ব্রিকলেনের ছেলে

সংখ্যা:

মূল : ফাররুখ ধন্ডি

তরজমা : সালমান আহমদ

[ব্রিটিশ কথাশিল্পী ফাররুখ ধন্ডির জন্ম ১৯৪৪ সালে ভারতের পুনে শহরে। ধন্ডি ব্রিটিশ টিভি চ্যানেল ফোর-এর কমিশনিং অ্যাডিটর হিসেবে ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত কাজ করেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা মিরা নায়ার, শেখর কাপুর, মিরা সায়ালসহ অনেকেরই শুরুর দিকের কাজের নির্মাণ ও প্রযোজনার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ টেলিভিশনের জন্যও লিখেছেন প্রচুর কমেডি ও ড্রামা। এ গল্পটি তাঁর ‘কিস মিস ক্যারল’ গল্পের অনুবাদ।]

 

জলিল জানে স্কুল থেকে ফিরে বাবাকে ঘরে পাওয়া যাবে না। তার বাবা মিস্টার মিয়া সাধারণত সন্ধ্যা সাতটার দিকে ঘরে ফেরেন। মাঝেমধ্যে আটটাও বেজে যায়। তিনি একটি টেইলরিং ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। ঘরে ফিরেই মাগরিবের নামাজ পড়েন। যদিও ইংল্যান্ডে সূর্যাস্তটা মাগরিবের কয়েক ঘন্টা আগেই হয়ে যায়। মিস্টার মিয়া যখন মাগরিব আদায় করেন, তখন আর ওয়াক্ত থাকে না।

মিস্টার মিয়ার নামাজের পরের কাজগুলো ঘরের সবাই জানে। মাগরিবের নামাজ পড়ে তিনি একটি টুলের উপর বসবেন। তারপর জলিলকে ডেকে তার স্কুলের খবরান্ত নেবেন, তার স্কুলব্যাগ খুলবেন, একটার পর একটা পাতা উল্টাবেন বইয়ের। জলিল জানে তার বাবা ভালো ইংলিশ জানেন না। কিন্তু দিনের পর দিন তাকে বাবার এইসব কর্মকাণ্ড দেখতে হয়। নতুন স্কুলে যাওয়ার পর বাবার এসব ভডুতা আরও বেড়েছে।

জলিল আজ মিস ইনগ্রামের একটি চিঠি নিয়ে এসেছে। চিঠিটি বাবাকে দেওয়ার কোনো ইচ্ছা জলিলের ছিলো না। চিঠির উপর মিস ইনগ্রাম লিখেছেন, ‘টু মিস্টার এন্ড মিসেস মিয়া।’

চিঠিটি যখন মিস্টার মিয়ার হাতে পড়লো, তিনি ভাবলেন নিশ্চয়ই স্কুল থেকে জলিলের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ এসেছে। তিনি চিঠিটি বাতির সামনে মেলে ধরলেন।

‘পড়ো! পড়ো!’ মিস্টার মিয়া গর্জে উঠে জলিলকে চিঠি পড়তে নির্দেশ দিলেন। মুখ ভেংচিয়ে বললেন, ‘এবার তাইলে পাপ বালিগ হইছে! হু।’

কিন্তু চিঠিতে কোনো অভিযোগের কথা লেখা ছিলো না। এটি ছিলো ক্রিসমাস কনসার্টের জন্যে স্কুলের পক্ষ থেকে সব অভিভাবকদের উদ্দেশে একটি দাওয়াতপত্র।

চিঠিটি জলিলের হাতে দিয়ে মিস ইনগ্রাম বলেছিলেন, ‘তোমার আব্বু-আম্মুকে এটা পড়ে শোনাবে। কেমন? তারা যেন ওইদিন সন্ধ্যায় কনসার্টে আসেন, তুমি তাদের রাজি করাবে, ঠিক আছে?’

জলিল মাথা নাড়লো।

মিস ইনগ্রাম বললেন, ‘তোমার আব্বু-আম্মু তোমাকে নিয়ে অনেক গর্ব করেন, তাই না জলিল? তুমি ভালো ইংলিশ বলতে পারো, এ জন্যে তারা খুবই হ্যাপি, তাই না?’

জলিল কোনো কথা বললো না।

মিস ইনগ্রাম বললেন, ‘আচ্ছা, যে শার্ট পরে তুমি নাটকে অভিনয় করবে, তাতে তালি লাগিয়ে দিতে তোমার মাকে বলেছো তো?’

‘হ্যাঁ, আমি ওটা কাল নিয়ে আসবো ম্যাম।’

জলিলের এই কথাটা সত্যি ছিলো না। সে তার মাকে শার্টে তালি দেওয়ার ব্যাপারে কিছুই বলেনি। এমনকি তার বাবার হাতে ওই চিঠিটি পড়ার আগে সে নাটকের ব্যাপারে কোনো কথাই বলেনি।

মিস ইনগ্রাম তার ইংলিশ ক্লাসে নাটকের পুরো স্ক্রিপ্টটা একবার পড়লেন। তারপর ছাত্ররা এর বিভিন্ন অংশ পড়ল। নাটকটির নাম- ‘এ ক্রিসমাস ক্যারল’।

মিস ইনগ্রাম বললেন, যেসব ছেলেমেয়ে শুদ্ধভাবে এবং ভরাটকন্ঠে কথা বলতে পারে, তারাই মঞ্চে অভিনয় করার সুযোগ পাবে। জলিল ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর এবং চমৎকারভাবে কথা বলতে পারে। কিন্তু সেই জলিল যখন মুখ ফসকে ক্রিসমাসকে কিস-মিস বলে দেয়, তখন তাকে নিয়ে পুরো ক্লাসে হাসির হল্লা পড়ে। এই সুযোগে হেড মাস্টারও তাকে নিয়ে মজা করতে ছাড়লেন না। তিনি বলেন, ‘মিসকে কিস করা এখন নয় জলিল, তোমাকে ক্রিসমাসের জন্য ওয়েট করতে হবে!’ ক্লাসে আরেক দফা হাসির রোল পড়ে।

এরপর মিস ইনগ্রাম নাটকে সুযোগপ্রাপ্ত নট ও নটীদের তালিকা পড়েন। তারপর তিনি চোখ নাচিয়ে বলেন, ‘নাটকের মূল চরিত্র টাইনি টিমের অভিনয় করবে জলিল।’

স্কুল থেকে ফেরার পথে জলিল ভাবল, নাটকে অভিনয়ের ব্যাপারটি শুনে তার বাবা কী বলবেন কে জানে। তিনি নাটক ফাটক একদমই পছন্দ করেন না। নাটকের কথা শুনে হয়তো বলবেন, আবারও সময় নষ্ট করার পায়তারা!

জলিলের ধারণাটা সত্যি হলো। নাটকের কথা শুনে তার বাবা বললেন, ‘নাটক-ফাটক এগুলা কোনো সময়ই ভালো না।’

তারপর বললেন, ‘ও ভালো কথা, তোমাকে কোন চরিত্র দেওয়া হয়েছে?’

‘টাইনি টিমের চরিত্র।’

‘টাইনি টিম আবার কিগু (কে)?’

‘টাইনি টিম একটি ল্যাংড়া ছেলে।’

একথা শুনে জলিলের বাবা রেগে আগুন হয়ে বললেন, ‘ওই নাটকে আর কোনো বাঙালি ছেলেমেয়ে কি অভিনয় করছে? না তুমি একাই?’

‘না আব্বা, আমাদের পুরো ক্লাসই অভিনয় করছে। মুমতাজ এবং মাহশোভাও অভিনয় করছে।’

‘আমার মনে হয় ওই দুটিকেও কোনো ল্যাংড়া অথবা কানার চরিত্র দেওয়া হয়েছে।’ জলিলের বাবা মুখ ভেংচালেন।

‘না আব্বা, ক্রিসমাস নিয়ে এটা খুব ভালো একটা গল্প। ক্রিসমাসে গরিবদের প্রতি কীভাবে দয়া দেখাতে হবে তাই এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।’ জলিল তার বাবাকে বোঝানোর চেষ্টা করে।

‘তোমাকে কিসের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে? দয়ালু না ফকিরের?

‘ফকিরের’- জলিল উত্তর দেয়।

‘আমি তোমাকে ফিটফাট করে বাবু সাজিয়ে স্কুলে পাঠাই, আর তারা তোমাকে ভিক্ষুক বানায়।’ জলিলের বাবা রাগে গজগজ করতে লাগলেন।

‘স্কুলে গিয়ে তোমার মাস্টারনীকে বলবে আল্লাহ তোমাকে দুই পা দিয়েছেন চলাফেরা করার জন্যে। ল্যাংড়া ফকিরের চরিত্রে অভিনয় করার জন্যে নয়। এটা খুবই খারাপ!’ জলিলের বাবা মাথা থেকে টুপি খুলে নিজের টাক মাথা চুলকাতে লাগলেন।

 

দুই

নাটক নিয়ে বাপ-বেটার বাতচিতের ঘটনার এক মাস হয়ে গেছে। এ সময়ে জলিল নাটকের রিহার্সেলে বেশ কয়েকবার অংশগ্রহণ করেছে, কিন্তু সে এ ব্যাপারে তার বাবার কাছে আর কখনও মুখ খোলেনি। সে নাটকের রিহার্সেল বেশ উপভোগ করছে। রিহার্সেলে ক্রাচের উপর ভর দিয়ে হেঁটে অনেক মজাও পেয়েছে। পল এবং রেবেকা তাকে ভালোই সঙ্গ দিয়েছে। নাটকে তারা তার ভাই-বোনের চরিত্রে অভিনয় করবে।

জলিল তার বাবাকে স্কুলের দাওয়াতপত্রটি না দেখানোর ইচ্ছার পেছনে অন্য একটি কারণ ছিলো। যদি অলৌকিকভাবে তার বাবা মত পরিবর্তন করে ফেলেন, আর ওইদিন সন্ধ্যাবেলা তাকে স্কুলে যেতে দেন এবং নাটকে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আপত্তি না করেন। যেদিন অন্যান্য অভিভাবকেরা স্কুলে আসবেন। চিঠি পড়লে তো জলিলের বাবা জেনে যাবেন, তারও কনসার্টে যাওয়ার দাওয়াত আছে। কিন্তু জলিল চায় না, তার বাবা তার স্কুলে আসেন।

শেষবার যখন তিনি স্কুলে এসেছিলেন, তখন তার বেশভূষা ছিলো খুব গেঁয়ো টাইপের। তিনি স্কুলে ঢুকে মাথা থেকে নামাজের টুপিটা খুলে ফেলেন। সাদা ঢিলেঢালা ট্রাউজারের সাথে লম্বা কালো কোটে তাকে বড্ড বেখাপ্পা লাগছিলো। অথচ অন্য ছেলেমেয়েদের বাবা তার বাবার মতো নয়। তারা অনেক ফ্যাশনেবল জ্যাকেট পরে স্কুলে আসে। এমনকি মুমতাজের বাবাও সেদিন স্কুলে স্যুট পরে এলেন। তাকে অনেক তরুণ দেখাচ্ছিলো। তিনি জলিলকে দেখে বললেন, ‘হোলো সনি।’

বাস্তবে জলিল তার বাবাকে নিয়ে লজ্জিত নয়। কিন্তু স্কুল তো অন্য জগত। স্কুলের আঙ্গিনায় তার বাবার সাথে হাঁটতে অনেক অস্বস্তি লাগে। তার বাবা যখন তাকে নিয়ে টিচারের রুমে প্রবেশ করেন এবং সেখানে বসে ভাঙ্গা ইংরেজিতে আবোল-তাবোল কথা বলেন, তখন জলিলের শরমের অন্ত থাকে না।

আজ জলিল স্কুল থেকে হেঁটে হেঁটে ঘরে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলো। আজ সে বাসে চড়বে না। ক্রিসমাস কনসার্টের দাওয়াতপত্রটি তার সাথেই আছে। জলিল একটি পুরাতন বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো, যেটাকে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। বাড়িটি হয়তো পুনরায় নির্মাণ করা হবে। বাড়ির আশেপাশে ঢেউ খেলানো কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া। বাড়িটিকে কংকালের মতো দেখাচ্ছে। কারণ এর জানালার গ্লাসগুলো খুলে নেওয়া হয়েছে।

জলিল লিভারপুল স্ট্রিটে এসে পৌঁছে। সে সতর্কভাবে রাস্তা পার হয়। আজ রাস্তায় অনেক জ্যাম। হাজারো শ্বেতাঙ্গ মানুষ দ্রুত ট্রেন স্টেশনের দিকে ছুটছে। জলিল ভাবলো, ওই শ্বেতাঙ্গ লোকদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তার বাবা বলেছেন- ‘ওরা অনেক ভালো। ওরা কখনও মানুষকে কষ্ট দেয় না’। কিন্তু তার ভাই খলিল বলেছে, কিছু শ্বেতাঙ্গ আছে, কোনো কিছু করতে চাইলে তারা তোমার প্রতি ভ্রুক্ষেপই করবে না। খলিলের কথাটা সত্যি ছিলো। একবার সে স্কুল থেকে ঘরে ফিরছিলো। কয়েকটি শ্বেতাঙ্গ তরুণ একটি বাড়ির ব্যালকনি থেকে তাকে দেখে ফেলে। তারা তাকে লক্ষ করে বাজে কথা বলে হাসাহাসি করতে থাকে। একজন তার মাথায় এক বালতি সাবান মাখানো পানি ফেলে দেয়। জলিল ভিজে একাকার হয়ে ঘরে ফেরে। মা জিজ্ঞেস করেন কী হয়েছে জলিল? সে বলে, ব্রিকলেনের অন্য পাশে খুব বৃষ্টি হয়েছে। তাই ভিজে গেছি। বাইরের জগত সম্পর্কে মার কোনো ধারণা নেই। তিনি কালেভদ্রেও একবার ঘর থেকে বেরোন না।

ব্রিকলেন বাঙালিদের জন্যে নিরাপদ এলাকা। ব্রিকলেন এবং এর রাস্তার মানুষগুলি বাঙালি, পাঞ্জাবী বা ইন্ডিয়ান হবে। অথবা অন্য কোনো জাতের হবে। স্কুল থেকে ফেরার সময় ব্রিকলেনের রাস্তায় কেউ যদি জলিলকে থামায়, জলিল ভাবে, ওই ব্যক্তি হয়তো তার বাবাকে ভালো করে চেনেন অথবা তিনি জলিলের বাবার গ্রাম থেকে এসেছেন। তিনি তাকে ভালো-মন্দ দু-একটি কথা জিজ্ঞেস করেন। ব্রিকলেনে অপরিচিত কেউ কখনও জলিলকে থামায়নি।

জলিল হানুবুরি স্ট্রিট ধরে হাঁটছে। এখান থেকে তার ঘর মাত্র দু’শো গজ দূরে। জলিল দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, দাওয়াতপত্রটি ছিঁড়ে ফেলবে। আর কনসার্টের দিন সে তার বাবাকে বলবে, সে ছবি দেখতে তার ভাইয়ের সাথে বাইরে যাচ্ছে। জলিলের ভাই খলিলের বয়স এখন ষোলো। সে যেকোনো সময় ঘর থেকে বাইরে বেরোতে পারে।

জলিল চিন্তা করলো, সে যদি কিছুদিন পায়ে হেঁটে স্কুলে যায়, তাহলে তার বাসভাড়াটা বেঁচে যাবে। আর টিফিনের সময় সে যদি পটেটো চিপস খাওয়া ছেড়ে দেয়, তাহলে আরও কিছু টাকা বেঁচে যাবে। তাখন খলিলকে ঘুষ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ তার হাতে চলে আসবে। কনসার্টের দিন সে খলিলকে নাজ সিনেমার একটি টিকেট কিনে দিতে পারবে। ওইদিন খলিল চলে যাবে সিনেমা দেখতে আর সে যাবে নাটক করতে স্কুলে। ছবি শেষ হলে খলিল তার জন্যে সিনেমা হলের সামনে অপেক্ষা করবে, তারপর দু’জন এক সঙ্গে ঘরে ফিরবে।

জলিল তার ব্যাগ থেকে খামটি বের করে। চিঠির দিকে তীর দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর ওটাকে ছিঁড়ে কুচি কুচি করে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। তখন তার মনে নাটকের বিখ্যাত সেই ডায়লগটি আসে, ‘গড ব্লেস আস, ওয়ান এন্ড অল।’

জলিলের কাজ শেষ। সে চারদিকে তাকায়। তার নিজেকে ভারমুক্ত মনে হয়। গাধা তার বোঝা ফেলে যেভাবে হালকা হয়, জলিলের নিজেকে সেভাবে হালকা লাগে।

হুম, এখন সবকিছু ঠিক আছে। খলিলকেও সহজে রাজি করানো যাবে। আর সে ডগ মার্কেট থেকে একটি পুরাতন শার্ট কিনে ফেলবে, যেটি নাটকের সময় পরতে হবে। যখন তার বাবা ঘরে থাকবেন না, তখন সে শার্টে একটা তালি লাগিয়ে দিতে পারবে। তাদের ঘরে দুটি সেলাই মেশিন আছে। তার বাবা একজন টেইলার। তার মাও একজন টেইলার। এমনকি তার কলেজপড়–য়া ভাই খলিলও একজন টেইলার। জলিল নিজেও ভালো সেলাই মেশিন চালাতে পারে, যেভাবে সাদা চামড়ার ছেলে-মেয়েরা কাটা চামচ এবং ছুরি দিয়ে খাবার খেতে পারে।

জলিল তার ঘরের দরজার সামনে এসে পৌঁছোয়। সে দরজায় চাবি লাগাতে যাবে এমন সময় ভেতর থেকে খলিলের কণ্ঠ শুনতে পায়। পরক্ষণে বাবার আওয়াজ শোনে। জলিল ঘরে ঢুকে বসার রুমে যায়। সেখানে খলিল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে। খলিল ভান করছে, বাবাকে দেখছে না, কিন্তু আয়নায় ঠিকই সে বাবাকে লক্ষ করছে।

‘আমি যেটা বললাম, তোমাকে সেটা করতে হবে’- বাবা বললেন। খলিল বেশ বিরক্ত হলো কিন্তু কোনো উত্তর দিলো না।

‘আব্বা, আজকে কি তোমার ফ্যাক্টরি নাই?’ জলিল জিজ্ঞেস করে।

‘তুমি আর নুন দিয়ো না।’ তার বাবা গর্জে উঠলেন- ‘যা, পাকঘরে যা।’

জলিল বাবার আদেশমাত্রই পাকঘরে চলে যায়। সেখানে তার মা একটি টুলের উপর বসে বাপবেটার কথাবার্তা শুনছিলেন। জলিলকে দেখে তিনি কোনো কথা বললেন না। খলিল তার বাবার কথার মাঝে মাঝে উত্তর দিচ্ছিলো। সে দেশে যেতে চায় না। জলিল বসে বসে পুরো ঘটনা বুঝার চেষ্টা করে। বাবা বলছেন, খলিলকে তার চাচার সাথে চার মাসের জন্য বাংলাদেশে যেতে হবে। ওখানে তাদের পারিবারিক ব্যবসা আছে। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে খলিলকে সহায়-সম্পত্তি দেখে আসতে হবে।

খলিল বাংলাদেশে যেতে চায় না, এমনকি কয়েক মাসের জন্যেও না। জলিল এবং খলিল দুই ভাই তাদের গ্রাম সম্পর্কে খুব ভালো জানে। খলিল দেশে জন্মগ্রহণ করেছে। কিন্তু জলিলের জন্ম ব্রিটেনে। বড়ও হচ্ছে পূর্ব লন্ডনে।

খলিল সবসময় বাংলাদেশের গল্প করে। সে বাংলাদেশের ছেলে। এখন তাকে দেশে যেতে হচ্ছে, কিন্তু সে যেতে চায় না। জলিল ভাবলো, আব্বা যদি বলেন, তোমাকে দেশে যেতে হবে, তাহলে তো না গিয়ে উপায় নেই। যেতেই হবে।

খলিল এ সময়ে দেশে চলে যাওয়াটা জলিলের জন্যে খুবই খারাপ। খলিলের জন্য জলিলের দুঃখ হয়।

অবশেষে জলিলের সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেলো। ক্রিস্টমাসের দিন সন্ধ্যায় কনসার্টের জন্যে ঘর থেকে বেরোনোর যে পরিকল্পনা সে করেছিলো, এখন তাও বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। হয়তো মিথ্যার জাল বোনার জন্যে আল্লাহ তাকে শাস্তি দিচ্ছেন। জলিল ভাবে।

পরের দিন স্কুলে যাওয়ার সময় গোটা পথ জলিল বিষয়টি নিয়ে ভাবলো। সে এখন কী করবে? সে কি মিস ইনগ্রামকে বলে দিবে যে, সে নাটকে অংশ নিতে পারবে না। তার চরিত্রটি ড্যারেনকে দিয়ে দিতে। যে ক’দিন সময় আছে, এর মধ্যে ড্যারেন সংলাপগুলো মুখস্ত করে নিতে পারবে নিশ্চয়ই।

এখন যদি মিস ইনগ্রাম বলেন, তুমি ড্যারেনের সাথে জায়গা পরিবর্তন করে নাও। ড্যারেন তোমার জায়গায় অভিনয় করবে আর তুমি স্টেজে চেয়ার টেবিল সরানোর কাজ করবে, যেটা ড্যারেনের দায়িত্ব ছিলো। তখন সে কী বলবে? এই কাজ তো তার মোটেও পছন্দ না।

তখন তাকে বলতে হবে, সে ওই দিন সন্ধ্যায় আসতেই পারবে না।

যদি একথা শুনে মিস ইনগ্রাম বলেন, তিনি জলিলের ঘরে আসতে চান এবং তার বাবার সাথে কথা বলতে চান, তাহলে আরেক ঝামেলা।

জলিল মিস ইনগ্রামের দিকে তাকায়। তার মাথায় কোকড়ানো সোনালী চুল। চরম অগোছালো একজন মহিলা মিস ইনগ্রাম। তার প্যান্টের মধ্যে দু’তিনটি তালি মারা। জলিল জানে, তার বাবা মিস ইনগ্রামকে একদম দেখতে পারেন না। মিস ইনগ্রাম যদি ভালো একটি স্কার্ট এবং শার্ট পরেন, মাথার চুল সুন্দর করে আচড়ান, তাহলে হয়তো জলিলের বাবা তার কথা শুনতে পারেন। কিন্তু জলিল তো মিস ইনগ্রামকে এটা বলতে পারবে না।

 

তিন

খলিল যেদিন বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য এয়ারপোর্টে চলে যায়, ওইদিন মিস ইনগ্রাম বললেন, ‘আজ তারা ক্লাসে কিছু কস্টিউম ব্যবহার করবেন।’ জলিলকে তিনি বললেন, ‘তোমার পা পেছনের সাথে বেঁধে তোমাকে টাইনি টিম বানানো হবে।’

নাটকে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় সবাই নিজেদের সংলাপ মুখস্ত করে ফেলেছে। রিহার্সেল করার ফলে তাদের অভিনয় আরও উন্নত হয়েছে।

ওইদিন সন্ধ্যায় জলিলের বাবা তার স্কুলব্যাগ খুলে দেখলেন না। এর পরিবর্তে তিনি জলিলের পাশে বসলেন এবং বললেন, ‘খলিল দেশে চলে গেছে। তার দেশে যাওয়ার পেছনে অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। এখন সেই অর্থ পুষিয়ে নিতে তাদের আরও বেশি কাজ করতে হবে।’

‘স্কুল থেকে ফিরে তুমি তোমার মাকে সেলাইকাজে সাহায্য করবে। আমি একজন ব্যবসায়ী পেয়েছি, যে আমাদের সেলাইয়ের কাজ দেবে। কাল আমি তার ঘরে থেকে বান্ডিল নিয়ে আসবো। তুমি সাহায্য করতে পারবে তো? বাবা জিজ্ঞেস করলেন।

জলিল মাথা নাড়ে।

বাবা তার পিঠ চাপড়ে বলেন, ‘তুই খুব ভালো ছেলে।’

তার বাবাকে খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে হচ্ছিলো। তিনি জলিলের দিকে না তাকিয়ে আড়চোখে দেয়ালের দিকে তাকাচ্ছিলেন।

নাটকের আর মাত্র একদিন বাকি আছে। জলিল মিস ইনগ্রামকে কীভাবে যে বলে, সে নাটকে আসতে পারবে না। তার মনে পড়ছে, একবার পূর্ব লন্ডন থেকে একটি ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছিলো। সে কি নাটকের পরের দিন হেডমাস্টারকে বলবে, তাকে মুখোশ পরিহিত কিছু লোক অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিলো। অথবা সে কি বলবে, নাটকের দিন সে বেহুশ হয়ে পড়ে গিয়েছিলো।

নাটকের দিন সেলাই মেশিনের ক্যাড় ক্যাড় শব্দে জলিলের ঘুম ভাঙ্গে। তার বাবা ভোরবেলা ঘর থেকে বের হয়ে কিছু জিনিস নিয়ে এসেছেন, সেগুলো সেলাই করতে হবে। বসার ঘরে তার মা একমনে সেলাই করে যাচ্ছেন। জলিলের স্কুলের আরও দু’ঘন্টা বাকি আছে। সে নিজের জন্য এক কাপ চা বানায়। তারপর স্কুলের পোশাক পরে সেলাই মেশিনে বসে পড়ে। সে ঘড়ির দিকে বারবার তাকাচ্ছিলো। যখন তার বাবা কাজের জন্য বেরিয়ে পড়েন, তখন সে মাকে বলে : আমাকে স্কুলে যেতে হবে।

মা বললেন, ‘আজ স্কুলে যাওয়ার দরকার নেই। একদিন স্কুলে না গেলে কী হয়? অনেক কাজ পড়ে আছে।’

‘আমি তো অনেক করেছি।’

‘আমাদের এই কাজগুলো আজ সন্ধ্যার আগেই শেষ করতে হবে। তোমার বাবা বলেছেন, তিনি আরও কাপড় নিয়ে আসবেন কাজ করে দেওয়ার জন্যে। আজকে সন্ধ্যার পর তোমার বাবার সাথে তোমাকেও যেতে হবে কাজগুলো নিয়ে আসার জন্য’- মা বললেন।

জলিল তার মার কথা শুনলো না। এমনিতেই তার স্কুলের দেরি হয়ে গেছে। সে যখন স্কুলে যায় তখন অংক ক্লাস ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

টিফিনের পরে ফাইনাল রিহার্সেলের জন্য ছাত্রদের হলরুমে ডাকা হলো। মিস ইনগ্রাম নাটকে অভিনয়কারীদের সাজতে সাহায্য করছিলেন। তিনি তাদের রুমের এক কোনায় পাঠাচ্ছিলেন, যেখানে দু’জন আর্ট টিচার বসা, তারা অভিনয়কারীদের মুখে গোলাপী রঙ লাগিয়ে দিচ্ছেন।

এর মধ্যে বাইরে তুষারপাত শুরু হলো।

জলিল পেছনের রুমে ছিলো। সে শুনতে পেলো ছাত্ররা এসে হলরুম ভর্তি হচ্ছে। শিক্ষকরা তাদের বসতে সাহায্য করছেন। প্রথম পরিবেশনা ছিলো রেগে ব্যান্ড। এটা একধরণের বাজনার শব্দ, যা শুনতে ট্রেন স্টেশনের গুঞ্জনের মতো লাগে। এই পরিবেশনা বন্ধ হওয়ার পর তুমুল করতালি শুরু হয়। করতালির শব্দ শুনে জলিলের বুকে কাঁপন ধরে যায়। যেসব ছাত্রছাত্রীরা ফিসফিস করছিলো, মিস ইনগ্রাম তাদের চুপ হতে বললেন।

জলিল ভাবলো, সে যখন স্টেজে উঠবে, তখন দর্শকসারিতে এতো মুখ দেখে সে ভয় পেয়ে যাবে। কিন্তু সে যখন অভিনয়ের জন্য স্টেজে উঠলো, হলের দিকে তাকানোর পর সে শুধু অন্ধকার দেখতে পেলো। কারণ, হলের বাতি নিভিয়ে ফেলা হয়েছিলো।

নাটকটি শেষ হলে সারা হল জুড়ে বিপুল করতালির গর্জন শুরু হলো। এই গর্জন যেন থামতেই চাইছে না।

হেডমাস্টার খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘খুব ভালো একটি নাটক হয়েছে। সবাই চমৎকার অভিনয় করে দেখালে। আজকে সন্ধ্যায় ঠিক এরকম অভিনয় করে দেখাতে পারলে সামনের টার্মে কয়েকদিনের জন্যে স্কুল ছুটি পাবে।’

‘কী ব্যাপার জলিল, তোমার মন খারাপ নাকি?’-মিস ইনগ্রাম জিজ্ঞেস করলেন। ‘আজকে তো তুমি খুব ভালো অভিনয় করেছো।’

জলিল বললো, ‘আমি ভালো আছি।’ পরক্ষণেই তার মনে হয় হলো, তার বলা উচিত ছিলো আমি ভালো নেই। সে যদি বলতো, আমি ভালো নেই , আমার শরীর খারাপ। আজ সন্ধ্যায় আমি আসতে পারবো না। তাহলে হয়তো মিস ইনগ্রাম তার কথা বিশ্বাস করতেন।

জলিলের মিস ইনগ্রামকে বলতে ইচ্ছে করছে, ‘মেম, আমি একজন বিশ্বাসঘাতক। স্কুলের জন্যে হলিডে হবে না। কারণ আজ সন্ধ্যায় আমরা এরকম অভিনয় করতে পারবো না। তুমি জানো মিস, আমার বাবা নাটক ভালোবাসেন না। তিনি কারো কথা শুনতে চান না। তিনি আমাকে নাটকে আসতে দেবেন না। মিস, আমাদের সেলাইকাজ করতে হয়। অনেক কাজ। আমি খুবই দুঃখিত মিস। খুবই দুঃখিত।’

জলিলের বলতে ইচ্ছে করছে, ‘আমার বাবা খুব কৃপণ।’

‘তুমি যদি ফেরশতা হও, ভালো আত্মার অধিকারী হও, তাহলে তিনি তোমার কথা শুনবেন। অন্যথায় নয়।’

মিস ইনগ্রাম বললেন, ‘ছয়টার সময় চলে আসবে। নাটক শুরু হবে সাড়ে সাতটায়।’

জলিল স্কুল থেকে ঘরে ফিরছিলো। ব্রিকলেন অতিক্রম করার পর তার মনে হলো তার বাবা ‘ভুল’ নয়। তার বাবার কথাই সত্যি- ‘তারা বিলেতে নিজেদের ঘাম বিক্রি করার জন্যে এসেছেন, ফাও সময় কাটানোর জন্যে নয়।’

সে ব্রিকলেনের মানুষগুলোকে সবসময় কর্মব্যস্ত দেখে। পুরুষ কী মহিলা সবাই কর্মব্যস্ত! সবাই কাজ করে।

জলিলের মনে হয়, সে তো শ্বেতাঙ্গ বালকদের মতো নয়। তার জীবন আলাদা। তাদের কখনও সেলাই মেশিনের পেছনে বসতে হয় না। তাদের কাজ করতে হয় না। তারা ঘরে বসে গল্পের বই পড়ে। ছেলেমেয়েরা সবাই মিলে বিকেলে বাড়ির পাশে খেলতে যায়।

জলিল ঘরে পৌঁছে দেখে তার মা সেলাইকাজ করে যাচ্ছেন।

জলিলকে দেখে তিনি বললেন, ‘কাপড়গুলো গুনে বান্ডিলে বেঁধে রাখো।’ জলিল কাপড়গুলো বান্ডিলের মধ্যে বেঁধে অন্য একটি মেশিনে সেলাই করতে বসে পড়ে।

তার বাবা সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ঘরে ফিরলেন। তখন সব কাপড় সেলাই করা শেষ। জলিলের মা বসার ঘর ঝাড়– দিচ্ছিলেন।

‘আমদের সময়মতো কাপড়গুলো পৌঁছে দিতে হবে। সময়ের দাম দেওয়া শেখো। মানুষের সাথে যে কথা দাও, তা রক্ষা করতে শেখো।’ জলিলের বাবা গজগজ করতে লাগলেন। তারপর তিনি জলিলকে কাপড়গুলো ব্যাগে ভরতে বললেন। এখুনি তাদের বেরুতে হবে।

জলিল ভাবছে, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় মিস ইনগ্রাম বুঝতে পারবেন জলিল নাটকে আসছে না। সবাই মনে হয় এখন চেঞ্জিং রুমে আছে। সবাই মনে হয় সাজগোজ করে নাটক করার জন্য তৈরি হয়ে আছে। জলিল প্রাণপণে এসব চিন্তা মাথা থেকে সরানোর চেষ্টা করছিলো। সে শক্ত করে ব্যাগটি ধরে এবং তার কোটটি জড়িয়ে নেয়।

তুষার পড়ে রাস্তায় বরফের ভারী আস্তরণ পড়েছে। তাই তাদের সতর্ক হয়ে পথ চলতে হচ্ছে। তারা কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছে না। নিচের দিকে তাকিয়ে পথ চলছে। তারা একটি পুরাতন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। জলিলের বাবা দরজার কলিং বেল চাপলেন।

ঘর থেকে একজন শ্বেতাঙ্গ লোক বের হয়ে বললো, ‘মিস্টার মিয়া, এই তোমার সময়জ্ঞান!’ তারপর লোকটি তাদের ঘরে আসার ইঙ্গিত করে বললো, ‘আমারও তো অন্যদের সাথে সময়মতো কাজ দেওয়ার কন্ট্রাক্ট আছে।

‘তুমি বৃহস্পতিবারের মধ্যে দিতে বলেছিলে, আমি বৃহস্পতিবারেই নিয়ে এলাম।’ জলিলের বাবা বললেন।

‘হুম, তোমার কথাই ঠিক।’ একথা বলে শ্বেতাঙ্গ লোকটি ব্যাগ থেকে কাপড় বের করে দেখতে থাকে। সেলাই মেশিনের ওপর এবং ঘরের মেঝেতে অনেক কাপড় ছড়ানো ছিটানো ছিলো।

‘এখন আমি তোমাকে সিল্ক সেট দিবো। তবে আমাকে এটা সোমবারের মধ্যে দিতে হবে। পারবে তো?’ শ্বেতাঙ্গ লোকটি জিজ্ঞেস করে।

‘হ্যাঁ, তুমি সময়মতো পেয়ে যাবে’- জলিলের বাবা বললেন।

‘খুব ভালো। খুব ভালো।’ একথা বলে লোকটি তাদের পেছনের একটি রুমে নিয়ে গেলো। যেখানে অনেকগুলো সবুজ কাপড়ের স্তুপ ছিলো। জলিল এবং তার বাবা কাপড়গুলো ব্যাগে ভরতে লাগলেন। কাপড় ব্যাগে ভর্তি করা শেষ হলে তারা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন।

জলিল এবং তার বাবা যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন, তাতে কোনো জনমানুষ ছিলো না। তারা রেলওয়ে ব্রিজের দিকে হাঁটছিলো, যে পথ তাদেরকে এই মরাভূমি থেকে বের করে আনবে। মিস্টার মিয়ার হাতে ছিলো তিনটি ব্যাগ এবং জলিলের হাতে দুটি।

হঠাৎ একটি সাদা ভ্যান তাদের পাশ কেটে কয়েক গজ সামনে গিয়ে ব্রেক কষে। তারা যখন ভ্যানের কাছে আসে, এক ব্যক্তি ভ্যানের জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘ওই আয়াতুল্লাহ! তোদের হাতে কীরে? ইঁদুরের তরকারি নাকি?’

‘এদিকে আয়,’ জলিলের বাবা তাকে বললেন। ‘এই রাবিশরা খামাখাই ঝামেলা করছে। ওদের কিছু বলিস না।’ মিস্টার মিয়া কথাগুলো ইংলিশে বলছিলেন, তিনি চাইছিলেন লোকগুলো তার কথা বোঝুক। তারপর ভ্যানের দরজা খুলে গেলো এবং ওই ব্যক্তি ভ্যান থেকে বেরিয়ে এলো। তার পিছু পিছু আরেক ব্যক্তি বেরিয়ে এলো। লোকগুলো দেখতে কেমন সেটা দেখার সময় জলিলের ছিলো না। তার বাবা তাকে কনুই দিয়ে ধাক্কা মেরে ঘুরতে বললেন।

‘চল, ফ্যাক্টরিতে ফিরে যাই-’ তার বাবা বললেন।

তারা খুব দ্রুত পা ফেলছিলো। জলিল মুখ ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখলো ওই দুই ব্যক্তি আবারও ভ্যান স্টার্ট দিয়েছে।

‘ওরা কি আসছে?’ বাবা জিজ্ঞেস করলেন।

ভ্যানটি খুব দ্রুত তাদের কাছে ফিরে আসে। তারা যে গলির মধ্যে ঢুকতে যাবে, ওই গলির সামনে এসে আবার ব্রেক কষে।

‘আয়াতুল্লাহ! কই যাও? তোমার মনে হয় খুব তাড়া! আমরা তো তোমার সাথে কথা বলতে চাইছি।’

‘নো টকিং।’ জলিলের বাবা বললেন।

তারা আবার মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে ছুটলেন।

‘শালা, ইট চাবাইয়া খা।’ ভ্যানের দ্বিতীয় ব্যক্তিটি বললো।

জলিল দেখলো, ওরা দু’জন নয়, তিনজন। একজন গাড়ি চালাচ্ছে এবং তার সাথে ওই দুই রাফিয়ান। তারা আবারও ভ্যান স্টার্ট দিয়ে জলিলদের পথরোধ করলো। এবার তিন ব্যক্তি ভ্যান থেকে লাফিয়ে বেরোলো। জলিল ও তার বাবা আবারও পথ পরিবর্তন করলেন। তারা দৌঁড়াতে লাগলেন।

তারা একটি গলিতে এসে পড়লেন। গলিটি জলিলের চেনা। জলিল চিৎকার করে বললো, ‘এই পথে।’ তারা ওই পথে গেলো। পেছনে আর লোকগুলোকে ধাওয়া করতে দেখা গেলো না।

‘ওরা মনে হয় ফিরে গেছে।’ একথা বলতে না বলতেই ভ্যানের হেডলাইট তাদের উপর এসে পড়লো।

‘জলদি করো বাবা।’ জলিল বাংলায় চিৎকার করে বললো।

তারা বাবা আর পারছিলেন না। মিস্টার মিয়া হাপাচ্ছিলেন। জলিল বললো, ‘আমার স্কুল এইতো সামনে, ওখানে মানুষ থাকবে।’

জলিলের বাবা জলিলের দুই গজ পেছনে ছিলেন। একটি কার তাদের পাশ দিয়ে গেলো। কারের হেডলাইটের আলোয় জলিল স্পষ্ট তার স্কুলের গেট দেখতে পেলো। ওখানে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছেন। সাদা ভ্যানটি এবার স্কুলের গেটের সামনে ব্রেক কষলো। জলিল দেখলো, ভ্যানটি সুবিধা করতে না পেরে গেটের সামনে থেকে আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। জলিল ভীড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে। সে তার বুক চেপে ধরে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছিলো। ওখানে কয়েকজন টিচার, ছাত্র, কেয়ারটেকার এবং মিস ইনগ্রাম ছিলেন।

‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তুমি এসেছো,- মিস ইনগ্রাম বললেন। ‘হ্যালো মিস্টার মিয়া, তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি ঠিক সময়ে জলিলকে নিয়ে এসেছো। ইয়ান আপনাকে দেখিয়ে দেবে কোথায় বসবেন।’ মিস ইনগ্রাম জলিলের হাত ধরে তাকে চেঞ্জিং রুমে নিয়ে গেলেন।

‘তোমার কী হয়েছিলো? আমি তো ভেবেছি, তোমাকে অপহরণ করা হয়েছে। যাই হোক, আমাদের হাতে সময় আর মাত্র পাঁচ মিনিট আছে। এরমধ্যেই তোমাকে তৈরি হতে হবে। তোমার দেরি দেখে ফিফথ ইয়ারকে পারফর্ম করতে দেওয়া হয়েছে। যাই হোক, তুমি স্বাভাবিক হও’Ñ মিস ইনগ্রাম এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বললেন।

‘জলিল এসেছে’- কথাটা সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো।

জলিল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে স্টেজে ওঠে। তার মাথা থেকে টুপি পড়ে যায়। সে দর্শকসারি থেকে মৃদু হাসির শব্দ শুনতে পায়। সে নিজেকে শক্ত করে। আজ তাকে ভালো অভিনয় করতেই হবে।

নাটকটি বেশ চমৎকারভাবে শেষ হলো।

স্টেজের আলোর ঝলকানিতে জলিল কিছুই দেখতে পাচ্ছিলো না। সে শুধু আলোর রেখাগুলো দেখতে পাচ্ছিলো। সে ভাবলো, দর্শকসারির কোথাও হয়তো তার বাবা বসে আছেন। অথবা তিনি রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছেন তার ফেলে আসা ব্যাগগুলোর সন্ধানে।

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১