্যই ছুরিকাঘাতগ্রস্ত লোকটার দিকে। দেখতে পেলাম, ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে আঘাতপ্রাপ্ত স্থান থেকে। তার শরীর থেকে চিকন একটা রক্তের প্রবাহনালা তৈরি হয়েছে। কতদূর গিয়ে গড়িয়েছে রাতের আঁধারে, আলোর দৈন্যতায় সেটা আর টের পাওয়া গেল না।

আমি আর দেরি করলাম না, উঠে পড়লাম। এভাবে অবাক হওয়ার জন্য আলাদা কোনো সময় বরাদ্দ নেই আমার হাতে, বিল্ডিংয়ের ভেতরে যেতে হবে। সবে তো একটা ফেলেছি, আর কয়টা ফেলতে হয় কে জানে!

 

দ্বিতীয় খুন

আমি যখন ফিরে এলাম বিল্ডিংয়ে, দেখতে পেলাম এখনো নিরাপত্তারক্ষী বাকিরা আসেনি। মানে মেইন গেটে কেউই নেই এখন। উপরে যাব কি-না ভাবছি। উপরে কোথায় কী আছে, কে কোথায় থাকে এগুলো জানা নেই আমার। এটা বেশ ভুগাতে পারে আমাকে। ভাবলাম, আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা যেতে পারে, সাবধানের মার নেই।

একটা পিলারের পেছনে নিজেকে আড়াল করে লিফট এবং সিঁড়ির দিকে তীক্ষ্ন নজর রাখলাম। আশেপাশে ভালোভাবে খোঁজাখুঁজি করে কোনো সিসি ক্যামেরার দেখা পেলাম না। কিন্তু মনে একটা খচখচানি থেকে গেল, নিজেকেই বিশ্বাস করাতে পারলাম না, আসলেই কি সিসি ক্যামেরা নেই? হতে পারে নতুন মেয়ে পেয়ে সিসি ক্যামেরার দিকে নজর কমে গেছে, নিজেকে প্রবোধ দিলাম আমি। তবে এদের শক্তি, লোকবল কী রকম- কিছুই ধারণা নেই আমার।

আমি ঘড়ি দেখছি আর চিলের চোখে তাকিয়ে আছি সিঁড়ি আর লিফটের সামনে। মুহূর্তের ব্যবধানে যে কোনো কিছুর সম্মুখীন হতে পারি, তবে সব ধরনের পরিস্থিতি মুকাবেলায় আমি সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

একটা মানুষের অস্তিত্ব টের পাওয়া গেল। একটা হিন্দি গানের লিরিক বাজছে মুখে, পুরুষকণ্ঠ। সিঁড়ির ওদিক থেকে আসছে লোকটা। আমি নড়েচড়ে দাঁড়ালাম। লোকটা রিসিপশনের কাছে এসেই দাঁড়িয়ে গেল, ‘সাইফুল’ বলে এদিক ওদিক তাকিয়ে চেয়ারে এসে বসে পড়ল।

আমি পিলারের পেছন থেকে উঁকি দিয়ে দেখলাম, এই লোকের গায়েও একই রকম পোষাক। নীল-সাদা চেকশার্ট আর ধূসর রঙের গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট। বুঝতে পারলাম, এটা এদের কোনো নির্দিষ্ট পোষাক। লক্ষ করলাম, এদের দুইজনই বয়সে আমার সমান, নয়ত আশপাশেই হবে। আমার হাতে খুন হওয়া লোকটা যে বয়সে আমার মতোই ছিল এবং তার নাম সাইফুল, এতক্ষণে মনে পড়ল। আসলে সেরকমভাবে খেয়ালই করা হয়নি এতক্ষণ। নামটা পর্যন্ত জানা হয়নি। তবে নাম জিজ্ঞেস করলে আসলটা বলত কি-না, সন্দেহ।

রিসিপশনের ল্যান্ডফোনে একটা কল এল। চেয়ারে বসে থাকা লোকটা কি যেন একটা ম্যাগাজিন হাতে নিয়েছিল, তড়িঘড়ি করে রিসিভার তুলল। কতক্ষণ হ্যাঁ, না, জি স্যার বলার পর লিফটের দিকে যেতে দেখলাম।

চট করে পিলারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলাম আমি। দৌড়ে গিয়ে পেছন থেকে জাপটে ধরলাম লোকটাকে, চিৎকার দিতে চাইল, তবে তার মুখে আমার হাত চেপে ধরায় গোঙানির মতো শোনাল সেটা। ‘শিকার’কে টেনে নিয়ে সিঁড়িতে গিয়ে উঠলাম। এক ঝটকায় চিৎ করে শুইয়ে দিয়ে তার শার্টের কলার ধরে বুকে চড়ে বসলাম। দেখতে পেলাম, চোখ দুটো বড় বড় করে চরম অবাক আর অবিশ্বাস নিয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে। আমার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার তীব্র চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আমি শিকারের বুকে চড়ে খুব একটা সুবিধা করতে পারছি না। সর্বশক্তি প্রয়োগ করে হাত-পা ছুঁড়ছে। আমি তার মুখ থেকে হাতটা সরিয়ে বললাম, ‘একটুও নড়চড় করবি না, আওয়াজ যেন না হয়। বল, মেয়েটাকে কই রেখেছিস, তোরা কয়জন আছিস? যদি একটু উল্টাপাল্টা করিস…’ আর বলতে পারলাম না আমি। বলতে চাচ্ছিলাম ছুরির কথা, কথাটা মুখে আসার পর মাথায় এল ছুরি আমগাছের ওখানেই আছে, সাইফুল নামক ছেলেটার বুকে বিঁধে আছে। আমার হাতের জোর কমিয়ে দিলাম ছেলেটার শরীর থেকে। বুক থেকে নেমে বসলাম। ছেলে উঠে বসল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘নাম কী?’

উত্তরে ভালো কিছু পেলাম না, কুৎসিত একটা গালি শুনিয়ে দেয়া হলো আমাকে। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি, আচমকা একটা লাথি কষলাম ছেলেটার বুক বরাবর। আধশোয়া-আধবসা অবস্থায় ছিল ছেলেটা। লাথির টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল সে। প্যান্টের বেল্টের কাছ থেকে কি যেন একটা বের করতে চাচ্ছিল, লাথির ক্ষিপ্রতায় দূরে, কয়েক সিঁড়ি নিচে ছিটকে পড়ল জিনিসটা। রিভলভার! আমি দেরি করলাম না, দৌড়ে গিয়ে অস্ত্রটা হাতে তুলে নিলাম। দেখতে পেলাম, উঠে আসার চেষ্টা করছে সে। আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। ছেলেটা বোধহয় ভয় পেয়ে গেল, শোয়া থেকে উঠে দাঁড়াবে, নাকি শুয়ে থাকবে বুঝতে পারছে না সে। চোখে মুখে তীব্র বিস্ময়ের ছাপ। জোরে চিৎকার করল, ‘সাইফুল!’

এদিকে বোধহয় কেউ নেই, ধুপধাপ মারপিটের আওয়াজ, চিৎকার এতসবের পরেও আশপাশে থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল না। কেমন যেন শ্মশানঘাটের মতো নীরব, চুপচাপ। আমি কয়েক কদম সামনে বেড়ে দাঁড়ালাম। মুখ খিঁচিয়ে বললাম, ‘সাইফুল ঘুমোতে গেছে, জনমান্তর ঘুমিয়েই যাবে।’ একলাফে শোয়া থেকে দাঁড়িয়ে গেল ছেলেটা, হাতের মুঠি পাকিয়ে হিংস্র ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গীর মৃত্যু-সংবাদ যেন তাকে শক্তি দান করেছে। দাঁত কটমটিয়ে আমার বাবাকে উল্লেখ করে আবারো একটা কুৎসিত গালি দিল সে। আমি যথেষ্ট ক্ষিপ্রতার সঙ্গে রিভলভার তুলে ধরলাম তার দিকে, খুব আওয়াজ করে একটা শব্দই মুখ থেকে বের হলো আমার- ‘একদম!’

মনে হচ্ছে যেন রেকর্ড করা গালি বাজানো হচ্ছে। একের পর এক জঘন্যতম গালিগুলি দিয়ে যাচ্ছে সে। আমি চোখ বন্ধ কওে জোরে জোরে গুনতে লাগলাম- ‘ওয়ান টু থ্রি…’

দুইহাতে রিভলভারটা ধরে ছেলেটার দিকে তাক করে রেখেছি। বললাম, ‘বাজে কথা বন্ধ করবি, নয়তো ওপারে পাঠিয়ে দেব এখুনি।’

কাজ হলো না, আরেকদফা গালি দিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসল সে। আমি চট করে একটু ডানে সরে গেলাম, ছেলেটা দেয়ালে ধাক্কা খেল। রিভলভারটা আবার তাক করলাম তার দিকে, চোখ বন্ধ করে ট্রিগার চেপে ধরলাম জীবনের প্রথমবারের মতো। আমার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। নার্ভাসনেস কাজ করছে আমার মধ্যে। হো হো করে হেসে উঠল ছেলেটা। আমি খেয়াল করলাম, গুলি লোড করা হয়নি। আমি গুলি লোড করতে লেগে গেলাম। দেখতে পেলাম, সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় দিকে চলে গেলো সে।

শিকারের নাগাল পেতে আমিও শিকারের পিছু নিলাম। দোতলায় এসে স্লাইড ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেলাম জায়গাটা একটা অফিসের মতো বানিয়ে রাখা হয়েছে। কতগুলো টেবিল সারিবদ্ধভাবে রাখা, সেগুলোর উপর একটি করে কম্পিউটার এবং পাশে বিভিন্ন ধরনের ফাইল।

শিকারকে কয়েক টেবিল দূরে একটা টেবিলের সামনে উপুড় হয়ে থাকতে দেখতে পেলাম, কিছু একটা খুঁজছে সে। আমি দৌড়ে কাছে গেলাম। দুর্দান্ত গতিতে ঘুরে দাঁড়াল সে, অসাধারণ রিফ্লেক্স তার। আমি বললাম, ‘ভালোয় ভালোয় বলে দে, কোথায় কী আছে…’ শেষ করতে পারলাম না কথাটা, আগের কয়েকবারের মতোই বিশ্রী গালি শুনতে হলো। আমি ক্ষিপ্র গতিতে হাত চালালাম শিকারের গাল বরাবর, ধপ করে একটা শব্দ হলো, মোটামুটি উচ্চ আওয়াজেই। গালে হাত চেপে বসে পড়ল যুবক।

কয়েক সেকেন্ড পর উঠে দাঁড়াল। আচমকা আমার উরুতে লাথি হাঁকাল। লাথির তেজ সামলাতে না পেরে পড়ে গেলাম আমি, ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলাম।

শিকার আবারো ‘জিনিস’ খুঁজতে লেগে গেছে। আমার হাতে তখনও রিভলভারটা শক্ত করে ধরা। হয়ত এখন টের পায়নি বা খেয়াল করেনি, এটা যে আমার হাতে আছে। নয়ত এতক্ষণে সে এটা দখল করার চেষ্টা করত।

আমি বুঝতে পারলাম এরা মারবে, নয়ত মরবে, কিন্তু কোনো রকম তথ্য অন্যের হাতে দেবে না। আমাকে বেঁচে থাকতে হলে একে কিছু একটা করতে হবে। সময় খুব কম, যা করার এখনই সময়। কখন কী হয়ে যায়, বলা তো যায় না।

আমি মেঝেতে শুয়ে থেকেই রিভলভারটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরলাম। সে আমার দিকে তার পশ্চাৎদেশ ফিরিয়ে রেখেছে বলে আমার কার্যকলাপ দেখতে পেল না। ট্রিগার চেপে ধরলাম আমি। গুলি আগেই লোড করা ছিল। বিকট আওয়াজে বেরিয়ে গেল গুলি, আমার হাত একটু কেঁপে উঠল, রাতের নীরবতা খান খান হয়ে একটুর জন্যে সরব হয়ে উঠল বোধহয়। শিকারের পিঠে গিয়ে বিঁধেছে গুলিটা, কাটা কলাগাছের মতো ধপাস করে পড়ে গেল সে।

আমি কাছে গিয়ে তার বুক বরাবর আরেকটা গুলি চালালাম, বার দুয়েক গোঙানোর মতো শব্দ করে চিরতরে নীরব হয়ে গেল সে। মানে, আমি কিছুসময়ের ব্যবধানে দু-দুটো মানুষকে খুন করলাম!

আমি আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে পেলাম না। কিছুটা অবাক হলাম, এতকিছু ঘটে যাওয়ার পরেও কেউ টের পায়নি!

যাই হোক, আমাকে এখানে দাঁড়িয়ে থাকা চলবে না। হয়ত এই বিল্ডিংয়ের বাইরে গিয়ে কোনো নিরাপদ স্থানে দাঁড়াতে হবে, নয়ত এখানেই কোথাও লুকিয়ে পড়তে হবে।

দোতলায় এলোমেলোভাবে কিছুক্ষণ ছুটোছুটি করার পর একটা ব্যালকনির দেখা পেলাম, তবে থাইগ্লাসে চারদিক আটকে ফেলা হয়েছে, গ্লাস ঠেলে দিলে অবশ্যি সুন্দরভাবেই রাস্তা দেখা যায়।

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দুয়েকটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করতে অন্য কোথাও ছুটে যাচ্ছে। গলির মুখে ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলো, রাতের আকাশে রুপোর থালার মতো চাঁদ আর কালো কালো মেঘ- এক কথায় চমৎকার। এ রকম একটা সময়ে, এ রকম একটা জায়গায় এক মগ ধোঁয়া ওঠা কফি পেলে মন্দ হত না!

আয়েশি চিন্তা ঝেড়ে ফেললাম। আমার ওসবের সময় নেই। প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে সবসময়ই ডায়াল লিস্টের উপরের দিকে থাকা একটা নম্বরে কল দিলাম।

 

চার.

ফারাজ তার গল্পবলা শেষ করল। আমি বললাম, ‘পিঁপড়ার গর্তে পা দিলি কই? যেটা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন বাসায় চলে গেলেই তো হয়। কেউ তো আর আটকায়নি, দেখেওনি! সহজ জিনিসটা এতো কঠিন করে দেখার কী আছে?’

জবাবে ফারাজ যা বলল, আমি আর দ্বিতীয় কোনো শব্দ করতে পারলাম না।

সে বলেছে, ‘এসব ক্যাডার দেখে ভীত হওয়ার লোক আমি নই, অন্যায় দেখে চুপ করে সয়ে যাব কেন? আমি যদি টের না পেতাম, কেউ কি জানত যে একটা মেয়ে কিডন্যাপ হয়েছে? আমি অকর্মা হতে পারি, কিন্তু কাপুরুষ নই। তোকে আসতে বলেছি কারণ, আমি জানি তুই সাহসী ছেলে, চুপচাপ থাকিস ঠিক। তবে, কাজের সময় অ্যাকটিভ। ভেতরে ঢুকতে ইচ্ছে না করলে চলে যা, আমি একাই পারব।’

কতক্ষু চুপ করে থেকে ফারাজকে বললাম, দেরি করে লাভ নেই, যেহেতু ভেতরে আমরা যাচ্ছিই, আগেভাগেই ঢুকি।’

‘ভেতরে যাওয়ার আগে আত্মরক্ষার জন্য হলেও দুয়েকটা অস্ত্র দরকার, আমার হাতে কয়েক রাউন্ড গুলিসহ রিভলভার আছে, তুই এক কাজ কর, এই ছুরিটা নিয়ে নে সাথে। কাজে লাগতে পারে।’ বলেই মৃতদেহের বুকে বিঁধে থাকা ছুরিটার দিকে ইঙ্গিত করল ফারাজ।

আমি একটু ইতস্তত করে ছুরিটা হাতে তুলে নিলাম। ফারাজ হাঁটছে, ওর পিছু পিছু আমিও। আবারো কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে উঠল, সে কি কিছু বলতে চায়?

বিল্ডিংয়ের সামনে এসেই দাঁড়িয়ে গেলাম। ভেতর থেকে মানুষের কথাবার্তার আওয়াজ পাওয়া গেল। ভেতরে ঢুকব কি-না ভাবছি। আন্দাজ করলাম এখানে তিনজনের বেশি নেই, আর আমরা দুইজন। ফাইটে গেলে খুব একটা সমস্যায় পড়তে হবে না। কিন্তু ওদের হাতে ভালো অস্ত্র থাকলে ফ্যাসাদে পড়ে যেতে পারি। অস্ত্রই ফ্যাক্ট, এটাই আমাদের মাঝে পার্থক্য গড়ে দেবে।

ফারাজ ইচ্ছে করেই খুক খুক করে কেশে উঠল। ওপাশে সব নীরব হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গেই। একটু পর গেইটটা খুলে গেল। দুইটা ছেলে এগিয়ে এলো আমাদের দিকে। দেখতে শুনতে- এককথায়, ওভার স্মার্ট। দুজনের মধ্যে তেমন কোনো তফাত নেই, যা দেখে সহজেই চিহ্নিত করা যাবে। চেহারায় তাচ্ছিল্যের চাহুনি, সাথে বিরক্তি আর খানিকটা রাগ। ফারাজ ওদেরকে আরেকটু রাগিয়ে দেয়ার জন্য মুখে অনেক রকম ভঙ্গি কওে ভেংচি কাটা শুরু করল। ফারাজের ঘুটি কাজে লাগল বোধহয়, দুটো ছোকরাই রেগে গেল। একটা ছোটখাটো গালি দিয়ে বলল, ‘বাইচলামি করবি না, এখানে কেন আইছিস?’

‘তোদের কাহিনি দেখতে।’ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ফারাজের জবাব।

‘মানে? বাইচলামি করতে মানা করছি না তোরে?’ সাথে একদম ফ্রিতে দুটো গালি ঝেড়ে দিল ছেলেটা।

দুম করে ছেলেটার নাক বরাবর ঘুষি মেরে বসল ফারাজ। আচমকা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না ছেলেটা। ছেলেটা নাক চেপে দূরে সরে গেল, ফেটে গেছে বোধহয়। অপরজন এগিয়ে এসে মারতে উদ্ধত হলো, সরে গেল ফারাজ। নিজের ভার সামলাতে না পেরে পড়ে গেল ছেলেটা। ফারাজ আমাকে ইশারায় ভেতরে ঢুকে যেতে বলল।

আমি একটু ইতস্তত করলাম, যখন ঢুকতে যাব ঠিক তখনই দেখতে পেলাম, ভেতর থেকে আরো দুইটা ছেলে দৌড়ে আসছে, আমি দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম। পেছনে তাকাতেই দেখি ফারাজ ওই ছেলেটার পকেট থেকে একটা রিভলভার বের করে নিজ পকেটে পুরছে। ছেলেটা কোঁকাচ্ছে, বুঝলাম দুয়েকটা স্পেশাল ফ্লেভারের নাস্তা-পানি পেয়েছে বোধহয়।

আমি সাহস করে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ছেলে দুটোও ততক্ষণে আমার কাছে চলে এসেছে। এরা এরকম অবস্থা দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রিভলভার উঠে এল হাতে পেছন থেকে ফারাজের হুংকার শুনলামÑ ‘একদম জায়গায় শুইয়ে দেব, কিছু হতেই অস্ত্র উঠে আসে কেন হাতে?’

ছেলে দুইটার মনোযোগ এখন ফারাজের দিকে। আমি পেছনে ফিরে দেখলাম, দুই হাতে দুই পিস্তল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিয়াম। একটু একটু করে এগিয়ে আসছে। ফারাজের হাবভাব দেখে ওরা কিছুটা দমে গেছে মনে হলো। আমি সুযোগ কাজে লাগালাম, তীব্রবেগে একটার গায়ে গিয়ে লাফিয়ে পড়লাম, গলায় হাত দিয়ে হ্যাঁচকা টানে ফেলে দিলাম মেঝেতে, পিস্তল ছিটকে পড়ল দূরে।

দ্বিতীয়জনকে দেখলাম আমার দিকে পিস্তল তাক করে আছে। বিদ্যুৎ গতিতে তাকেও ফেলে দিলাম মেঝেতে। তবে আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল খানিকটা, মাটিতে পড়ে গেল বটে, কিন্তু পিস্তলটা বহাল তবিয়তেই রয়ে গেল তার হাতে। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, ফারাজের সাথে সেই ছেলের মোচড়ামুচড়ি চলছে। আমি দৌড়ে গিয়ে প্রথম ছেলের পড়ে থাকা পিস্তলটা তুলে নিলাম। ‘হয়ত মারো, নয়ত মরো’র টাইপ কিছু ছাড়া এখানে আর দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা নেই আমাদের সামনে। দেখতে পেলাম একজন আক্রমণের ভঙ্গিতে উঠে আসছে আমার দিকে, হাতের মুঠোয় পিস্তলটা শক্ত করে ধরলাম। কাছে আসতেই চাদিতে সজোরে আঘাত করলাম। সাথে সাথে জ্ঞান হারাল ছেলেটা।

‘ঠুস…!’ একটা গুলির আওয়াজ হলো। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম ফারাজ ওই ছেলেটাকে গুলি করেছে। কাতরাচ্ছে ছেলেটা। টেনে হিঁচড়ে ছেলেটাকে গেইটের ভেতর নিয়ে এল ফারাজ।

এদিকে আমার সামনে আবার উদয় হলো হাতে পিস্তল ধরে রাখা ছেলেটা, যাকে আমি মাটিতে ফেলে দিয়েও পিস্তলছাড়া করতে পারিনি। আমি তড়িঘড়ি করে ট্রিগার চাপলাম।

একটা বিকট আওয়াজ এবং সাথে সাথেই ধপাস করে পরে যাওয়া একটা দেহ। আমি আর ফারাজ পূর্ণ মনোযোগে তাকিয়ে আছি সেদিকে।

আপাতত কেউ নেই সামনে, সবাইকেই মোটামুটি কিছু উত্তম-মধ্যম বিতরণ করা হয়েছে। তার মাঝে দুইজন ইহজনম ত্যাগ করেছে এরই মধ্যে।

ফারাজ আমাকে নিয়ে দোতলায় চলে এলো, কেউ নেই, ফাঁকা। তিন তলায় গেলাম, একই অবস্থা। হঠাৎ টের পেলাম পুরো বিল্ডিংয়ে অভিনব ধরনের একটা অ্যালার্ম বাজছে। খুব টেনে টেনে ‘ট্যাঁও ট্যাঁও’ ধরনের একটা শব্দ। পুরোটা বিল্ডিংয়ে কেমন যেন থমথমে অবস্থা বিরাজমান। ফারাজ আমাকে সাবধান হতে বলল।

উপর থেকে চার-পাঁচজন মানুষের নেমে আসার আওয়াজ পেলাম। স্পষ্টই টের পাওয়া গেল, তারা ভারি অস্ত্রে সজ্জিত। আমি কিছুটা ভড়কে গেলেও দেখলাম ফারাজ খুব স্বাভাবিকভাবেই দাঁড়িয়ে আছে।

চার-পাঁচ মিনিট ওই রকমই চলল, বুকের ধুকপুকানি বাড়তে লাগল। ফারাজ উপর দিকে এক রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে নিজেদের অবস্থান জানান দিল। সঙ্গেই রণক্ষেত্রে পরিণত হলো জায়গাটা। মুহুর্মুহু আক্রমণ আসছে উপর থেকে, ফারাজ আর আমি তিন তলায় ভেতরে ঢুকে পিলারের আড়ালে চলে গেছি।

আমাদের এপাশ থেকে কেনো রকম আক্রমণ না হওয়ায় ওরা আরো দ্বন্দ্বে পড়ে গেল। সামনাসামনি আসবে কি-না সেটা নিয়ে কনফিউজড ওরা।

ধুম ধুম শব্দে উপর থেকে গুলি আসতে লাগল। আমরা আক্রান্তস্থল থেকে বেশ দূরে থাকায় আমাদের কোনো ক্ষতি হলো না। কালো ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধে টেকা দায়। চোখ জ্বালা করতে লাগলো আমাদের।

হঠাৎ পুলিশের গাড়ির সাইরেন বাজার আওয়াজ শুনতে পেলাম। তার দুয়েক মিনিট বাদেই শুনতে পেলাম গোলাগুলি থেমে গেছে, উপর থেকে হ্যান্ড মাইকে বলা হচ্ছে ‘অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করো, বেঁচে যাবে। নয়ত নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হবে।’

নিচের চোয়াল ঝুলে পড়ল আমার। বলে কি! কী হচ্ছে কিছুই ভেবে পেলাম না। ফারাজ আর আমি একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলাম।

আচ্ছা, পুলিশের গাড়ি বিল্ডিংয়ের নিচ থেকে আওয়াজ করল, এতো তাড়াতাড়ি তারা উপরে চলে গেল এবং মাইকে ডাকতে লাগল? তাছাড়া, এরা কী দেখে কী বুঝল? বা, গভীর রাতে এরা খোঁজ পেলই বা কিভাবে?

কিছু প্রশ্ন আমার মাথায় এসে জমা হতে লাগল।

থেমে থেমে গুলি, আবার হ্যান্ডমাইকে সারেন্ডারের জন্য বলা দুটোই সমানতালে হচ্ছে। একটু একটু করে সামনে এগিয়ে আসছে পুলিশ।

আমরা তিন তলার যেই পিলারের পেছনে আছি, হয়ত খুঁজে খুঁজে একটু পর এখানেও চলে আসবে। চরম উৎকণ্ঠার সাথে ঢোক গিলছি আমি।

 

পাঁচ.

আমি আর ফারাজ বড় একটা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। টেবিলের উপর অনেক ধরণের অস্ত্র আর কিছু বই রাখা। আমাদের গলায় ছোট সাইজের একটা করে প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে বড় করে আমাদের নাম লেখা, নিচে ব্রাকেটের ভেতর একটু ছোট করে বয়স লেখা সংখ্যায়।

সারারাত না ঘুমানোর ফলে চোখগুলি আর মেলে রাখা যাচ্ছে না, আয়নায় চেহারার অবস্থা দেখতে পারলে ভালো হত। ফারাজের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওরও একই অবস্থা।

আমাদের সাথে টেবিলের সামনে আরো একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, গলায় ঝুলানো প্ল্যাকার্ড দেখে জানতে পারলাম, ওর নাম নার্গিস। আমাদের মতোই বয়স।

অনেক সাংবাদিক দেখতে পেলাম। হুলস্থূল কাণ্ড ঘটিয়ে ছবি তোলা হচ্ছে, ভিডিও করা হচ্ছে। আমরা মাথা নিচু করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছি, নট নড়নচড়ন।

পরদিন পত্রিকাগুলোতে চটকদার খবর। প্রথম পৃষ্ঠায় লালকালিতে বড় বড় করে লেখা ‘অপারেশন বোল্ড আউট’, ‘গভীর রাতে দুধর্ষ কয়েকজন জঙ্গি গ্রেফতার’ ইত্যাদি।

 

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১