পরম করুণাময় পরম দয়াময় আল্লাহর নামে
শ্রদ্ধেয় সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সম্মানিত সদস্য ও সম্মানিত সুধীবৃন্দ, আসসালামু আলায়কুম।
আজ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ জন প্রাক্তন অধ্যাপককে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা জ্ঞাপনের জন্য এই মহতী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। একজন প্রাক্তন ছাত্র ও প্রাক্তন শিক্ষক হিসেবে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। এই ধরনের অনুষ্ঠানের একান্ত প্রয়োজন ছিল। আজ সর্বজনশ্রদ্ধেয় ২৯ জন প্রাক্তন অধ্যাপককে সম্মাননা জ্ঞাপন করে আমরা একটা বড় কর্তব্য পালন করলাম। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও এবং সাক্ষর-শিক্ষিতের সংখ্যা স্বল্প হলেও বিদ্বজ্জনের প্রতি সম্ভ্রমবোধ ও শ্রদ্ধাশীলতা আমাদের সংস্কৃতিতে আবহমানকাল থেকে বিদ্যমান। ইউরোপীয়দের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হওয়ার বহু আগে থেকে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে-মঠে-বিহারে ও মক্তব-মাদরাসায় বিদ্যাচর্চা অব্যাহত ছিল। বলা বাহুল্য, শুধু আমাদের দেশে নয়, ইউরোপেও উচ্চশিক্ষায় ধর্ম ও চিকিৎসাশাস্ত্র প্রাধান্য পেয়ে আসছিল ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত। বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস একদিক থেকে অনেক প্রাচীন। যুক্তিবাদের ঐতিহ্যে লালিত বিজ্ঞানচর্চা বয়সে তেমন প্রবীণ নয়।
অফিস-আদালতে ফার্সি উঠে যাওয়ার পর আমাদের দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় গোষ্ঠী বড় ফাঁপড়ে পড়ে। রাজভাষা ও মাতৃভাষা শেখার মধ্যে তাঁদের মধ্যে একটা দোটানা ভাব ছিল। ইংরেজি শিখে ব্রাহ্মণসন্তান যখন স্বধর্ম ছেড়ে রাজধর্ম গ্রহণ করেন তখন অহিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেও আতঙ্কগ্রস্ত হয়। আসল কথা কিন্তু শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করতে না পারায় দুনিয়াদারির জন্য যে ইংরেজি শেখা একান্ত আবশ্যকীয় হয়ে উঠেছিল, তা অনেক মুসনলমান পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয়নি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ তিন দশক থেকে যখন অর্থকরী ফসলের কাঁচা টাকা কৃষকদের ঘরে এল, তখন থেকে শিক্ষার আন্দোলনে মুসলমানেরা ব্যাপৃত হলেন। লক্ষণীয়, রাজনৈতিক আন্দোলনের চেয়ে শিক্ষা প্রসারের আন্দোলনে তাঁরা বেশি আগ্রহী ছিলেন। ‘দারুল হারব’ ও ‘দারুস সালাম’-এর দ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত মুসলমান তাঁর সন্তানকে শিক্ষা দিতে চাইল। শিক্ষার প্রতি সম্ভ্রমবশত দরিদ্র মুসলমানের ঘরেও জায়গির মাস্টার সাহেবের জন্য একটা জায়গা নির্দিষ্ট ছিল।
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করার ১০ বছর পর ১৯২১ সালে Splendid imperial compensation চমৎকার সাম্রাজ্যিক খেসারত হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে এই অঞ্চলের অবহেলিত জনগণের মধ্যে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, বঙ্গভঙ্গ রদ করার ফলে সে আশা ও সে স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়। মুসলমান সমাজে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের জন্য বিভিন্ন দাবি-দাওয়া বেশ জোরের সঙ্গে পেশ করা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ তিন দশক থেকে। ব্রিটিশ সরকার ১৯১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করে। তৎকালীন নেতৃস্থানীয় হিন্দুসমাজ, বিশেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজ এর বিরোধিতা করে। তাঁদের ধারণা ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় হবে একটি ধর্মভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এর শিক্ষার মান ভালো হবে না এবং এটা হবে ব্রিটিশের Divide and Rul নীতিরই অংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কোর্টের সভায় ইংরেজ ভাইস-চ্যান্সেলর হার্টগ বলেছিলেন যে, ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অধ্যয়নই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে। এসব কথা লক্ষ্য করে বিদূষকেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মক্কা বিশ্ববিদ্যালয় বলত। ১৯২১ সালের ৭ জানুয়ারি সুধী সমাবেশে বক্তৃতাকালে হার্টগ শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলমানদের পশ্চাৎপদতা এবং অধিক হারে তাদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, এটা কোনো মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকে এখানে হিন্দু শিক্ষার্থীরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ মাইল পরিধির মধ্যে ছাত্রসংখ্যা ছিল ৮০০। আজ যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান সংকুচিত সেখানে মোট ছাত্রের সংখ্যা ২৬ হাজার। অতিসম্প্রসারণে যেমন সাম্রাজ্য ভেঙে যায়, তেমনি অতি সম্প্রসারণে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানও বিনষ্ট হতে পারে। প্রতিষ্ঠার দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের পাণ্ডিত্য ও জ্ঞান-গরিমার খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া।
এক প্রজন্মের মানুষ তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শিক্ষার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়। এভাবে মানুষের জ্ঞানভাণ্ডার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি লাভ করেছে। মানবসমাজ স্থিতু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষার প্রয়োজন আর কোনোদিন এত বড় হয়ে দেখা দেয়নি।
শিক্ষিত কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছাড়া রাষ্ট্রকর্ম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে না। একদিকে যেমন জ্ঞানের পরিধি যত বাড়ছে, তেমনি সমাজসংস্থার গংগঠন রক্ষা করার জন্য তত শিক্ষিত লোকের প্রয়োজনও বাড়ছে। মহান ব্যক্তিত্ব, বৃহৎ সমাজব্যবস্থা, বিরাট সাম্রাজ্য, যা কিছু বড় সব উচ্চশিক্ষার সাহায্য ছাড়া সম্ভব হয়নি। হামুরাব্বির সময়ও দক্ষ খোদাইকারের প্রয়োজন ছিল শিলানুশাসন রচনা করার জন্য। প্রতিটি প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাসে শিক্ষা-প্রশিক্ষণের দান সুস্পষ্ট। দিগ্বিজয়ী সেকান্দার শাহের সৈন্যবাহিনীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক, বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিকেরা। নওরতনের সমাবেশ ঘটেছিল উম্মি (নিরক্ষর) আকবরের সভায়। কেবল তলোয়ারের জোরে সাম্রাজ্য টেকে না। মুঘল শাসক-প্রশাসকেরা তাঁদের তাজিক-তাওয়ারিখে ও আইন ফতোয়ায় এবং ইংরেজ শাসকেরা তাঁদের রিপোর্ট-ডেসপ্যাচে ও ডায়েরিতে তাঁদের পরিশীলিত মনের পরিচয় রেখে গেছেন।
এই শিক্ষার আন্দোলন অবশেষে সামান্য প্রজা-খাতকের অধিকার রেয়াতের দাবির সঙ্গে, উদীয়মান মধ্যবিত্তের আকাক্সক্ষা ও অধিকারের দাবির সঙ্গে মিশে গিয়ে স্বাতন্ত্র্যপ্রিয় মুসলমানদের সুসংহত করে। পাকিস্তানের দাবিতে প্রায় সবাই সেদিন সোচ্চার ছিল।
এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যমণ্ডিত ভূমিকা সর্বজনবিদিনত। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তর সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ ইত্যাদি গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সমাজের শিক্ষিতশ্রেণির প্রতিভূ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সমাজকে অবশ্যই সমাজ-সচেতন ও রাজনীতি সচেতন হতে হবে। তবে স্বাধীনতা-উত্তরকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে রাজনীতি চর্চার অনেক নেতিবাচক দিক ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকেরা আদর্শহীন পেশাদার রাজনীতির শিকার হবেন না, বরং আদর্শভিত্তিক রাজনীতির প্রথপ্রদর্শক হবেন, এটাই সবার আশা। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে মেধাবী ছাত্রদের যেভাবে ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্ব দিতে দেখা যেত, এখন আর তেমনটি দেখা যায় না। মেধাবী ছাত্ররাই কি বড় স্বার্থপর ও সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, নাকি ছাত্ররাজনীতিতে কোথায়ও ধস নেমেছে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনীতি চর্চা এবং কর্তব্যপরায়ণতা ও দায়িত্বসচেতনতা সম্পর্কে আজকে সমালোচনা শোনা যায়, তার পেছনে রয়েছে এক বড় প্রত্যাশার অপূরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছ থেকে বড় মুখ করে অনেক আশা করা হয় বলেই তাঁদের সামান্যতম ত্রুটি-বিচ্যুতি বা সামান্যতম স্খলন বড় হয়ে দেখা দেয়। আমি জানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন অনেক নিবেদিতপ্রাণ ও প্রতিভাবান শিক্ষক রয়েছেন, যাঁরা পৃথীবীর যেকোনো শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠের জন্য গৌরবের কারণ হতে পারেন। চতুষ্পার্শ্বস্থ আবহাওয়ার জন্য অনেক প্রতিভাধর শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংসারের ভার বহন করতে চান না, অকালে বানপ্রস্থের পথ তাঁরা বেছে নিয়েছেন এবং কেবল অধ্যয়ন-অধ্যাপনায় নিজেদের সীমিত বা খণ্ডিত করে রেখেছেন। আজ যাঁরা সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষক, তাঁরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পরিচালনা ও শিক্ষক সমাজের নেতৃত্ব দানের ক্ষেত্রে তেমন উৎসাহ বোধ করেন না। শিক্ষকদের বর্তমান রাজনীতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিভাবান শিক্ষকদের উদ্যোগী ভূমিকা পালনের হয়তো বা অনুকূল নয়।
প্রতিবছর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সেরা ছাত্রদের একটা বড় অংশ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে যান। এঁদের অধিকাংশই উচ্চশিক্ষা লাভের পর আর দেশে ফিরে আসেন না। যাঁরা ফিরে আসেন, তাঁদের অনেকেরই কিছুদিনের মধ্যেই আশাভঙ্গ হয়। তাঁরা আবার বিদেশে পাড়ি দেন। এ প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে ক্রমেই বাড়ছে। এই বিপুলসংখ্যক মেধাবী ব্যক্তির পরবাস আমাদের উচ্চশিক্ষার ও গবেষণার প্রসার ও মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের স্নাতকোত্তর, বিশেষত ডক্টরেট পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ ও মান এখনো খুব আশাব্যঞ্জক নয়। মেধাবী ছাত্রদের আকৃষ্ট করার জন্য এ সুযোগ যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত কিছু কিছু বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক মানের Centers of Excellence-কেন্দ্র স্থাপন করা যায় কি না, তার সম্ভাবনা সম্পর্কে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা দরকার। এ ধরনের ঔৎকর্ষ-কেন্দ্র তৈরি করা গেলে আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ অনেক প্রাসঙ্গিক বিষয়ের ওপর উন্নতমানের মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণা পরিচালনা করা সম্ভব হবে। উন্নতমানের গবেষণালব্ধ জ্ঞান থেকে সমাজ লাভবান হবে। তখন হয়তো বা বিদেশে বসবাসরত প্রতিভাবন ছাত্র, শিক্ষক ও গবেষকরাও গৃহে প্রত্যাবর্তনে আকৃষ্ট হবেন।
শিক্ষা মানুষের একটি মৌলিক চাহিদা, আবার শিক্ষা এক ধরনের বিনিয়োগও। আমি আশা করব, সীমিত সম্পদের দেশে শিক্ষার বিনিয়োগ থেকে সমাজ কীভাবে সবচেয়ে লাভবান হতে পারে, সেদিকে শিক্ষা-পরিকল্পনাবিদেরা দৃষ্টি দেবেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার মান উন্নত করা না গেলে উচ্চশিক্ষার মান উন্নত করা যাবে না। ক্রমবর্ধমান সামাজিক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটাতে গিয়ে শিক্ষার মানের ওপর যাতে কোনো বিরূপ প্রভাব না পড়ে, সেদিকে আমাদের অনুক্ষণ লক্ষ রাখতে হবে। উচ্চশিক্ষার পাঠ্যক্রম আমাদের আর্থসামাজিক পরিবর্তনশীল চাহিদার সঙ্গে কতখানি সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা মুখাপেক্ষী। বিদেশের গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে আত্মস্থ করে কী করে তা আমাদের সমাজের সঙ্গে সাঙ্গীকরণ করা যায়, সে বিষয়ে যথেষ্ট চিন্তাভাবনার অবকাশ আছে। আমরা উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ পর্যায় শিক্ষাদানের মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষার প্রচলন করেছি। অথচ সে অনুযায়ী বাংলা ভাষায় উচ্চমানের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের ব্যবস্থা করতে পারিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর আবাসিক চরিত্র। নানা কারণে ১৯৪৭ সালের পর সেই চরিত্র বদলে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ছাত্র আহত হলে কাউকে হুকুম না দিয়ে টার্নার সাহেব ছুটে গিয়ে নিজে বালতি ভরে পানি নিয়ে আসেন। ছাত্র রাত জেগে পড়ছে এবং ঠিক সময়ে বাতি নেভায়নি দেখে ল্যাংলে সাহেব কাজী মোতাহার হোসেনকে বলেন, ‘নো নো। এটা ভারি অন্যায়। রীতিমতো সময়ে তোমরা ঘুমাবে। রীতিমতো সময়ে তোমরা উঠবে।’ আবার সেই কাজী মোতাহার হোসেনের বইয়ের ভূমিকা পড়ে খুশি হয়ে সত্যেন বসু সবাইকে শুনিয়ে বলেন, ‘দেখ, তোমরা কেউ লিখতে পারতে? পারতে না। এ আমার ছেলে!’ এমনটি আজ হয়তো বা হয় না, কিন্তু ছাত্রের প্রতি শিক্ষকের স্নেহ আজও সম্পূর্ণ উবে যায়নি। অর্থনীতির উদীয়মান অধ্যাপক আমার পুত্রবৎ নুবান আহমেদ যেদিন অপঘাতে মৃত্যুবরণ করেন, সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক বেদনায় ভেঙে পড়েন। আমি তাঁর মরণোত্তর সব ধর্মীয় কর্মে যোগদান করি। আজ সরকারপ্রধান হিসেবে এখনো তাঁর হত্যার কোনো কিনারা আমি করতে পারছি না। তাঁর জন্য আমি নিজের কাছে বড় ছোট হয়ে আছি। যখনই কোনো নরহত্যা ঘটে, তখন তার প্রতিবিধান করা সরকারের একান্ত কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। সরকারের অপারগতার ফলে সমাজে যে বিষবৃক্ষের জন্ম হবে, তার কুফল কিন্তু বড় সুদূরপ্রসারী।
অধ্যাপক রাজ্জাক, যাঁর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব নাড়িনক্ষত্র জানা, তিনি পুরোনো দিনের একটা কথা আমাকে বলেছিলেন। একজন অধ্যাপক শখের হোমিওপ্যাথি করতেন। তাঁর হাতযশ ছিল। তৎকালীন ইংরেজ উপাচার্য তাঁকে ডেকে বলেন, আপনি দাতব্য চিকিৎসা করছেন ভালো কথা, কিন্তু যে সময়টা এ ব্যাপারে ব্যয়িত হচ্ছে, সেটা তো অধ্যাপনার খাতে ব্যয় করা উচিত।
একসময় ছিল যখন ১০ টাকা সম্মানীতে রেডিও প্রোগ্রাম করতে হলে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন লাগত। কন্সাল্টেন্সির যুগে এসব কথা বড় অপ্রাসঙ্গিক শোনাবে। যে কথা বলতে যাচ্ছিলাম, আবাসিক বা অনাবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের সংসারের কাজ সেরে অধ্যাপকের যে সময়টা বাড়তি হয়, সেটা সাধারণত অধ্যাপনার স্বার্থে ব্যয়িত হওয়ার একসময় রেওয়াজ ছিল। মুষ্টিমেয় শ্বাপদ ও সরীসৃপের দৌরাত্ম্যে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অতিষ্ঠ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে আজ যেন সারা বাংলাদেশ জিম্মি। সমাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধান্যের যে কী গুরুত্ব, তা এই বেদনাদায়ক অবস্থা থেকেই বোঝা যায়। হাতেগোনা কিছু সশস্ত্র সন্ত্রাসী, যার সবাই শিক্ষার্থীও নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অভয়ারণ্য ভেবে যেভাবে বিচরণ করত, তারা হয়তো এখন তা আর পারছে না। এই সন্ত্রাসীদের দোসররা আবার ফিরে এসে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণœ না করতে পারে, তার জন্য আমাদের সব প্রচেষ্টা নিতে হবে।
জাতি হিসেবে গৌরবময় ঐতিহ্য ধরে রাখা, তাকে সমৃদ্ধতর করে তোলা এবং একবিংশ শতাব্দীর প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য উচ্চশিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। সমাজ থেকে আলাদা করে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়, যাতে বাইরের ঝুটঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে নির্ঝঞ্ঝাটে ছাত্র ও শিক্ষকেরা অধ্যয়ন ও অধ্যাপনায় নিজেদের নিয়োজিত করতে পারেন। সমাজে নিম্নচাপের সৃষ্টি হলে ঝড়ঝাপটা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল টপকে আঘাত হানবে। নতুন সামাজিক প্রশ্ন সাধারণত তরুণ মনে প্রথম আলোড়নের সৃষ্টি করে। সমাজের ভেতরকার অস্থিরতার কিছু প্রতিফলন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়বে, তা আর বিচিত্র কী। সে অস্থিরতার ফলে যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম অনিয়মিতভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে গোটা জাতিই অন্ধকারে নিপতিত হবে। আপনাদের প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ, দেশের এই সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠকে সন্ত্রাসমুক্ত করুন, আগামী প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখুন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব অক্ষুণœ থাক।
বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক।
ঢাকা, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪০৩/১৬ মে ১৯৯৬
