মুসলমানদের সঙ্গে ইংরেজদের প্রতারণা : একটি ঐতিহাসিক দলিল

সংখ্যা:

মূল: হোসাইন আহমদ মাদানি রহ.
অনুবাদ: মনযূরুল হক

 

ইংরেজ কর্তৃক হিন্দুস্তানের দেওয়ানি  ক্ষমতা লাভের অঙ্গীকার ভঙ্গ করা

হিন্দুস্তানের ওপর ইংরেজদের দখলদারি বিজয়ীসুলভ ছিলো না; বরং বিভিন্ন শর্ত-চুক্তি ও প্রস্তাবনা-অঙ্গীকারের বদৌলতে তারা শাসন ক্ষমতা অর্জন করেছিলো। এইসব চুক্তি ও অঙ্গীকারের প্রশ্রয় নিয়েই তারা ধীরে ধীরে সমগ্র হিন্দুস্তান করায়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছে এবং এইসব কাগুজে অঙ্গীকারের মধ্যে শঠতা, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকার সকল উপায়ই অবলম্বন করা হয়েছিলো।

ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার লিখেছেন-

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রাক্তন কর্মকর্তারা তাদের অবস্থান কি তা ভালোভাবেই বুঝতেন। প্রথম দিকে তারা যখন বিভিন্ন প্রদেশ দখল করছিলেন, তখন সেসব অঞ্চলে ইসলামি বিধান বহাল রাখেন। এমনকি তারা ইসলামি শরীয়তকে দেশের সাংবিধানিক আইন হিসেবে সাব্যস্ত করেন এবং তা কার্যকর করার জন্যে মুসলিম বিচারক নিয়োগ করেন। সে-সময় যা-ই করা হতো, দিল্লির মুসলিম বাদশার নাম নিয়ে করা হতো। বাস্তবতা হলো, হিন্দুস্তানের বাদশাহি বিশেষত্ব অর্জনের ক্ষেত্রে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এতোটাই ভীত ছিলো যে, দীর্ঘ একটি সময় পর্যন্ত, যখন মুসলিম কর্মকর্তাদের মাধ্যমে শাসন চালানোর এই প্রয়াস নিশ্চিত ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিলো ইসলামি বিধানের অনুল্লেখযোগ্য দুর্নামধারীদের কারণে, তখন তারা ঘোষণা করলো যে, তারা বাদশার সহকারী। এ এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এই ঘোষকগণ শেষমেষ এক ঘৃণ্য তামাশার পথ অবলম্বন করেছিলো যে, সে-সময় আমরা একদিকে আমাদের রেসিডেন্ট দিল্লীর বাদশাকে একজন অসহায় বন্দির খেতে-পরতে সামান্য মাসিকি দান করতাম ভাতা হিসেবে, আবার অন্যদিকে যে-বিধান জারি করা হতো, তা করা হতো তার নামে। যেহেতু আজ পর্যন্ত যারা হিন্দুস্তানের ইতিহাসের ওপর কলম তুলে যাচ্ছিলো, তারা কখনো হিন্দুস্তানে আসেই নি, তাই তাদের থেকে এই আশা করা বাতুলতা যে, বিলেতে বসেই তারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির (উপরে বর্ণিত) এমন দুর্বোধ্য কাণ্ড-কারখানাকে তর তর করে বুঝে ফেলবে। বাস্তবতা ছিলো এটাই যে, যদি আমরা দশ বছর আগেই রীতিমতো শাসন ক্ষমতা গ্রহণের তোড়জোড় করতাম, তাহলে আমরা মুসলিমদের শত্রুতায় এমনভাবে বেষ্টিত হয়ে পড়তাম, যা ১৮৫৭ সালের শত্রুতা থেকে আরও বেশি ভয়াবহ হতে পারতো। মুসলিমগণ উপলব্ধি করতে পারতো যে, তাদের অবস্থান কলমের এক খোঁচায় অদল-বদল হয়ে গেছে। আমাদের অবস্থাও ইসলামি রাষ্ট্র দখলকারী ‘কুফরি শক্তি’র মতো হয়ে যেতো। ভেতরে ভেতরে মুসলিমদের বিরাট সংখ্যক দল জমায়েত হয়ে যেতো, যেনো বিদ্রোহকে ফরজে আইন আখ্যা দেয়া যায়। আমি ইতিপূর্বে বর্ণনা করে এসেছি যে, শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্যে প্রথম ফরজ হলো, সে বিধর্মী শাসকদের শেকড় কাটবে এবং তাদেরকে নিজেদের দেশ থেকে বহিষ্কার করবে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কেবল তাদের এই ভারসাম্যনীতি ও অনড়-অবিচল মনোভাবের কারণেই প্রশংসাযোগ্য। কেননা, তারা ইসলামি শাসনকে ধীরস্থির ও স্বাভাবিক গতিতে মৃত্য পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে মুহূর্তের জন্যে তাড়াহুড়া করে নি, যেনো বিপদের এই খড়্গ আমাদের মাথার ওপর থেকে নামতে কসুর না হয়। এভাবেই হিন্দুস্তান ধীরেসুস্থে এবং অনুভূতির বাইরে থেকে দারুল ইসলাম থেকে দারুল হরবে রূপান্তরিত হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় জেলা প্রশাসকদের নথিপত্র বছরব্যাপী ঘাঁটাঘাঁটির পরেও আমার জন্যে এটা বলা সম্ভব নয় যে, এই রূপান্তর কোন বছর কিংবা কোন সময়কালে সংঘটিত হয়েছে। মুসলিম বাদশার বাহ্যিক মহার্ঘ্য সুবিধা দান করার বহুপূর্ব থেকেই আমরা মুসলিম প্রশাসকদের পদচ্যুত করা শুরু করে দিয়েছিলাম। কিন্তু মুসলিম বাদশার সম্মানিত নামখানি কেবল তামাশার বস্তু হয়ে যাওয়ারও যথেষ্ট সময় পরে, এমনকি ১৮৩৫ সালেও বাদশার নামেই মুদ্রা প্রচলিত ছিলো। (১৮৩৫ সালে কোম্পানির মুদ্রায়- যার ওজন ছিলো ১৮০ গ্রেন- ইংরেজ রাজার আকৃতি খোদাই করা হয়েছিলো এবং ইস্ট ইন্ডিয়ার নাম অংকন করা হয়েছিলো।) এরপর যখন আমাদের এই সাহস হলো যে, মুদ্রায় ইংরেজ রাজার আকৃতি অংকন করা যেতে পারে, তখনও আমরা ইসলামি প্রয়োগবিধি ও আদলতে ইসলামি ভাষা বহাল রেখেছি, যেনো এগুলোও ধীরেসুস্থে নির্মূল হয়ে যায়। এভাবে ১৮৬৪ সালে আমরা একটা সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করলাম, আমার মতে, এই পদক্ষেপ ছিলো অত্যন্ত নির্বুদ্ধিতাসুলভ। অর্থাৎ বিচার বিভাগের প্রণীত এক নীতিমালার আলোকে সব মুসলিম বিচারককে পদচ্যুত করা হয়। এই নীতিমালাই নয়া হিন্দুস্তানি রাজত্বের কাঠামোকে পরিপূর্ণ দারুল হরবে রূপান্তরিত করে দেয়, যেই কাঠামোর নির্মাণ চলছিলো দীর্ঘ এক শতাব্দি (১৭৬৫ থেকে ১৮৬৪) পর্যন্ত। ইসলামি শাসনক্ষমতা এভাবে ধীরে ধীরে খতম হয়ে যাওয়ার ফলে আমাদের মুসলিম প্রজাদের ওপর নতুন নতুন আইন-কানুন আপতিত হতে থাকে।

 

ড. হান্টারের ব্যাখ্যার আলোকে পরিষ্কার বোঝা যায়, ইংরেজরা হিন্দুস্তানকে মোঘল বাদশাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ঘোষণা, চুক্তি ও অঙ্গীকারের নামে ধোঁকা দিয়ে এবং তাদেরকে নানারকমভাবে আশ^স্ত করে অর্জন করেছিলো। কিন্তু তাদের নীতি বিশুদ্ধ ছিলো না; নিজেদের অভিশপ্ত ও অপবিত্র উদ্দেশ্য সবার অগোচরে লুকিয়ে রেখেছিলো। প্রতিশ্রুতি দেয়া হলো যে, সর্বযুগে সর্বাবস্থায় ইসলামি ও বাদশাহি রীতিনীতি বজায় রেখে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং ব্যবস্থপানাকে উন্নত করা হবে, কিন্তু ভেতরের চৌর্যবৃত্তির মানসিকতার কারণে প্রথম থেকেই ইসলামি বিধি-বিধানকে ধ্বংস করা শুরু করে দিয়েছে এবং মুসলমানকে ধীরে ধীরে বের করে দিয়ে, নিজেদের বিষাক্ত পরিকল্পনা ঢুকিয়ে দিয়ে রাজকীয় শক্তি ও মুসলিমদের উৎকর্ষকে বরবাদ কের দিয়েছে। এবং সকল চুক্তি ও শর্তাবলি একটু একটু করে এমনভাবে ভেঙে ফেলেছে, যেনো তাদের সেসব চুক্তির সামান্য অবশিষ্টাংশও বাকি না থাকে।

 

ডব্লিউ হান্টার এরপরে লিখেছেন-

ইংরেজরা বছরখানেক মুসলমানদের সাথে কৃত চুক্তি ও অঙ্গীকার বহাল রেখেছে বটে, যখন সংশোধন ও নবায়নের সময় এসেছে, তখন এতোটা সতর্কভাবে পা ফেলেছে যে, তাদের কাপুরুষ ভাবাই স্বাভাবিক মনে হবে। এতদ সত্ত্বেও সবচে’ কার্যকর পদ্ধতি, যা আমরা পুরাতন বহু ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছি, তা এতোটা প্রতারণাপূর্ণ ছিলো যে, ইতিপূর্বে যার অনুমান না মুসলিমরা করতে পেরেছে, না পেরেছে ইংরেজরা। এর দ্বারা আমি সেই পরিবর্তনকে বোঝাতে চেয়েছি, যা লর্ড কর্ন ওয়ালেস চালু করেছেন এবং যার মাধ্যমে ১৭৬৩ সালে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ জারি হয়েছে। এই বন্দোবস্তের মাধ্যমে সেইসব মুসলিম অফিসারদের কার্যক্রম বাধ্যতামূলক আমাদের আয়ত্তে এসে যায়, যারা রাষ্ট্র ও রাজস্ব সংগ্রহকারীদের মধ্যস্থতা পালন করতেন এবং যাদের সৈনিকরা সংগৃহীত সম্পদের একটি বৈধ অংশ লাভ করতো।

 

এরপর তিনি লেখেন-

এক অফিসার, যিনি মুসলমানদের তৎকালীন অস্থিরতা ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সাথে এর সম্পর্কের বিষয়টি অত্যন্ত গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তিনি লিখেছেন- “এই বন্দোবস্ত হিন্দু কর্মচারীদের, যারা মামুলি পদে কর্মরত ছিলো, তাদের পদোন্নতি দিয়ে জমিদার বানিয়ে দিয়েছে। তারা জমিনের স্বত্ব হাসিল করেছে এবং এখন তারা সেই সম্পদ পুঞ্জিভূত করে চলেছে; যার প্রাপ্য ছিলো মুসলমানরা, যেহেতু মুসলিম হুকুমত চলছে।” সুতরাং এটা সবচে’ বড় অন্যায়, যার বলে মুসলিম শাসকবর্গ ইংরেজদের অপরাধী আখ্যা দিয়ে থাকে। তাদের দাবি হলো, আমরা মুসলিম বাদশার কাছ থেকে বাংলার ‘দেওয়ানি’ ক্ষমতা এই শর্তে আদয় করেছিলাম যে, আমরা ইসলামি শাসনতন্ত্র অক্ষুণ্ন রাখবো। কিন্তু যখনই আমরা নিজেদের শক্তি সম্পর্কে অবগত হলাম, অমনি সেই শর্তকে ছুঁড়ে ফেলেছি।

আমাদের জবাব হলো, যখন আমরা বাংলা অঞ্চলে মুসলমানদের শাসনতন্ত্র পর্যবেক্ষণ করলাম, দেখলাম, তাতে এতোটা একপেশে, অকেজো ও মানবতার খেলাফ নীতিমালা সন্নিবেশিত রয়েছে যে, যদি আমরা সেগুলি বহাল রাখি, তবে তা সভ্যতার জন্যে লজ্জার কারণ হবে। আমরা বিভিন্ন জেলার সরেজমিন হাল দেখিয়ে প্রমাণ করতে পারি, ইসলামি হুকুমতের উদ্দেশ্য ছিলো কেবল অর্থ জমা করা। রাজস্ব আদায়কারীদের হাতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সকল দায়-দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া হয়েছিলো। তাদের অনুমতি ছিলো যা মনে চায় তা করার; শর্ত হলো, রজস্বের অর্থ ঠিকঠাক জমা হওয়া চাই। সাধারণ মানুষকে নিপীড়ন করা হতো যেনো জমিদারদের কর ঠিকভাবে উসুল হয়। তাদের সম্পদ লুটে নেয়া হতো, যেনো জমিদারদের কর্মচারীরা সম্পদশালী হতে পারে। এই ধরনের অন্যায়-অবিচারের অভিযোগ করে কোনো ফল হতো না। কেননা, জমিদার ও অফিসারদের মর্জির সামনে তাদের হাত-পা ছিলো বাঁধা, চাই তাদের অভিযোগ শুনুক বা না শুনুক। তাদের অভিযোগের সুরাহা হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো খুবই কম, কেননা, সাধারণত জমিদারদের কর্মচারীরাই হতো এইসব অপকর্মের হোতা। যদি এই ডাকাতদের চেষ্টা-তদবির করে গ্রেপ্তারও করা হতো, তথাপি গ্রেপ্তারাকারীদের সাথে আঁতাত করে নেয়াও কঠিন কিছু ছিলো না। মোটকথা, মুসলিমদের হাতে থাকা শাসনের অবস্থা ছিলো এমন একটা মেশিনের মতো, যার মাধ্যমে অল্প সংখ্যক মানুষ সম্পদশালী হতে পারবে; এটা নয় যে, বেশিরভাগ মানুষের সুরক্ষা হবে। বোঝা যায়, এ-ব্যাপারে কখনো কোনো শাসকের মনেও দয়ার উদ্রেক হয় নি, অফিসারদের মনেও না।

 

অর্থাৎ ড. হান্টার স্বীকার করছেন যে, অবশ্যই তারা এই শর্তে বাংলা অঞ্চলের দেওয়ানি লাভ করেছিলেন যে, তারা ইসলামি আইনকে অক্ষুণ্ন রাখবেন। এবং তিনি এটাও স্বীকার করেন, আমরা (ইংরেজরা) সেই শর্ত ভঙ্গ করেছি এবং চুক্তির অন্যথা করেছি। কিন্তু তিনি তার জাতিগত চেতনায় এতোটাই বুঁদ হয়েছিলেন যে, নিজের জাতি ও শাসকবর্গের কর্মকাণ্ড ও চরিত্র প্রথমেই সঠিক মানদণ্ডে পরখ করার ফুরসত পান নি। যদি পরখ করতে পারতেন, তবে তার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করাও জরুরি মনে করতেন। স্বজাতির প্রতি ভালোবাসা তাকে সত্য থেকে অন্ধ করে রেখেছিলো। অথচ এটাই ছিলো সেই শাসনতন্ত্র, যা সম্রাট বাবরের জমানা থেকে সম্রাট আলমগীরের জমানা পর্যন্ত দুইশো বছরেরও অধিক সময় চলমান ছিলো। বরং যদি এইভাবে বলা হয় যে, ইসলামি সম্রাজ্যের সূচনাকাল থেকে আলমগীরের আমল পর্যন্ত একহাজার বছরের বেশি সময় ধরে চলমান ছিলো, যার অধীনে সমস্ত ইসলামি রাজ্য, বিশেষ করে হিন্দুস্তান ঈর্ষণীয় পর্যায়ে পৌঁছে ছিলো, তবেই সবচে’ সঠিক বলা হবে। যদি এই ইসলামি শাসনতন্ত্র একপেশে, অকেজো ও মানবিকনীতির পরিপন্থি হয়, তবে প্রশ্ন জাগে, কেনো তা এতো ফলবান হয়েছিলো? কেনো এতোটা বিস্তৃত অর্জন করেছিলো?

 

মিয়াহবর বসু বলেন-

প্রজাদের সচ্ছলতা ও ধনাঢ্যতার দিক থেকেও মুসলিমদের শাসনকাল স্বর্ণের অক্ষরে লিখে রাখার মতো। সম্পদ বৃদ্ধি ও শান্তি-স্বস্তির যে রূপ-প্রকৃতি বাদশা শাজাহানের সময়ে দেখা যেতো, নি:সন্দেহে তা ছিলো অনুপম, অপূর্ব।

 

লর্ড মাইকেল বলেন-

মুসলিম নিপীড়ক ও মারাঠী লেড়ুয়া সত্ত্বেও প্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বাংলা অঞ্চলকে ‘শান্তিকানন’ বা অত্যন্ত সমৃদ্ধ জনপদ গণ্য করা হতো। তার বসতি সীমাহীন বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। শস্যের আধিক্যের কারণে দূর-দূরান্তের প্রদেশগুলোও প্রবৃদ্ধি লাভ করতো এবং লন্ডন ও প্যারিসের অভিজাত রমণীকুল এখানকার কারিগরদের বুনানো কোমল কাপড় পরিধান করতেন।

 

লর্ড ক্লাইভ লিখেছেন- “এ (হিন্দুস্তান) অসীম সম্পদের দেশ।”

স্যার জন শাওয়ার ইংরেজ আগমনের পূর্বেকার সময়কে ‘সোনালী সময়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

সুতরাং ‘ইসলামি শাসনতন্ত্র একপেশে, অকেজো ও মানবিকনীতির পরিপন্থি’ ছিলো- এটা একেবারেই মিথ্যা ও বানোয়াট। এই ধরনের অসংখ্য সাক্ষ্য স্বয়ং ইংরেজদের থেকেই পাওয়া যাবে যে, ইসলামি শাসনতন্ত্রের অধীনে হিন্দুস্তান সর্বদিক থেকে উন্নতি লাভ করছিলো। বরং যেই শাসনতন্ত্র কোম্পানি ও লর্ড কর্নওয়ালেস প্রমুখ গঠন করেছিলেন, তা ছিলো, তার কারণে দেশ চূড়ান্ত ধ্বংসের মুখে পৌঁছে গিয়েছিলো।

 

স্যার জন শাওয়ার (যিনি সুবে বাংলার সিভিল সার্ভিসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন) ১৮৩৭ ইং সালে লিখেছেন-

ব্রিটেন যেই শাসন পদ্ধতি চালু করেছে, তার কারণে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের অধিবাসীরা ধীরে ধীরে অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এটাই হলো খুব দ্রুত তাদের ধ্বংসের কারণ। ইংরেজ রাজ্যের শান্তিদানকারীদের নিপীড়নে দেশ ও দেশের অধিবাসীদের এতোটাই হতদরিদ্র করে তুলেছে, যার নজির মেলা ভার। ইংরেজদের মৌলিক নীতিমালাই ছিলো এটা যে, সর্বাবস্থায় সমগ্র হিন্দুস্তানি জাতিকে নিজেদের স্বার্থের গোলাম বানিয়ে রাখা হবে। তাদের পিঠে এতো বেশি করের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে যে, করবৃদ্ধির আর কোনো সুযোগই বাকি রাখে নি। একের পর এক প্রদেশ আমাদের আয়ত্তে আসতে থাকে, আর তাকে আরও বেশি রাজস্ব প্রাপ্তির জমিন বানানো হয়। আমাদের সবসময়ই গর্ব হতো, স্বদেশি অভিভাবকরা যতোটা উসুল করতে পারতেন, তার থেকে আমাদের আয়-উন্নতি কতো বেশি হচ্ছে। প্রতিটি সম্মানজনক পদ ও অবস্থান, যা গ্রহণের ক্ষেত্রে নিম্ন থেকে নিম্নতর কোনো ইংরেজকে রাজি করানো যেতে পারে, হিন্দুস্তানিদের জন্যে রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। মোটকথা, হিন্দুস্তানে এ পর্যন্ত যতো কঠোর ও নিপীড়ক শাসন অতিক্রান্ত হয়েছে, তার অন্যতম হলো ব্রিটিশ শাসন। এ-আমলে সরকার ও সম্পদশালী ব্যক্তি (শর্ত হলো, তার সম্পদ হবে অপরিমেয়) উভয়ে ইনসাফকে খুন করতে পারে এবং করে এসেছেও। এ-আমলে জুলুমের প্রতিবিধান বলতে গলে একটা অসম্ভব বিষয়। এর পরিণাম হলো, প্রজারা আমাদের ঘৃণা করে। তারা যে-কোনো শক্তিকে স্বাগত জানানো এবং তার পতাকাতলে সমবেত হতে প্রস্তুত; একটাই শর্ত, এই শক্তির ক্ষমতা যেনো এতো বেশি থাকে, যা আমাদের ধ্বংস করতে পারে।

 

এই বর্ণনার পূর্বে তিনি লিখেছেন-

কিন্তু হিন্দুস্তানের সোনালী সময় পার হয়ে গেছে। যেই সম্পদ একটা সময় তাদের হাতে ছিলো, তার বিরাট একটি অংশ দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তাদের কার্যক্ষমতা সেইসকল অপদার্থ লোকের ব্যবস্থাপনা অকার্যকর করে দিয়েছে, যারা লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বার্থকে গুটিকতক লোকের স্বার্থের সামনে কোরবান করে দিয়েছে।

 

মিস্টার সিভিল ম্যারিয়েট (কাউন্সিল মেম্বার) ১৮৩৬ সালে লিখেছেন-

ব্রিটিশ শাসনকালকে গ্রহণযোগ্য ও মেহেরবান বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এ-আমলে দেশ যে-অবস্থায় পৌঁছে গেছে, তার তুলনা স্বদেশী শাসনকালের সাতে করা হলে প্রতীয়মাণ হবে যে, সে-সময় মানুষ ভালো ছিলো। এই দেশ দরিদ্রতার সর্বনিম্ন তলদেশে পৌঁছে গেছে। আমি একটি ঘটনা বর্ণনা করে চাই, যা অত্যন্ত গুরুত্বহ পরিণামের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তা হলো, কয়েক বছর ধরে সরকারি রাজস্বের বড় একটি অংশ দেশের ক্যাপিটাল হিসেবে নথিবদ্ধ করে আদায় করা হচ্ছে। যদিও এই ক্যাপিটাল নিতান্তই সামান্য। ক্যাপিটাল দ্বারা আমার উদ্দেশ্য কৃষকদের অস্থাবর সম্পত্তি; যাতে রয়েছে মূল্যবান ধাতু ও পাথরের তৈরি গয়না ইত্যাদি। এই গয়নাগুলোকে সংকটের সময় উপকারের কাজে ব্যবহার করা হয় এবং কৃষকদের আবশ্যকীয় বিষয়াবলি পরস্পরের কাছে পৌঁছানোর জন্যেও এই অলঙ্কারগুলি ব্যবহার করা হয়। সাধারণত যতোদিন অন্যকিছু দ্বারা অভাব মেটানোর যায়, ততদিন এইসব অলঙ্কারে হাত লাগানো হয় না। সারকথা হলো, এই অলঙ্কারগুলির দিকে তাকালেই বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে, দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া সংকট আমাদেরকে ব্যাপক দুর্ভিক্ষের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

 

মিস্টার ম্যারিয়েট অন্যত্র লিখেছেন-

হিন্দুস্তানে আমাদের শাসনের কারণে যেই বিপদ এখন প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে, তা হয়তো একমাত্র অধিক পরিমাণে কর-আদায়ের কারণেই প্রত্যক্ষভাবে তৈরি হয়েছে, নয়তো ইংরেজদের আদায়কৃত কর এর পরোক্ষ কারণ হয়েছে।

 

উপর্যুক্ত আলোচনা, যা ব্রিটিশদের প্রসিদ্ধ দায়িত্বশীলগণের বক্তব্য এবং যারা হিন্দুস্তানে থেকে হিন্দুস্তানের হালত ভালো করে চাক্ষুস করেছেন, আমাদের একেবারে স্পষ্ট করে দেয় যে, ড. হান্টার যে অপবাদ এই ইসলামি শাসনতন্ত্রের (যা অক্ষুণ্ন রাখার অঙ্গীকার ইংরেজরা সুবে বাংলার দেওয়ানি হাসিল করার সময় করেছিলো) ওপর আরোপ করেছেন, তা নির্জলা মিথ্যা এবং কেবল স্বজাতির প্রতি নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব ও না-জায়েজ প্রোপাগান্ডা বৈকি। একইভাবে যেইসব কল্যাণকর দিক তিনি তাদের শাসনতন্ত্রের মধ্যে দেখিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ বাস্তব পরিপন্থি। বরং তাদের শাসন পদ্ধতি ছিলো কেবল লুটপাট, ধ্বংস ও স্বার্থসিদ্ধির পায়তাঁরা মাত্র। যার ফলে হিন্দুস্তান অভাব-দারিদ্র্য ও সংকট-সংকীর্ণতার অতল গহ্বরে নেমে গিয়েছিলো। হিন্দুস্তানে পূর্বতন শাসনপদ্ধতি সম্পর্কে ড. হান্টারের সমালোচনা ও আপত্তির সাথে যার কোনোই মিল নেই। বরং তিনি ইসলামি শাসনপদ্ধতির আলোচনা করতে গিয়ে যেসব মন্দ ও অহিতকর দিক সম্পর্কে আলোচনা করেছেন, তার সবগুলিই কিংবা তারও অনেক বেশি খারাপ পদ্ধতি ছিলো ব্রিটিশদের গঠিত শাসন ব্যবস্থার মধ্যে।

 

লর্ড অ্যাডাসলে ১৮৬৭ সালে বর্ণনা করেছিলেন-

যতদূর সম্ভব দেশি শাসন পদ্ধতিকে আমাদের উন্নত করার চেষ্টা করা উচিত। দেশীয়দের স্বভাব যোগ্যতা ও দক্ষতায় প্রবৃদ্ধি ঘটানো যায় এবং তাদের মধ্যে যেসব ভালো বৈশিষ্ট্য ও মৌলিক গুণাবলি নিহিত রয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সেগুলোর সহায়তা নেয়া যায়। মোঘল শাসকদের শ্রেষ্ঠত্বর মূল রহস্য ছিলো সেই কুশীলতা কাজে লাগানোর ফল, যা সম্রাট আকবর ও তার সভাসদগণের বিশেষ বৈশিষ্ট্যও বটে, তা হলো, তারা হিন্দুদের যোগ্যতা ও সহায়তা গ্রহণ করে উপকৃত হয়েছেন এবং যথাসম্ভব নিজেদেরকে দেশের মানুষের সঙ্গে একাত্ম করে রেখেছেন। তাদের ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। আমরা যদি চাই যে, সেই দায়িত্ব আমরা পালন করবো, যা হিন্দুস্তানের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর এসে বর্তেছে, তবে আমরা সেইভাবেই অগ্রসর হতে পারি। আমরা দেশের অভিজাত ও নেতৃস্থানীয় যতো লোক আছে, তাদের সাহায্য ও পরামর্শ থেকে লাভবান হতে পারি। আপনারা যে বলছেন, হিন্দুস্তানিদের মন-মস্তিষ্কে যোগ্যতা ও পরিচালনার যথেষ্ট মগজ নেই, এটা একটা নিরর্থক বাজে কথা।

 

লর্ড সিয়াসবরিও লর্ড অ্যাডাসলের বক্তব্যের সমর্থন করে বলেন-

যারা হিন্দুস্তান সম্পর্কে সবচে’ বেশি অবগত, তাদের সম্মিলিত অভিমত হলো, কয়েকটি ছোটো ছোটো দেশি রাজ্য, যাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও সরকার পরিচালনা পদ্ধতি ভালো, হিন্দুস্তানিদের রাজনৈতিক ও চারিত্রিক উন্নয়নের জন্যে তা সীমাহীন উপকারী।

 

পুরাতন ইসলামি শাসনপদ্ধতি ও নতুন ইংরেজ শাসনপদ্ধতি সম্পর্কে হ্যানিবার্ড লিখেছেন-

ইংরেজদের সাধারণ অভিমত সে-যুগে এটাই ছিলো যে, হিন্দুস্তানের শাসনব্যবস্থা এতোকাল যেভাবে চলে এসেছে, সেভাবেই বহাল রাখা হবে। তা সত্ত্বেও আমরা হিন্দুস্তানে সেই শাসনব্যবস্থাই চালু রেখেছি, যা কোম্পানি শাসনকালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর লর্ড সিয়াসবরি যে-সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন, সে-ক্ষেত্রে কথা হলো, আইন-কানুন ও রীতিনীতির দিকে ব্রিটিশ সরকারের মনোযোগ ততোটকু, তাদের অলস কান ও বেপরোয়া আহাম্মকির ফাঁদ গলে যতোটুকু যায়। বেশিরভাগ সময় তাদের পূর্ণাঙ্গ ও জটিল ব্যবস্থাপনার কারণে এমনটি হয়ে থাকে। দায়িত্বশীলতার ভয় ও গৃহীত নীতিমালা ও আইন-কানুন এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হওয়া- এইসব হলো সেই সকল সম্পদ কুক্ষিগত করার ফল, যার দায় কারোই নয়। যার ফলে সরকার অকেজো হয়ে পড়ে এবং অযোগ্যতায় উত্তোরত্তর আরও প্রবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। যার সর্বশেষ পরিণাম এটাই হলো যে, একটা ভয়াবহ ধ্বংস দৃশ্যমান হতে থাকে।

 

সুতরাং এই শাসনব্যবস্থার কারণে যেই বিপদ এই দেশে নেমে এসেছে, তা মিস্টার অ্যাবর্ট নায়েট-এর নিম্নোক্ত অভিমত থেকে পরিষ্কার হতে পারে, যা তিনি গুজরাটের অধ:পতন সম্পর্কে বলেছেন। তিনি বলেন-

১৮০৭ সালে যখন আমরা গুজরাটে প্রথম পা রাখি, তখন সেখানে অনেক সম্পদশালী ও সচ্ছল খান্দান বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু আজ তাদের তাদের শরীরে পরিধেয় কাপড়ও নেই। তালুকদারদের কাছে আমাদের দাবিকৃত লোকজন আগে যে পরিমাণ আদায় করতো, তার তিনগুণ কিংবা তারও অধিক দিচ্ছে। তবে এই বর্ধিত অর্থের দ্বারা যারা উসুল করেছে, তাদের কোনোই লাভ নেই। কেননা, ইংরেজ দাদনরা, যাদের কাছ থেকে তালুকদারদের মারাত্মক চড়া সুদে ঋণ নিতে হতো, তারা নিজেদের দাবিমাফিক অর্থ না পেয়ে তালুকদারদের রাজ্য ও গ্রামগুলি ক্রোক করে নেয়। যার ফলে ঋণের বোঝা ক্রমশ মাথার ওপর বেড়েই চলেছে এবং শস্য ছাড়িয়ে আনারও কোনো উপায় নেই। কে জানে, তাদের পরিবারের ওপর কাল কী বিপদ নেমে আসবে!

 

মোটকথা, পুরাতন ইসলামি শাসনব্যবস্থার কল্যাণ ও বরকত তো বোঝাই যাচ্ছে এবং যার স্বীকারোক্তি সকল ঐতিহাসিক দিয়েছেনও। এবং একারণেই যারা বাহ্যতই হিন্দুস্তানকে স্বর্গতুল্য ঈর্ষণীয় বানিয়ে দিয়েছিলেন, তারা, অর্থাৎ মোঘল সম্রাটগণ ইংরেজদের কাছ থেকে ইসলামি শাসনব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখার এবং উত্তরোত্তর উন্নয়নের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ইংরেজরা যেহেতু নিজেদের লোভ-লালসা মেটানো এবং যথাসম্ভব দ্রুতগতিতে সর্বাধিক সম্পদের মালিক হওয়ার প্রবৃত্তি তাতে খুঁজে পায় নি, বরং তাতে হিন্দুস্তানের সাধারণ মানুষের উন্নতি ও অগ্রগতি দেখেছে বটে কিন্তু ইংরেজ জাতির লোলুপ অগ্রগতির প্রভাব তাতে ফুটে ওঠেনি, তাই সেই অঙ্গীকার ছুঁড়ে ফেলা আবশ্যক মনে করেছে এবং তাতে দোষত্রুটির প্রোপাগান্ডা আর নিজেদের ইবলিসি কামনা পূরণের ব্যবস্থাকে মহিয়ান করার কাজ ধীরে ধীরে চালিয়ে গেছে। (যেহেতু একবারে করলে তা বিপজ্জনক হতে পারে।) যার ফলে হিন্দুস্তান দারিদ্র্য ও ধ্বংসের নিপতিত হয়েছে। ন্যায়প্রিয় ও বিবেকবান ইংরেজরা এর বিরোধিতা করা সত্ত্বেও ১৮৫৭ সালের পরেও তা বহাল রাখা হয়েছে এবং ‘ভিক্টোরিয়া’ ঘোষণাকে পশ্চাতে ফেলে রাখা হয়েছে।

ফিলিপ ফ্রান্স, যিনি বাঙ্গাল কাউন্সিলের মেম্বার ছিলেন, লিখেছেন-

যে-কোনো ইংরেজের এই তথ্য শুনে দুঃখ পাওয়া উচিত যে, যখন থেকে কোম্পানি রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা পেয়েছে, দেশবাসীর অবস্থা আগের থেকে আরও খারাপ হয়ে গেছে, আর এটা কোম্পানির ব্যবসা ইত্যাদির ফলেই হয়েছে। আমার মতে, একারণেই এই দেশ এতোদিন একব্যক্তি ও একনায়ক শাসনের অধীনে থাকা সত্ত্বেও উন্নতি-সমৃদ্ধির পথে চলেছে, কিন্তু যখন ইংরেজদের হাতে এসেছে, তখন দেশ ধ্বংসের কিনারে পৌঁছে গেছে।

 

লর্ড ক্লাইভ নিজেই ১৭৬৫ সালে বলেছেন-

যেই অব্যবস্থাপনা দেখছি, তা কিসের পরিণাম? এটা হলো কিছু লোকের লুটপাট করে বিলাসিতার করার লোভ এবং অল্প সময়ে অধিক সম্পদশালী হবার বাসনার পরিণাম; যা কেবল অল্প লোকের পক্ষেই অর্জন করা সম্ভব।

 

মোটকথা, যেইসব আপত্তি ও মানবতার জন্যে লজ্জাজনক হওয়ার অপবাদ ইংরেজদের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই পাওয়া যাচ্ছিলো এবং এখন পর্যন্ত গৃহীত হয়ে থাকে, সেগুলিকে ইসলামি শাসনব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দেয়া কাপুরুষতা ও নির্লজ্জ কর্মকাণ্ড; যা আসলে সর্বদাই ইংরেজ ডিপ্লোমেসির বা হাতের কারিশমা।

 

এরপর মিস্টার হান্টার তার রচিত গ্রন্থের ২২৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

যখন আমরা এই শাসনবিধি ভঙ্গ করতে শুরু করলাম, যা অক্ষুণ্ন রাখার অঙ্গীকার করেছিলাম আমরা, তখন এখানকার বেচারাদের ধরে প্রাণ ফিরে এলো।

 

এখানেও তিনি পরিষ্কারভাবে স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন যে, ইংরেজরা মুসলিম বাদশাদের সামনে অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো, সেই অঙ্গীকার ছিলো ইসলামি ও বাদশাহি আইন-কানুন অক্ষুণ্ন রাখা, কিন্তু তারা সেসব ভেঙে ফেললো। বাকি রইলো এই বিষয়টি যে, এই ভঙ্গ করার দ্বারা এবং ইংরেজ শাসন চালু করার দ্বারা হিন্দুস্তানের সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের ধরে প্রাণ ফিরে এসেছে নাকি প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়েছে। উপরে উল্লেখিত কয়েকটি উদ্ধৃতি, যা আমরা বিভিন্ন গ্রহণযোগ্য বরাতে উল্লেখ করেছি, তা থেকেই বাস্তবতা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যায়। উপরন্তু এ জাতীয় সাক্ষ্যমালা আমরা কলেবর দীর্ঘ হয়ে যাবার আশঙ্কায় খুবই কম উল্লেখ করেছি। হিন্দুস্তানের বতর্মান চূড়ান্ত ধ্বংসশীল অবস্থাও চোখে আঙ্গুল দিয়ে ইংরেজ শাসনামলের পরিস্থিতি বোঝানোর পক্ষে যথেষ্ট।

 

এরপর ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার ২৩০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

এই প্রমাণাদি যতো ভারীই হোক না কেনো, সেইসব নবাবদের তৃপ্ত করতে পারে না, যারা ব্রিটিশ সরকারকে সহায়তা না করার কারণে কঠিন থেকে কঠিন দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হয়েছেন। সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব হাতছাড়া হয়ে যাওয়া মুসলমানদের নিকটে সবচে’ বড় অন্যায় এবং তাদের পুরাতন অর্থব্যবস্থাপনা থেকে আমাদের সরিয়ে রাখা নিশ্চিত অঙ্গীকার ভঙ্গের নামান্তর।

 

উপর্যুক্ত বাক্যগুলোতে মিস্টার হান্টার অন্যায় ও অঙ্গীকার ভঙ্গের দোষ মুসলিমদের বলে আখ্যা দিয়েছেন। (অথচ তিনি ইতোমধ্যেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে, প্রকৃতপক্ষে আমাদের যে অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি ছিলো, আমরা তা বজায় রাখি নি এবং ১৭৬৫ সাল থেকে ওঁৎ পেতে ছিলাম যে, কবে তা ছিন্নভিন্ন করে ফেলা যায়। সুতরাং শতাব্দিকাল ধরে অর্থাৎ ১৮৬৪ সাল পর্যন্ত আমরা ধীরে ধীরে সব ভেঙে চুরমার করে ফেলেছি। জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে তার ওপর পর্দা ফেলে সেই অঙ্গীকারকে ভঙ্গ করা এবং নতুন শাসনব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করাকে উত্তম ও উপকারী সাব্যস্ত করেছি। এবং অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে সেই বাস্তবতাকে ঢেকে রাখতে চেয়েছি, যার সারশূন্যতা নিজেরাই প্রমাণ করেছি।

উপরে কয়েকটি ঘটনা উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ঘোষণা ও অঙ্গীকারের সাথে প্রকাশ্য বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে। এ পর্যায়ে আমি কয়েকটি নতুন ঘটনা বর্ণনা করতে যাচ্ছি, যার সম্পর্ক মুসলমান ও তাদের ধর্মীয় কেন্দ্র ‘পবিত্র স্থানসমূহে’র সাথে।

 

পবিত্র স্থানসমূহ সম্পর্কে ঘোষণা ও প্রতারণা

২ নভেম্বর ১৯১৪ সালে হিন্দুস্তানের ভাইসরয় ‘পবিত্র স্থান’ সম্পর্কে হিন্দুস্তানের মুসলমানদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেনÑ

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও তুরস্কের মধ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার কারণে, যা উসমানি সম্রাজ্যের পক্ষ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো প্রকারের হুমকি-ধমকি ব্যতিরেকেই ভুল পরামর্শের বশবর্তী হয়ে শুরু করেছে, ব্রিটিশ সরকার হিন্দুস্তানের হারএক্সিলেন্সিকে ক্ষমতা দিয়েছে, তিনি যেনো আরবের পবিত্র স্থান ও স্থাপনা, ইরাকের পবিত্র জেরারতগাহ এবং জেদ্দার তীরবর্তী এলাকাগুলো সম্পর্কে সাধারণ ঘোষণা দিয়ে দেন, যেনো ব্রিটিশ সম্রাজ্যের অত্যন্ত আস্থাভাজন হিন্দুস্তানি মুসলিম প্রজাগণ এই যুদ্ধ সম্পর্কে কোনো ধরনের ভুল ধারণার শিকার না হয়। কেননা, ধর্মীয় বিষয়ের সঙ্গে এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ঘোষণা হচ্ছে যে, এই সকল পবিত্র স্থান ও স্থাপনা এবং জেদ্দা অঞ্চল ব্রিটিশদের নৌ ও স্থল সেনাদের আক্রমণ ও অভিযান থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে, যেনো এ-সময়ে হিন্দুস্তানি হাজি ও জেয়ারতকারীদের যাতায়াতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। ব্রিটিশ সম্রাজ্যের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা আসায় ফ্রান্স ও রাশিয়ান সরকারও একই ধরনের আশ্বাস দিতে থাকে।

 

ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যেই সেই আশ্বাস গুড়িয়ে দেয়া হয়। ১৯১৬ সালে জেদ্দার উপকূলবর্তী অঞ্চলে টানা আটদিন গোলাবর্ষণ করা হয়। এরপরে সেখানে সেনাবহর নেমে আসে এবং সেই সেনাবহরের মাধ্যমে জেদ্দা থেকে মক্কা মোয়াজ্জমায় আক্রমণ করা হয়। তুর্কি গভর্নর ও অফিসারদের প্রথমে জেদ্দায় অস্ত্র ফেলে দিতে বাধ্য করে বন্দি করা হয় এবং মিশরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর মক্কা মোয়াজ্জমায় কাশলা ও দুর্গের ওপর গোলাবর্ষণ করানো হয়। এরপর যখন অপারগ হয়ে তুর্কি অফিসাররা অস্ত্র পেলে দেয়, তখন তাদেরকেও বন্দি করে মিশর পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর তায়েফে হামলা চালায় এবং প্রায় আড়াইমাস অবধি গোলাবর্ষণ করতে থাকে, তুর্কি সৈনিকরা অস্ত্র ফেলে দিলে তাদেরকেও বন্দি করে মিশর প্রভৃতি স্থানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। যেহেতু আমি (লেখক) হেজাজে (তায়েফে) হজরত শায়খুল হিন্দের সাথে অবস্থান করছিলাম, তাই এইসব ঘটনা সত্য সত্য অবগত হতে পেরেছি। অবস্থাটা এমন ছিলো, প্রথম প্রথম যখন ১৯১৪ সালে যুদ্ধের ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়লে ছ-সাত মাস পর্যন্ত ইংরেজদের অত্যন্ত আস্থা ও ভরসার প্রতীক নৌশক্তির মাধ্যমে চানাক দুর্গ দখল করা সম্ভব হয়নি এবং সকলে একযোগে হামলা করার পরেও কয়েক হাজার সৈন্য খুইয়ে ফিরে যেতে হয়। তুর্কিদের বাহাদুরি ও সাহসিকতার সামনে চূড়ান্তভাবে লজ্জিত হতে হয়। তাই তারা নিজেদের বীরত্বপূর্ণ লড়াই থেকে নিরাশ হয়ে পুরানো চক্রান্ত ও কূটনীতিকে কাজে লাগানো জরুরি মনে করে এবং মক্কার গভর্নর শরীফ হোসাইনের নামে বার্তা পাঠায় ও ষড়যন্ত্র শুরু করে। মিশরে জেনারেল ম্যাকমোহন এবং হেজাজ ও আরবে কর্নেল লরেন্স ছিলো এর মূল হোতা। শরীফ হোসাইন ইউনাইটেড আরব ও তার প্রেসিডেন্ট বানাবার স্বপ্ন দেখানো হয় এবং তাকে অঢেল অর্থ দিয়ে সাহয্য করা হয়। একই সাথে তার গভর্নর নেয়ামত তুর্কিকে বিশ্বাসঘাকতার জন্যে উস্কে দেয়া হয়। প্রথমে হেজাজে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সেখানকার অধিবাসীদের শান্তি ও জীবিকার ক্ষেত্র সংকীর্ণ ফেলা হয়, এরপর শরীপের মাধ্যমে, যিনি ততোদিনে তাদের নি:শ্বাসে বিশ্বাসে মিশে গিয়েছেন, ৫ জুন ১৯১৬ সালে বিদ্রোহের ঘোষণা দেয়া হয়। শরীফের বেদুঈন সেনাদের মাধ্যমে মদিনা মুনাওয়ারা, জেদ্দা, তায়েফ ও মক্কা মুয়াজ্জমায় হামলা করানো হয়। কিন্তু তার বেদুঈন সেনারা তুর্কিদের নিয়মতান্ত্রিক যোদ্ধাদের বিপরীতে বিজয় লাভ করতে পারে নি এবং তাদের অস্ত্র সমর্পণ করা কিংবা শহরের দখল ছেড়ে দিতেও বাধ্য করতে পারে নি। তখন শরীফ হোসাইন গোলাবর্ষণের (যা ছিলো গোত্রগুলির মধ্যকার সম্পাদিত পারস্পরিক সন্ধির খেলাফ) এবং নিয়মতান্ত্রিক সৈন্যবাহিনী দিয়ে মক্কায় হামলা করার জন্যে একটু সুচতুর চালবাজি করলেন। তিনি আদেশ দিলেন, মক্কা ও জেদ্দার অধিবাসীদের স্বাক্ষরনামা নিয়ে ইংরেজ নৌসেনাপতিদের কাছে পাঠানো হোক, যেখানে লেখা থাকবে যে, আমাদেরকে তুর্কি সেনাদের করায়ত্ত থেকে মুক্ত করো, আমরা নিরুপায় হয়ে পড়েছি। সুতরাং জোরপূর্বক শহরের বিভিন্ন মানুষের থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয় এবং কামানবাহী নৌসেনাদের কাছে সেই স্বাক্ষরনামা পাঠানো হয়, সুতরাং তাদের কাছে পৌঁছানো মাত্রই গোলাবর্ষণ শুরু হয়ে যায়।

কর্নেল নিজেই লিখেছেন-

১৯১৬ সালে হেজাজের বাদশাকে আমরা মিত্রশক্তিকে সহায়তা করার জন্যে রাজি করিয়েছি।

 

লন্ডন টাইমস লিখেছে-

জেদ্দা উপকূলে ইংরেজ রণতরী গোলাবর্ষণ করে। টাইমসের প্রতিবেদক এটাই লিখেছেন- এই কর্মতৎপরতা বিদ্রোহীদের সাহায্য করেছে। যদিও ব্রিটিশ সেনারা তিন হাজার ফিট কিংবা সর্বোচ্চ তিন হাজার গজ দূরত্ব থেকে সামনে অগ্রসর হতে পারে নি এবং বিভিন্ন অপ্রতিকারযোগ্য বাধার কারণে গোলাবর্ষণ করা দুষ্কর হয়ে গিয়েছিলো।

 

কিন্তু এইসব তৎপরতার খবর হিন্দুস্তান থেকে একেবারেই আড়াল করে রাখা হয়। দীর্ঘ একটি সময় পড়ে যখন হিন্দুস্তানে এই সংবাদ এসে পৌঁছে, তখন চারিদিকে আগুন জ¦লে ওঠে; যার প্রকৃতি সম্পর্কে সবারই জানা আছে, তাই নতুন করে বর্ণনা করা প্রয়োজন দেখছি না। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এমন খোলামেলা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও গাদ্দারি করার পরও আজাদি আন্দোলনের বিরোধিতা করা হয়ে থাকে।

 

বিশেষভাবে মুসলমানদের ধ্বংস করা

সাধারণভাবে ইউরোপীয়ানরা এবং বিশেষভাবে ইংরেজরা সমগ্র এশিয়া ও আফ্রিকাবাসীদের সঙ্গে শত্রুতা করে আসছে এবং তাদেরকে হিংস্র, অসভ্য, মানবতাবোধহীন ইত্যাদি বলে তাদের সম্মান, সম্পদ, সম্পদ অর্জনের উপকরণ প্রভৃতি অত্যন্ত বর্বরভাবে লুণ্ঠিত করে চলেছে। তবে বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর ইংরেজ-ইউরোপীয়ানদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দেরও শৌণদৃষ্টি সর্বদাই বলবৎ ছিলো এবং মুসলিমদের শত্রুদের ভয়াবহ আগুনে নিক্ষেপ করে যাচ্ছিলো। এই দৃষ্টিকোণ থেকে হিন্দুস্তানে মুসলমানদের উৎখাত করা এবং ধ্বংসের অতলে ফেলে দেয়ার জন্যে সবচে’ বেশি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে তখন থেকে, যখন মুসলমানদের বাদশা দেওয়ানি ক্ষমতার লাগাম তুলে দেয়ার মাধ্যমে প্রকারন্তরে বাংলা,আসাম, বিহার, ঊড়িষ্যা ইংরেজদের দিয়ে দিলেন। উচিত তো ছিলো, এতো বড় পুরস্কার যেই বন্ধুদের হাত ধরে এসেছে, তাদের কৃতজ্ঞ হওয়া এবং তাদের প্রতি বিশ^স্ততা ও নেমক হালালির আচরণ করা। কিন্তু বজ্জাতকে অনুগ্রহ করাই ছিলো আসলে বড় ভুল। কবি বলেছেন-

ভালো কিছু করলে জেনেবুঝে করো। যদি ভালো মানুষ ভিন্ন ভালো কিছু করো, তবে সেটা প্রকারন্তরে খারাপ কাজই হবে।

 

বাদশা আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান, আলমগীর ও তাদের উত্তরসূরিরা নিতান্ত ভুল করেছেন যে, তারা এমন নীচ ও হীনজাতকে নিজেদের দেশে থাকা ও নাগরিক অধিকারসহ বাণিজ্য করার অনুমতি দিয়েছেন এবং বারংবার তাদের অসৌজন্য দেখে, অভিজ্ঞতার ঘাঁ খেয়েও এগিয়ে চলবার ছাড়পত্র দিয়ে গেছেন। ক্যাপ্টেন আলেক্সান্ডার হ্যামিল্টন তার ভ্রমণকাহিনীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের ষড়যন্ত্র, তাদের ওপর রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী নিযুক্ত করা, দিল্লীতে বাদশার দরবারে ইংরেজ ডেপুটেশনের (যার অন্যতম একজন সদস্য ছিলেন তিনিও) আগমন এবং বাদশার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে ইংরেজ অপরাধীদের ছাড়িয়ে নেয়ার বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এ ছাড়াও মোঘল বাদশারা ইংরেজদের ওপর ভরসা করে উচ্চপর্যায়ের কয়েকটি পদও দান করেছিলেন। ফলশ্রুতিতে যা কখনো না হওয়ার ছিলো, তা-ই হলো।

 

মুসলিম জনসাধারণের কর্মদক্ষতা

যাই হোক, ইংরেজরা দেওয়ানি ক্ষমতা লাভ করামাত্রই মুসলমানদের সঙ্গে সতীনসুলভ আচরণ শুরু করে। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় পদ থেকে মুসলমানদের ছাঁটাই এবং শূন্যপদগুলি নিজেদের লোকজন কিংবা মুসলমানদের শত্রুজনদের দ্বারা ধীরে ধীরে ভরাট করতে থাকে। অথচ সে-যুগে সমস্ত সরকারি ও সামরিক পদে মুসলমানদের আধিক্য ছিলো এবং মুসলমানদের মধ্যে উচ্চমার্গের রাজনৈতিক ও সামরিক যোগ্যতা বিরাজ করছিলো।

ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার ৩৩৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

আসল কথা হলো, যখন এই দেশ আমাদের করতলে এলো, তখন মসুলমানরাই ছিলো এখানকার শ্রেষ্ঠ জাতি। তারা কেবল অন্তরের দৃঢ়তা ও বাহুর বলিষ্ঠতায়ই সেরা ছিলো না, বরং রাজনীতি ও প্রজ্ঞা-কুশীলতায়ও ছিলো সবার চেয়ে অগ্রণী। কিন্তু এতোকিছু সত্ত্বেও মুসলমানদের জন্যে সরকারি চাকরি-বাকরির দরোজা বন্ধ ছিলো এবং বেসরকারি জীবনঘন্ষ্ঠি ক্ষেত্রগুলিতেও তাদের কোনো উল্লেখযোগ্য অবস্থান বজায় নেই।

 

২৩৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

এক শতাব্দি পূর্বে রাষ্ট্রের সকল দায়িত্বশীল পদগুলোর ওপর মুসলমানদের পরিপূর্ণ দখল ছিলো। হিন্দুরা কেবল কৃতজ্ঞতার সাথে সেই টুকরোগুলি কুড়িয়ে নিতো, যা তাদের প্রাক্তন বিজয়ীরা নিজেদের দস্তরখান থেকে তাদের দিকে ছুঁড়ে দিতো; আর ইংরেজদের অবস্থান ছিলো অনেকটা গোমস্তা ও ক্লার্কের মতো।

 

২২২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

সারকথা মুসলিম নবাবগণ ছিলেন বিজেতা এবং সেই প্রভাব রাষ্ট্রের সর্বত্র পরিলক্ষিত হতো। কোথায় কখনো কোনো হিন্দু সুদক্ষ অর্থনীতিবিদ কিংবা কোনো হিন্দু জেনারেলও উল্লেখযোগ্য অবস্থান অর্জন করেছেন বলেও দেখা যেতো। এইসব উপমার উপস্থিতিই এটা প্রমাণ করে যে, এমন হতো খুবই কম।

 

ড. হান্টার ২৩১ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

কিন্তু এরপরও চিন্তা করা উচিত, যতো হিন্দুস্তানি সিভিল সার্ভিসে জয়েন করতো কিংবা কোর্টের জজ হিসেবে নিয়োগ পেতো, তাদের মধ্যে একজনও মুসলমান নেই। অথচ এই দেশ আমাদের হাতে আসার কিছুকাল পর পর্যন্তও রাষ্ট্রের সকল কাজ মুসলমানদের হাতেই সম্পাদিত হতো; যেমনটা আমরা ইতোমধ্যে লিখেছি।

 

২৩২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

কোম্পানির প্রথম পঞ্চাশ বছরের শাসনকালে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটি ছিলো মুসলমানদেরই, কিন্তু দ্বিতীয় অর্ধশতকে এসে বাতাস বদলে গেলো।

 

২৪৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

ইংরেজরা হিন্দুস্তান দখলকারী হয়ে ওঠার পূর্বে তাদের (মুসলমানদের) কেবল রাজনৈতিক কারণে নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির কারণেও মান্য করা হতো।

 

২৬৫ পৃষ্ঠায় ইসলামি দিনগুলির ছুটিছাটা সম্পর্কে লিখেছেনÑ

সেই জাতি, যাদের একসময় হিন্দুস্তানের সকল কোর্ট-কাচারির পদগুলোতে সফল বিচরণ ছিলো, তারা এতেটাই অপদস্থ হয়ে গেছে। যাই হোক, হয়তো এটা জেনে নেয়াও সান্ত¡নার বিষয় হতে পারে। নয়তো এই অন্যায় কার্যকর করার অনুমোদন তাকে দেওয়া হয় নি। অথচ আজ রাষ্ট্রপ্রধান হস্তক্ষেপ করলেন এবং প্রজ্ঞার সাথে ইসলামি ছুটিছাটার জন্যে কয়েকটি দিন নির্ধারণ করে দিলেন। অবশ্য তা মুসলমানরা যতোদিন চেয়েছিলো, ততোদিন নয়।

 

মিস্টার হেনরি হেরিংটন টমাস (বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের পেনশনার) ১৮৫৭ সালে স্বরচিত গ্রন্থে লিখেছেন-

শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মদক্ষতার দিক থেকে মুসলিমগণ হিন্দুদের থেকে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ এবং তাদের তুলনায় হিন্দুদের মক্তবের শিশু মনে হয়। তা ছাড়া মুসলমানদের মধ্যে কর্মতৎপরতা বেশি হয়ে থাকে, যার কারণে সরকারি চাকরি-নকরি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারাই পেয়ে থাকে। এভাবে সরকারি কাজকর্ম ও রাষ্ট্রীয় রীতিবিধি সম্পর্কে তারা ওয়াকিফহাল হওয়ার সুযোগ পেয়ে যায় বেশি এবং তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবানুগ হওয়ার সক্ষমতা অধিক অর্জন করে।

 

মুসলমানদের ধ্বংস করার তরিকা

যদিও মুসলমানদের সরানোর কাজটি ইংরেজরা ১৭৬৫ সাল থেকে শুরু করেছিলো এবং এভাবে সরতে সরতে শতবর্ষ পার হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু তারপরও ১৮৫৭ সালে অন্যান্যদের ওপর তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রায়োগিক যোগ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব ততখানি ছিলো, যা হেরিংটন টমাস বর্ণনা করেছেন। এর দ্বারা অনুমান করা যায়, তাদের রাজনৈতিক ও দেশ পরিচালনার যোগ্যতা ইতিপূর্বে কতখানি ছিলো। এর প্রথম প্রমাণ হিন্দুস্তানে ইংরেজ আগমনের পূর্বে সর্বক্ষেত্রে মুসলমানদের উর্ধ্বগতি ও দিন দিন তাদের উন্নতি ও অগ্রগতি দেখে অনুধাবন করা যেতে পারে। কিন্তু ইংরেজরা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করা, রাজনৈতিক প্রভুত্ব ও ভবিষ্যতের সুরক্ষার নামে যা করেছে, তার সাক্ষ্য নি¤েœাক্ত উদ্ধৃতিগুলো থেকে পাওয়া যেতে পারে।

 

মুসলিম বিচারকদের বরখাস্ত করা

ড. হান্টার ১৯৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

মুসলিম বাদশাদের বাহ্যিক শ্রেষ্ঠত্ব ক্ষুণœ করার বহুপূর্ব থেকেই আমরা মুসলিম বিচারকদের পদচ্যুত করা শুরু করেছিলাম।

‘হুকুমতে খোদ এখতিয়ারি’ গ্রন্থের লেখক ১৪ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

হিন্দুস্তানে ইংরেজি কার্যকরণের একটা বিশেষত্ব হলো, প্রথম থেকেই হিন্দুস্তানের উচ্চপর্যায়ের পদগুলো (যেসব পদের অধিকারী ছিলেন মুসলিমগণ) থেকে হিন্দুস্তানিদের পুরোদস্তুর বরখাস্ত করা। আইন প্রণয়ণ এবং দেশের লোকদের মধ্যে ন্যায়বিচার করার ক্ষেত্রে তাদের কোনো ইচ্ছাধিকার আর অবশিষ্ট ছিলো না। কার্যকরণের এই বিশেষ দিকটির ক্ষতিকর প্রভাব আন্দাজ করতে পেরেছিলেন স্যার টমাস মনরো খুব ভালোভাবেই; যা তিনি রিপোর্টে নি¤েœাক্ত বাক্যাবলির মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন-

“আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই এবং আইনের কার্যপ্রকরণেও তাদের জায়গা খুব কম। সামান্য কয়েকটি ছোটো ছোটো পদ রয়ে বটে, কিন্তু কোনো বড় পদে তারা পৌঁছতে পারবে না, চাই তা সামরিক হোক কিংবা বেসামরিক (সিভিল)। তাদেরকে একটা নগণ্য সংখ্যালঘু জাতির সদস্যদের মতো গণ্য করা হচ্ছে। যাবতীয় সামরিক ও আর্থিক পদের মধ্যে যা-ই কিছুটা গুরুত্ববহ হতে পারে, এখন তা ইউরোপীয়ানদের দখলে; যাদের উদ্বৃত্ত অর্থ স্বয়ং তাদের দেশ চালিয়ে নিতে পারে।”

 

এই সকল বড় বড় পদ ও উচ্চপদস্থ চাকরির সুবিধা থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে, তাদের অযোগ্যতার কারণে নয়, বরং তা কেবল তারা হিন্দুস্তানি সহকর্মী এবং মুসলমান হওয়ার কারণে। আমরা পূর্বে লিখেছি যে, স্বয়ং ইরেজ দায়িত্বশীলদের স্বীকারোক্তি আছে যে, হিন্দুস্তানি মুসলমানগণ নিরীক্ষণ শক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির দিক থেকে ইংরেজদের থেকে বহুগুণে সেরা ছিলো।

 

[লেখক পরিচিতি : হোসাইন আহমেদ মাদানি ছিলেন ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলামবেত্তা। ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের সঙ্গে মিলে তিনি ভারত স্বাধীনতা আনেদালনে অসামান্য অবদান রেখেছেন। জন্মগ্রহণ করেন ৬ অক্টোবর ১৮৭৯ উত্তর প্রদেশের উন্নাও জেলায়। ভারতের এতিহাসিক বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে লেখাপড়া করেছেন এবং ১৮ বছর ধরে মদিনায় বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদান করেছেন। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশের সিলেট  ও কলকাতায় হাদিসের অধ্যাপনা করেছেন। প্রায় ২৮ বছর দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান শিক্ষক এবং শাইখুল হাদিস পদে

দায়িত্বপালন করেছেন। হাদিস ও ফিকহে তার পান্ডিত্যের জন্য তাকে শাইখুল ইসলাম উপাধি দ্বারা সম্বোধন করা হয়। রেশমি রুমাল আন্দোলনের কারণে দণ্ডিত শিক্ষক ল হাসানের সঙ্গে  তিন বছর মাল্টা দ্বীপে নির্বাসিত জীবন কাটান। তিনি দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরোধী ছিলেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন ছিলেন। বহুগ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি, এরমধ্যে সালাসিলে তাবিয়্যাহ, ফাতাওয়ায়ে শায়খুল ইসলাম, মুত্তাহেদায়ে ক্বাওমিয়া আওর ইসলাম প্রধান। নকশে হায়াত নামে একটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থও লিখেছেন ।

১৯৫৪ সালে তিনি ভারত সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘পদ্মভূষণ’ পুরস্কার লাভ করেন । ভারতের ডাকবিভাগ ২০১২ সালে তার প্রতিকৃতি অঙ্কিত ডাকটিকেট প্রকাশ করে।]

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১