গুয়ান্তানামো বে। নামটা শুনলেই সমস্ত শরীর কেমন শিউরে ওঠে! পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও ভয়াবহতম জিন্দানখানা। জিন্দানখানাটির মালিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মানবতার বুলি কপচিয়ে যারা সাধু সেজে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের বাইরে কিউবার দক্ষিণ-পূর্ব পাশে ক্যারিবীয় সাগরের একটি উপসাগর গুয়ান্তানামো। মার্কিন নৌবাহিনীর একটি ঘাঁটি আছে এখানে। জায়গাটার নাম কিউবা। মার্কিন সরকার ১৯০৩ সালে ৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটি অধিগ্রহণ করে নিজেদের দখলে এনেছিল। এখানে, এই নৌঘাঁটিতেই ২০০২-এর ১১ জানুয়ারি তাঁরা নির্মাণ করে কুখ্যাত গুয়ান্তানামো বে কারাগারটি।
নির্যাতনের বোধহয় এমন কোনো কায়দা নেই, যা এখানে প্রয়োগ করা হয় না। অবাক করা ব্যাপার হলো, এখানের কোনো বন্দিই নিয়মতান্ত্রিক বিচারে দণ্ডপ্রাপ্ত না, স্রেফ সন্দেহের বশে তাদেরকে এখানে নিয়ে আসা হয়, তারপর তথ্য আদায়ের বাহানায় বিনা বিচারে চলতে থাকে নির্যাতনের স্টিম রোলার। মার্কিন স্বার্থ-বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত সন্দেহে আটক এসব কয়েদিদের অধিকাংশই আখেরে একদম নির্দোষ প্রমাডুত হন। আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আট বছর গুয়ান্তানামোর নির্যাতন-সেলে বন্দি থাকার পর ১৯৮ জনের মধ্যে ১৩০ জনেরও বেশি বন্দি নির্দোষ খালাস পেয়েছে।
গুয়ান্তানামো ফেরত এমনই এক হতভাগ্য আলেম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুফতি মুবারক হোসেন। টানা পাঁচটি বছর মর্ত্যরে এ নরকে নিরীহ নির্দোষ মানুষটা সীমাহীন নির্যাতন ভোগ করেছেন। মার্কিনিদের নিপীড়ন এবং তাঁর জীবনের জিল্লতির সেই দাস্তান শুনতে কার না লোভ জাগে! মুবারকের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার অজপাড়া এক গ্রামে। গ্রামের নাম মৈন্দ।
এক সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী বাসে চেপে বসলাম। গন্তব্য মুফতি মুবারকের নিবাস, মজলিশপুরের মৈন্দ গ্রাম। দুপুরের দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিশ্বরোড মোড়ে নামিয়ে দিল হানিফ এন্টার প্রাইজ। সেখান থেকে স্থানীয় পাবলিক বাসে চড়ে বাড়িউড়া। বাড়িউড়া থেকে রিকশাযোগে আঁকাবাকা গ্রামঢু পথ মাড়িয়ে মৈন্দ মধ্যপাড়া জামে মসজিদে। দৃষ্টিনন্দন গেঁয়ো এই মসজিদেই বর্তমানে ইমামতির দায়িত্ব পালন করছেন মুফতি মুবারক। তাঁর সাথে ফোনে যোগাযোগ করেছিলাম আসার আগে। আসার পথে গাড়ি থেকেও কয়েকবার কথা হয়েছে। মসজিদের সামনে রিকশা থামতেই দেখলাম একজন মাওলানা দাঁড়িয়ে আছেন। বুঝতে কষ্ট হলো না, ইনিই মুফতি মুবারক, আমার কাক্সিক্ষত মেজবান। রিকশা থেকে নেমে মুসাফা করলাম। হাতে ধরে তিনি নিয়ে গেলেন ভেতরে। হালপুরস্তির পর জানতে চাইলাম তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া নিপীড়নের দীর্ঘ ফিরিস্তি। করুণ একটা হাসি ফুটে ওঠে মুবারকের চেহারায়। হাসিটা ঠোঁটের কোণায় ধরে রেখে ভাবলেশহীন কণ্ঠে তিনি শুরু করেন নিজের জীবনের নির্মম দাস্তান-
‘আমার বাবা একজন আলেম। রাজধানীর একটি মসজিদের ইমাম। ছয় ভাই দুই বোনের মধ্যে আমি সবার বড়। ছোটবেলা থেকেই আমরা ইসলামি অনুশাসনের ভেতর বড় হয়েছি। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় আমাকে নিয়ে মা-বাবার একটু বেশি স্বপ্ন ছিল। ১৯৯৮-তে রাজধানীর মুহাম্মদপুরস্থ জামিয়া রাহমানিয়া সাত মসজিদ থেকে আমি দাওরা পাশ করি। শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ.-এর কাছ থেকে গ্রহণ করি বোখারির সনদ। তারপর সেখানেই আরো এক বছর তাফসির পড়ি। ১৯৯৯ ইংরেজিতে তাখাসসুস ফিল ফিকহি ওয়াল ইফতা অধ্যয়নের জন্য মুরব্বিদের পরামর্শে পাকিস্তানের করাচি গমন করি। ভর্তি হই নিউ করাচির জামিয়া আনোয়ারুল কুরআনে। পড়ালেখা আর অধ্যয়ন আমার কাছে নেশার মতো ছিল। জামিয়া আনোয়ারুল কুরআনে গভীর অধ্যাবসায়ের ভেতর কিভাবে দুটি বছর অতিবাহিত করলাম, টেরই পাইনি। আনোয়ারুল কুরআনে আমার কিছু আফগান সহপাঠী ছিল। আফগানরা প্রকৃতিগতভাবেই যোদ্ধা জাতি। প্রচণ্ড আত্মমর্যাদাশীল। আত্মমর্যাদায় তাদের এতটুকুন আঘাত লাগলে আর কোনো কথা নেই-লাগাও যুদ্ধ। আফগান সহপাঠীদের কাছ থেকে নানা সময় তাদের গল্প শুনতাম। শুনতাম আফগানের পাহাড়-প্রকৃতির বর্ণনা। এজন্যে আফগান নিয়ে আমার ভেতর আলাদা একটা আগ্রহ কাজ করত সবসময়।
২০০১ সালের নভেম্বরের শুরুর দিকে পরীক্ষা-পরবর্তী দীর্ঘ ছুটি হয় মাদরাসা। ছুটির দিনগুলো কিভাবে কাটাব ভাবছিলাম। একাধারে দুই বছর যাবত এক জায়গায় পড়ে আছি। এই দুই বছরে নিউ করাচির বাইরে কোথাও বেরোনো হয়নি। কেমন একটা একঘেয়েমি পেয়ে বসেছিল নিজেকে। করাচির বাইরে কোনো জায়গা থেকে ঘুরে এলে একঘেয়েমিটা হয়ত কেটে যেত। মনটাও একটু ফ্রেশ হত। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায়? আমার আবার যেনতেন জায়গায় ঘোরাটাও ভালো লাগে না। হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি এল- আফগানিস্তান থেকে একটা সফর দিয়ে এলে কেমন হয়! আফগানে তখন তালেবান-শাসন চলছিল। ইসলামি খেলাফত রাষ্ট্রের আদলে তারা গড়ে তুলেছিল এক নয়া আফগানিস্তান। সমস্ত বেহায়া-বেলেল্লেপনা দূর করে ইনসাফ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করায় ইসলামি দুনিয়ায় অনন্য এক মর্যাদায় সমাসীন হয়েছিল আফগানভূমি। পশ্চিমা মিডিয়া যদিও নানা অপপ্রচার চালাত তাদের নিয়ে, তবুও আফগান সহপাঠীদের বরাতে তালেবানের সুশাসনের ব্যাপারটা আমার অজানা ছিল না। একে তো আফগানের অপরূপ পাহাড়-প্রকৃতি, স্বভাবজাত যোদ্ধা জাতি- তার উপর তালেবানের ইসলামি শাসন, সব মিলিয়ে আফগানিস্তান আমার মননে-মানসে একটি স্বপ্নভূমি হয়ে হাজির হয়েছিল। তাছাড়া শুনেছি বেশ ক’জন সাহাবির সমাধিও আছে দেশটির নানা জায়গায়, এক উসিলায় তাদের মাকবারাগুলোও জিয়ারত হয়ে যাবে। এসব নানাবিধ কারণে আফগান-সফরের চিন্তাটা মাথায় আসতেই আমার সমগ্র সত্ত্বা এর পক্ষে জেগে ওঠে। আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই, ছুটির দিনগুলো আফগান-পাহাড়ের কন্দরে কন্দরেই কাটাব।
আফগানি সহপাঠীরা মাদরাসা যেদিন বন্ধ হয় সেদিনই চলে গেছে। তারাও আমাকে অনেকদিন ধরে বলছিল তাদের দেশ থেকে ঘুরে আসতে। যাবার দিনও অনেক জোরাজুরি করে গেছে। আফগানি এক সহপাঠী রফিকুল ইসলাম। সে জোরাজুরি করেছে সবচেয়ে বেশি। যাবার সময় তার বাড়ির ঠিকানাও লিখে দিয়ে গেছে। কিন্তু তখন পর্যন্ত কল্পনাও করিনি আমি কখনো আফগানিস্তান যাব। অন্যথায় তাদের সাথেই চলে যেতাম। এখন যেতে হবে একা, একা একাই ঘুরতে হবে। আফগান রাষ্ট্রটি দেখার, আফগান পাহাড়ের কন্দরে কন্দরে খুলাফায়ে রাশেদিনের সুশাসনের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি অবলোকন করার তাড়না আমার ভেতরে এতটাই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল যে, সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা একটা দেশে একা একা গাইডহীনভাবে যে যাচ্ছি, এই চিন্তাটা একবারও মাথায় আসেনি।
যাই হোক, অইদিন রাতেই ব্যাগ-ব্যাগেজ সব গুছিয়ে ফেলি। পরদিন ভোরবেলা রওনা হই আল্লাহর নাম নিয়ে। তখনকার সময়ে পাকিস্তান থেকে সীমান্তপথে আফগানিস্তান যাওয়া-আসা করাটা খুব কঠিন কিছু ছিল না। একটু তদবির করলেই হয়ে যেত। আমি করাচি থেকে প্রথমে কোয়েটা যাই। সেখান থেকে বুলদান সীমান্ত হয়ে নিরাপদে ঢুকে পড়ি আফগানিস্তানে, আমার স্বপ্নের দেশে। সেরেফ একাই যাই আফগানিস্তানে। ভরসা কেবল বন্ধু রফিকের বাড়ির ঠিকানা। রফিকের বাড়ি রাজধানী কাবুলে। তাই সীমান্তপথে প্রবেশ করে সোজা কাবুলের পথ ধরি। দীর্ঘ জার্নি এবং অনেক খোঁজাখটুজির পর গিয়ে হাজির হই রফিকের বাড়িতে।
এরই ভেতর নাইন-ইলেভেন সংঘটিত হয়। ধ্বসে পড়ে আমেরিকার টুইন টাওয়ার। মার্কিন সরকার দোষারোপ করে আফগানে অবস্থানরত উসামা বিন লাদেনকে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নাম করে আফগানের উপর আক্রমণ শুরু করেন। আফগানের চারিদিকে যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। অজানা আতঙ্ক কাজ করছে সবার ভেতর। ভিনদেশি এক মুসাফির আমি। আফগানের এই পরিস্থিতি আমাকে শঙ্কিত করে তোলে। দ্রুত গন্তব্যে ফেরার তাড়না অনুভব করি।…’
তন্ময় হয়ে শুনছিলাম মুফতি মুবারকের আত্মকাহিনি। এরই ভেতর মধ্য পাড়া মসজিদের মাইক সরব হয়ে ওঠে। জোহরের আজান। আজান শুরু হতেই মুফতি মুবারক থেমে যান। চোখ বন্ধ করে অনুচ্চ স্বরে জবাব দেন আজানের। আজান শেষে আমাকে নিয়ে ওঠেন- ‘বাকি কথা নামাজের পরে হবে, এখন আমরা নামাজের প্রস্তুতি নিই?’ আমি মাথা নেড়ে মেজবানের প্রস্তাবে সমর্থন দিই। অজু সেরে মসজিদে প্রবেশ করে সুন্নত নামাজ আদায় করি। খানিক পর জামাত শুরু হয়। মুফতি মুবারক ইমাম।
নামাজ শেষে মুসল্লিদেরকে জরুরি কিছু মাসলা-মাসায়েল আলোচনা করে শোনান তিনি। তারপর আমাকে নিয়ে নিজের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। মসজিদ থেকে পায়ে হাঁটা পথে মিনিট দশেক লাগে। না না করা সত্বেও মুফতি মুবারক দুপুরের দস্তরখান মেলে ধরেন আমার সামনে। সুগন্ধি চালের পোলাও, মোরগের রোস্টসহ খাবারের নানা আইটেমে দস্তরখান সাজানো। চিন-পেহচানহীন এক মেহমানের জন্য মুফতি মুবারকের এই মেহমান নাওয়াজি রীতিমতো বিস্মিত করে আমাকে।
খাবারপর্ব শেষে মুফতি মুবারককে নিয়ে আবারও বসলাম। পূর্বের গল্পের রেশ ধরে তিনি শুরু করলেন- ‘আফগানের ভীতিকর এই পরিস্থিতিতে আমি প্রচণ্ড ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে পড়ি। আমার সহপাঠী মেজবান রফিককে বলি, আমি দ্রুত পাকিস্তান ফিরতে চাই। ইতোমধ্যেই সীমান্ত পারাপার বেশ একটা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। রফিক অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আমার ফেরার ব্যবস্থা করে। কাবুল থেকে জালালাবাদ হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ঝামেলা-ঝঞ্ঝাটহীন অনেকটা নিরাপদেই পেশোয়ার সীমান্ত দিয়ে আমি পাকিস্তানে ফিরি। সীমান্ত দিয়ে যখন প্রবেশ করি তখন গভীর রাত। সীমান্ত থেকে আধাঘণ্টার পায়ে হাঁটা পথ পাড়ি দিয়ে একটা মসজিদ পাই। ফজরের সময় প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। বিরামহীন দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিও আমাকে কাহিল করে ফেলেছে। মসজিদের অজুখানায় অজু করে কিছুটা ফ্রেশ হই। তারপর খোলা বারান্দায় হালকা বিশ্রাম নিতে নিতে আজানের অপেক্ষা করি। খানিকপর মুয়াজ্জিনের ঘুমজড়ানো ভাঙা ভাঙা কণ্ঠের আজান ভেসে আসে মসজিদের মিনার থেকে। নির্ধারিত সময়ে ফজরের জামাত দাঁড়ায়। নামাজ শেষ করে মসজিদ চত্বর থেকে বেরিয়ে আসি।
জায়গাটা ছিল আমার কাছে একদম অপরিচিত। এখান থেকে করাচি যাবার পথ আমার জানা ছিল না। এক যুবককে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘করাচি যেতে চাই, সহজ রোডটা বলতে পারবেন?’ যুবক জানতে চাইল আমি কোথা থেকে আসছি। আমি সরল দিলেই তাকে জানাই, আফগানিস্তান থেকে। হায়, এই জানানোটাই যে আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে, কে জানত! যুবকের সাথে একটা গাড়ি ছিল। বলল, সেও করাচি যাবে, আমি চাইলে তার গাড়িতে লিফট নিতে পারি। এক গাড়িতে করাচি পৌঁছে যাব ভেবে আমি সাত-পাঁচ চিন্তা না করে যুবকের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই। কিছুপথ চলার পর আবিস্কার করি যুবক গাড়িটা নিয়ে একটা থানায় ঢুকছে। কী হতে যাচ্ছে, তখন পর্যন্ত আমি কল্পনাও করতে পারিনি। যুবকটা ছিল পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্য। ব্যাপারটা বুঝতে পারি, যখন সে আমাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে, তখন। পুলিশকে কী যেন বলে সে কানে কানে। তারপর পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে। আমি অসহায়ের মতো তাকাই যুবকের দিকে। যুবকের ঠোঁটে তখন একটা শয়তানি হাসি লেপ্টে আছে। আমি তাকে শুধু এতটুকু বলি, একজন অসহায় মুসাফিরের সাথে তুমি যে আচরণটা করলে, আল্লাহ তোমাকে এর যথোপযুক্ত বদলা দেবেন।
পেশোয়ারের সীমান্তবর্তী এই থানায় আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, কেন আফগানিস্তান গিয়েছিলাম। আমি আমার যাবার কারণ বলি। কিন্তু এই উত্তর তাদের মনঃপুত হয়নি। তারা আমাকে কোহাট কারাগারে চালান করে দেয়। দুসপ্তাহ অবধি কোহাট কারাগারে থাকি। তখন পর্যন্ত আমি কল্পনাও করতে পারিনি, মুসলমান হয়ে তারা তাদের অপর এক মুসলমান ভাইকে বেদীন কাফের মার্কিন সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেবে।
দু’সপ্তাহ পর আমিসহ আরো আট-নয় জন বন্দিকে হাত-পা বেঁধে সামরিক ট্রাকে করে পেশোয়ার বিমানবন্দরে নিয়ে যায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কয়েকজন গোয়েন্দা। সেখানে অপেক্ষমাণ মার্কিন বাহিনীর হাতে আমাদের সোপর্দ করে দেয়। আমাদের হাত-পা বাঁধা ছিল। মার্কিন সৈন্যরা আমাদেরকে ট্রাক থেকে নামাতে আসে। প্রত্যেক বন্দিকে দুজন করে সৈন্য চ্যাংদোলা করে ধরে ট্রাক থেকে এমনভাবে নিচে ছটুড়ছিল, যেন ধানের বস্তা তারা ট্রাক থেকে ফেলছিল। নিচে শক্ত কংক্রিটের মেঝে। নিক্ষেপের সাথে সাথে মনে হলো আমার হাড়-গোড় সব গুড়ো হয়ে গেছে। মাথাটা ঝিম ঝিম করে উঠল। চারদিক কেমন অন্ধকারাচ্ছন্ন দেখছিলাম। ট্রাক থেকে নামানোর পর সৈন্যরা হায়েনার মতো আমাদের কাপড়-চোপর সব ছিঁড়ে ফেলল। কিল-ঘুষি আর লাথি তো আছেই। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গোয়েন্দারা খানিক দূরে দাঁড়ানো ছিল। আমি যন্ত্রণার মাঝেও তাদের প্রতিক্রিয়া দেখার চেষ্টা করলাম। আমি মনে করেছিলাম, তারা হয়ত পরিস্থিতির শিকার। মার্কিনিদের হাতে তাদের মুসলিম কিছু ভাইকে তুলে দিতে তারা বাধ্য। ভেবেছিলাম, আমাদের সাথে মার্কিনিদের এই আচরণে তারা দুঃখিত হবে। কারণ আমাদের মতো তারাও তো এক কালেমার ঝাণ্ডাবাহী। পবিত্র ভূমি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার মহান দায়িত্বে নিয়োজিত। কিন্তু হায়, আমি তাকিয়ে দেখলাম, তারা দুঃখিত হবে কী, আমাদের সাথে কৃত নির্যাতন দেখে বরং মিটিমিটি হাসছিল। কেউ কেউ তো উল্লাস করে আকাশের দিকে ফাঁকা বুলেট ছুঁড়ছিল। পরে জানতে পেরেছি এই গাদ্দারগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে আমাদেরকে তালেবান সাজিয়ে মার্কিনিদের হাতে বিক্রি করেছিল।
মার্কিনিরা আমাদেরকে একটি বিশেষ সামরিক হেলিকপ্টারে নিয়ে তুলল। আমাদের হাত-পা নতুন করে আবার বাঁধা হয়েছে। মাথায় কালো একটা মুখোশ পরিয়ে দেয়া হয়েছে। আওয়াজ না করার জন্য মুখে লাগানো হয়েছে স্কচটেপ। তারপর হেলিকপ্টারের মেঝেতে বেঁধে এমনভাবে শুয়ানো হলো, আমরা না শ্বাস নিতে পারছিলাম, না পারছিলাম চিৎকার করতে। শ্বাস নেয়ার জন্য একটু নড়াচড়া করলেই সৈন্যদের শ’ কেজি ওজনের ভারি লাত্থি পড়ছিল আমাদের উপর। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মনে হচ্ছিল এখনই বুঝি আমার প্রাণবাছু উড়ে যাবে।
হেলিকপ্টার আমাদের নিয়ে ল্যান্ড করল আফগানিস্তানের কান্দাহারে। ট্রাকের মতো একই কায়দায় ছুঁড়ে ফেলা হলো রানওয়ের শক্ত ফ্লোরে। তারপর মাথায় পরানো কালো মুখোশ খুলে দেয়া হলো। শুরু হলো নতুন মাত্রার নির্যাতন। পেশোয়ারেই আমাদের কাপড়-চোপড় সব ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল। এরপরও এক দু’টুকরো শরীরের সাথে জড়ানো ছিল। এখানে অবশিষ্ট এই টুকরোগুলোও ছুরি দিয়ে কেটে ফেলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে ফেলা হয়। এতক্ষণ শারীরিক নির্যতনটা চোখ বুজে সহ্য করার চেষ্টা করলেও মানসিক এই অপমানটা কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না। হৃদয়ের আর্তনাদ কতটা প্রকট এবং বিষাদময় হয়ে উঠেছিল, সে কেবল আমি আর আমার অন্তর্যামী জানি, অন্য কাউকে বুঝাতে পারব না।
উলঙ্গ করার পর আমাদের চুল-দাড়ি-গোঁফ সবকিছু মুণ্ডিয়ে ফেলা হয়। তারপর উন্মত্ত হায়েনার মতো মার্কিন সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের উপর। কূন্যে উঠিয়ে ধড়াম করে মেঝেতে আছাড় মারতে থাকে। কিল-থাপ্পড়-লাথি তো আছেই। আগে হেলিকপ্টারে থাকতে একবার ভেবেছিলাম, এই বুঝি মারা যাব। কিন্তু মারা যাইনি। ভাবলাম, এখন নিশ্চিত মারা যাব। আকুল হয়ে আল্লাহকে ডাকলাম মনে মনে। বললাম, এই জুলুমের বদলা হিসেবে তিনি যেন আমার জিন্দেগির গোনাহ-খাতা ক্ষমা করেন। আব্বা-আম্মার কথা মনে পড়ল। হায়, তাদের নিবিড় ভালোবাসার প্রথম সাক্ষী, তাদের প্রথম সন্তানকে নিয়ে কত স্বপ্নই না বুনেছিলেন তারা! সেই স্বপ্নের সমাধি যে কত নির্মমভাবে দূর আফগানের এক মার্কিন ক্যাম্পে রচিত হচ্ছে, আদৌ কি তারা কখনো জানতে পারবেন! এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে জ্ঞান হারালাম, বলতে পারি না।
জ্ঞান যখন ফিরে পেলাম, দেখি একটা কনটেইনারের ভেতর আছি। সঙ্গে বাকিরাও। তাদের কয়েকজন আরব আর বাকিরা আফগান। খাওয়া-পানি ছাড়া কনটেইনারের ভেতর এভাবে এক দিন অতিবাহিত হলো। এর ভেতর একজন দোভাষী এসে বলে গেল, পরস্পর যেন কোনো বাতচিত না করি। ব্যথায় সমস্ত শরীর টনটন করছিল। একদিন একরাত পর আমাদেরকে কনটেইনার থেকে নামানো হয়। সম্ভবত আমরা কোনো জাহাজে ছিলাম। কনটেইনার থেকে নামিয়ে আবার শুরু হয় নির্যাতন। তখন প্রচণ্ড শীত ছিল। মাটির উপর দিয়ে টেনে ঠাণ্ডায় নিয়ে বসানো হলো। তারপর শুরু হলো কিল-লাত্থি আর থাপ্পড়ের ঝড়। খানিক পর যখন সৈন্যরা হয়রান হয়ে উঠল, তখন পা দিয়ে পাড়াতে লাগল। হিম ঠাণ্ডা মাটিতে শুইয়ে চার-পাঁচজন বিশালদেহী সৈন্য আমাদের উপর সওয়ার হয়ে নাচতে আরম্ভ করল। আমি ভাবলাম এখন বুঝি আমাকে হত্যা করা হবে। আল্লাহ মাফ করুন, এই নির্যাতনের চেয়ে মৃত্যুটা তখন অনেক কামনার ছিল। কিন্তু না, খানিক পর নির্দেশ দেয়া হলো প্রচণ্ড এই ঠাণ্ডার মাঝে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে।
তারপর মাটির উপর দিয়ে টেনে হেচড়ে একটা তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হয়। এবার শুরু হলো জিজ্ঞাসাবাদ। আমি আফগানিস্তান কেন গিয়েছিলাম, তালেবানের সাথে আমার কী সম্পর্ক ইত্যাদি। আমি সোজা-সাপ্টা জবাব দিই- বেড়াতে গিয়েছিলাম, তালেবানের সাথে আমার দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই। উত্তর শুনে তারা অসন্তুষ্ট হল। আমার উপর আবার নেমে আসে অত্যাচারের স্টিম রোলার।
তাঁবুর মধ্যে ছিল হিম ঠাণ্ডা। ঠাণ্ডায় সীমাহীন কষ্ট হত আমাদের। প্রতি তাঁবুতে বিশ জন করে বন্দি থাকত। দিনরাত চলত জিজ্ঞাসাবাদ। জিজ্ঞাসাবাদের পরই শুরু হত অমানুষিক নির্যাতন। কারণ, কেউই সৈন্যদের মনমতো উত্তর দিতে পারত না। রাতের বেলা তাঁবুতে তল্লাশি অভিযান চালানো হত। আমাদের সঙ্গে অল্প যে জিনিশ-পত্র ছিল, অনুসন্ধানী কুকুর দিয়ে তন্ন তন্ন করে তা চেক করা হত।
তাঁবুতে প্রতিদিন দুবার করে পাহারাদার পরিবর্তন করা হত। নীচুস্তরের সৈন্যরা বন্দিদের সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করত। এরা ছিল প্রচণ্ড মুসলিমবিদ্বেষী। রোজ রোজ তারা যখন আসত বন্দিরা মাথা নিচের দিকে দিয়ে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। কারো নাম ধরে যখন ডাক দিত, সঙ্গে সঙ্গে ওয়েলকাম বলে সাড়া দিতে হত। কেউ একটু বিলম্ব করলেই তার উপর শুরু হত মারধর। প্রতিদিন সব বন্দির সম্মিলিত হাজিরা নেয়া হত। এজন্য তারা বন্দিদেরকে প্রচণ্ড রোদে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখত। সেখানে মোট বিশটি তাঁবু ছিল। বিশ তাঁবুতে বন্দিসংখ্যা ছিল ৮০০। হাজিরা নেবার আগে আধা ঘণ্টা এবং হাজিরা নিতে দুই ঘণ্টা সময় বন্দিদেরকে তপ্তরোদে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। কেউ ছায়ার নিচে অথবা ছায়া ছাড়া এমনিতেও বসতে পারত না।
প্রতিদিন সকালে জনপ্রতি এক মগ চা এবং একটি রুটি দেয়া হত। বিকালেও অনুরূপ। এর বাইরে কোনো খাবার ছিল না। ঘুমোনোর কোনো সুযোগ ছিল না। ঘুম নিষিদ্ধ ছিল। চোখটা বুজলেই পাহারারত সৈন্য চিৎকার দিয়ে উঠতÑ ওয়েক আপ! (ঘুম থেকে ওঠ্)। প্রথম প্রথম শব্দটার অর্থ বুঝতাম না। পাহারাদার এসে তখন লাত্থি দিয়ে ঘুম থেকে তুলে দিত।
এই অবস্থায় আফগানিস্তানে আমাদের দুই সপ্তাহ অতিবাহিত হয়। দুই সপ্তাহ পর আমিসহ আমাদের তাঁবুর বিশ বন্দিকে কিউবা নেয়ার জন্য চেইন দিয়ে এক সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়। প্রত্যেককে পরানো হয় কালো মুখোশ। তারপর সেখান থেকে অন্য একটি জায়গায় নিয়ে কালো মুখোশ খুলে এর পরিবর্তে কালো চশমা পরিয়ে দেয়া হয়। কানে লাগানো হয় প্লাগ। বিমানে ওঠানোর পূর্বে লাল জামা ও লাল জুতা পরিধান করানো হয় এবং প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ছবি তোলা হয়। মুখে লাগানো হয় এক ধরনের মাস্ক। হাত-পা নতুন এক প্রকারের চেইন দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হয়। তারপর বিমানে উঠিয়ে আমাদের পা বিমানের মেঝের সঙ্গে আটকানো হয়। হাতগুলো পেছন দিকে নিয়ে লোহার চেয়ারের সাথে একইভাবে বাঁধা হয়। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, আমরা এক ইঞ্চি পরিমাণ নড়াচড়া করতে পারছিলাম না। ব্যথায় আমরা কাতরাতে লাগলাম। বিমান চলতে শুরু করল। ক্রমশ আমাদের যন্ত্রণাও বাড়ছিল। মাঝখানে একবার বিমান বদল হয়। কিন্তু বদলি বিমানেও আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। যাত্রার পুরো সময়টাতে আমাদের একবারের জন্য বাথরুমে পর্যন্ত যেতে দেয়া হয়নি।
অসহ্যকর এই নরকযাত্রার সমাপ্তি ঘটল এক সময়। কিন্তু গুয়ান্তানামোর মাটিতে নেমে আমাদের নয়া আরেক নরক-জিন্দেগির সূচনা হয়। বিমান থেকে নামিয়ে সবার নাম-ঠিকানা নতুন করে লেখা হয়। আঙুলের ছাপ নেয়া হয়। তারপর প্রত্যেকের হাতে লাগিয়ে দেয়া হয় একেকটি করে ব্যান্ড। তাতে কয়েদি নম্বর লেখা। আমার নম্বর ১৫১। এটাই আমার পরিচয়। গুয়ান্তামোর পুরো বন্দিজীবনে এই নম্বরেই আমাকে ডাকা হত।
এসব আনুষ্ঠানিকতা শেষে আমাদের সামনে হাজির করা হয় নয়া এক কিসিমের আজাব। সবাইকে উলঙ্গ করে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। তারপর লেলিয়ে দেয়া হয় শিকলে বাঁধা উন্মত্ত এক দল কুকুর। শিকলের মাথা সৈন্যদের হাতে। কুকুরগুলো আমাদের পাঁচ-ছয় আঙুল ব্যবধান সামনে এসে এমনভাবে ঘেউ ঘেউ করে লাফাতে থাকে যে, মনে হয় এই বুঝি আমাদের উপর হামলে পড়বে। ভয়ে একদম আড়ষ্ট হয়ে যাই আমরা। আমাদের ভীতসন্ত্রস্থ অবস্থা দেখে সৈন্যরা পৈচাশিক উল্লাসে ফেটে পড়ে। কিছুক্ষণ পর এই দৃশ্যের পরিবর্তন ঘটে। আমাদের উপর শুরু হয় সেই পুরানো নির্যাতন- কিল-থাপ্পড়-ঘুষি, কূন্যে তুলে আছাড় মারা। কখন জ্ঞান হারালাম বলতে পারি না। হুঁশ যখন ফিরল, দেখি, নাক-মুখ রক্তে একাকার। শরীর ফোলে কলাগাছ। কিছুক্ষণ পর গোসল করিয়ে সবাইকে পৃথক পৃথক সেলে রাখা হয়। দেয়া হয় প্যাকেট করা শুকনো খাবার।
একাকী এই সেলে আড়াই মাসের মতো ছিলাম। একেকটি দিন মনে হত একেকটি বছরের সমান। কিছুক্ষণ পরপরই সৈন্যরা এসে খামাখা তল্লাশি চালাত। অথচ পুরো সেলে একটি কম্বল আর টয়লেটের কাজের জন্য একটি মগ ও বালতি ছাড়া কিছুই ছিল না। দফায় দফায় চলত জিজ্ঞাসাবাদ। আমি নির্দোষ মানুষ। তকদির আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। নানা কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদের পরও তারা যখন আমার কাছে কোনো তথ্য পেত না তখন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠত। শুরু করত অমানুষিক নির্যাতন। তাদের সমস্ত ক্ষোভ যেন আমার উপরই ঝাড়ত। মাঝে মাঝে সেলের বাইরে নিয়ে যেত। জামা-কাপড় সব টেনে খুলে ফেলত। নগ্ন করে চালাত নতুন মাত্রার অত্যাচার।
একসময় একাকী এই সেল থেকে পরিবর্তন মঞ্জুর হয় আমার নামে। এখান থেকে ক্যাম্প ডেল্টায় স্থানান্তর করা হবে আমাকে। খবরটা শুনে কিছুটা খুশি হলাম। একাকিত্বের যন্ত্রণাটা এবার হয়ত একটু ঘুঁচবে। আমি খুশি মনেই ক্যাম্প ডেল্টায় গেলাম। কিন্তু হায়, সেখানে গিয়ে বুঝতে পারলাম এই জায়গার চেয়ে পূর্বের নির্জন দোজখটা আমার জন্য অনেক ভালো ছিল। ক্যাম্প ডেল্টা ছিল ঠাণ্ডা হিম। জামা-কাপড়হীনভাবে বন্দিদের এখানে রাখা হয়। ঠাণ্ডার যন্ত্রণায় মনে হত এখনই মারা যাব। পূর্বের তুলনায় এখানে তল্লাশি এবং জিজ্ঞাসাবাদের যন্ত্রণা অনেক বেশি। অত্যাচারের কায়দাও নানা কিসিমের। এক মাস পর সেখান থেকে নতুন আরেক ব্লকে স্থানান্তরিত হই। লম্বা সেল। তিন দিক খোলা। চতুর্দিকে কাঁটাতারের বেষ্টনী। প্রতিটি সেলে দুটি সারি। সব মিলিয়ে ৪৮ জন বন্দি এখানে। সবার গায়ে গাঢ় কমলা রঙের পোষাক। হাতে পায়ে শিকল। এই সেলে এসে সর্বপ্রথম রান্না করা খাবারের দেখা পাই। নির্যাতন এখানে নুতন মাত্রা পায়। তল্লাশি এবং জিজ্ঞাসাবাদ বাড়ে। সাথে নানা রকমের অত্যাচার। কঙ্করময় মাঠে প্রায় প্রতিদিন নিয়ে যাওয়া হত। সেখানে নুড়ি পাথরের উপর আছড়ে ফেলে মুখ চেপে ধরা হত। পাথরের আঘাতে নাক-মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হয়ে আসত। কত রকমের নির্যাতনের কথা বলব! সেই সময়কার কথা এখন মনে পড়লে গা শিরশির করে ওঠে।
গুয়ান্তানামো আসার পর এক বছর অবধি নিজের মুক্তির ব্যাপারে কোনো আশা করিনি। ভেবেছিলাম এভাবে নির্যাতন সয়ে সয়েই একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ব। বাড়ির কথা মনে পড়ত খুব বেশি। আহা, আব্বা-আম্মা আত্মীয়-স্বজন কত পেরেশানির ভেতর সময় পার করছেন আল্লাহ মালুম! তারা কি কখনো জানতে পারবেন আমার করুণ এই হালাতের কথা? নিজেকে তকদিরের হাতে সঁপে দিয়ে আল্লাহকে ডাকতাম খুব বেশি। এরই ভেতর মানবাধিকার সংস্থা রেডক্রসের সদস্যদের সঙ্গে আমাদের দেখা করার সুযোগ দেয়া হয়। রেডক্রসের সদস্যরা আমাদেরকে টুকটাক খাবার সরবরাহ করত। আমাদের নির্যাতনের কাহিনি শুনতে চাইত। আমরা ভয়ে আমাদের করুণ অবস্থার কথা বলতাম না। কারণ, এসব বললে তারা যাবার পর সৈন্যরা আমাদের প্রচুর মারধর করত।
রেডক্রসের সদস্যরা আমাদের একটি করে কুরআন শরিফ দেয়। আমি অবসর সময় কুরআন শরিফ তেলাওয়াত করতাম। এভাবে আল্লাহর রহমতে এক সময় পুরো কুরআন হিফজ করে ফেলি। আরো কিছু দিন যাবার পর রেডক্রসের সদস্যরা আমার বাড়ির ঠিকানা নেয় এবং আমাকে বলে বাড়িতে আমি কোনো চিঠি লিখব কি না। আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ি। তারা আমাকে কাগজ-কলম এনে দেয়। আমি এই প্রথম বাড়ির সাথে যোগাযোগের সুযোগ পাই। রেডক্রসের সদস্যরা আমার এই চিঠি আব্বার কাছে পৌঁছে দেয়। বাড়ির মানুষ এই প্রথম আমার অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হন এবং নিশ্চিত হন আমি বেঁচে আছি।
রেডক্রস আমাকে আশ্বস্ত করে, তারা আমার মুক্তির ব্যাপারে তদবির করছে। আমি জুলুম-জিল্লতির এই জাহান্নাম থেকে মুক্তির ব্যাপারে খানিকটা আশান্বিত হই। তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখত আমার সাথে। বিভিন্নভাবে সাহায্য করত। তাদের আমি এই কথা বুঝাতে সক্ষম হই যে, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। এদিকে নির্যাতনের মাত্রা কিন্তু একটুও কমেনি। তবুও মনের ভেতর একটা সাহস পেতাম মুক্তির ব্যাপারটা চিন্তা করে।
অতঃপর ২০০৬ সালের ১৫ জানুয়ারি রেডক্রসের সহায়তায় জিল্লতির এই জীবন থেকে আমি নির্দোষ খালাস পাই। গুয়ান্তানামো কর্তৃপক্ষ আমার নামে এই মর্মে মুক্তিপরোয়ানা জারি করে যে, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমি আল্লাহর দরবারে শোকরগোজারি পেশ করি। দুই দিন পর মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষ একটি ফ্লাইটে আমাকে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু বিমানবন্দরে নামার পর বাংলাদেশ পুলিশ বিমানবন্দর থানা আমাকে আবার আটক করে ফেলে। তারপর পাসপোর্ট আইনে মামলা দিয়ে আদালত থেকে আমার তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করায়। কিন্তু যেখানে মার্কিন সেনাবাহিনীর দুর্ধর্ষ টিম পাঁচ বছর যাবত অবিরাম নির্যাতন চালিয়েও আমার সামান্যতম কোনো অপরাধ খটুজে পায়নি, আমাদের বাংলাদেশের পুলিশ কীণ্ডই বা আর করবে। তিনদিনের রিমান্ড শেষে আমাকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। মাননীয় আদলত আমার জবানবন্দি শুনে আমাকে নির্দোষ ঘোষণা করেন। কেবল পাসপোর্ট সংক্রান্ত জটিলতার কারণে কয়েক মাসের আটকাদেশ দেন। অবশেষে ২০০৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে আত্মীয়-স্বজনের কাছে ফিরে আসি।
দীর্ঘ পাঁচ বছরের লাগাতার অমানুষিক নির্যাতনের কারণে আমার শারীরিক অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। শরীরের প্রতিটা জোড়ায় জোড়ায় ছিল প্রচণ্ড ব্যথা। মুক্তি পাবার পর দীর্ঘ দিন আমাকে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে আমি চাইলাম রাজধানীর কোথাও কোনো মাদরাসা/মসজিদে দীনের খেদমত করব। কিন্তু আব্বা-আম্মা নিরাপত্তার কথা ভেবে আমাকে আর বাইরে কোথাও যেতে দিলেন না। গ্রামের মসজিদেই খেদমত করতে বললেন। সেই থেকে গ্রামেই আছি। একটা সংসারও করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমানে আমি দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক।
মুক্তির পর প্রশাসনিক তেমন কোনো ঝামেলা পোহাতে হয়নি আর। ভালো ভালোই দিন কাটছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের রমজানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামিয়া ইউনুসিয়ায় হামলার জের ধরে আমাকে গ্রেফতার করা হয়। অথচ এসবের সাথে আমার বিন্দুমাত্রও যোগাযোগ ছিল না। গ্রেফতারের পর আমাকে রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ডে অবশ্য কোনো ধরনের নির্যাতন করা হয়নি, স্রেফ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আমি তদন্ত কর্মকর্তাদেরকে উল্টো প্রশ্ন করেছি, বিশ্বের সবচাইতে ভয়ঙ্কর টর্চার সেল গুয়ান্তানামোতে আমি একাধারে পাঁচ বছর নির্যাতন সয়ে এসেছি, সন্ত্রাস কিংবা কোনো ধরনের নাশকতার সাথে আমার সংশ্লিষ্টতার বিন্দুতম প্রমাণ পাওয়া গেছে? সেখান থেকে মুক্তি পাবার পর বাংলাদেশে এসে আবারও গ্রেফতার হয়েছি, বাংলাদেশের আদালত কিছু প্রমাণ করতে পেরেছে? বন্দিজীবনের পূর্বে বা পরে আপনাদের রেকর্ড ফাইলে আমার নামে কোনো বেড রেকর্ড আছে? সবগুলো প্রশ্নের উত্তরেই কর্মকর্তারা না সূচক মাথা নাড়লেন। এবার আমি জানতে চাইলাম, তবে কেন একজন নিরীহ মানুষকে আপনারা অযথা গ্রেফতার করে হয়রান করছেন? কর্মকর্তা নরম স্বরে বললেন, আমরা পরিস্থিতির শিকার হুজুর। টেনশেন নেই, আপনি মুক্তি পেয়ে যাবেন। এর দেড় মাস পর আমি জামিনে মুক্তি পাই। কিন্তু মামলা এখনও শেষ হয়নি। এখনো আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিতে হয়। জানি না, এই হয়রানির শেষ কবে হবে!’
দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস নিয়ে থামলেন মুফতি মুবারক। একজন মজলুমের হৃদয়বিদারক দাস্তান শুনতে শুনতে আমি হয়রান হয়ে উঠছিলাম। একবিংশ শতাব্দীতে যারা সভ্যতা ও মানবতার ফেরি করে বেড়ায়, তাদের মানবিকতার (?) আসল রূপ দেখে অনেকটা কাহিল হয়ে পড়েছিলাম।
ঘড়ির দিকে তাকালাম। বেলা অনেক গড়িয়ে গেছে তখন। বিকেল নেমে আসছে। এবার ফিরতে হবে। মুফতি মুবারকের কাছে বিদায় চাইলাম। অতিথিপরাছু এই মানুষটি বিদায় দিতে রাজি হলেন না। বললেন, অনেক দূর থেকে এসেছেন। আজ বিশ্রাম নিন। আগামী কাল যাবেন। আমি ওজরখাহি পেশ করলাম। অনেকটা জোর করেই বিদায় নিলাম তাঁর কাছ থেকে। বিস্ময়কর ত্যাগী একজন মানুষের সান্নিধ্য থেকে পা বাড়ালাম নিজের কর্মস্থলের উদ্দেশে।
