হুমায়ূন আহমেদের প্রশংসার চাইতে আমার কাছে তার সমালোচনাই বেশি। বাংলা সাহিত্যে নির্জীব-চিন্তাহীন পাঠক তৈরির একটা বড় অবদান তার। কোনোরকম ভাবনা-চিন্তা ছাড়া দৈনন্দিন কাজকর্ম-ব্যবহারের খুঁনসুটি দিয়ে তার তরুণতর পাঠক শ্রেণিকে আটকে রেখেছেন দিনের পর দিন। সাহিত্যের মূল্যবোধ তৈরিতে তার বিশাল অনিচ্ছা। প্রায়ই বলতেন- আমি তো শিক্ষক না; সাহিত্য দিয়ে শিক্ষা দিবো, এটা একটা বিনোদন। আর বিনোদন দেয়াই আমার কাজ।
এই সমালোচনাবোধ নিজের মধ্যে ধারণ করেও প্রতি বছর হুমায়ূনের প্রতিটি বইয়ে ছিলো আমার নজর; তার ছবিতে ছিলো দৃষ্টি, কখন মুক্তি পাবে তার নতুন কোনো ছবি। কোনো কোটেশন না দিয়ে কেবল অনুভূতি আজ দিতে চাই ছড়িয়ে। ছোট ছোট মানুষ, মধ্যবিত্ত মানুষ, রিকশাঅলা, তরুণ বেকার, লাল শাড়ির যুবতী, সবার মনে ছোট ছোট কথা, একটু ব্যথা, বেশ সমাদরেই তুলে আনতেন নিজের গল্পে-উপন্যাসে-ছবিতে-নাটকে-গানে।
এতোটা কোমল-হাস্যরসের খেয়ায় চড়িয়ে খুব কম সাহিত্যিকই পেরেছেন খুব সাধারণ পাঠকের কাছে অসাধারণ আবেদন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। তার মৃত্যুর পর তাই ফেসবুকে এক পাঠক লিখেছিলেনÑ আপনাকেই পড়ে মনের গহীন কোণে একটু একটু ভালোবাসা টের পাচ্ছিলাম। ভালোবাসা জিনিসটা বুঝতে শিখছিলাম। আজ না বলে চলে গেলেন, খুব কষ্ট এবং মানতে পারছি না।
হুমায়ূন আহমেদ আর নেই। শব্দটা খুব অচেনা-বেমানান। অতি বানোয়াট মনে হয়। এই মানুষটা ঈদে ঈদে প্রতিটি দৈনিকের সংখ্যা আলোকিত করে রাখতেন হাসি-ঠাট্টা আর বিনোদনে। কী ঘরে কী বাইরে।
বৃহস্পতিবার রাত এগারোটা বিশে, একেবারেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। প্রথম সংবাদটা দেয় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের কলেজ কার্যক্রমের বন্ধু নিশাত রহমান শারিকা- শাকিল! হুমায়ুন আহমেদ আর নেই। বুঝা যায়, নিশাত এর চে বেশি কথা বলবে না। আমি তাই আগ বাড়িয়ে বলি- তোর কি প্রিয় ছিলো? নিশাত উত্তরে বলে- না না, তার তো চান্নি পসর রাইতে যাওয়ার কথা। তার তো দেয়াল আমাদের হাতে তুলে দেয়ার কথা।’ -নিশাতের ফোনলাইন কেটে যায়।
আমি স্থবির হয়ে মিনিট দশেক বসে থাকি জানালার পাশে বিছানায়। দু পাশের জানালা দিয়ে হুহু করে বাতাস ঢুকছে, খুব বিরক্ত হয়ে ওঠি। বাতাসের শব্দ ভালো লাগে না। হঠাৎ পাশের রুম থেকে সুর ভেসে আসে- যদি মন কাঁদে তবে চলে এসো, চলে এসো এক বরষায়। গানের সুরে বাইরের প্রকৃতির আধোবৃষ্টিতে চোখ যায়, মনে পড়ে সারাদিন ঘ্যানঘ্যান বৃষ্টির কথা।
এই বরষাতেই কি হুমায়ূনের মন কেঁদেছিলো, নিজের লেখা গানের সুর তাল আর লয়ের সঙ্গে চলে গেলেন একেবারে!
হুমায়ূনস্ত্রী শাওনের কণ্ঠে গানটি পাশের রুমের প্রতাপ, তনু আর তাপসরা শুনছে। দু’পা ফেলে ওদের রুমে প্রবেশ করি। রুমের ভেতর পুরোটা জুড়েই আট-দশজন বসে আছে। তনুর ডেস্কটপে শাওনের গানে সবার কান। অবলীলায় বসে পড়ি ওদের মাঝে।
খুব দেখার ইচ্ছা ছিলো হুমায়ূন আহমেদকে। এখন তার লাশটাই দেখতে হবে। -প্রতাপের কণ্ঠে যন্ত্রণা ঝরে পড়ে। ওর পাশে বসা তৈয়ব শেখ- প্রতিরাতেই বাসায় ফিরে হুমায়ূনের বইয়ে চোখ দিতেন- কী- বলতেই ‘নো কমেন্টস’ বলে বিছানায় পাশ ফেরেন।
বুঝা যায়, এই হতবাক-বিমূঢ় খবরে কারো স্বস্তি নেই। সারাদিন যাদের হিন্দি গানেই ভালোলাগা, তাদের কাছে হুমায়ূন এতোটা প্রিয়, আনন্দ এসে গেলো।
প্রতাপ বলে- ওর ‘আমার আছে জল’ গানটা শুনেই একটা প্রিয় অনুভূতি কাজ করে প্রথম।
সংবাদটা জানাবো বলে নেত্রকোণায় বাস করা বাংলা প্রবন্ধের অন্যতম রাজপুত্র যতীন সরকারের কাছে ফোন দিই। সংবাদ শুনেই যতীন সরকার একটু শব্দ করে বলে উঠলেনÑ খুব ক্ষতি হয়ে গেলো আমাদের। খুব মর্মান্তিক। জনপ্রিয় ধারার প্রধানতম সাহিত্যিক আর নেই। সামনে কিছু দেখতে পাচ্ছি না।
একচোট নিলেন, যারা জনপ্রিয় সাহিত্যকে দূরে রাখেন- যতীন সরকার বলেনÑ জনপ্রিয় সাহিত্য সাহিত্য না বলে যারা বুলি কপচান, তাদের বুঝতে হবে সাহিত্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এরচে ভালো পথ নেই। বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিকতা রাখতে হুমায়ূনের ভূমিকা প্রধান।
অভিনেত্রী, নৃত্যশিল্পী নিলুফার ওয়াহিদ পাপড়ি বললেন- বাংলাদেশ একজন মহীরুহকে হারালো। সৃষ্টিকর্মের কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে হুমায়ূনের কলমের ছোঁয়া লাগেনি। বিশেষ করে নাটকে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমি খুব মর্মাহত।
সমালোচক, কবি সৈকত হাবিব সংবাদ শুনেই আহারে বলে চুপ করে থাকলেন কিছু সময়। এক সঙ্গে অনেক কিছু হারালাম আমরা। এতো এতো সৃষ্টিকর্মের নায়ককে… খুব ক্ষতি হয়ে গেলো সাহিত্যের।
তবে কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার আলো ফেলেন অন্যত্র। তিনি বলেন- সাহিত্যের কতোটা ক্ষতি হলো তা বুঝা যাবে আরও পরে, ভবিষ্যতে। তবে তার মৃত্যুতে অসংখ্য তরুণ পাঠক বেদনাহত হয়েছে। বেশি ক্ষতিটা হয়েছে বই প্রকাশনীর।
জাকির তালুকদার বলেন- যারা তার বই বিক্রি করে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলো, তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে।
এমন স্বপ্নভঙ্গ কেবল প্রকাশক নন, কোটি কোটি তরুণের হয়েছে। বইমেলায় লাইন ধরে তার অটোগ্রাফ আর নিতে পারবে না। ফটো-শিকারীরা ছবি তুলতে মারামারি করবে না। বইমেলার দায়িত্বরত পুলিশদের আর বাড়তি পরিশ্রম করতেও হবে না। বড় বড় লেখকরা অভিযোগ তুলবেন না- হুমায়ূনের কারণে মেলায় হাঁটা যায় না। মেলার পরিবেশটা গেলো।
মহামান্য বিচারপতি প্রশ্ন তুলে রুল জারি করবেন না- দেয়াল উপন্যাসটা সংশোধন করার।
একেবারে সবার অনুযোগ-অভিযোগ-রক্তচোখ রাঙানিকে উপড়ে ফেলে চলে গেলেন প্রশ্নহীন দেশে। একেবারেই একা, নিজের মতো এখন বাস করবেন হুমায়ূন। নাস্তিকতা কিংবা আস্তিকতার ক্যালকুলেশন ছাড়িয়ে। কার দলে কতোদিন ছিলেন হুমায়ূন, এখন সে হিসেবে পানি ঢেলে দিলেন নিজেই। তাই অপেক্ষা, তার প্রতিটি সৃষ্টিকর্মের পরশমণির ছোঁয়ায় কতদূর আলো দেখবো আমরা।
(লেখাটি ২০১২ সালের ১৯ জুলাই রাতে রচিত, হুমায়ূন আহমেদ প্রয়াণের সংবাদে। তাকে নিয়ে এ যাবত এটিই আমার প্রথম ও শেষ লেখা। ছফা-ইলিয়াস পাঠশালা ব্লগস্পটে এটি ২৫ আগস্ট প্রকাশিত।)
