২০০৭ সালে আমরা তিন-চারজন মিলে যে নবধ্বনির যাত্রা শুরু করেছিলাম, সেটির আজ দশ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। এই দশ বছর ধরে নবধ্বনি নানা বৈচিত্রময় স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের তারুণ্যকে বর্ণিল করে রেখেছে। নবধ্বনির কাছে তাই আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই।
সৃষ্টির বসন্তকাল হচ্ছে তারুণ্য। যার তারুণ্যে কোনো সৃষ্টি নেই, নতুন কিছু করবার আনন্দ নেই, তাঁর জীবন কেবলই শীতকালে শুকিয়ে থাকা শুকনো পাতার গাছের মতো। সেখান থেকে অনবরত কেবল পাতা ঝরে পড়ে, কোনো ফুল পল্লবের সৌন্দর্য তার জোটে না। এই বিবেচনায় আমার এবং নবধ্বনির সঙ্গে জড়িত আমাদের তারুণ্য বড় আনন্দময়।
২০০৭ সালে যখন নবধ্বনির পূর্বনাম ছিল নবযুগ, তখন আমরা মাদরাসার ছাত্র। কোনো পুঁজি-বিনিয়োগ নেই, দপ্তর কিংবা দপ্তরিও নেই, আমরা নবযুগ ছাপিয়ে নিয়ে এলাম নীলক্ষেত থেকে। প্রথম সংখ্যাটি হলদে রঙের চায়না নিউজপ্রিন্টের কোমল কাগজে ছাপা। প্রচ্ছদ করে দিয়েছিলেন সেকালের একজন নামজাদা প্রচ্ছদশিল্পী, তাঁকে কেবল ডিজাইন বাবদ দিতে হতো দু হাজার টাকা। আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের কাছে সেটি তখন এক মাসের বোর্ডিং ফিয়ের চেয়ে বেশি ছিল।
আমাদের হাতে প্রকাশিত নবযুগের প্রথম সংখ্যাটি পাঁচ টাকা দিয়ে কিনেছিল আমার বন্ধু ফিরোজ। ওর পুরো নাম মাহফুজুর রহমান ফিরোজ। এখন সে বারডেম থেকে পাশ করা এমবিবিএস ডাক্তার। নবযুগ-নবধ্বনির ইতিহাসে তাঁর নাম আজও লেখা আছে প্রথম ক্রেতা এবং উৎসাহদাতা একজন সুহৃদ হিসেবে। এমন ‘প্রথম’-এর তালিকায় আরও কয়েকজনের নাম আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে।
আমাদের এই ছোট কাগজ প্রকাশের আগে প্রথম ৫০০ টাকার বিজ্ঞাপন দিতে সম্মতি দিয়েছিলেন উদার হৃদয়ের মানুষ এবং তৎকালীন হাফেজ্জী হুজুর রহ. লাইব্রেরির কর্ণধার আব্দুল কুদ্দুস ভাই। এক বুক কৃতজ্ঞতায় আমি আজও তাঁকে স্মরণ করি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে। তিনি আজ কোথায় আছেন, কেমন আছেন-আমাদের জানা নেই। কিন্তু আমাদের হৃদয়ের আয়নায় তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।
আর নিজের পাঠাগারের নামে মাত্র ৫০ টাকার ছোট একটি শুভেচ্ছা বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন আমার সহপাঠী শাহজালাল ভাই। তিনিও আছেন এই ‘প্রথম’-এর তালিকায়। কারণ, পত্রিকা প্রকাশের পর বিজ্ঞাপন-মূল্য সবার আগে তিনি হাসিমুখে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শাহজালাল ভাই এখন বড়কাটারা মাদরাসার শিক্ষক। লেখালেখি কিংবা বাংলা সাহিত্য চর্চার সঙ্গে আজ তাঁর কোনো সম্পর্ক আছে কি-না জানি না, তবে নবযুগ-নবধ্বনির খাতায় তাঁরও নাম লেখা আছে।
২০০৭ সাল পেরিয়ে ২০০৮। একদিন নবধ্বনির ইমেইল খুলে দেখি বেশ কিছু বার্তার ভিড়ে কাতার থেকে একটি লেখা এসেছে। লেখাটি পাঠিয়েছেন সৈয়দ মাহবুব আলম। আমাদের সীমিত কলেবরে যে আকারের লেখা ছাপা হয়, এর চেয়ে তাঁর লেখাটি কয়েকগুণ বড়। ফলে লেখার গুণগত মান এবং বিষয়বস্তু ভালো হলেও সেটি আর ছাপানো সম্ভব হয়নি।
কয়েকদিন পর কোনোভাবে নবধ্বনির মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন কাতারপ্রবাসী মাহবুব ভাই। ফোনের ওপাশ থেকে তার বিনয়ী কথাবার্তা আমাদের মুগ্ধ করল। কথায় কথায় একদিন তিনি আমার প্রসঙ্গে জানতে চাইলেন। তাঁকে বললাম, সদ্য দাওরা শেষ করেছি। আরব দেশগুলোর কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছে রয়েছে। সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। তিনি বলে ফেললেন, অন্যান্য দেশে যখন আবেদনপত্র পাঠাচ্ছেন, কাতার বিশ্ববিদ্যালয়েও পাঠাতে পারেন।
এ ফোনালাপে কয়েকবার কাতার শব্দটি শোনার পর আমি গুগলে কাতার সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করি। এর আগ পর্যন্ত কাতার সম্পর্কে আমার কোনো পূর্বধারণা ছিল না। মাহবুব ভাইয়ের কথায় কাতার এবং কাতার বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানার আগ্রহ হলো। এর কিছুকাল পর যখন সৌদিআরব, ইয়েমেন, লিবিয়াসহ বিভিন্ন আরব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদনপত্র তৈরি ও পাঠানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, তখন কাতারের নামটিও আমার পকেটে থাকা তালিকায় লিখে রাখলাম।
২০০৯ সালে আমি অনেকগুলো আরব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও বৃত্তির আবেদন জানিয়ে কাগজপত্র পাঠাতে শুরু করি। মাহবুব ভাইয়ের সুবাদে আরেক সুহৃদ সাইফ ভাইয়ের সঙ্গে একদিন কথা বলার সুযোগ পেলাম। সাইফ ভাই তখন এবং আজও কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। আমাদের বাসায় থাকা র্যাঙ্কসটেল ফোন ব্যবহার করে সাইফ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার পর তাঁর আন্তরিকতা এবং মমতাময় সৌহার্দ আমাকে ছুঁয়ে গেল।
মাহবুব এবং সাইফ ভাইদের সঙ্গে কথা বলে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে যেটুকু বাড়তি আগ্রহ জন্ম নিল, এর ওয়েবসাইট দেখার পর তা মোটামুটি কমতে শুরু করল। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত কাতার বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর বৃত্তিতে অন্তর্ভুক্ত পড়ালেখা ও থাকা-খাওয়ার সব সুযোগ দেখে মনে হলো, অতো সুখ আমার কপালে হয়তো নেই। তবুও আশা ছাড়িনি। অন্যান্য আরব বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানায়ও একটি প্যাকেট রওয়ানা হলো ঢাকায় অবস্থিত ডিএইচএল অফিস থেকে।
এর পর ধীরে ধীরে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম নানা কাজে। নবধ্বনির কারণে ততদিনে মুদ্রণ ব্যবসায় আমার হাত বেশ পেকেছে। হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিকে কিভাবে কত স্তর পেরিয়ে কাগজে বাঁধাই ঝকঝকে বইয়ে রূপান্তর করতে হয়, এর সবকিছু আমার নখদর্পণে। দু-এক মিনিটে বলে দিতে পারি, এতো ফর্মার বই হলে এতো টাকা খরচ হবে। বেশকিছু পরিচিতজন তখন আমাকে দিয়ে তাঁদের ছাপার কাজও করাচ্ছেন। নবধ্বনির ব্যস্ততা, মানুষের ছাপার কাজে নিয়মিত নীলক্ষেত দৌড়ঝাঁপ-কী এক সুবর্ণ ব্যস্তসময় কেটেছে আমার উনিশ-বিশের বয়সে।
আমার আজও স্পষ্ট মনে পড়ে, বি-বাড়িয়াবাসী মরহুম বড় হুজুর আল্লামা সিরাজুল ইসলাম রহ. স্মরণে একটি স্মারক প্রকল্পের কাজে তখন যুক্ত আমি। সময়টা ২০১০ সালের শুরুর দিকে। এই প্রকল্পে যুক্ত ছিলাম আমি, সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর, আনছারুল হক ইমরান এবং আরও কয়েকজন। কাজের কাজ উল্লেখযোগ্য কিছু হচ্ছিল না সত্য, কিন্তু কাজ ঘিরে আমাদের ব্যস্ততা ও অর্জন ছিল উপভোগ্য।
এই স্মারকের জন্য তথ্য সংগ্রহ ও সংকলনের কাজে আমি যখন বি-বাড়িয়ায় এক রেস্তোরাঁয় দুপুরের ভোজ সারছি, তখন কাতার থেকে সাইফ ভাইয়ের ফোন এল আমার মোবাইলে। তিনি আমাকে জানালেন, আপনার ভর্তি প্রায় নব্বই ভাগ নিশ্চিত। শুধু আইইএলটিএস পরীক্ষাটা দিতে হবে। খুব জলদি পরীক্ষাটা দিয়ে দিন এবং এর ফলাফল আমাকে পাঠাবেন।
উচ্চতর পড়ালেখার স্বপ্ন আবারও প্রাণশক্তি ফিরে পেল। ঢাকায় ফিরে সাইফুরসে ভর্তি হলাম। মাস দুয়েক কোর্স করে চট্টগ্রাম গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে এলাম। এরপর খুব সংক্ষেপে বলছি, কাতার বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ভর্তি এবং বৃত্তি দিল। অযোগ্য হলেও দৌড়ঝাঁপ এবং মা-বাবার দোয়া সবসময় অব্যর্থ-এই বিশ্বাস আরও পোক্ত হলো তখন। ব্যাগ গুছিয়ে ২০১০ সালের ২৯ আগস্ট (১৯ রমজান) আমি দেশ ছেড়ে চলে এলাম কাতারে।
কাতারে আসার পর আজ সাত বছর পেরিয়ে গেছে, অর্ধযুগের বেশি এই সময়ে আমি কাতার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষে বিশ্বখ্যাত শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাতার ফাউন্ডেশনে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত এখন। এর সঙ্গে জুটেছে একটি সরকারি চাকরি। আমার এই ক্ষুদ্র তারুণ্যের এটুকু অর্জনের পেছনে নবধ্বনি জড়িয়ে আছে গভীরভাবে। নবধ্বনিতে লেখা পাঠানো কাতারপ্রবাসী মাহবুব ভাইয়ের সঙ্গে ফোনালাপ থেকে আজকের আমি-পরম করুণাময়ের এই অসামান্য দানের আনন্দে আজও প্রতিনিয়ত দ্রবীভূত হই।
নবধ্বনির প্রকাশনা শুরু থেকে অনিয়মিত। প্রথম দু-তিন বছর, যখন আমরা প্রতি মাসের এক তারিখে এটি তুলে দিতাম পাঠকের হাতে, তখনও রমজানের প্রাক্কালে বন্ধ থাকতো এর প্রকাশনা, আমরা সেই সুযোগে হাফ ছেড়ে বাঁচতাম, আরও নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নিজেদের ঝালাই করে নেওয়ার সুযোগ পেতাম। ফলে অনিয়মিত প্রকাশনার এই মধুর কলঙ্ক শুরু থেকেই লেপ্টে আছে আমাদের গায়ে। আজ দশ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে, এখনও অনিয়মিত রয়ে গেলাম আমরা।
তবে স্বার্থপর হয়ে একটি কথা এখানে না বললেই নয়, পাঠকদের জন্য নবধ্বনির ছাপা ও বিতরণ অনিয়মিত হয়েছে বারবার-এতে পাঠকরা বঞ্চিত হয়েছেন নবধ্বনি প্রাপ্তির আনন্দ থেকে, আমরা বঞ্চিত হয়েছি পাঠকদের সান্নিধ্য থেকে। কিন্তু নিজেরা নিজেদের কাছে আমরা শূন্য হইনি। নবধ্বনি কৈশোর ও তারুণ্যের প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের উজ্জীবিত করেছে সামনে এগিয়ে যেতে। নবধ্বনি করতে গিয়ে এই বিপুলা পৃথিবীর কত কিছু আমরা জানতে পেরেছি, এতে আমাদের চোখ বড় হয়েছে, আমরা নিজেদের চোখে বিশ্ব দেখতে চেয়েছি-এই দেখা এবং জানতে চাওয়ার উন্মাদনায় ছুটে চলেছি আজও। ফলে নবধ্বনি অন্দরমহল থেকে আমাদের বহির্জগত দেখবার প্রথম জানালা, যা আমাদের স্বপ্ন চর্চায় নিয়মিত আলো-বাতাস প্রবেশের পথ করে দিচ্ছে।
নবধ্বনির সুবাদে আমাদের বন্ধু হয়েছে বেশুমার, শত্রুতারও মুখোমুখি হয়েছি কয়েকবার। বি-বাড়িয়ার হোসাইন আহমদ, আমাদের শ্রেণিতে যার পরিচিতি ছিল অত্যন্ত নীতিবান এবং রসহীন কঠোর-সেই তিনি আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলেন। নবধ্বনি ছাপাখানায় যাওয়ার আগে তিনি প্রথম পাঠক হিসেবে পুরোটা পড়ে দিতেন। এরপর আরও বেশকিছু কাজে জড়িয়ে গেলেন তিনি। বিভিন্ন জায়গায় এজেন্ট সংগ্রহ, পাঠকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগসহ নানা কাজে বিনা বেতনে নবধ্বনির জন্য মেধা, শ্রম ও সময় ব্যয় করেছেন হোসাইন আহমদ। কোনোদিন একটি টাকাও বেতন দেওয়া হয়নি তাঁকে; অথচ আজকের এই স্বার্থপর সময়ে এসে আমি তীব্রভাবে অনুভব করছি-সেকালের মতো একজন হোসাইন আহমদ আজ আর কেউ কোথাও খুঁজে পাবে না।
নবধ্বনির প্রচার, প্রসার ও অন্যান্য কাজে বেশ শ্রম দিয়েছেন আনছারুল হক ইমরান। তিনি ছিলেন এর প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি রাজনীতি করতেন, কিন্তু নবধ্বনির আঙিনায় এলে রাজনীতি ছেড়েছুঁড়ে সুবোধ বালক হয়ে যেতেন। আনছারুল হক ইমরানের সঙ্গে আমাদের অনেক স্মৃতি। কত গভীর রাতে আমরা নবধ্বনির মুদ্রণ প্রস্তুতি সেরে লালবাগে ফিরেছি দেয়াল টপকে-সেসব আজও সোনালি স্মৃতি হয়ে আছে আমার কাছে। আনছারুল হক ইমরান আজও রাজনীতি ছাড়েননি, চাকরি ও সংসার নিয়ে এখন ব্যস্ত সময় কাটে তাঁর-নবধ্বনির সঙ্গে তিনি আজ আর নেই, কিন্তু আমরা তাঁকে কৃতজ্ঞচিত্তে মনে রেখেছি।
প্রতি মাসের শেষনাগাদ নবধ্বনি ছাপতে গিয়ে ধার কর্জের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিত। বিভিন্ন জেলা থেকে এজেন্টরা বিক্রয়ের যা অর্থ পাঠাতেন, সেসব সময়মতো হাতে আসতো না। কখনো কখনো বিজ্ঞাপনদাতারাও দেরি করতেন, ওদিকে নগদ অর্থ ছাড়া ছাপাখানার মালিকদের বশ করা যেত না। ফলে সহপাঠীদের কাছ থেকে অর্থ ধার করে নবধ্বনি ছাপাতাম আমরা। এমন দুঃসময়ে ঋণদাতা হয়ে পাশে থাকতেন আব্দুল মুমিন, সানাউল্লাহ, আবরারসহ আরও দুয়েকজন। কত সহপাঠীর নামধাম আমরা ভুলে গেছি, কিন্তু নবধ্বনির কারণে এঁদের কথা আজও মনে পড়ে।
প্রতি মাসে নবধ্বনি বেরোবার পর আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম ১০-১১ তারিখের জন্য। এদিন আমরা সোলায়মান সাহেবের অফিসে যেতাম। তিনি ছিলেন স্বপ্নকুটির আবাসিক প্রকল্পের চেয়ারম্যান। ধানমণ্ডিতে একটি বিদেশি ওষুধ কোম্পানিতে চাকুরি করতেন। আমরা কখনো তাঁর ধানমণ্ডিস্থ অফিসে গিয়েছি, কখনো মোহাম্মদপুরে তাঁর বাসভবন-লাগোয়া আবাসিক প্রকল্পের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হয়েছি। নবধ্বনিতে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের বিনিময়ে তিনি আমাদের দু হাজার করে টাকা দিতেন। সেকালে এই অর্থ পেয়ে আমরা নবধ্বনির বিল পরিশোধ করতাম, নয়তো ধারদাতাদের হাতে তাঁদের পাওনা তুলে দিতাম।
সোলায়মান ভাই একজন তরুণ এবং সদাহাস্যমুখ ভালো মানুষ ছিলেন। নয়তো আমাদের মতো বাউন্ডুলে ছোকড়াদের জন্য প্রতি মাসে তিনি ওই পরিমাণ অর্থ পানিতে ফেলতেন না। পাঁচটাকা মূল্যের পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে ক’জন পাঠক স্বপ্নকুটির আবাসিক প্রকল্পে প্লট বুকিং দেবে-এসব বাস্তবতা না ভেবে তিনি আমাদের আবেগ ও স্বপ্নের প্রতি দীর্ঘকাল যে মমতাময় স্নেহ ও সমর্থন যুগিয়েছেন, এর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আজও জানা নেই আমার।
আমার খুব ইচ্ছে হয়, নবধ্বনির সেই দুর্দিন এবং সুদিনে যারা আমাদের পাশে ছিলেন, তাঁদের সবাইকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করব। সবার প্রতি আমাদের গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব। তাঁদের উদ্দেশ্যে বলব, আমাদের স্বপ্নের চারাগাছ আজ দিনে দিনে বড় হচ্ছে, এর মূলে রয়েছে আপনাদের সেদিনের হাসিমুখ এবং সমর্থনের অমূল্য পরিচর্যা। নবধ্বনিকে কেন্দ্র করে আমাদের যত সাফল্য এবং অর্জন-এর সবই আপনাদের।
যে কথাটি খানিক আগেও বলতে চেয়েছি, নবধ্বনি অনিয়মিত হলেও এটির ছায়ায় আমাদের যাত্রা কখনো অনিয়মিত থাকেনি। কারণ, নবধ্বনির মাধ্যমে আমরা সবার আগে নিজেদের গড়তে চেয়েছি, নিজেদের চোখ পাকিয়ে বিশ্বটাকে দেখতে চেয়েছি। আমাদের সেই চর্চা এবং পথচলা আজও অব্যাহত। নবধ্বনি থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও সঞ্চিত সাহস নিয়ে আমরা শুরু করেছি ‘নবপ্রকাশ।’ পাঠকদের হাতে ইতিহাস, গল্প ও উপন্যাসের সেরা বইগুলো তুলে দিতে আমাদের এই প্রয়াসের মূল উৎস নবধ্বনিতে গেঁথে আছে।
ঢাকার বাজারে এখন অনেক ইসলামি মাসিক পত্রিকা ও ম্যাগাজিন প্রতি মাসে বেরোচ্ছে। অন্য ধারা ও ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের আরও কত সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক প্রকাশনা রয়েছে। এর সঙ্গে যুগ হয়েছে ফেসবুকনির্ভর নেটআসক্তি। এমন অস্থির সময়ে কে বা কারা নবধ্বনি পড়বে, সেটি নিয়ে আমাদের মোটেও দুশ্চিন্তা নেই। অবশ্য এই চিন্তা আগেও আমাদের ছিল না। কারণ, নবধ্বনি আমরা নিজেদের স্বার্থে করি। আমাদের এইসব কথাবার্তা কারও ভালো লাগলে তাঁকে বন্ধু হিসেবে বরণ করে নেব, মন্দ লাগলে তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে বলব, নবধ্বনি আপনার জন্য নয়।
আজ ১৬ অক্টোবর। ইচ্ছে ছিল দশম বর্ষপূর্তির এই সংখ্যা যথাসময়ে পাঠকদের হাতে তুলে দেব। এরপর ভাবনা হলো, পাঠকই-বা কোথায়, যেহেতু নিজেদের জন্যই করছি, একটু দেরি না হয় হোক। কিন্তু ১০ অক্টোবরের পর থেকে আসাদ প্রতিনিয়ত জানাচ্ছে, পাঠকরা এসে নবপ্রকাশে নবধ্বনির খোঁজ করছেন। ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জার এবং নবপ্রকাশের মোবাইলে দূরবর্তী পাঠকদের জানতে চাওয়ায় বিব্রত হচ্ছে নবপ্রকাশের কর্মী ইসহাক, এসব শুনে আমি অবাক হয়েছি। আমি দীর্ঘকাল পর আবারও ২০০৭ সালের হারানো শিহরণ অনুভব করলাম।
গত ক’দিন ধরে অব্যাহতভাবে তাড়া দিচ্ছেন সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর। নবধ্বনির শুরুলগ্নে তিনি ছিলেন কেবলই একজন লেখক। আমরা লেখা চাইতাম, তিনি লেখা দিতেন। বেশ ভালো করেই জানতেন, লেখার বিনিময়ে নবধ্বনি তাকে দু’ পয়সাও সম্মানি দেবে না। তবুও সহপাঠী বলে মুখলজ্জার খাতিরে লিখতেন নিয়মিত। কিছুদিন পর অবসরে ছাত্রাবাসে বসে না থেকে আমাদের সঙ্গ দেওয়া শুরু করলেন। যাতায়াত শুরু হলো মনির ভাইয়ের দেশবাংলা গ্রাফিক্স হাউসে। বসে বসে এর সাজসজ্জার কায়-কারবার দেখতেন।
একদিন জাহাঙ্গীর বলে বসলেন, গ্রাফিক্স শিখে ফেলি, কী বলেন? আমরা সায় দিলাম, উৎসাহ যোগালাম। তিনি মনির ভাইয়ের কাছে প্রাথমিক তালিম নিলেন। এরপর আরও কয়েকজন গুরু ধরলেন। হাত পাকিয়ে নিলেন। ততদিনে আমাদের সঙ্গে তিনি জড়িয়ে গেছেন। লেখক থেকে অঘোষিত সম্পাদক হলেন। এরপর নবধ্বনির প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জার কাজ নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। এখন তিনি নবপ্রকাশের প্রধান সম্পাদক। আজ অবধি বিনা বেতনে নবধ্বনির চূড়ান্ত সম্পাদনা ও প্রচ্ছদ তৈরি এবং অভ্যন্তরীণ সাজগোজের কাজ করে দেন। অনন্ত কৃতজ্ঞতা বলতে কোনো শব্দ হয়তো নেই, কিন্তু সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীরের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা ও কৃতজ্ঞতারও কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।
দশ বছর যেহেতু পেরিয়েই গেল, এখন আর খামখেয়ালি চলে না। শৈশবের অনেক দুষ্টুমি এখন ছেড়ে দেওয়ার সময় হয়েছে। যেটি ছিল আমাদের খেয়ালিপনা, সেই অনিয়মিত প্রকাশনা এখন থেকে আর করা চলবে না। দশ বছর পেরোনোর এই আনন্দঘন সময়ে আমরা সেই পুরনো প্রতিজ্ঞা আবারও করতে চাই, এখন থেকে নবধ্বনি নিয়মিত প্রকাশিত হবে। প্রতি মাসের এক তারিখে পাঠকদের হাতে পৌঁছে যাবে আমাদের নবধ্বনি, নতুন দিনের পদধ্বনি। একইসঙ্গে আবারও জেগে উঠবে নবধ্বনির কিশোর পাঠকদের সংগঠন রংধনু। আবারও আগের মতো ভরে উঠবে আমদের ডাকবাক্স এবং ইমেইল ইনবক্স-এটি কেবল আমাদের প্রত্যাশা নয়, বরং শপথও। প্রিয় পাঠকরা নিশ্চয় এবার আমাদের প্রতিজ্ঞা আগের চেয়ে গভীর বিশ্বাসে কবুল করবেন।
এই পর্যায়ে এসে মনে পড়লো, একটি কথা বলা-ই হয়নি। ‘নতুন দিনের পদধ্বনি’ আমাদের এই শ্লোগানটির রচয়িতা সবার প্রিয় জাগ্রত কবি, আমাদের আপনজন মুহিব খান। তাঁর প্রতি আমাদের শুভেচ্ছা এবং এক ডালি কৃতজ্ঞতা। নবধ্বনির বর্তমান পরিসরে যুক্ত আছে আসাদুল্লাহ খান, হামমাদ রাগিব এবং সিফাত খান। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নবধ্বনি আগের চেয়েও বেশি পাঠকপ্রিয়তায় নন্দিত হবে, এই বিশ্বাসে আমাদের নতুন যাত্রা ঘোষণা করছি আজ থেকে।
সর্বশেষ বলতে চাই, নবধ্বনি আমাদের লালিত স্বপ্ন নয়, বরং স্বপ্নের প্রতীক। একে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় আমাদের অনেক স্বপ্ন ও আবেগ। এর কোনোটি বাস্তবে রূপ পায়, কোনোটি অবাস্তবতার আড়ালে হারিয়ে যায়। নবধ্বনির ভেতর যেহেতু নতুনের গন্ধ আছে, আমরা সেই গন্ধ শুঁকে বারবার জেগে ওঠি নতুনের চেতনায়। প্রতিটি সূর্যোদয় আমাদের কাছে নতুন নতুন প্রেরণার বাণী নিয়ে হাজির হয়। আমরা নতুন উদ্যমে নিজেদের নবায়ন করি, নতুনের সন্ধানে ছুটে চলি।
আমরা চাই, নতুনের পেছনে বিরামহীন ছুটে চলার এই প্রেরণা সবাইকে ছুঁয়ে যাক। যা কিছু জীর্ণ, তা পড়ে থাক, আমরা খুঁজে নেব নতুনের আনন্দ। জীবন তখন হয়ে উঠবে আগের চেয়ে বেশি চাঙ্গা এবং কর্মময়। অতীত ভুলে নয়, বরং আমরা অতীত স্মরণে রাখি আনন্দ বেদনার স্মৃতির আবরণে, কিন্তু সেটি আঁকড়ে ধরে রাখি না। অতীতের সাফল্য আমাদের অনুপ্রাণিত করে, অতীতের ব্যর্থতা আমাদের সতর্ক করেÑকিন্তু অতীতের বৃত্তে বসে অর্জনের আনন্দে আহ্লাদিত হয়ে মনের সুখে অলস সময় পার করতে আমরা রাজি নই কোনোদিন।
নবধ্বনি তাই এক দশক পরও আমাদের কাছে চিরনতুন। নতুনের এই আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বময়, সেই প্রত্যাশায় আমাদের সব পাঠক, গ্রাহক, বিজ্ঞাপনদাতা এবং শুভানুধ্যায়ীর প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
নতুন দিনের পদধ্বনিতে মুখরিত হোক আমাদের সময়।
সম্পাদক, মাসিক নবধ্বনি
