বাংলাভাষা ও সাহিত্যের বরপুত্র এবং নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদ আমার কাছে একমাত্র লেখক, যার সবগুলো বই আমি পড়েছি। তবে এটিও সত্য যে, তার জীবদ্দশায় তার কোনো বই আমার পড়া হয়নি। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর যখন তার মরদেহ সবার শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ঢাকায় শহীদ মিনারে রাখা, আমি তখন লালবাগ থেকে বাসায় ফিরছিলাম।
শহীদ মিনার পর্যন্ত এসে মানুষের ভিড়ের কারণে রিকশা থেকে নেমে যেতে হলো। কিছুদূর হেঁটে এগিয়ে যেতেই দেখি, হাজারো মানুষের সারিবদ্ধ লাইন। কারও হাতে ফুল, কারও চোখে অশ্রু। দেখে বোঝা যাচ্ছিলো, এরা কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নয়, এরা সবাই সমবয়সী বা সমলিঙ্গেরও নয়। বরং কিশোর-তরুণ থেকে শুরু করে সব বয়সের নারী ও পুরুষের শোকাবহ অপেক্ষা ছিলো সেখানে। ২০১২ সালের ২৩ জুলাই তারিখের ওই দৃশ্য আমাকে বেশ অবাক করলো। একজন প্রয়াত লেখককে শ্রদ্ধা জানাতে এতো মানুষ ছুটে এসেছেন দেখে আমি নিজেও বেশ কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করলাম।
কিছুক্ষণ পর আমি বায়তুল মোকাররমের নিচে অবস্থিত মার্কেটের একটি দোকানে গেলাম। নিয়মিত নামাজি এবং তাবলিগের সঙ্গে যুক্ত পরিচিত একজনের সঙ্গে দেখা হলো সেখানে। তাকে বললাম, হুমায়ূন আহমেদের লাশ দেখে ফিরেছি। তিনি ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘ওই নাস্তিকের লাশ আপনি দেখতে গেলেন! ছিঃ!’ এরপর তিনি একটি বিশ্রী গালিও উচ্চারণ করলেন, যা আমি এখানে লিখতে পারছি না।
একদিকে এতো বিপুল মানুষের বিনম্র শ্রদ্ধা এবং আবেগমাখা ভালোবাসা, অন্যদিকে ধর্মানুরাগী মানুষের এমন বিদ্বেষপ্রসূত ঘৃণা- এ দুটো বিষয় আমাকে ভাবিয়ে তুললো। কারণ, আমি ভাবছিলাম, হুমায়ূন আহমেদ যদি সত্যিই নাস্তিক পর্যায়ের ইসলামবিদ্বেষী হয়ে থাকেন, তবে কোনোদিনই এতো অসংখ্য সাধারণ মানুষ রোদে পুড়ে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন না, অন্তত বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে কোনো নাস্তিকের কপালে এতো সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জনের সৌভাগ্য জুটে না।
আমি বাসায় ফিরে এলাম। সেদিন এবং তার পরের কয়েকটি দিন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে প্রকাশিত বিশেষ আয়োজনগুলো পড়তে শুরু করলাম। শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, রাজনীতিক, সংস্কৃতিকর্মী থেকে শুরু করে সমাজের নানা শ্রেণি ও পেশার বিশিষ্টজনরা হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে তাদের স্মৃতিময় লেখা ও শোকগাথা লিখেছেন। আমি সেসব লেখা পড়ে হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে যেসব তথ্য পেলাম, তাতে তাকে একজন অসাধারণ জনপ্রিয় লেখক ও প্রতিভাবান হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হলাম সত্য, পাশাপাশি তার লেখা পড়া ও তাকে জানার আগ্রহ প্রবলভাবে বেড়ে গেলো।
এর কিছুদিন পর আমি কাতারে ফিরে আসি। কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার অবসরে পড়তে শুরু করলাম হুমায়ূন আহমেদের লেখা বইগুলো। জোছনা ও জননীর গল্প, মাতাল হাওয়া, দেয়াল, বাদশাহ নামদার দিয়ে হুমায়ূনপাঠ শুরু হলো আমার। এরপর একে একে তার আত্মজীবনী, ভ্রমণকাহিনি, উপন্যাস, কলাম এবং রম্য রচনা- সব ধরনের বই ডাউনলোড করে নিলাম বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে। ২০১২ সালের শেষ ছয় মাস এবং ২০১৩ সালের প্রথমার্ধজুড়ে আমি অবচেতন মনে কেবলই হুমায়ূন পাঠে মগ্ন থাকলাম।
আজও স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ে যে আনন্দ অনুভব করেছি, আর কারও লেখায় তা আমি পাইনি। এমন মগ্নতা ও মুগ্ধতা আর কারও লেখা আমাকে স্পর্শ করেনি। সেই থেকে আজ অবধি আমি হুমায়ূন আহমেদের পাঠক। তার লেখা একাধিক বই আমি বারবার পড়েছি। এখনও খুঁজে খুঁজে পড়ি। প্রতিবারই পাঠের নতুন আনন্দে দ্রবীভূত হচ্ছি।
এবারও গত মাসে (জুন ২০১৭) ঈদুল ফিতর উপলক্ষে যখন মাত্র এক সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশে গিয়েছি, পল্টন ও নীলক্ষেতের ফুটপাতে হুমায়ূন আহমেদের লেখা বা তাকে নিয়ে লেখা বইপত্র খুঁজেছি। এমন খোঁজাখুঁজির মধ্যে এবার সর্বশেষ পেয়েছি মাহফুজ আহমেদের লেখা একটি সাক্ষাতকারধর্মী বই। বইটির নাম ‘ঘরে-বাইরে হুমায়ূন আহমেদ, হাজার প্রশ্ন’। হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে অনেকে লিখেছেন, কিন্তু শাকুর মজিদের লেখা ‘যে ছিল এক মুগ্ধকর’ এবং আরও দুয়েকটি বই ছাড়া বাকি সবই বাজে হয়েছে। সেসবের মলাটে শুধু হুমায়ূন আছেন, ভেতরে আছে পত্রিকার পুরনো খবর।
আমার বন্ধুদের মধ্যে যাদের বই পাঠের অভ্যাস আছে, তাদের কারও কারও মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে এক ধরনের ভাবচরিত্রের দেখা পাই। এই ভাবের পেছনে নিজেকে অতি উঁচু মাপের পাঠক কিংবা সাহিত্যবোদ্ধা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা থাকে তাদের। হুমায়ূন রচনা তাদের কাছে কেবলই ঘুমের ট্যাবলেটতুল্য- অথবা কেউ বলেন, নির্দিষ্ট বয়সের আগে যেমন হুমায়ূনরচনা পাঠের অযোগ্য, তেমনি নির্দিষ্ট বয়সের পর তা অস্পৃশ্য। এদের বিরুদ্ধে আমার কিছুই বলবার নেই। আমি শুধু বলি, হুমায়ূন আহমেদের লেখা যারা পড়েননি, তারা সত্যিকার অর্থে পড়ার আনন্দময় অনুভব থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে রেখেছেন।
হুমায়ূন আহমেদ ব্যক্তিগত জীবনে রাগী ছিলেন বা অহঙ্কারী ছিলেন, সেসব নিয়ে নানা কথা রয়েছে। কিন্তু তার লেখা পড়লে অকপটে সবাই স্বীকার করতে বাধ্য হন, পাঠকদের কাছে তিনি কোমল ও মানবিক চরিত্রের একজন অসাধারণ লেখক। তার রসবোধ এবং সরল গদ্য ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনা যে কোনো বয়সের পাঠককে আবিষ্ট করে রাখে বইয়ের পাতায়। হুমায়ূন আহমেদের ঢঙে লেখালেখির চেষ্টা অনেকে করেছেন, আজো করছেন, কিন্তু কেউ পারেনি এমন মায়াময় টানে পাঠককে শব্দের জালে বন্দী করে রাখতে।
হুমায়ূন আহমেদের আত্মজৈবনিক বা স্মৃতিগদ্য অথবা কলামধর্মী যেসব লেখা আমি বারবার পড়েছি, এসব লেখায় তিনি নিজেকে জাহির করবার কোনো উদ্ভট কোশেশ করেননি। বরং তাকে নিয়ে মানুষের কুৎসা, তাকে ঠেকাতে হিংসুকদের অপচেষ্টা- সবই তিনি তুলে ধরেছেন তার লেখালেখিতে। নিজেকে জনপ্রিয় মহামানব হিসেবে প্রকাশের কোনো মোহ হুমায়ূন আহমেদকে কলুষিত করতে পারেনি, এটাই আমার কাছে তার রচনা ভালো লাগার অন্যতম প্রধান কারণ। অথচ হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তার তুলনায় সিকিভাগ পাঠকপ্রিয় হয়ে অনেকেই নিজের গীত গাইতে শুরু করেন, ফলে একপর্যায়ে পাঠকরা বিরক্ত হয়ে তাকে পরিত্যাগ করতে বাধ্য হন।
মাদরাসাপড়ুয়া ছাত্র ও আলেমসমাজের একটি শ্রেণির কাছে হুমায়ূন আহমেদ একজন নাস্তিক। এ বিষয় নিয়ে যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, কেউ কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। শোনা কথা বুকে পুঁতে কাউকে অব্যাহতভাবে নাস্তিক আখ্যা দেওয়ার যে সহজ প্রবণতা আমাদের মধ্যে বিদ্যমান, এটি তারই বহিঃপ্রকাশ। হুমায়ূন আহমেদের দুটি রচনাও পড়েননি, কিন্তু তার প্রসঙ্গ এলে মুখে নাস্তিক বলে ফতোয়া দেওয়ার খই যাদের ফোটে, তাদের সঙ্গে অবশ্য তর্ক করেও লাভ নেই। হুমায়ূন আহমেদের খ্যাতি সব কাল ও শ্রেণির বাঙালি লেখকদের জনপ্রিয়তাকে অতিক্রম করেছে, এই একটি ধ্রুব সত্য ও বাস্তবতাই তাকে ঘিরে সব কুৎসা ও হিংসা এবং অসত্য প্রচারণার মূল, অন্য কিছু নয়।
এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন আমার সামনে রয়েছে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে সদ্য কেনা মাহফুজ আহমদের লেখা বইটি। এর ৩৭ পৃষ্ঠায় মাহফুজ আহমেদ তাকে প্রশ্ন করেছেনÑ এ দেশের বুদ্ধিজীবিদের ভূমিকা সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
হুমায়ূন আহমেদ উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন- ‘আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজে যাঁরা আছেন, তাদের কার্যক্রম খুব একটা পরিষ্কার না। এরা কেন জানি ইসলাম ধর্মকে খুব ছোট করে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান অন্য যে কোনো ধর্মের প্রায় সব উৎসবে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা উপস্থিত থাকেন, বক্তৃতা করেন, বাণী দেন- কিন্তু ইসলামি কোনো জলসায় কেউ উপস্থিত থেকেছেন বলে শোনা যায় না। তাদের মতে, ইসলামি জলসায় কেউ উপস্থিত থাকা মানে তার বুদ্ধিবৃত্তিও নিম্নমানের। সে একজন প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক লোক। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কাছে হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টানদের কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার অর্থ মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা, প্রগতির চর্চা করা, সংস্কারমুক্ত হওয়া ইত্যাদি। প্রফেসর সালাম ঢাকায় এসে যখন বক্তৃতার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বললেন, তখন আমাদের বুদ্ধিজীবীরা হকচকিয়ে গেলেন। কারণ তাদের কাছে প্রগতিশীল হওয়া, বুদ্ধিজীবী হওয়া, মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা মানেই ইসলামবিরোধী হতে হবে। তাদের কাছে রামকৃষ্ণের বাণী, যিশুর বাণী সবই গ্রহণীয়। এসব তারা উদাহরণ হিসেবেও ব্যবহার করেন; কিন্তু হজরত মোহাম্মদের বাণী কখনো তাদের মুখ থেকে শোনা যায় না। তাদের কাছে হজরত মোহাম্মদের বাণী গ্রহণযোগ্য নয়। আমার মতে, পৃথিবীর তাবৎ ঔপন্যাসিক যার কোটের পকেট থেকে বেরিয়ে এসেছেন, তার নাম দস্তয়ভস্কি। আরেকজন আছেন মহামতি টলস্টয়। এক রেলস্টেশনে যখন টলস্টয় মারা গেলেন, তখন তার ওভারকোটের পকেটে একটি বই পাওয়া গেছে। বইটি ছিল টলস্টয়ের খুব প্রিয়। সব সময় সঙ্গে রাখতেন। সময় পেলেই পড়তেন। বইটিতে হজরত মোহাম্মদ সা.-এর বিভিন্ন সময়ে বলা ইন্টারেস্টিং কথাগুলো নিয়ে গ্রন্থিত। আমি বিনয়ের সঙ্গে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কাছে জানতে চাইছি, আপনাদের ক’জন বইটি পড়েছেন? টলস্টয় যে বইটি পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, সেই বই আমাদের প্রত্যেকের একবার কি পড়া উচিত নয়? আমার মতে, প্রতিটি শিক্ষিত ছেলেমেয়ের বইটি পড়া উচিত।’
হুমায়ূন আহমেদের স্পষ্টবাদিতা ও সত্যবাদিতার এমন ঢের উদাহরণ তার লেখালেখিতে রয়েছে। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যাপক ছিলেন। পরে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে লেখালেখির জন্য নিজেকে সঁপে দিয়েছেন। কিন্তু আমৃত্যু লেখালেখির মাধ্যমে তিনি পাঠকদের শিক্ষা দিয়েছেন। পাঠকদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারে হুমায়ূন আহমেদের মতো শক্তিশালী লেখক বাংলা সাহিত্যে আর একজনও নেই। এটি কেবল দাবি নয়, বরং প্রমাণিত বাস্তবতাও।
হুমায়ূন আহমেদ যখন অসুস্থ হয়ে নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন, তখন তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন ‘নবীজি’। প্রিয়নবি হজরত মোহাম্মদ সা.-কে নিয়ে লেখার স্বপ্ন তার দীর্ঘদিনের ছিলো, মৃত্যুর আগে তিনি তা শুরুও করেছিলেন। কিন্তু শেষ করে যেতে পারেননি। যেটুকু লিখেছেন, তা পড়লে মনে হয়, আহা! তিনি যদি পুরো জীবনীটুকু লিখে যেতে পারতেন, তবে কতো অসংখ্য পাঠক নবীজিকে জানার সুযোগ পেতো।
হুমায়ূন আহমেদ আজ পৃথিবীতে নেই। তিনি আজ ওপারে। পরম করুণাময় ও মহান দয়াময়ের আশ্রয়ে। আমি সেই শক্তিমান রবের কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন হুমায়ূন আহমেদের সব ত্রুটি ও পাপ মার্জনা করেন। যার লেখায় আনন্দ খুঁজে পেয়েছে লাখো পাঠক, মহান আল্লাহ যেন তাকে নিজের দয়া ও করুণার চাদরে তাকে ঢেকে রাখেন।
