কাগজের অক্ষরে আলো কি ফুটবে

সংখ্যা:

ধরা যাক, আমি সময়-অসময়ে ফেসবুকের নিউজফিড ঘাঁটছি। ঘাঁটতে ঘাঁটতে একটি লেখায় পেলাম বন্ধুর বাবার মৃত্যুসংবাদ। তার পরের লেখায় আরেক বন্ধু তাঁর বউয়ের হাতে বানানো কুমড়ার মুরব্বা চিবুচ্ছে-সেই ছবি ও খবর। পরের লেখায় পড়লাম ‘নাস্তিকের জানাজা কেন পড়া যাবে না’-এমন ধর্মসিদ্ধ বিষয় নিয়ে ধুন্ধুমার বিতর্ক।

তো, এসব দেখে আমি যেটা করলাম, বন্ধুর বাবার মৃত্যুসংবাদে মন্তব্য করলাম-‘কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে, তাঁর মতো একজন ভালোমানুষ চলে যাবেন মেনে নিতে কষ্ট হয়। আল্লাহ তাঁকে জান্নাত নসিব করুন!’ সঙ্গে দুঃখ ভারাক্রান্ত একটি স্যাড রিয়্যাক্ট দিয়ে দিলাম। এসব ব্যাপারে কিপ্টেমি চলে না। যে বন্ধু বউয়ের বানানো চালকুমড়ার মুরব্বা চিবানোর ছবি দিয়েছে, তাঁর ছবির নিচে দাঁত কেলানো হাসির রিয়্যাক্ট দিয়ে মন্তব্য করলাম-‘ওরে শালা! বউ নিয়া দিনের বেলা একা একা মুরব্বা চাবাইতেছিস, আমরা কি মইরা গেছি নাকি!’ মুরব্বার জেল্লাদার চেহারা দেখে মনটা আঁকুপাকু করছে। যাকগে, পরবর্তী লেখা যেটা চোখে পড়লো, একটা পাবলিক গ্রুপে ‘নাস্তিকের জানাজা কেন পড়া যাবে না’-এ নিয়ে ইসলামিস্ট এবং ননইসলামিস্ট লোকজন বিপুল বেগে বিতর্ক শুরু করেছে। তাদের তর্কের গতি দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না, দুম করে একটা মারমুখী মন্তব্য করে বিতর্ক যথাসম্ভব উস্কে দেয়ার চেষ্টা করলাম। ধর্ম জিনিস এতো সোজা না!

ফেসবুক নামের মহাঅরণ্যে এই যে আমাদের চিন্তা ও মানসিকতার ত্বরিৎ পরিবর্তন, মুহূর্তে দুঃখে জর্জর হয়ে কান্নার পরিবেশ সৃষ্টি করছি, দু সেকেন্ড পরই হাহা করে হাসছি, আবার মুহূর্তেই আমাদের মধ্যে ফুঁসে উঠছে চরম অসহিষ্ণু এক দানবব্যক্তি, একটু পরই কোনো ললনার দিকে ছুড়ে মারছি চটুল মন্তব্য; মাত্র ত্রিশ সেকেন্ডে আমার চরিত্র থেকে চার ধরনের অভিব্যক্তি প্রকাশ পাচ্ছে। এটা কি মানুষ হিসেবে আমাদের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ?

আমরা নিজেরাই এখন নিজেদের চিনতে পারি না-কোনটা সত্যিকারের আমি। যে আমি বন্ধুর বাবার মৃত্যুসংবাদে দুঃখে বিমূঢ়Ñসে আমি? নাকি যে মুরব্বা চিবোনোর খায়েশে লালায়িত, সে? নাকি ভরা বিতর্কসভায় গালি দিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগা লোকটি আমি? একজন স্বাভাবিক মানুষের মধ্যে মুহূর্তে মুহূর্তে তো এতো ট্রান্সফর্মেশন হওয়া সম্ভব না। এর দ্বারা পরিস্কার হয়ে যায়, হয়তো ব্যক্তি হিসেবে আমি নিতান্ত ব্যক্তিত্বহীন অথবা আমার প্রকাশ করা সকল দুঃখ, আনন্দ, রাগ, চটুলতা সকলই ফেইক, সবই লোকদেখানো।

অস্বীকার করার জো নেই, ফেসবুক বা অন্যান্য সোস্যাল নেটওয়ার্ক প্লাটফর্মে নিজেকে জাহির করার তাগিদ ধীরে ধীরে আমাদের যেমন ব্যক্তিত্বহীন করে ফেলছে, তেমনি আমাদের আবেগ-অনুভূতিকেও করে তুলছে কেবলই লোকদেখানো। ছেলেরা এখন চুল কাটছে ফেসবুকে ছবি আপলোড করার জন্য, মেয়েরা পার্লারে গিয়ে সেজেগুজে আসে সেলফি তুলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করার জন্য। আত্মীয়ের বিয়েতে গিয়ে কিসের বিয়ের আয়োজন বা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত, সবাই ব্যস্ত সেলফি তোলা আর ফোনে ফেসবুকে। চারপাশের পৃথিবী থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে আমরা প্রকাশিত হচ্ছি অন্য আরেক পৃথিবীতে। যে পৃথিবীতে সকলই ভার্চুয়াল, সব কিছু অন্তর্জালের ফেইক কারনামা।

সেদিন ফেসবুকে একটি ছবিতে দেখলাম, কয়েকজন জুব্বাপরা মওলানা সাহেব কোনো এক কবরস্তানে গিয়েছেন কবর জিয়ারত করতে। হয়তো কোনো ধনীব্যক্তির বাবা-মায়ের কবর হবে। ধনীব্যক্তির বাড়িতে দাওয়াত খেয়ে গিয়েছেন কবর জিয়ারত করতে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সব ক’জন মওলানা হাত তুলে কবরবাসীদের জন্য দোয়া করছেন। এক মওলানা স্মার্টফোন দিয়ে সেলফি তুলছেন। মওলানাগণ কবরবাসীদের জন্য হাত তুলে দোয়া করতে করতেই ক্যামেরার দিকে হাস্যবদনে তাকিয়ে আছেন।

বুঝতে পারছেন আমাদের মানসিকতার লেভেলটা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে!

আস্তে আস্তে আমাদের চারপাশটাই মেকি হয়ে যাচ্ছে, খুব বেশি করে হয়ে যাচ্ছে। অন্যের সামনে নিজেকে প্রদর্শনের এমন সস্তা মানসিকতা পরিহার অতিআবশ্যকীয়।

 

দুই

লেখালেখি বিষয়ে কিছু কথা বলতে হয়। তবে যে কথাগুলো এখন বলবো সেগুলো শুনতে খুব একটা আরাম লাগবে না অনেকেরই। কিন্তু বিষয়গুলো বলতেই হবে, আমাদের বৃহৎ স্বার্থেই।

ব্যক্তিগতভাবে আমি ‘নবপ্রকাশ’ নামের একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। বছর দু-তিন হল নবপ্রকাশের যাত্রা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু আলোচিত গ্রন্থ প্রকাশ করে সুনাম অর্জন করেছে প্রকাশনীটি। প্রকাশনাশিল্পের সঙ্গে এ যাত্রপথে নানা ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। সে অভিজ্ঞতার দু-চারটে সবার সঙ্গে শেয়ার করা উচিত মনে করছি।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। ব্যবসায়িকভাবে নবপ্রকাশ থেকে আমরা এমন বই বের করতে আগ্রহী, যেসব বই অন্য আর দশটা ইসলামি প্রকাশনী প্রকাশ করে না বা করতে আগ্রহী নয়। প্রকাশনা শুরু করার আগে আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল-আমরা এমন একটি প্রকাশনী করতে চাই যে প্রকাশনী পাশ্চাত্য প্রদর্শিত পাঠোপকরণ থেকে বর্তমান তরুণদের আপন আলয়ে ফিরিয়ে আনবে। বর্তমানে আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণ ইংরেজি ও পাশ্চাত্য বিভিন্ন ভাষার বই অনূদিত হচ্ছে। সেসব বইয়ের মাধ্যমে পাশ্চাত্য সমাজ, সংস্কৃতি, অপসংস্কৃতি হুড়মুড় করে আমাদের সমাজে ঢুকে পড়ছে। আমাদের তরুণরা বিশ্বসাহিত্য অধ্যয়নের মোহে আটকা পড়ে যাচ্ছে পশ্চিমা বেহায়া সংস্কৃতির নাগপাশে। আমাদের লক্ষ্য-আমরা এমন বই প্রকাশ করতে সচেষ্ট হবো যেসব বই এই পশ্চিমা অপসংস্কৃতিকে কিছুটা হলেও রুখে দাঁড়াবে।

আমাদের যুক্তিটি ছিল পরিস্কার-ইতিহাসের বদলে ইতিহাস, উপন্যাসের বদলে উপন্যাস, গল্পের মুখোমুখি গল্প। যে যুবক ড্যান ব্রাউনের ‘অরিজিন’ পড়ার জন্য মুখিয়ে আছে তাকে তো আপনি ‘মকছুদুল মোমেনিন’ পড়িয়ে তৃপ্ত করতে পারবেন না। যে পাঠক উইলবার স্মিথের ‘রিভার গড’ পড়ে অভ্যস্ত, তাকে ‘তালেবানের মেয়ে’ পড়িয়ে ইসলামি পাঠাগ্রহে অভ্যস্ত করতে পারবেন না।

বর্তমান সময়ের পাঠকের পাঠরুচি আপনাকে বুঝতে হবে।

এসব কারণে আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশিত অনেক প্রয়োজনীয় বই অনুবাদ করে প্রকাশ করার প্রয়োজন পড়ে আমাদের। বই অনুবাদ করতে গিয়ে নানা বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সেসব বেদনার কথা পাঠকমাত্রই জ্ঞাত হওয়া প্রয়োজন।

প্রথম কথা: যোগ্য অনুবাদকের প্রচুর অভাব। হোক সেটা আরবি-উর্দু কিংবা ইংরেজি, সব ভাষাতেই দক্ষ অনুবাদকের অভাব প্রকটভাবে ধরা পড়েছে। বাজারে অনুবাদকের অভাব নেই, কিন্তু দক্ষতাসম্পন্ন, মননশীল, সম্যক ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন অনুবাদক হাতেগোনা। ইদানীং অনেক প্রকাশনী বিভিন্ন ভাষার বই অনুবাদ করে প্রকাশ করছেন।

ইসলামি প্রকাশনাজগতে প্রকাশনীর অভাব নেই। শত শত প্রকাশনী বাংলাবাজারসহ সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রতিমাসে এসব প্রকাশনী শত শত বই প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু মানসম্পন্ন বই কয়জন প্রকাশক প্রকাশ করছেন, এটা হাতে গুনে বলে দেয়া যায়। এছাড়া আরও কিছু সমস্যা রয়েছে, সে বিষয়গুলো পরে বলছি।

দ্বিতীয় কথা: লেখক-অনুবাদকদের মধ্যে পেশাদারিত্বের অভাব। অনেকবার এমন হয়েছে, কোনো অনুবাদক নিজ থেকে আমাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। জানিয়েছেন, তিনি আমাদের প্রকাশনীর কোনো বই অনুবাদ করতে চান। তাঁর আগ্রহ এবং আমাদের প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবে তাঁকে আমরা অনুবাদের জন্য একটি আরবি বা ইংরেজি বই দিলাম। বই দেয়ার সঙ্গে আমরা বইয়ের কলেবর অনুযায়ী একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দেই। সেটা তিন থেকে পাঁচ মাস হয়ে থাকে, বইয়ের আকার অনুপাতে। যদিও এ সময়ের মধ্যে তিনটি বই অনুবাদ করে ফেলা যায়, তবু অনুবাদকের সুবিধা এবং অনুবাদ যথাযথ হওয়ার তাগিদে আমরা তাঁকে সময়ের বাগডোরটা একটু বাড়িয়েই দেই। কিন্তু অনেকবার এমন হয়েছে, এ নির্ধারিত তিন-পাঁচ মাস সময়ে অনুবাদক বইয়ের এক পৃষ্ঠাও অনুবাদ করেননি। অথচ এক সপ্তাহ দু সপ্তাহ পর পর তাঁকে ফোন করে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, কাজ হয়ে যাবে। আখেরে দেখা গেছে তিনি বইয়ের কিছুই অনুবাদ করেননি।

এই যে পেশাদারী (প্রফেশনাল) মনোভাবের অভাব, এমন অপেশাদারিত্ব নিয়ে কীভাবে একজন লেখক বা অনুবাদক নিজেকে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবেন? আরেকটি কথা এখানে বলে নেয়া ভালো, পেশাদারী মনোভাবের অভাবে লেখক-অনুবাদকরা লেখালেখিকে কখনোই সিরিয়াসলি নেন না। তাঁরা মনে করেন, লেখালেখিটা একটা শখের বিষয়। সময়-সুযোগ হলে লিখবো, ইচ্ছা না হলে লিখবো না। কিন্তু তাঁর স্মরণ রাখা প্রয়োজন, তাঁর কাছে লেখালেখি খাম-খেয়ালির বিষয় হলেও প্রকাশকের কাছে বই অনুবাদ করে বা পাণ্ডুলিপি তৈরি করে বই প্রকাশ করা রুটিরুজির প্রশ্ন। একজন লেখক যদি সঠিক সময়ে তাঁর কাজটি শেষ না করে দেন তবে প্রকাশক অবশ্যই ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।

পেশাদারী মনোভাবের অভাবের বিষয়টি শুধু প্রকাশককে বিপদে ফেলছে তাই কিন্তু নয়, এর দ্বারা ওই লেখক বা অনুবাদকও গোনাহগার হচ্ছেন। লেখক প্রকাশককে কথা দিয়ে কথা রাখতে পারছেন না, এটা তো অবশ্যই গোনাহর মধ্যে পড়ে। প্রকাশক তাঁকে নির্দিষ্ট সময় দিয়ে বই লেখা বা অনুবাদের সময় দিয়েছেন, কিন্তু লেখক সেটা নির্দিষ্ট সময়ে দিলেন না, এর দ্বারা প্রকাশকের যে লোকসান হলো, এর দায়ভার কে নেবে? ওই লেখক যদি নিজের অপারগতা আগেই প্রকাশ করে কাজটি না নিতেন তাহলে প্রকাশক অন্য কাউকে দিয়ে কাজটি করাতেন। তাতে তাঁর লোকসানের সম্মুখীন হতে হতো না।

আবার সম্মানীর অর্থ পাওয়ার পরও নির্দিষ্ট সময়ে পাণ্ডুলিপি দিতে পারেননি কিংবা পাণ্ডুলিপি আরেক প্রকাশকের কাছে বিক্রি করেছেন কিংবা অর্থের কথা অস্বীকার করেছেন, এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ বাংলাবাজারের প্রকাশকদের কাছে বসলেই শোনা যায়। অথচ যারা লেখক হিসেবে নিজেদের দাবি করছেন তাঁরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমাজের মান্যজন, বড় মাওলানা, মাদরাসার মুহাদ্দিস কিংবা মসজিদের ইমাম সাহেব।

এমন আরও অনেক অপেশাদারী মানসিকতা আমাদের লেখকদের মধ্যে ছড়িয়ে আছে, যার পরিশোধন হওয়া প্রয়োজন।

আপনি লিখতে পারেন-লেখক হয়েছেন, ভালোকথা। আপনি এখন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আইডল হিসেবে বিবেচিত। আপনাকে দেখে অসংখ্য পাঠক অনুপ্রাণিত হবে, আপনার জীবনাচার তাঁকে আকৃষ্ট করবে। কিন্তু আপনার মধ্যে যদি সাধারণ মনুষ্যত্ববোধ, দায়িত্বজ্ঞান, পাপবোধ, পেশাদারি মনোভাব না থাকে তবে আপনার লেখক হওয়ার তো আমি তেমন ফায়দা দেখি না। একজন লেখক মানে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। আপনার মধ্যে যদি অনুসরণের এমন বদগুণ প্রস্ফুটিত হয় তবে সাধারণ পাঠক কীভাবে আপনাকে অনুসরণ করবে?

 

তিন

প্রকাশকদের কথা বলা যাক। একটি প্রকাশনী যখন কেউ প্রতিষ্ঠা করে তখন তার মাথায় সর্বপ্রথম যে চিন্তাটা কাজ করে-আমাকে এখান থেকে ব্যবসা করতে হবে। ঠিক আছে, ব্যবসা আপনি করবেন, কিন্তু তাই বলে যাচ্ছেতাই জিনিস ছাপিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? যে প্রকাশক ব্যবসা করার জন্য প্রকাশনী দিয়ে বসেছেন, তিনি বাজার ঘুরে দেখেন কোন বইটা বাজারে বেশি বিক্রি হচ্ছে। সেটা যদি কোনো আরবি-উর্দু বইয়ের অনুবাদ হয় তখন তিনিও নিজের প্রকাশনী থেকে ওই বইটার আরেকটা অনুবাদ বের করেন। যেহেতু কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব কী জিনিস, এটা অধিকাংশ প্রকাশকই জানেন না, সেহেতু বাছ-বিচারহীন যে যেভাবে পারছেন বই অনুবাদ করে ছাপিয়ে ব্যবসা করছেন। মানবিচারের প্রশ্ন তো উঠছেই না, অনুমতি ব্যতীত অন্যের বই ছাপিয়ে তাঁরা যে গোনাহর কাজ করছেন, সেই অনুভূতিও কখনো হৃদয়ে উত্থিত হয় না। যেখানে লেখককে সম্মানী দিতে হয় না, সম্পাদনা বা প্রুফ দেখার টাকা দিতে হয় না, সেখানে কেবল লাভই লাভ। কিছু কিছু প্রকাশক এমন ব্যবসাই খুলে বসেছেন বাংলাবাজারে।

বাংলাবাজারের কিছু প্রকাশনী আছে যারা অভিনব উপায়ে জোচ্চুরি করে থাকে। ধরুন, কোনো বই যদি বাজারে খুব কাটতি হয় তখন এক শ্রেণির প্রকাশনী ওই বইটিকে স্ক্যান প্রযুক্তির মাধ্যমে স্ক্যান করে নতুন করে ট্রেসিং করে নিজেরা ছাপে, তবে বইয়ের প্রচ্ছদ এবং লেখক বা অনুবাদকের নাম পাল্টিয়ে সেখানে নতুন লেখকের নাম বসিয়ে দেয়। ব্যাস, একই বই তাঁরা একটু ভিন্ন নামে বিক্রি শুরু করে। পাপ-পুণ্যের বিচার কে করতে যায়!

সম্প্রতি আরও ভয়াবহ কিছু খবর শুনলাম। ধরা যাক বাংলাবাজারের কোনো বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। যারা পাঠ্যবইয়ের নোট-গাইড প্রকাশ করে আবার সাধারণ ধর্মীয় বইও প্রকাশ করে থাকে। বিরাট তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম। সারা দেশের মাঠপর্যায়ের লাইব্রেরিগুলোর সাথে বিশাল নেটওয়ার্ক। প্রতিমাসে কয়েক কোটি টাকার ওপরে তাদের ব্যবসায়িক বিক্রি-বাট্টা।

তো, এই প্রকাশনীর কাজ হলো, বাজারে যেসব বইয়ের কাটতি ভালো তারা সেসব বই বাজার থেকে কিনে এনে স্ক্যানের মাধ্যমে নতুন করে ছাপে। প্রচ্ছদও একই, কোনো পরিবর্তন নেই। এমনকি যে প্রকাশনী বইটি ছেপেছে তারাও ওই প্রকাশনীর নামেই বইটি ছাপে। মোটকথা, ভেতরে-বাইরে একদম হুবহু একই বই তারা নিজেদের প্রেসে দ্বিতীয়বার ছাপে এবং ওই নকল বইটি তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সারা দেশে বিক্রি শুরু করে। যারা আসল প্রকাশক তারা ঘুণাক্ষরেও টের পায় না যে তাদের বই নকল হয়েছে। বাজারে তাদের বই ভালো বিক্রি হচ্ছে ঠিকই কিন্তু লাভের পয়সা তার পকেটে না এসে যাচ্ছে নকলবাজের পকেটে। কী অভিনব জোচ্চুরি! অথচ এই প্রকাশনী থেকে কিন্তু কুরআনের তাফসির আর হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থও ছাপা হয়!

এ ধরনের প্রকাশনীর আরেকটি জোচ্চুরি শুনলাম। বাজারের কাটতি বইগুলো কিনে তারা তাদের নিজস্ব কম্পোজারের হাতে দেয়। কম্পোজার পুরো বইটি হুবহু কম্পোজ করে প্রকাশনীর কসাইসম সম্পাদকদের হাতে অর্পণ করে। সম্পাদকদের হাতেই মূলত আসল ম্যাজিক! সম্পাদকগণ কম্পোজকৃত বইটি দ্রুত সম্পাদনা শুরু করেন। এসব সম্পাদনার কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। সম্পাদক প্রতি পৃষ্ঠার প্রতিটি প্যারার প্রথম এবং শেষ লাইন পরিবর্তন করে পুরো বইটিকে নতুন করে রচনা করেন। বইয়ের নাম ও লেখক-অনুবাদকের নাম পরিবর্তন করে সেখানে নতুন নাম বসিয়ে নতুন বই বাজারে ছাড়া হয়। আসল প্রকাশনী যারা তারা যদি বইটি দেখে নকলের অভিযোগ আনে তবে নকল প্রকাশনী বলে-না, দুটো বইয়ের লেখা একেবারেই ভিন্ন, একটির সঙ্গে আরেকটির কোনো মিল নেই। আসল প্রকাশকের নিজের চুল ছেঁড়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না তখন।

 

চার

যাক, এতক্ষণ কেবল হতাশ্বাসের কথা বললাম। এবার কিছু আশাবাদের কথা বলা যাক।

পরিবর্তন হচ্ছে, ধীরে হলেও হচ্ছে। লেখক-অনুবাদকদের মধ্যে যেমন হচ্ছে তেমনি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানেও পরিবর্তন আসছে। একসময় মনে করা হতো, ধর্মীয় বই লেখা সোয়াবের কাজ তাই বই লিখে সম্মানী নেয়াটা গোনাহ। অনেক আলেম-লেখক নিতেনও না। কিন্তু এখন ধর্মীয় বিষয়ে লেখালেখি একটা প্রফেশন হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং আমি মনে করি, এটাই হওয়া উচিত। যে লেখক নিজের মেধা, সময়, শ্রম ব্যয় করে একটি বই লিখেলেন, হোক সেটা ধর্মীয়, তাঁকে অবশ্যই তাঁর প্রাপ্য সম্মানী বুঝিয়ে দেয়াটা ফরজ।

আমি আমার অনেক লেখকবন্ধুর ব্যাপারে জানি। তাঁদের যদি প্রশ্ন করি, আপনি মৌলিক কিছু লিখছেন না কেন? এভাবে অনুবাদ করে করে তো ইসলামি সাহিত্য বলতে কিছু দাঁড়াবে না। তখন তাঁর সোজাসাপ্টা উত্তর, এমন প্রকাশক কই? আমি ছয় মাস রক্ত-ঘাম ব্যয় করে একটি মৌলিক বই লিখলাম, তারপর সেটা কোনো প্রকাশককে দেয়ার পর প্রকাশক আমাকে ফর্মাপ্রতি বড়জোর আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা দেবে (ফর্মা=১৬ পৃষ্ঠা)। অথচ এ ছয় মাসে আমি যদি অনুবাদ করি তবে তাহলে নিদেনপক্ষে তিনটি বই অনুবাদ করতে পারবো। যার সম্মানীও ওই মৌলিক বইয়ের সমান হারেই পাবো। তাহলে কেন শুধু শুধু আমি মৌলিক বই লিখতে যাবো। দিনশেষে আমারও পেটের চিন্তা করতে হয়।

আবার মজার বিষয় হলো, কোনো প্রকাশককে যদি প্রশ্ন করি, আপনারা অনুবাদের পাশাপাশি মৌলিক বই প্রকাশ করেন না কেন? তখনা তাদের জবাবও খুব সাফ-মৌলিক বই লেখার মতো লেখক কই? আমাদের লেখকদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাঁকে দুই-চার হাজার টাকা বেশি দিয়ে একটা মৌলিক বই লেখাবো।

সুতরাং এখানে উভয় পক্ষ থেকেই গাফলতির প্রশ্ন তোলা যায়। তবে সবচে বড় যে বিষয়টি মৌলিক সাহিত্য বা মৌলিক গবেষণাগ্রন্থ রচনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, সেটা হলো আর্থিক বিষয়। বাংলাদেশে ইসলাম বিষয়ে মৌলিক সাহিত্য বা গবেষণাগ্রন্থ লেখার লেখকের যেমন অভাব নেই তেমনি এমন মানসম্পন্ন বই প্রকাশ করার মতো প্রকাশকেরও অভাব নেই। এর প্রমাণও আছে। বর্তমানে কিছু কিছু প্রকাশনী যোগ্য সম্মানীর মাধ্যমে ভালো লেখকদের দিয়ে অনেক মৌলিকগ্রন্থ প্রকাশ করছেন।

কিন্তু এ ধারা এখনও ততটা শক্তিশালী নয়। অনেক ইসলামি প্রকাশনী লেখকসম্মানী বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক বেখেয়াল। এই সম্মানী বিষয়টি যখন পেশাদারিত্বের আবহে উভয় পক্ষকে সমঝদার করবে, তখনই কেবল সৃষ্টিশীল মৌলিক কাজ হতে পারে। অন্যথায় সারাজীবন আমাদের অনুবাদ আর কপি-পেস্টের যাতনা সহ্য করে যেতে হবে। মৌলিক সাহিত্য যেমন সৃষ্টি হবে না, তেমনি সাহসী প্রকাশকও তৈরি হবে না।

বিদেশি উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে একজন লেখক একটি বই প্রকাশ করে আরামে বছরখানেক শুয়ে বসে কাটাতে পারেন। কারণ একটি বই লিখে সম্মানী বাবদ তিনি যে অর্থ পান তা দিয়ে তাঁর পরবর্তী এক বছর আরামছে চলে যায়। এই একটা বছর তিনি নতুন আরও দুটি বই লেখার জন্য যথেষ্ট গবেষণা ও অনুসন্ধানের সময় পান। এ সময়টা কাজে লাগিয়ে তিনি আবার নতুন দুটি বই লিখে ফেলেন।

আর আমাদের প্রকাশনীগুলো যে সামান্য সম্মানী লেখকদের জন্য বরাদ্দ করেন, তা দিয়ে কোনোমতে দু’মাসের বাড়িভাড়া দেয়া যায়। বাজার-সদাই আর সংসার চালানোর জন্য তখন লেখক মহোদয়কে নানা ধান্ধায় ছুটতে হয়। ধান্ধায় দৌড়াতে দৌড়াতে বই লেখার সময় কই! কিন্তু সত্যিকারার্থে যদি আমাদের প্রকাশক আর লেখকদের মাঝে পেশাদারিত্ব গড়ে ওঠতো তবে লেখকরা যেমন ভালো বই লেখার অনুপ্রেরণা পেতেন তেমনি প্রকাশকরাও মৌলিক বই ছাপিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ পেতেন। দুই নম্বরি করে বিদেশি বই অনুবাদ কিংবা আরেক প্রকাশনীর বই মারিং-কাটিং করে ছাপানোর প্রয়োজন হতো না। লাভবান হতেন দুই শ্রেণির মানুষই।

 

পাঁচ

‘নবধ্বনি পড়ে কেউ লেখক-সাহিত্যিক হয়ো না, নবধ্বনি পড়ে কেউ দিগ্বিজয়ী আলেম হয়ো না, নবধ্বনি পড়ে কেউ সভ্য-নম্র-ভদ্র হয়ো না; নবধ্বনি কোনো জাদুর যষ্ঠি নয়, নবধ্বনি পড়ে পারলে একজন মানুষ হয়ো!’

বছর কয়েক আগে নবধ্বনির কোনো এক সংখ্যায় এ কথাগুলো পুরো পৃষ্ঠাজুড়ে ছাপা হয়েছিল। এ কথাগুলোর মাঝে ছোট্ট নবধ্বনির অনেকটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। নবধ্বনি ঋজু, তবে অহমবোধে গর্বিত হওয়ার মতো রসদ নেই তার। তবে ভালোবাসা বিলিয়ে ভালোবাসা পাওয়ার ক্ষমতা অসীম।

মাঝে মাঝে অপরিচিত কারো সঙ্গে দেখা হলে আচমকাই জিজ্ঞেস করেন, আপনাদের ছোট্ট একটা পত্রিকা ছিল নবধ্বনি নামে, সেটার কী অবস্থা? অনেক ভালো লাগতো পত্রিকাটা…। এই, নবধ্বনির প্রাপ্তি দিনশেষে এইটুকুই যথেষ্ট। এই ভালোবাসাটুকুর জন্যই নবধ্বনি ক্লান্তির জঞ্জাল সাফ করে ফের ভেসে ওঠে, ডুবে আবার মস্তক উঁচিয়ে জানান দেয়- জিন্দা হ্যায়!

কয়েক মাস আগে যখন হঠাৎই মনে হলো, নবধ্বনি তার প্রকাশের দশ বছর পার করেছে; সত্যি বলছি, নিজের কাছেই কেমন বেখাপ্পা লেগেছিল। দশ বছর কেমন করে হয়! এমন দশ বছরী, বিশ বছরী স্মৃতিতর্পণ তো বড় বড় পত্রিকা-ম্যাগাজিনের বেলায় হয়। নবধ্বনির মতো ছোট্ট ম্যাগাজিন দশ বছর পার করলো কীভাবে? নাকি হিসাবে ভুল হল। আঙুল গুনে গুনে বছর গণনা করে দেখি। সত্যিই দশ বছর!

মনে পড়ে, প্রথম সংখ্যাটা ছাপা হওয়ার আগে আমি আর আনছারুল হক ইমরান ভাই গিয়েছিলাম প্রচ্ছদশিল্পী নাজমুল হায়দারের কাছে প্রচ্ছদের সফট কপি আনার জন্য। ২০০৭ সালের কথা। নাজমুল ভাইয়ের তখন নয়া পল্টনে অফিস। গিয়ে দেখি তিনি অফিসের নিচে একটা আঙিনামতো জায়গায় র‌্যাকেট খেলছেন। আমাদের দেখে কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখলেন। খেলা শেষ হলে তাঁর অফিসে গেলাম। তিনি সম্ভবত বিএনপি ঘরানার লোক ছিলেন, অফিসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছবি-টবি লাগানো ছিল। তিনি কম্পিউটার থেকে সিডি ডিস্কে কভারটা কপি করে আমাদের হাতে দিলেন। আমার কোনো ধরণাই ছিল না এই সিলভার ডিস্ক থেকে কীভাবে একটা জলজ্যান্ত পত্রিকার কভার বেরোবে! এমনই আনকোরা বোকা ছিলাম আমরা।

পত্রিকার ভেতরের পাতাগুলো ডিজাইন করতেন নীলক্ষেত ইউনিভার্সিটি মার্কেটের ডিজাইনার মনির ভাই। তাঁর কাছে আসা-যাওয়ার দুয়েকদিন পর জানতে পারলাম, তিনি আমাদের ধামরাইয়ের লোক। সে হিসেবে বেশ চিন-পেহচান হয়ে গেলো। অনেক দিন পর্যন্ত মনির ভাই নবধ্বনি ডিজাইন করে দিয়েছেন। একটা সময় নবধ্বনির ভালো-মন্দে তিনিও একাকার হয়ে মিশে গিয়েছিলেন। এখনও মাঝে মধ্যে যাত্রাপথে গাড়িতে কিংবা নীলক্ষেত গেলে মনির ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়। সহাস্যে জিজ্ঞেস করেন, আমার নবধ্বনির কী খবর?

মনির ভাই বড় আপন ছিলেন আমাদের। এখনও কোনো প্রয়োজনে যদি ইউনিভার্সিটি মার্কেটের সামনে দিয়ে যাই, স্মৃতি এসে কোলাহল করে ওঠে-কতো দিন নাওয়া-খাওয়া ভুলে তামীম ভাই, ইমরান ভাই, আমি এসে মনির ভাইয়ের ছোট্ট দোকানটাতে গাদাগাদি করে বসে থেকেছি। নবধ্বনি জন্মের নাড়ীর আঁচড় লেগে আছে মনির ভাইয়ের ‘দেশ-বাংলা গ্রাফিক্স হাউজ’-এ। এ দাগ মুছবে না কোনোদিন।

আসলে দশ বছর তো তেমন কিছুই নয় এক অর্থে। এভাবে সামান্য বিষয় নিয়ে স্মৃতি খুঁড়ে বেদনা জাগানোর মতো ঘটনাও বড় বাহুল্য শোনায়। কিন্তু ছোট বলে নবধ্বনির কাছে এসবের দারুণ দাম।

দশম বর্ষে পদার্পণ করার যাত্রাপথে নবধ্বনির জন্য এক বুক ভালোবাসা।

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১