আমাদের কওমি বন্ধুরা ঝাঁকে ঝাঁকে লেখালেখির সফেদ ময়দানে পা রাখছেন, তা আনন্দের সংবাদ। এমতাবস্থায় তরুণ সম্পাদক বন্ধুরা কিছু মনে না করলে সম্পাদনার প্রস্তুতি নিয়ে কিছু বলতে চাই। আমরা জানি, সব কিছুরই একটা উপযুক্ত বয়স আছে। সম্পাদনা করার মতো লেখালেখিতে পরিণত হওয়ার আগেই অনেকে সম্পাদক হয়ে যাচ্ছেন। তরুণদের মধ্যে আজকাল যেন প্রতিযোগিতা চলছে সম্পাদক হওয়ার। গত অর্ধযুগের সবচেয়ে সম্ভাবনাময়ী তরুণদের সিংহভাগই পত্রিকা সম্পাদনায় যুক্ত। যার লেগে থাকার কথা সারাদিন নিজের লেখার শ্রী ও প্রসাদগুণ বৃদ্ধির পেছনে, তাকে ব্যস্ত হতে হচ্ছে অন্যের লেখা ঠিক করার কাজে। ফলে লেখক হিসেবে তাদের সুষ্ঠু বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের প্রতিভার যেমন অপমৃত্যু বা অপচয় হচ্ছে, তেমনি জাতি বঞ্চিত হচ্ছে আরও প্রতিশ্রুতিশীল একঝাঁক উদ্ভাবনী মেধা থেকে।
যিনি শুদ্ধ করে দু’লাইন লিখতে পারেন না, যার চিন্তা এখনো সাবালক হয়নি তার সম্পাদক হওয়া কাম্য নয়। তিনি তো পদে পদে অ্যাকসিডেন্ট করবেন। অনেককে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটাতে দেখাও যায়। (উপযুক্ত না হবার কারণে) যে তরুণের কাছে কেউ লেখা চায়নি, তার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় কিভাবে বড়দের কাছে লেখা চাইতে হয়। তাই সম্পাদক হয়ে সে সিনিয়রদের সঙ্গে না সম্পর্ক গড়তে পারে, না পারে বড় হিসেবে তরুণদের ছায়া দিতে। এদের সম্পাদিত লেখায় যেমন বিপুল বানানপ্রমাদ থাকে, তেমনি থাকে তথ্য ও তত্ত্বগত নানা অসঙ্গতি। আবার অনেককে দেখে মনে হয় তার কোনো গন্তব্য নেই কিংবা ভুল গন্তব্যে ধাবিত। হ্যাঁ, অপরিণত বয়সেও দু’একজন পরিণত মেধার সাক্ষর রাখতে পারেন, কিন্তু সেটা কেবলই ব্যতিক্রমী ঘটনা। সবাই এমন হবে তা ভাবার কারণ নেই।
বলবেন, কাজের মধ্য দিয়েই ওরা ক্রমশ পরিণত হয়ে যাবে, পত্রিকার সংখ্যা বাড়লে লেখকও বাড়বে কিংবা এতে আরও ইতিবাচক নানা দিক রয়েছে। বলব, আপনি হাত-মশকের জন্য মাসিক পত্রিকা করতে যাবেন কেন? এ জন্য লিটলম্যাগ করুন। লিটলম্যাগের মাধ্যমে নিজেদের বিকাশ ও মেলে ধরার কাজটি সাফল্যের সঙ্গেই করা যায়। মূলধারার সাহিত্যিকরা তো তাই করেন। আর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রচুর লিখুন। নিত্যনতুন বিষয়ে হাত দিন। সমালোচনা সাহিত্য পড়ুন এবং ভালো লেখকদের মূল্যায়ন শুনে এগিয়ে যান। অন্যথায় ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব হলেও হারিয়ে যেতে হবে ছুটে যাওয়া তারকার মতো।
এ গেল সম্পাদনার কথা। লেখালেখি প্রসঙ্গে বলব, চলতে হবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবার প্রত্যয়ে। লেখালেখিতে শর্টকাট কোনো ফর্মুলা নেই। মামা-খালুতেও কোনো কাজ হবার নয়। নীরব নিরন্তর সাধনা করেই প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। সস্তা প্রশংসায় ভিজলে গন্তব্য অনিশ্চিত। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বুভুক্ষু অধ্যয়ন ও অক্লান্ত অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই। একটা লেখার জন্য একশ’ লেখা পড়তে হবে। একটি পত্রিকা সম্পাদনার জন্য একশটি পত্রিকা দেখতে হবে।
লক্ষ্য সম্পর্কে বলব, লক্ষ্য আমাদের অবশ্যই ইসলামের সপক্ষে থেকে সত্য ও সুন্দরের জয়গান গাওয়া। দাওয়াত ও ইসলামপ্রচারের মহৎ সেবা করে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা। লক্ষ্য যদি এর বাইরে কিছু হয় তাহলে এ অঙ্গনে তার প্রয়োজন নেই। তার চেয়ে অনেক বেশি মেধা ওখানে ভাত পাচ্ছে না। নিজেকে প্রতিষ্ঠার জন্য কওমির কোনো তরুণ যদি ঘরের দুর্গন্ধ ট্যাঙ্কির তলদেশ থেকে তুলে নিয়ে রাষ্ট্রের সবার নাকে নাকে পৌঁছে দেয়, তাহলে তার আদর্শিক মৃত্যু হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। সে মৃত আত্মার নাম ভুলে যেতে হবে। পাশাপাশি মৃত আত্মার মিছিল যাতে দীর্ঘ না হয়, সে জন্য আমাদেরকে তরুণদের পাশে থেকে তাদের সাহস ও সুপরামর্শ দিয়ে যেতে হবে।
মনে রাখতে হবে, একজন আল্লাহবিমুখ লেখকের বৈষয়িক প্রতিষ্ঠা পেতেই হবে। অন্যথায় তিনি নিজেকে ব্যর্থ হিসেবেই ধরে নেবেন। কিন্তু আল্লাহর জন্য যারা লেখালেখি করেন, তাদের ব্যর্থ হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। আল্লাহ চাইলে আপনি প্রতিষ্ঠিত হবেন, অন্যথায় আখেরাতের প্রতিদান আপনার জন্য সাফল্যের বিজয় টোপর নিয়ে নিশ্চিত অপেক্ষমান।
বিশেষভাবে বলি, আল্লাহ আমাদের যা মেধা দিয়েছেন তার ৮০ পার্সেন্ট অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে কিংবা অপ্রয়োজনীয় কাজে অপচয় হচ্ছে। তিনি যা যোগ্যতা দিয়েছেন তার ক্ষুদ্র অংশ থেকেই সমাজ উপকৃত হতে পারছে। এর জন্য শুধু সামাজিক স্বীকৃতির অভাবই নয়; নিজেদের ব্যাপারে আমাদের উদাসীনতা এবং আপন শক্তি ও সামর্থ্য সম্পর্কে অনবগতিও অনেকখানি দায়ী। আমরা ৩/৪টি ভাষা জানি। ভাষাগুলো যদি ভালো করে রপ্ত করে লেখালেখি করি, তাহলে সহজেই অন্যদের ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। সম্ভাবনার নতুন নতুন দিগন্ত হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এ জাতির আগামীর দিনগুলো হোক তরুণদের প্রতিভায় উজ্জ্বল ও প্রদীপ্ত- সেটাই সবার প্রত্যাশা।

