এক.
সুলতান সুলাইমান আল-কানুনি। উসমানি খেলাফতের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী শাসক। একাধারে ৪৫ বছর খলিফা ছিলেন। ইউরোপের ক্রুসেডারদের জন্য ছিলেন সাক্ষাত যমদূত। তার খেলাফতকালেই ইউরোপে উসমানি খেলাফাতের সীমানা সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত হয়েছিল। ছিলেন আল্লাহওয়ালা। বীর মুজাহিদ। ন্যায়পরায়ণ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের সাথে যাঁর সম্পর্ক ছিলো গভীর।
একদিন সুলতান সুলাইমান আল-কানুনি ঘুমোচ্ছিলেন। স্বপ্নে কলিজার টুকরো নবিজি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে দেখলেন, তিনি তাঁকে একটি বড় মসজিদ নির্মাণের আদেশ করছেন। সাথে এই ভবিষ্যদ্বাণীও করছেন যে, মসজিদটি কেয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী হবে এবং তাতে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হবে।
সুলতান সুলাইমান আল-কানুনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত সুসংবাদ আর অর্পিত দায়িত্ব নিয়ে ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন। তাঁর পুরো অবয়বজুড়ে আনন্দের ঊর্মিমালা ঢেউ খেলে চলছে। ততক্ষণাৎ তিনি মসজিদ নির্মাণের কাজে লেগে গেলেন। কিছু লোককে তলব করে এনে ইস্তাম্বুলের সবচয়ে উঁচু, দামি ও ভালো জায়গা খুঁজে বের করতে আদেশ করলেন। কার্যত তারা তা-ই করলো। তারা সুলতানের বাতানো গুণানুসারে একটি জায়গা চিহ্নিত করে এসে সুলতানকে অবহিত করলো। সুলতান খেলাফতের বড় মাপের ইঞ্জিনিয়ার ও মিস্ত্রীদের উপস্থিত করলেন। তাদের অন্যতম ছিলেন সিনান আগা।
ইঞ্জিনিয়ার ও মিস্ত্রীদেরকে নিয়ে সুলতান নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখে নিজ দাড়িতে হাত বুলিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলেন আর কী যেন চিন্তা করছিলেন। কোনো টুঁ শব্দ করছেন না। সকলেই তাঁর আশপাশ ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন, কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত সিনান আগা সুলতানের পাশে এসে বললেন, ‘কী এতো ভাবছেন জাহাঁপনা! এখানে মিম্বর হবে, ওখানে মেহরাব, এখানে মাদরাসা, ওখানে কলেজ, এখানে দোকান-পাট, ওখানে পাকঘর, এখানে…’
সুলতান যারপরনাই আশ্চর্য হয়ে গেলেন! জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কিভাবে জানলে যে, আমি এইসব বানানোর নিয়ত করছি?’
সিনান আগা উত্তর দিলেন, ‘জাহাঁপনা! যখন স্বপ্নযোগে সায়্যিদুনা মুহাম্মদ সা. আপনাকে মসজিদ নির্মাণের আদেশ দিচ্ছিলেন এবং সুসংবাদ দিচ্ছিলেন যে, মসজিদটি কেয়ামত অব্দি বাকি থাকবে, তখন আমি আপনার পেছনে দাঁড়ানো ছিলাম। স্বপ্নে আমার কাছেও রাসুল সা. এসেছিলেন এবং আপনাকে যে মসজিদ নির্মাণের আদেশ করেছিলেন, আমাকেও তা নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন।’
সুবহানাল্লাহ! কেমন ছিলেন সুলতান আর সুলতানের প্রধান মিস্ত্রী! কেমন ছিলেন রাজা আর কেমন ছিলো তাঁর প্রজা! আজও তুরষ্কের ইস্তাম্বুলে ‘সুলাইমানিয়্যাহ জামে মসজিদ’ আপন মহিমায় সুলতান সুলাইমান আল-কানুনির স্মৃতি বহন করে কালের সাক্ষী হয়ে আছে। মসজিদটি ইস্তাম্বুলের সবচেয়ে বড় মসজিদ।
দুই
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ জায়নবাদী ইহুদিদের জন্য ছিলেন সাক্ষাত যমদূত। অভিশপ্ত ইহুদিদের প্রতি তাঁর কঠোর নীতির কারণে তাদের জন্য ফিলিস্তিনের মাটিতে পা জমানো মুশকিল ছিলো! সংবিধিবদ্ধ সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে বেঁধে দেয়া দিনেই ফিলিস্তিন ছেড়ে তাদেরকে চলে যেতে হতো।
বিংশ শতাব্দীর শেষ দিককার ফিলিস্তিনের প্রখ্যাত কলামিস্ট ও সাংবাদিক ইউসুফ হান্না আল-ইসি ০৩. ০৯. ১৯১১ তারিখে তাঁর ডায়েরিতে ফিলিস্তিনের ‘হাইফা’র স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে লেখেন-‘ফিলিস্তিনের সমুদ্রবন্দরের কর্মকর্তাদের গায়ে বিশেষ ইউনিফর্ম থাকতো। উসমানি খেলাফত তা বাধ্যতামূলক করেছিলো সমুদ্রপথে আসা ভিনদেশিদেরকে সহজে সনাক্ত করার জন্য।
ফিলিস্তিনে বসবাসের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ইহুদিদের কেউ ‘হাইফা’র সমুদ্রবন্দরে আগমন করলে কর্মকর্তারা তার থেকে তার বৈদেশিক পাসপোর্ট নিয়ে নিতো এবং তাকে তারা একটি ‘লালকার্ড’ ধরিয়ে দিতো। সেই ‘লালকার্ড’ প্রদানের অর্থ এই ছিলো যে, কার্ডপ্রদত্ত ব্যক্তি শর্তযুক্ত ও সাময়িক বসবাসের অনুমতিপ্রাপ্ত। নির্দিষ্ট সময়ের পরপরই ফিলিস্তিন ছেড়ে দিতে হবে। অতঃপর যখন ওই ইহুদির পর্যটন বা প্রয়োজন শেষ হয়ে যেতো এবং ফিরে যাওয়ার জন্য সমুদ্রবন্দরে জাহাজের সিঁড়িতে পা রাখতো, তখন বন্দরের কর্মকর্তারা তার বৈদেশিক পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিতো এবং প্রদত্ত ‘লালকাকার্ড’ ফিরিয়ে নিতো।
ড. মুহাম্মদ ইসা সালিহিয়্যাহ বলেন, ব্রিটেন সরকার ফিলিস্তিনে বসবাসের জন্য ইহুদিদেরকে ‘সাদা কার্ড’ প্রদানের আইন প্রণয়ন করেছিলো। এই ‘সাদাকার্ড’ উসমানিদের ‘লালকার্ড’-এর বিপরীত ছিলো, যা উসমানি প্রশাসন পর্যটক বা আল-আকসা অবলোকনকারী কোনো ইহুদিকে ফিলিস্তিনে তিন মাসের জন্য বসবাসের অনুমতি হিসেবে প্রদান করতো। তিন মাস পর তাকে ফিলিস্তিন ছেড়ে দিতে হতো। কোনো প্রকার বিলম্ব বা বসতি স্থাপনের মোটেই সুযোগ ছিলো না। আর ব্রিটেন সরকার ইহুদিদেরকে এই ‘সাদাকার্ড’ ফিলিস্তিনে চলে আসার এবং বসতি স্থাপনের জন্য প্রদান করতো।
[ইতিহাসের দুই টুকরো খবর। একটি লালকার্ডের অপরটি সাদাকার্ডের। লালকার্ডেরটি ছিলো উসমানি খেলাফতের সময়কার, আর সাদাকার্ডেরটি হলো উসমানি খেলাফত বিলুপ্ত হবার পর। লালকার্ডের সাথে মুসলিম উম্মাহর ইজ্জত, শৌর্য-বীর্য ও প্রতাপের সম্পর্ক আর সাদাকার্ডের সাথে মসলিম উম্মাহর অপমান, অধঃপতন ও দুর্বলতার সম্পর্ক। আজকের আল-আকসা ও ফিলিস্তিনিদের অসহায়ত্বই এর জ্বলন্ত প্রমাণ।]
তিন
কোনো রণক্ষেত্র থেকে যখন প্লাটুনের পর প্লাটুন আহত সৈন্য ইস্তাম্বুলে আগমন করত, তখন সুলতান আবদুল হামিদ তাদেরকে রাজপ্রাসাদের প্রশস্ত আঙিনায় পাঠিয়ে দিতেন। সেখানেই তাদের চিকিৎসা চলতো। সুলতান প্রাসাদের খাদেমা এমনকি উসমানি সম্রাজ্ঞীদের পর্যন্ত যুদ্ধাহত সৈন্যদেও ছেঁড়াফাঁড়া কাপড় সেলাই করার জন্য আদেশ করতেন। সময় পেলে তিনি নিজেও তাদের সাথে ভাঙা হাড়গোড় জোড়া লাগানোর জন্য লাকড়ির খাটিয়া বানানোর কাজে শরিক হয়ে তা আহতদের কাছে পৌঁছিয়ে দিতেন। সময়ে সময়ে আহতদের খোঁজখবর নিতেন। তাদের সমবেদনা জ্ঞাপন করতেন।
যখনই কোনো যুদ্ধ-ময়দান থেকে বিজয়ের সুসংবাদ আসতো, সাথে সাথে সেজদা করার জন্য মাটিতে লুটিয়ে পড়তেন। এরপর দাঁড়াতেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, আগামীতেও যেন তিনি তাঁর সেনা-সন্তানদের বিজয় দান করেন ও উম্মতে মুহাম্মদির সাহায্য করেন।
তাঁর নিত্ত-নৈমিত্তিক অভ্যাস ছিলো, তিনি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়েই গোসল করতেন। ফজরের সালাত আদায় করতেন। সালাত শেষ হতে না হতেই স্ত্রী কফির কাপ নিয়ে এসে হাজির। তিনি কফি পান করতেন। পান শেষ হয়ে গেলে কাপটা রেখে স্ত্রীর হাতখানা ধরতেন। এক উষ্ণ টানে হাতের ঘ্রাণ শুঁকার পাশাপাশি হাতে চুমু খেতেন। বলতেন, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
এভাবে একদিন কফি পান করা অবস্থায় সুলতান আবদুল হামিদ এই দুনিয়া ত্যাগ করেন। তার সর্বশেষ কথা ছিলো- ‘ইয়া আল্লাহ!’
চার
সুলতান প্রথম সালিম। সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদের সুযোগ্য সন্তান। ৮৭৪ হিজরি মোতাবেক ১৪৭০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। উসমানি খেলাফতের একজন আল্লাহঅলা, নিভৃতচারী, বিনয়ী শাসক। আবার তাঁর শক্তি, সাহস ও বীরত্বের জন্য লোকেরা তাঁকে ‘মারকুটে শাসক’ বলে ডাকতো। ইউরোপের ক্রুসেডার ও ইরানের শিয়া বাদশাহ ইসমাইল সাফাভির জন্য ছিলেন সাক্ষাত আজরাইল। তিনিই সর্বপ্রথম হিজাজকে উসমানি খেলাফাতের অন্তর্ভুক্ত করে গোটা মুসলিম বিশ্বকে একটি পতাকার নিচে একীভূত করেন।
উসমানি খেলাফতের মসনদে সমাসীন হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সুলতান প্রথম সালিমের নাম খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মুসলিম বিশ্বের দিকে দিকে। জামে মসজিদের খতিবগণ জুমার খুতবায় তাঁর নাম ‘হাকিমুল হারামাইন’ বলে উচ্চারণ করতে শুরু করলেন। কিন্তু সুলতান প্রথম সালিম এই উপাধি পছন্দ করতেন না।
একদিন তিনি সিরিয়ার আলেপ্পো বড় মসজিদে জুমার নামাজ পড়ছিলেন। খুতবার মধ্যে খতিব সাহেব তাঁর নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে ‘হাকিমুল হারামাইন’ উপাধি লাগিয়ে উচ্চারণ করলেন। উপাধিটা শুনতেই সুলতানের গা শিউরে উঠলো। তিনি শশব্যস্ত কণ্ঠে প্রতিবাদ করে উঠলেন- না! না! আমি ‘হাকিমুল হারামাইন’ নই, বরং ‘খাদিমুল হারামাইন।’ সাথে সাথে খতিব সাহেব ভুল শুধরে পুনরায় সুলতানের নির্দেশিত উপাধিটা উচ্চারণ করলেন। নামাজ শেষে সুলতান তাঁর পরিধেয় ‘কুফতান’ (দামি সুতার পাতলা ফিনফিনে কাপড়, যার সামনাংশ খোলা থাকে এবং যার উপর জুব্বা পরা হয়) পোশাকটি খতিব সাহেবকে শোকরানা হিসেবে হাদিয়া দেন। ইতিহাস আবারও প্রত্যক্ষ করে একজন উসমানি সুলতানের নবিপ্রেম। রাসুলের শায়িত মাটির প্রতি এক বিনম্র শ্রদ্ধা।
উল্লেখ্য, তখনকার খাদিমুল হারামাইনরা ছিলেন মুসলমানদের জানের দুশমন পশ্চিমা ক্রুসেডার, জায়নবাদী ইহুদি ও শিয়াদের মৃত্যুদূত। আর আজকের খাদিমুল হারামাইনরা হলেন এদের পরম বন্ধু। বরং সেবাদাস!
পাঁচ
* উসমানি খেলাফতের যুগে কোনো ঘরে যখন কোনো মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত হতো, তখন সে ঘরের সামনে লালগোলাপ রাখা হতো। যাতে করে বুঝা যায়, এই ঘরে বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে আছে। ফলে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে অনায়াসেই সেখানে যাওয়া যেতো। অনেক সময় ঘরের মধ্যে বিয়ের উপযুক্ত মেয়ের সংখ্যানুসারে লালগোলাপ সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হতো।
* বিয়ের আগের রাতে এলাকার দাদি, নানি, চাচি, ফুফু, ভাবী এবং সখীরা কনেকে মেহেদি পরানোর জন্য ঘিরে বসতো। এ-রাতকে মেহেদি রাত বলা হতো। একসাথে সবাই সুর মিলিয়ে ধরতো মন চৌচির করা গীতি। এ গীতি আনন্দের নয়, বিরহের। কেঁদে কেটে বুক ভাসাতো সবাই। এজন্য এ রাতকে ‘অশ্রুঝরার রাত’-ও বলা হতো। সর্বপ্রথম কনের মা একটি স্বর্ণমুদ্রার উপর কিছুটা মেহেদি নিয়ে আগে বেড়ে মেয়ের হাতের তালুতে গোল বৃত্তাকারে পরিয়ে দিতেন, অতঃপর অন্যান্যরা হাতের সব আঙুলের অগ্রভাগে মেহেদি ভরিয়ে দিতো।
* বিয়ের পর ভালোবাসার সুবাস উপভোগ করতে স্বামী নবপরিডুতা স্ত্রীকে নিয়ে ঘরের সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠতো। ওঠার সময় স্বামী থাকত পেছনে আর স্ত্রী আগে আগে। যাতে পা পিছলে পড়তে গেলে খপ করে ধরে নিতে পারে স্বামী! আর নামার বেলায় আগে নামত স্বামী, যাতে স্ত্রী আগের দিকে ঝুঁকে পড়তে গেলে স্বামী সামলে নিতে পারে! স্ত্রীও নির্ভয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতো বা নামতো, এই ভরসায় যে, প্রাণপ্রিয় পতি আছে যে পাশে!

