একটা সময় ছিল যখন বই কিনতে গেলে ওপার বাংলার শরৎরাই ছিল বাঙালির ভরসা। নিজের দেশের লেখকের বই পড়ার সৌভাগ্য তাদের ছিল না। তখন কেবল হাতেগোনা দু’চারজন লেখকের জন্ম হয়েছিল এদেশে। কিন্তু তারপর দিন বদলেছে। বিশ্বসাহিত্যে বাংলাদেশও একটা স্থান দখল করে নিয়েছে। একে একে মুজতবা আলী, ওয়ালীউল্লাহ, আহমাদ ছফা, জহির রায়হান, হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখক তৈরি হয়েছে। সে যাত্রা থেমে নেই। বরং অপ্রতিরোধ্য গতিতে প্রতিশ্রুতিশীল লেখকের তালিকা দিনকে দিন দীর্ঘ হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে নারীও একেবারে পিছিয়ে নেই। বাংলাভাষায় প্রথম নারী সাপ্তাহিক ‘বেগম’ ১৯৪৭ সালে কলকাতায় প্রকাশিত হয়। তারপর ১৯৫০ সালে ঢাকায় এর কার্যালয় স্থানান্তরিত হয়। বেগম সুফিয়া কামাল আর নূরজাহান বেগমের হাত ধরে তৈরি হয় শত নারী লেখকের। ১৯৪৭ সালে ‘বেগম’-এর প্রথম ঈদ সংখ্যায় ৬২ জন নারী লেখকের লেখা ছাপা হয়েছিল। ৪০-এর দশকের রক্ষণশীল সমাজের দিকে তাকালে নারীদের এ পদচারণা ছিল বিস্ময়কর। ধীরে ধীরে রক্ষণশীল সমাজের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু নারী লেখকদের ভোগান্তি বেড়েছে বৈ কমেনি। নানান চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজকের সমাজ নারীদের মাধ্যমিক পার করে ইউনিভার্সিটিতে ঢোকার অনুমতি দিয়েছে বটে, কিন্তু লেখালেখি বা এ ধরনের অন্য কোনো সৃজনশীল কাজের অনুমতি কিংবা সুযোগ তাদের নেই। পুরুষতান্ত্রিক এ সমাজের মতে, নারীর কাজ কেবল রান্নাবান্না করা, বাচ্চা প্রতিপালন করা, সংসার নিয়ে পড়ে থাকা। এর বাইরে কিছু করতে গেলেই অগ্নিদৃষ্টি আর শরভাষা নিয়ে হামলে পড়ে তারা। শুধু তাই-ই না, নারীরাও নারীদের শত্রু। পুরুষরা তাদের মগজ এভাবেই ধোলাই করে দিয়েছে যে, তুমি যেমন রান্নাঘরের বাইরে কোনো কাজ করবে না, তেমনি অন্য নারীরাও করবে না। এ কারণে দুর্ভাগ্যবশত পুরুষের পাশাপাশি নারীদের স্লোগানও স্বলিঙ্গের বিরুদ্ধেই।
এ ধরনের বিকৃত মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি, প্রয়োজনের দাবি। কারণ, নারীজীবনের সঠিক রূপ পুরুষের কলমে উঠে আসা সম্ভব নয়। একজন নারীই পারে নারীর সুবিধা-অসুবিধা, প্রয়োজনের কথা বুঝতে, বলতে। এছাড়াও সুস্থ ধারার নারী সাহিত্যিক যতো বৃদ্ধি পাবে, তসলিমা নাসরিনরা ততোই কমতে থাকবে।
‘সাহিত্যের অপর নাম অশ্লীলতা’ এ বিশ্বাস থেকে জনসাধারণকে মুক্ত করতে সুস্থ ধারার লেখকদের বিকল্প নেই। আশার কথা এই যে, এতো প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও বর্তমানে নারী লেখকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। মার্জিত রুচিশীল লেখকের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি লেখিকার সংখ্যাও বাড়ছে।
আমাদের কওমি অঙ্গন থেকেও এ ব্যাপারে যথেষ্ট সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। প্রয়োজন আজ আলেমসমাজের চোখ খুলে দিয়েছে। তাই এখন মাদরাসাগুলোতে সাহিত্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। অনেক মহিলা মাদরাসায়ও সাহিত্য জলসা হচ্ছে। কওমি ছেলেদের পাশাপাশি কওমির মেয়েরাও লেখালেখি করছে, বই বের করছে, নিজেদের সম্পাদিত পত্রিকা নিজেরাই বের করছে। এটা সাহিত্যজগতের যেমন বিশাল প্রাপ্তি, তেমনি কওমি ইতিহাসেরও নতুন এক অধ্যায়।
সাহিত্য মানে যে শুধু মনগড়া গল্প-উপন্যাসই নয়, বরং কুরআনের বাণী, হাদিসের কথা, ইতিহাসের ঘটনাও যে সাহিত্যিকের কলম থেকে বের হতে পারে-এ অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্তও কওমি ছেলেমেয়েরা স্থাপন করে দিয়েছে। কুরআন-হাদিসের কথাকে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম কিংবা আকাবিরদের জীবনকাহিনিকে ‘রসকষহীন’ বলে যে আধুনিক সমাজ প্রায় ছুঁড়ে ফেলেছিল, সেই গৌরবোজ্জ্বল কাহিনিগুলোকে শিল্পের আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলে ম্যাংগো জুসের মতো আধুনিক সমাজকে তারা গিলিয়ে দিচ্ছে। মুজাহিদিন আর শহিদানের বীরত্বগাথা উপাখ্যানকে ভিন্নরূপে, ভিন্নভাষায় উপস্থাপন করে তারা অধুনাদের পড়িয়ে ছাড়ছে। ১৪০০ বছর আগের ‘জৌলুসহীন’ সমাজের মহিলা সাহাবিদের জীবনকাহিনি গল্প-উপন্যাসের আদলে নতুন পদ্ধতিতে লিখে কলেজ-ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের পড়তে বাধ্য করছে। এতে ইসলামের সুমহান সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত ইসলামবিমুখ ছেলেমেয়েরা ইসলামের আসল সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারছে। ইসলামি সমাজব্যবস্থাকে ‘ব্যাকডেটেড’ বলার সুযোগও তারা হারাচ্ছে। কওমি ছেলেমেয়েদের এ অবদান কেবল সমাজেরই নয়, বরং ইসলামের জন্যও নতুন এক অধ্যায়ের দরোজা খুলে দিয়েছে, বিপুল সম্ভাবনার পথ দেখিয়ে দিয়েছে।
অতীতে এক সময় মসির চেয়ে অসিরই জয়-জয়কার ছিল। কিন্তু এখন সময়ের পরিবর্তন ঘটেছে, সামাজিক দাবি-চাওয়ারও সংস্করণ হয়েছে। ‘কলম’ই শিক্ষিত এ সমাজের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তাই এ কলমের কালি শুকিয়ে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। সুস্থধারার পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও সক্রিয় হতে হবে। কলমের মাধ্যমে নারীদের সঠিক অধিকার বাস্তবায়ন করতে হবে। নির্যাতিত নারীদের কথা কলমের সাহায্যে সুধীজনকে জানাতে হবে। আইনের চোখ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে। সর্বোপরি ইসলামের শিক্ষা, উৎকৃষ্ট, শ্রেষ্ঠত্ব সর্বসাধারণের কাছে তুলে ধরতে হবে।
নারীর কলমকে চলমান রাখতে সহায়তা করতে হবে পুরুষকেই। নারী যেমন ঘরকন্নার কাজ করবে, তেমনি সে লেখালেখির কাজও করবে। একটি পুরুষ যেমন চাকরির পাশাপাশি লেখালেখি করারও সুযোগ পায়, তেমনি নারীদেরকেও চামচ আর কলম একসাথে নাড়ানোর সুব্যবস্থা করতে হবে। নারী যদি ২৪ ঘণ্টার ২ ঘণ্টাও বই-খাতা-কলম নিয়ে বসার সুযোগ পায়, তাহলে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, সে অনেক কিছুই করতে পারবে। কলুষিত এই সমাজের চেহারা বদলে দিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারবে। নারীর সে যোগ্যতা আছে।
‘ঘরের মহিলা বই-খাতা নিয়ে বসলে ঘর-সংসারের ক্ষতি হবে’-এ ধরনের চিন্তাধারা জিইয়ে রাখলে আপনি যে কেবল বোকার স্বর্গেই বাস করছেন তা নয়, বরং আপনার নির্বুদ্ধিতা আর গোঁড়ামির কারণে ইসলাম এবং সমাজেরও বিরাট ক্ষতি করছেন। মেরে ফেলছেন জীবন্ত এক সম্ভাবনাকে।
আজ পুরুষ-নারী নির্বিশেষে সবার চোখ মেলার সময় এসেছে। সময় এসেছে আলো ঝলমল উজ্জ্বল পৃথিবীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের। এ পথে এগিয়ে আসতে হবে সকলকে।
সবশেষে নারীর কলমের অগ্রযাত্রা শুভ হোক। পিছু হটুক সকল কালো ছায়া।

