চলচ্চিত্রের হুমায়ূন ও ঘেটুপুত্র কমলা

সংখ্যা:

সহজ করে বললে কথাকার হুমায়ূন আহমেদ তার গল্প বা উপন্যাসে চরিত্র ও কাহিনি নির্মাণে যে পরিচর্যা চালিয়ে আসছিলেন তার প্রায়োগিকতা দেখিয়েছেন চলচ্চিত্র ও নাটকে। গল্পের বয়ান ও সংলাপে হুমায়ূন যেমন স্বতঃস্ফূর্ত ও সাবলীল, চলচ্চিত্রেও তাকে পাওয়া যায় সরল-সরস স্রষ্টা হিসেবে। চলমান ধারার নায়িকা ভার্সাস নায়কের জোড়া চরিত্রকে কেন্দ্র করে  প্রেমকাহিনি নির্ভও যে চর্চা চলছে, এবং আমাদের নির্মাতাকুল ঘুরে ফিরে একই কাহিনিকে ভিন্ন ভিন্ন রেসিপিতে গেলানোর যে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এর বাইওে গিয়ে আমাদের দু’দণ্ড স্বস্তির আয়োজন করেছিলেন হুমায়ূন।

সত্যজিৎ রায় তার এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন- বাঙালি নির্মাতাদের সবচে বড় সমস্যা তারা গল্প ও চরিত্রায়ণে নায়ক ও নায়িকার বাইরে অন্য কোনো চরিত্রে ঢুকতে পারেন না, সব সংলাপ তুলে রাখেন নায়কের ঠোঁটে আর সব আবেগ নায়িকার চোখে। এ দুইয়ের বাইরে অন্য কারো দিকে নির্মাতার মন, চোখ বা ক্যামেরা কোনোটাই যায় না।

আমার মনে হয় সত্যজিৎ রায়ের এই অভিযোগ কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন হুমায়ূন । তার কাহিনি একেবারে প্রচলিত না হলেও চলচ্চিত্রে কোনো উৎকট কল্পব্যায় ছিলো না। তার নির্মিত আটটি চলচ্চিত্রের প্রতিটিই কোনো না কোনোভাবে আলাদা, তবে কখনোই তা আমাদের সমাজের বা সংসারের বাইরের গল্প ছিলো না। দারুচিনি দ্বীপের কথা বলি আর  ঘেটুপুত্র কমলার উল্লেখই করি, কোনোটাই উদ্ভট কিংবা অতি চর্চিত  কোনো আখ্যান ছিলো না। গল্প নতুন তবে তা আমাদেরই, সুশৃঙ্খল চরিত্র তবে একদমই সঞ্জীব, সরস সংলাপ তবে নিগূঢ় ভাবের আকর; এমনই ছিলো তার চিত্রাখ্যানের বৈশিষ্ট্য।

বলা যায় এদেশের অস্বস্তিকর চলচ্চিত্রাভিনয়ে একটু স্বস্তি এনে দিয়েছিলেন হুমায়ূন, সেই সাথে খানিকটা সুস্থতাও। সুস্থতা শব্দটি বলছি সচেতনভাবেই। দুই দশক ধরে যেসব অভিনয় হচ্ছে বড় পর্দায় তা আমার কাছে অসুস্থতাই মনে হয়। সিরিয়াস চরিত্রকেও ভাড় করে তুলে, অভিনয়ে এতো এতো অতিরঞ্জন আর ভাবালুতা নিছকই ফাজলামো মনে হয়। সব চরিত্রে কেমন সস্তা ন্যাকামি। এসব কিছুকে বিবর্জনের প্রয়াস চালিয়েছেন হুমায়ূন।

হুমায়ূনের দৃষ্টি ছিলো প্রখর। যা দেখতে চেয়েছেন খুব ভালো করে খটুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন। অবজার্ভ করেছেন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর সময়। আর তার এই  দেখাই তাকে করে তুলেছে বিশাল, ফলে তিনি হয়ে উঠেছেন ইমেজ ও আবহের নিপুণ কারিগর। একজন ভালো দর্শক হওয়ার ফলে হুমায়ূন আহমেদ অন্যদেরও খুব ভালো করে দেখাতে পারতেন। দেখা বা দেখানোতে হুমায়ূন অনন্য। তার প্রদর্শনভঙ্গি ছিলো স্বচ্ছ। কাচের  ভেতর দিয়ে দূর-বহুদূর, গভীর ও প্রগাঢ় সব ম্যাটারকে দেখিয়েছেন কাছে এনে, বিন্যাসিত করে। তার চরিত্রায়ণ, সংলাপ, দৃশ্যসজ্জা, সঙ্গীত ও সম্পাদনা সবখানেই ছিলো প্রাজ্ঞতা ও সচেতনতার ছাপ।

 

দুই

আগেকার দিনে হাওরাঞ্চলে বর্ষা মানেই ঘরবন্দি অবস্থা। কাজ  নেই।  কোথাও যাওয়া  নেই । ঘরে বসে বসে দিন পার। এসব অলস দিনে বউকে  কেন্দ্র করেই ছিলো গরিবের সকল বিনোদন। আর যাদের অর্থপ্রতিপত্তি ছিলো, জমিদার কিংবা জোতদার কৃষক ছিলো যারা, এইরকম ভরা বর্ষায় বিভিন্ন ধরনের গানের আয়োজন করতো। সাপের খেলা দেখার জন্য বেদেনী ডাকতো। ধনাট্য সৌখিনরা নিয়ে আসতো চিত্রকর। প্রায় দেড়শো বছর আগে হাওরাঞ্চলে বর্ষাকে কেন্দ্র করে চালু হয় ঘাটু গান। একজন কিশোরকে  মেয়েদের পোশাক পরিয়ে নাচানো হতো সেই সাথে চলতো গান। এই কিশোরকে বলা হতো ঘেটু। যাকে  কেন্দ্র করেই গড়ে উঠতো একটি ঘাটু গানেরদল। নাচধর্মী এই গানের প্রথাটি খুব দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে হাওরাঞ্চলে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোণায় প্রচুর সমাদর  পেতে থাকে এইসব গানের দল। বাউল আব্দুল করিমের একটি গানে ঘাটু দল বা গানের উল্লেখ পাওয়া যায়- আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম/ আমরা আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম/ গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান/ মিলিয়া বাউলা গান আর ঘাটুগান গাইতাম।

একসময়  মেয়ে সাজা এসব কিশোরদের প্রতি লালায়িত হয়ে ওঠে কিছু পুরুষ। সমকামে আসক্ত ধনবানরা আয়োজন করতো ঘাটু গানের। বাড়ি নিয়ে আসতো কোনো ঘাটুদল। সন্ধ্যায় বা রাতে গান শেষে এসব  ঘেটুকে আয়োজক পুরুষ নিজের বিছানায় নিয়ে যেতো। নৃশংসতায় হামলে পড়তো কিশোরের উপর। যেহেতু কিশোরটি কয়দিনের জন্য স্ত্রীর মতো হয়ে যেতো এ-কারণে এসব সমকামী পুরুষদের স্ত্রীরা কোনোভাবেই সহ্য করতে পারতো না ঘাটুদল ও ঘেটুদের। তারা ঘেটুকে মেরে ফেলার চিন্তা করতো। ষড়যন্ত্র করতো। এবং মেরেও ফেলতো।

হবিগঞ্জের সুলেখা গ্রামের এক জমিদার কোনো এক বর্ষায় এক ঘাটুদলকে তিনমাসের জন্য আমন্ত্রণ জানায় তার বাড়িতে। ঘেটুদলের প্রধান দরিদ্র বাবা তার নিজের কিশোর ছেলে জহিরকে তৈরি করেন ঘেটু হিসেবে, নাম রাখেন কমলা। ছেলে কমলা ও তার দল নিয়ে চলে আসেন জমিদারের বাড়ি। কিশোর কমলাকে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারে না জমিদারের স্ত্রী। ফলে সে এই নিরপরাধ কমলাকে হত্যার ফন্দি আঁটতে থাকে। এভাবেই এগিয়ে যায় গল্প…।

একজন  ঘেটু, একটি ঘাটুদল ও  বিকৃত মনস্ক একজন জমিদারের কাহিনিকে  কেন্দ্র করে হুমায়ূন আহমেদ নির্মাণ করেন ঘেটুপুত্র কমলা চলচ্চিত্রটি। তার কথায় গল্পটি বাস্তব ঘটনার রূপায়ন এবং তা হবিগঞ্জ অঞ্চলের কোনো এক জমিদারের। হুমায়ূন তার ছোটগল্প একজন সৌখিনদার মানুষ থেকে ঘেটুপুত্র কমলা চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা করেছেন। চলচ্চিত্রটিতে নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন মেহের আফরোজ শাওন, প্রধান সহকারী পরিচালক জুয়েল রানা ও প্রযোজনায় ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। এই চলচ্চিত্রের একটি গান বাজে বংশী-এর গীতিকার ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ নিজেই। জমিদারের চরিত্রে অভিনয় করেনÑ তারিক আনাম খান। একজন জমিদার হিসেবে যে ধরনের ব্যাক্তিত্বের প্রয়োজন তার পুরোটাই তিনি দেখাতে সম্ভব হয়েছেন। তবে পরিচালক তার উপর যে রূঢ়তা ও ভাবলেশহীনতা চাপিয়ে দিয়েছেন তার হয়তো প্রয়োজন ছিলো না। জমিদারপত্নী চরিত্রে মুনমুন আহমেদ নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেনÑ এক কথায় চমৎকার।

ঘেটুপুত্র কমলা চরিত্রে শিশু অভিনেতা মামুন অভিনয় করেছে দারুণ। তার সংলাপ ও ভাব ছিলো একদম অভিজ্ঞ অভিনেতার। ঘাটুদলের প্রধানের চরিত্রে অভিনয় করেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, পিতা ও ঘাটু দলের প্রধান হিসেবে তাকে মানিয়েছে বেশ। তবে যেখানে যতোটুকু বিষাদ ও পিতৃশোক প্রকাশ করার দরকার ছিলো তা হয়ে ওঠেনি।  কোরিওগ্রাফিতে ছিলেন মেহের আফরোজ শাওন। তার কাজ ছিলো অসাধারণ। চরিত্র ও দৃশ্যানুযায়ী তার প্রদত্ত  গেট-আপ আদতেই যুৎসই ছিলো।

৮৫তম অস্কার প্রতিযোগিতায়  সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগের জন্য বাংলাদেশ  থেকে মনোনয়ন  পেয়েছে ঘেটুপুত্র কমলা।

ছবিটি রিলিজ হওয়ার আগেই হুমায়ুন আহমেদ পিতা-মাতাদের নিষেধ করেছিলেন বাচ্ছাদের নিয়ে চলচ্চিত্রটি না দেখতে। যা শুনে অনেকেই চলচ্চিত্রটিকে নোংরা ও অশ্লীলতার দোষে দুষ্ট বলে প্রচার করেছিলেন। রিলিজ হওয়ার পরও কিছুটা সমালোচনা  থেকে গিয়েছিলো যৌনতার কারণে। যেহেতু গল্পটিই বিকৃত মনস্কের যৌন কালচার এবং কদাচার একটি সঙ্গীতধারার উপস্থাপনা ও তার ঘৃণ্যতা নিয়ে, তাই যৌনতার প্রকাশ সেখানে থাকাটাই স্বাভাবিক। তথাপি হুমায়ূন অনেকটা পরিমিতভাবে যৌনতার দৃশ্যায়ন করেছেন যার দরুণ তা খোলামেলাভাবে ছিলো না। যখন মুভিটি বাজারে আসলো কিছু অংশ ছাটাইও করা হয়। হুমায়ূন সচেতনভাবেই  যৌনদৃশ্যকে এড়িয়ে  গেছেন এবং যথাসম্ভব চলচ্চিত্রটিকে অশ্লীলভাবেই নির্মাণ করেছেন।

সর্বোপরি  ঘেটুপুত্র কমলা আমাদের চলচ্চিত্রে ভিন্নমাত্রিক সংযোজন। বেঁচে থাকুক হুমায়ূন, বেঁচে থাক তার নির্মাণ।

 

লেখক : তরুণ গল্পকার

ট্যাগ :

সম্পাদক
তামীম রায়হান

নির্বাহী সম্পাদক
সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

প্রকাশনা ব্যবস্থাপক
আসাদুল্লাহ খান

নবধ্বনি/নবপ্রকাশ | দোকান নং-২৭ | ২য় তলা | ইসলামী টাওয়ার | ১/১১ বাংলাবাজার | ঢাকা
সার্কুলেশন: ০১৯৭৪৮৮৮৪৪১