১৯২০ সাল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। সৈনিকদের পল্টন ভেঙে দেয়া হয়েছে। করাচি থেকে কলকাতায় ফিরে এসেছেন এক তরুণ। বিশ-একুশের ভরা তারুণ্যে তার বয়স। নাম কাজী নজরুল ইসলাম।
কলকাতার ব্যস্ত শহরে এসে কাজী নজরুল ইসলাম যেন হারানো চঞ্চলতা ফিরে পেলেন। গল্প ও কবিতায় ততদিনে খানিক পরিচিতি জুটেছে তার। এ নিয়ে উচ্ছাসের শেষ নেই তরুণ কবি নজরুলের। শহর দাবড়ে বেড়ানো আপাতত তাঁর প্রথম কাজ। কতো দিন পর একটু অবসর মিলেছে তাঁর!
টগবগে তরুণ নজরুল তখনও সৈনিক জীবনের মায়া ছাড়তে পারেননি। তিনি যতদিন করাচিতে সৈনিক শিবিরে ছিলেন, সেখানে তিনি সবাইকে মাতিয়ে রেখেছেন হাসি-আনন্দে। সৈনিক জীবনের ফাঁকে ফাঁকে তিনি একজন মৌলভির কাছে ফার্সি ভাষা রপ্ত করেছেন। ফার্সি কবি হাফিজের বেশ কিছু কবিতাও বাংলায় অনুবাদ করেছেন সে সময়। এ ছাড়া তিনি কিছু গল্প ও কবিতা লিখতেন অবসরে এবং সেগুলো পাঠিয়ে দিতেন কলকাতার ‘মোসলেম ভারত’ ও অন্যান্য পত্রিকায়।
সৈনিক জীবন শেষে কলকাতায় এসে নামের আগে ‘কাজী’ আর ‘হাবিলদার’ খেতাব ব্যবহার করতেন কবি নজরুল ইসলাম। শুধু তা নয়, বরং খেয়ালি তরুণ কবি কারো কথা তোয়াক্কা না করে কালো বুট পায়ে দিয়ে সৈনিকের পোষাক পরে বিভিন্ন সভায় হাজির হতেন। সৈনিকবেশী নজরুল আর তাঁর আচার আচরণ দেখে অন্যরা ভাবত, শহরে কে এই নতুন আগন্তুক। তাঁর হো হো শব্দে অট্টহাসি শুনে মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখত, প্রাণখোলা হাস্যরসে গড়াগড়ি খাচ্ছেন কাজী নজরুল ইসলাম।
একুশের তারুণ্যে সেই কবি নজরুলকে কেমন লাগত দেখতে তখন? জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বন্ধু এবং জীবনীকাররা তাঁর অবয়ব সম্পর্কে যেসব বর্ণনা করেছেন, এসব থেকে কয়েকজনের লেখা তুলে ধরার চেষ্টায় আজকের এ লেখা।
কলকাতায় ওই সময়ের সাহিত্য পত্রিকা সওগাতের জনাব নাসিরুদ্দীনের লেখা দিয়েই শুরু হোক। তার স্মৃতিকথায়- ‘পল্টন থেকে ফিরে নজরুল কলকাতায় এসে স্টেশন থেকে ফিরে সোজা আমাদের সওগাত অফিসে উঠল। সওগাত অফিস তখন লালবাজারের নিকটবর্তী বউবাজার স্ট্রিটে ছিল। নজরুলের পরনে তখন সামরিক কাপড়-চোপড় পরা ছিল। আমি আকস্মিক ওকে দেখে চমকে গেলাম। আমাদের অফিসে মিলিটারির লোক কেন? কী কান্ড! ও আমার ভ্যাবাচ্যাকা মুখ দেখে বলল, আমি নজরুল ইসলাম। বলেই হা হা হাসি। আমি তখন আশ্বস্ত হলাম। বসতে বললাম ওকে। ও জানাল, আগে চা পান-জর্দা আনান তারপর বসা যাবে। এটা ১৯২০ সালের এপ্রিল মাসের গোড়ার দিকের কথা।’
‘সবল শরীর, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, চোখ দুটো যেন পেয়ালা, আর সে পেয়ালা দুটো যেন কখনো খালি নেই, প্রাণের অরুণ রসে সদা ভরপুর, তার গলা সারসের মতো পাতলা নয়, বরং পুরুষের গলা যেমন হওয়া উচিত তেমনি সরল বীর্য-ব্যঞ্জক, গলার স্বর ছিল ভারী, তার সেই মোটা গলার সুরে ছিল যাদু, ঢেউয়ের আঘাতের মতো তার গান আছড়ে পড়তো ঝড়ের ঝাপটা হয়ে শ্রোতার বুকে। প্রবল হতে সে ভয় পেতো না, নিজেকে মিঠে দেখানোর জন্য সে চেষ্টা করতো না।’ এ বর্ণনা দিয়েছেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
কবির বন্ধু বুদ্ধদেব বসুর ভাষ্য আরও আকর্ষণীয়। তিনি লিখেছেন- ‘নজরুল ছিল একাই একশো। চওড়া মজবুত জোরালো তার শরীর, লাল-ছিটে লাগা বড়ো বড়ো মদির তার চোখ, মনোহর মুখশ্রী, লম্বা ঝাঁকড়া চুল তার প্রাণের ফূর্তির মতোই অবাধ্য, গায়ে হলদে কিংবা কমলা রঙের পাঞ্জাবী এবং তার উপর কমলা কিংবা হলদে রঙের চাদর, দুটোই খদ্দরের। কেউ জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি রঙিন জামা পরেন কেন? ‘সভায় অনেক লোকের মধ্যে চট করে চোখে পড়ে তাই’, বলে ভাঙা ভাঙা গলায় হো হো করে হেসে উঠেতেন তিনি। কথার চেয়ে বেশী তার হাসি, হাসির চেয়ে বেশী তার গান। একটি হারমোনিয়াম এবং যথেষ্ট পরিমাণ চা এবং অনেকগুলো পান দিয়ে বসিয়ে দিতে পারলে সব ভুলে পাঁচ-ছয়-সাত ঘন্টা একনাগাড়ে গান করতে থাকতেন। নজরুল যে ঘরে আড্ডা জমাতেন, সে ঘরে আর কেউ ঘড়ির দিকে তাকাতো না।’
আবুল মনসুর আহমদও তার ‘আত্মকথা’য় কবিকে ১৯২২ সালে প্রথম দেখার কথা বর্ণনা করেছিলেন এভাবে- ‘সভায় গিয়ে অন্যান্য সবার সাথে নজরুল ইসলামের সাথেও পরিচয় হলো। মিলিটারী ইউনিফর্ম পরা কাঠখোট্টা লোক, কবি বলে পছন্দ হলো না, কিন্তু চোখ দুটো তার ভাসা ভাসা হরিণের মতো, দেখে আকৃষ্ট হলাম। আমার এক কথায় সভার সমবেত সবার হাসির আওয়াজ ছাপিয়ে যে ছাদ ফাটানো গলা শুনতে পেলাম, সেটি নজরুলের আওয়াজ। সভা শেষে তিনি আমাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরলেন যে, আমি তার গায়ের অসাধারণ শক্তিতে বিস্মিত হলাম।’
আরেকজন সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন কবি নজরুলকে প্রথম দেখার সুখস্মৃতি তুলে ধরেছেন- ‘অবশেষে প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হল, নজরুল এলেন। সৈনিক বেশ, কাঠখোট্টা চেহারা, দাড়ি গোফ নেই, খনখনে অট্টহাসিতে ঘর মুখরিত করে আমাদের কাছে এগিয়ে এলেন।’
প্রবোধ কুমার লিখেছেন- ‘নজরুল যখন তার অনুরাগরঞ্জিত কবি জীবন নিয়ে এসে দাঁড়ালেন কলকাতার রাজপথে, তখন তার একদল লক্ষীছাড়া বন্ধুভিন্ন অপর সহায় সম্বল বিশেষ কিছু ছিল না। কিন্তু তার সঙ্গে ছিল এমন একটি প্রবল উজ্জ্বল প্রাণ, এমন একটি সরল উজ্জ্বল ও হাস্যোদ্দীপ্ত জীবন, যেটি সর্বক্ষণ অনুপ্রাণিত করে রাখতো তার বন্ধু সমাজকে। তার স্বভাবের দীপ্তি, তার প্রাণবন্যা এবং তার হাস্যমুখরতা- এদের আকর্ষণে একদা কলকাতার রাজপথে ভীড় জমে যেত।’
আব্দুল হালিম লিখেছেন- ‘কবির সুডৌল বলিষ্ঠ দেহ, বড় বড় বিস্ফোরিত উজ্জ্বল চোখ, মাথায় রুক্ষ দোলায়মান লম্বা চুল, সহাস্য মুখ, দীর্ঘ পিরান, পীত শিরস্ত্রাণ, গৈরিক বেশ হাতে বেণু কবিকে মহিমান্বিত করে তুলতো। ঘন্টার পর ঘন্টা চলে যাচ্ছে গান ও কবিতায়। শেষ হচ্ছে কাপের পর কাপ চা। নজরুলের মুখে হাসির ফোয়ারা ছুটছে, কলহাস্যে মজলিস মুখরিত, আহার নেই, নিদ্রা নেই, কবি তার ছন্দ দোলায় গান ও কবিতা রচনা করে চলেছেন, শত কোলাহলের মধ্যেও তার লেখনী স্রোতের মতো বেগবান।’
কবি কাজী নজরুল ইসলামকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন এবং তার সান্নিধ্যের ছোঁয়া পেয়েছেন তারা সবাই স্বীকার করেছেন, মৃত্যু অবধি কাজী নজরুলের দু চোখে যে অপূর্ব দীপ্তি ও তেজোদ্দীপ্ত চাহনী ছিল, তাতে সরাসরি কেউ তার চোখের দিকে বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারতো না।
জীবনভর তার শরীর ছিল নাদুস নুদুস, কাঁধ পর্যন্ত ঝোলানো বাবরী চুলে অপূর্ব দেখাতো তাকে। যে অসুখে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুশয্যায় শায়িত হলেন, এর আগে পুরো যৌবন ও তারুণ্যে কখনো তিনি কোনো মারাত্মক অসুখে পড়েননি।
নজরুলনামা
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বহুমুখী প্রতিভার অধিকার বর্ণিল জীবনের এই কবির কর্ম সম্পর্কে বাংলাভাষী পাঠক অবগত আছেন। তবে তার জীবন ও চরিত্রের নানা দিক সম্পর্কে জানাশোনা অনেকেরই কম। মাত্র কয়েক বছরের কাব্যসাধনায় যে কবি বাংলা সাহিত্যে প্রাণের জোয়ার বইয়ে দিলেন, তার ব্যক্তিগত স্বভাব চরিত্র ও অনেক কিছু ছিল অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রমী। কবিতায় তার যে সত্ত্বা আমরা দেখতে পাই, এর সাথে অনেক পার্থক্য ছিল তার ব্যক্তিগত চরিত্রে ও আচার আচরণে। সেরকম কয়েকটি ঘটনা ও চিত্র নিয়ে এই লেখা-
বিজ্ঞাপন লেখক কবি নজরুল ইসলাম
‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় কবি নজরুল লিখতেন। সেকালে এই পত্রিকার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। কলকাতার ‘ডোয়াকিন এন্ড সন্স’ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার একদিন কবি নজরুলের কাছে এসে অনুরোধ জানালেন, কবি তাদের তৈরি হারমোনিয়ামের জন্য বিজ্ঞাপন লিখে দেন। কবি তখন কাগজ কলম নিয়ে বসে লিখে ফেললেন এই বিজ্ঞাপনটিÑ ‘কি চান? ভাল হারমোনী?? / কাজ কি গিয়ে জার্মানী? / আসুন দেখুন এই খানে, / যেই সুর যেই গানে, / গান না কেন, দিব্যি তাই, / মিলবে আসুন এই হেথাই, / কিননি কিন, ডোয়ার কিন…’
কলকাতার পার্কসার্কাস এলাকায় আরেকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল বাহাদুর কোম্পানি। এটিও বাদ্যযন্ত্র হারমোনিয়ামের ব্যবসা করত। মোসলেম ভারত পত্রিকায় ডোয়াকিন কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখে বাহাদুর কোম্পানির কর্তারাও ছুটে এলেন কবি নজরুলের কাছে। তাদের দাবি, আমাদের জন্যও লিখে দিন এমন একটি বিজ্ঞাপন। কী আর করা! কবি আবারও লিখলেন আরেকটি বিজ্ঞাপন- ‘মিষ্টি বাহা বাহা সুরে, চান তো কিনুন ‘বাহাদুর’/ দুদিন পর বলবে না কেউ- ‘দুর দুর’, / যতই বাজান ততই মধুর মধুর সুর!! / করতে চান কি মনের প্রাণের আহা দূর? / একটি বার ভাই দেখুন তবে ‘বাহাদুর’,/ যেমন মোহন দেখতে তেমনি শিরীন ভরাট, / বাহা সুর, চিনুন, কিনুন বাহাদুর।’
এরপর কয়েক মাস ধরে একই পত্রিকায় এ দুটো বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছিল। কোম্পানি দুটো ব্যবসাও করেছিল বেশ। কবি নজরুল ইসলাম আরেকবার মাথার চুল তৈরিকারী একটি বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বিজ্ঞাপন লিখেছিলেন। এক জীবনে কতো না বৈচিত্রময় কাজে জড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
নির্বাচনে প্রার্থী কবি নজরুল ইসলাম
বর্ণিল ও কর্মমুখর জীবন ছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের। অজানা রোগে আক্রান্ত হয়ে নির্বাক হওয়ার আগে তিনি যে সময় তার কর্ম ও সৃষ্টিতে তৎকালের সবাইকে মুগ্ধ করে যাচ্ছিলেন, সে সময়গুলো ছিল বিচিত্র কর্মে সমৃদ্ধ। ছোটবেলা থেকে কবি ছিলেন স্বাধীনচেতা বন্ধনহীন। কোনো বাধা বা প্রতিকূলতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। যখন যা চেয়েছেন, আপন মনের খেয়ালে তাই করেছেন।
অনেকের হয়তো জানা নেই, কবি নজরুল ইসলাম একবার নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। তবে অবাক হলেও সত্য যে, তিনি ওই নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি।
১৯২৬ সাল। মাসের নাম নভেম্বর। পূর্ববঙ্গের নির্বাচনে কবি নজরুল ইসলাম কেন্দ্রীয় আইনসভার সভ্য পদপ্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নাম লিখিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বরং নির্বাচনী কাজে তিনি বাংলাদেশের ঢাকা ও ফরিদপুরসহ কয়েক জায়গায় প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। কবির আশা ছিল, এ নির্বাচনে জয়ী হতে কংগ্রেস তাকে সাহায্য করবে। কিন্তু তাঁর সেই আশা পূর্ণ হয়নি। হয়তো এজন্য তিনি কিছুটা পরাজয়ের আঁচ করতে পেরেছিলেন। ২৯ নভেম্বর নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের তারিখ ছিল, কিন্তু কবি ২৩ নভেম্বর ফিরে যান নিজ বাড়িতে।
পরবর্তীতে ব্রজবিহারী বর্মণকে লেখা এক চিঠিতে কবি এ পরাজয়ের কারণ হিসেবে কংগ্রেসের তরফ থেকে যথেষ্ট সাহায্য না পাওয়াকে দায়ী করেছেন।
কবি নজরুলের রুচি ও সৌন্দর্যবোধ
জন্ম থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত কবি নজরুল ইসলামের জীবনকাল কেটেছে অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে। মাঝখানে কিছু সময় সুখ ও ঐশ্বর্য কবির জীবনে এসেছিল সত্য, তবে তা স্থায়ী হয়নি। তাছাড়া জীবনের অর্ধেক কবির কেটে গেল নির্বাক হয়ে, বিছানায় শুয়ে থেকে।
কবির জীবন সাক্ষী দেয়, মাত্র দু দশক তিনি সাহিত্য সাম্রাজ্যে বিচরণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। আর এ অল্প সময়ে তিনি যে আগুন জ্বালিয়ে গেছেন বাংলা কবিতার সাম্রাজ্যে, তা জ্বলছে আজো। কলকাতার পথে ঘাটে কবি নজরুল ছিলেন সাধারণ মানুষের কৌতূহল ও আকর্ষণের অন্যতম এক কেন্দ্র। কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণরা চেয়ে থাকতো তার পথপানে, হাজারো মানুষের সময় কাটতো কবির গানে গানে।
বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মানুষ হিসেবে ছিলেন হাস্যরস ও সাহসিকতায় পরিপূর্ণ একজন মানব। তাঁর ব্যতিক্রমধর্মী জীবনধারা মুগ্ধ করতো সবাইকে। অভাব ও অনটনে থাকাকালেও কবির রুচি ও সৌন্দর্যবোধ ছিল অবাক হওয়ার মতো।
হাতে পয়সা না থাকলে খাবেন না, কিন্তু খেলে ভালো জিনিসই খাবেন কবি। দিনভর প্রচুর পান খেতেন তিনি। সেই পানে মেশাতেন বাজারের সেরা জর্দা ও মাল-মশলা। সোনালি ও রুপালি তবক দেয়া জর্দামাখানো পান মুখে দিয়ে আপন মনে গান-কবিতা লিখতেন কবি। তাঁর মুখ থেকে ছড়িয়ে পড়া পান-জর্দার সুঘ্রাণে মোহিত হতেন আশপাশের লোকেরা। কবির বেশ কয়েকজন বন্ধু তাঁর পান খাওয়ার আয়োজন দেখে শখ করে পান খেতেন পানের বাটা থেকে।
কোথাও যাওয়ার বেলায় পকেটে পয়সা থাকলে ট্যাক্সিতে চড়তেন কবি। পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে ট্রামে উঠতেন। কিন্তু টানা রিকশায় তিনি চড়েননি কখনো। সাধারণ পরিবহনের ট্রামে বসতে লজ্জা হতো কবি নজরুল ইসলামের। কারণ, লোকে তাকে চিনে ফেলত, কাছে এসে মিশতে চাইত অচেনা অনেকে।
সাধারণত ট্যাক্সি ভাড়া দেওয়ার সামর্থ না থাকলে কবি ট্রামে উঠে এক কোণায় চুপচাপ বসে থাকতেন। তাতেও কাজ হতো না। যাত্রীরা চিনে ফেলত তাঁকে। একে অন্যকে ডেকে আঙুল উঁচিয়ে দেখাতো- ‘ওই যে কবি নজরুল ওখানে বসে আছেন।’ মানুষের এমন কৌতূহলে তিনি অস্বস্তি বোধ করতেন। এ কারণে বেশ কয়েকবার তিনি নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছার আগে নেমে গেছেন ট্রাম থেকে। এমনও হয়েছে, কলকাতায় কলেজ স্ট্রিট থেকে ডি.এম লাইব্রেরি পর্যন্ত সামান্য পথ যেতে কবি তিনবার ট্রাম বদল করেছেন। একটি থেকে নেমে আরেকটিতে উঠেছেন, তারপর আবার নেমে আরেকটিতে।
মুক্ত জীবনে তো বটে, বন্দী জীবনেও কবি নজরুল ইসলাম অন্য সবার চেয়ে আলাদা হয়ে থাকতে ভালোবাসতেন। কারাগারে বন্দীদের যে কাপড় দেয়া হয়, তা সবার জন্য একই রকম হতো। সেকালে বন্দীদের জন্য তৈরি কাপড়ে চিকন চিকন নীল রঙের সুতোয় টানা রেখা থাকত। বন্দী হওয়ার পর কবি নজরুল যখন কারাগারে, তখন অন্য বন্দীদের চেয়ে একটু আলাদা থাকার জন্য তিনি বসে বসে তার কাপড় থেকে টেনে সব নীল সুতো বের করে ফেলেছিলেন। এতে তার কাপড় পুরোটাই সাদা রঙের হয়ে পড়ে। কাজটি কারাগারের নিয়ম পরিপন্থী হলেও কারারক্ষীরা কবিকে কিছু বলেননি।
একবার বাজার থেকে দশ টাকা দিয়ে এক সেট চায়ের কাপ পিরিচ কিনেছিলেন কবি নজরুল ইসলাম। এর ভেতর একটি কাপ এবং পিরিচ ছিল খুব সুন্দর ডিজাইন করা। পাইল ভরে ছোট একটি নৌকা এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে, একটি গাছের ডাল এসে পড়েছে নদীর ওপর, সেই ডালে বসে আছে একজোড়া ছোট পাখি। ঠোঁটের উপর ঠোঁট দিয়ে তারা বসে আছে ডালটিতে। সবমিলিয়ে অপূর্ব এমন প্রাকৃতিক দৃশ্য কবির মন কেড়েছিল। আর তাই এ কাপ-পিরিচে অন্য কাউকে চা খেতে দিতেন না তিনি। বরং এটি শুধু তার জন্য বরাদ্দ ছিল। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় তিনি এ কাপটি আলাদা করে রাখতেন। একবার তার বন্ধু মঈনুদ্দিন ওই কাপটির দিকে হাত বাড়ালেন। কবি নজরুল চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এ্যাই থাম, ওদিকে লোভ দিসনে।’
আর্থিক অভাব লেগে থাকায় জীবনে খুব বেশি দামি কাপড় চোপড় পরার সুযোগ পেতেন না কবি নজরুল ইসলাম। কিন্তু সাধারণ যে খদ্দরের পাঞ্জাবি, নিমাই বা চাদর তিনি গায়ে দিতেন, তা যেমন ছিল ধবধবে সাদা পরিস্কার, তিনি সেগুলোকে গায়ে দিতেন চমৎকারভাবে। এর ফলে খুব সহজে অনেক মানুষের ভীড়ে আলাদাভাবে চেনা যেত কবিকে। অচেনা যে কেউ বুঝে ফেলত, এই মানুষটি অন্য দশজনের মতো সাধারণ কেউ নন।
হলদে গাড়ির কবি নজরুল ইসলাম
কবি নজরুল ইসলামের জীবদ্দশায় কলকাতার দু নম্বর ডিস্ট্রিক্টের গো-খানার সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন আব্দুল হামিদ। একবার কোনো এক উপলক্ষে খাবার দাবারের আয়োজন করলেন তিনি। শহরের বিশিষ্টজনদের আমন্ত্রণ জানালেন নিজ বাড়িতে। আমন্ত্রিত অতিথিদের একজন ছিলেন কবি নজরুল ইসলাম। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের পদস্থ কর্তারা আব্দুল হামিদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তার বাড়িতে উপস্থিত হয়েছিলেন।
কথা, গল্প আর গানে রাত অনেক হয়ে গেল। সবাই ফিরে যাচ্ছেন নিজ নিজ গন্তব্যে। কাজী নজরুল ইসলামের তখন বেশ সুনাম-সুখ্যাতি। আর্থিকভাবে তিনি তখন বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাচ্ছেন। কবি সেদিন নিজ মোটর গাড়িতে চড়ে এ আমন্ত্রণে এসছিলেন। হলুদ রঙের সেই গাড়ি তখন কলকাতায় বেশ আকর্ষণীয় ছিল। এমন রঙে এ ডিজাইনের গাড়ী সাধারণত দেখা যেত না। দূর থেকে লোকে আঙুল উঁচিয়ে দেখাত, ওই দেখো কাজী নজরুলের গাড়ি যায়।’
অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে কবি গাড়িতে উঠছেন। এর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন কলকাতার একজন আয়কর কর্মকর্তা। নামের শেষে তার ছিল খান বাহাদুর পদবি। কবি দেখলেন, এই লোকটি একা দাঁড়িয়ে আছেন। তাই তিনি বললেন, চলুন, উঠুন জনাব আমার গাড়িতে, আপনাকে পৌঁছে দিয়ে যাব আমি।
ওই কর্মকর্তার বাড়ি ছিল পার্ক সার্কাস এলাকায়। আর কবি নজরুল ইসলাম থাকতেন শ্যামবাজারে। কলকাতার উত্তর-দক্ষিণে বিপরীতমুখী দুটো এলাকা। আর যেখান থেকে তারা অনুষ্ঠান শেষে বের হচ্ছেন, সেটি কলকাতার মধ্যবর্তী অঞ্চল- বৈঠকখানা রোড, দু নম্বর ডিস্ট্রিক্ট গো-খানা স্টাফ কোয়ার্টার।
আয়কর কর্মকর্তাকে তার বাড়িতে পোঁছে দিতে কবির বেশ দূরের পথ যেতে হল। তারপর আবার উল্টোপথে ঘুরে নিজের ঘরে ফিরে এলেন তিনি। অনেকক্ষণ ধরে গাড়িতে বসে থেকে কাহিল কবি তাকে হাসিমুখে নামিয়ে দিয়ে এলেন বাড়ির সামনে। মানবিকতা ও ভদ্রতার খাতিরে কবি নজরুল এটুকু কষ্ট সহ্য করে নিলেন।
তিন দিন পর। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঠিকানায় চিঠি এসেছে। চিঠির প্রেরক কলকাতার আয়কর বিভাগে কর্মরত ওই লোকটি। চিঠিতে বলা হয়ছে- খুব শিগগির যেন কবি নিজের যাবতীয় আয়-ব্যয়ের হিসাবপত্র তাঁর অফিসে জমা করেন।
এমন চিঠি পেয়ে কাজী নজরুল ইসলামের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। কিছুক্ষণ নীরব নির্বাক হয়ে থাকলেন তিনি। এ আবার কোন বিপদ ডেকে আনলেন তিনি! অভাব অনটন আর ইচ্ছেমতো খরচের সংসারে তার বসবাস। একখানা গাড়ি না হয় আছে, সেটিও তো ধার করে কিস্তিতে পরিশোধের শর্তে কেনা। তার আবার কিসের হিসেবপত্র!
কবির বন্ধুমহলে ছড়িয়ে পড়ল এই উটকো ঝামেলার খবর। তারা বেশ ভাল করেই জানেন কবির সংসারের অন্দরমহলের হাল হাকিকত। বন্ধুদের কয়েকজন মিলে এখানে ওখানে আলাপ আর দেন-দরবার করে কবিকে উদ্ধার করলেন এ বিপদ থেকে। সেবার আর কবিকে আয়কর বিভাগের দ্বারস্থ হতে হয়নি হিসাবের খাতাপত্র নিয়ে।
তবুও এ নিয়ে কবি বেশ উৎকন্ঠা ও উদ্বেগে দিন পার করেছিলেন। বন্ধুদের আড্ডায় বলেছিলেন, ‘দেখলি রে তোরা, সে রাতে ওই বেটাকে উপকার করতে গিয়ে ভদ্রতা দেখালাম, এর পরিণাম কী হলো!
নেওয়া হলো না কবি নজরুলের রক্ত
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রিয় বন্ধুদের একজন কাজী মোতাহার হোসেন। তাঁকে লেখা বেশকিছু চিঠি আজও সংরক্ষিত রয়েছে। সেসব চিঠিতে কবি নজরুল ইসলাম বারবার তার প্রিয়তমার মতো সম্বোধন করে কারো কথা লিখেছেন। কখনো … দিয়ে দিয়ে তাকে বুঝিয়েছেন। কবির যৌবনে কে ছিলেন তাঁর সেই প্রিয়তমা? এর সুনির্দিষ্ট মর্ম উদ্ধার বেশ কঠিন। কাজী মোতাহার ও অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবদের উদ্দেশ্য করে লেখা সেসব চিঠি কবি নজরুল ইসলাম সম্পর্কে জানার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত। কবি এসব চিঠিতে নিজের সুখ দুঃখের কথা লিখেছেন অকৃত্রিমভাবে। নিজের ভেতর লালন করা দুরন্ত স্বভাবের ভিন্ন পরিচয় পাওয়া যায় এসব পত্রলিপিতে।
১০-০৩-২৮ তারিখে রাত দুটোয় লেখা কাজী মোতাহারের কাছে পাঠানো চিঠিতে কবি নজরুল লিখেছেন, তিনি একজন হিন্দু ব্রাক্ষণের জন্য রক্ত দেবেন। সেজন্য ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন তিনি। দৈনিক বসুমতী পত্রিকায় ওই ব্রাহ্মণ নিজের জন্য রক্ত চেয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। এ কথা লিখে কবি অনুরোধ করছেন কাজী মোতাহারকে, ‘তোমার বন্ধুর অনুরোধ, এ কথা কাউকে জানিয়ো না যেন। কাউকে মানে- তাঁকেও জানিয়ো না।’ এই ‘তাকে’ কে? কবির অনেক চিঠিতে এই অজানা প্রিয়তমার কথায় ভরা। এসব পত্রের ভাষায় বোঝা যায়, কবি এই প্রিয়তমার কাছ থেকে বিচ্ছেদ পেয়েছেন, তবে এখনও তাকে ভুলতে পারছেন না।
পরের চিঠিতে কবি কাজী মোতাহারকে লিখেছেন কবি, তাঁর রক্ত নেওয়া হয়নি। কবির ভাষায়Ñ ‘রক্তদান করিনি। ডাক্তার শালা বলে, হার্ট দুর্বল। শালার মাথা! মনে হচ্ছিল, একটি ঘুষি দিয়ে দেখিয়ে দিই কেমন হার্ট দুর্বল। ভিতরের কথা তা নয়। ব্রাহ্মণ ভদ্রলোক ‘মুসলমানে’র রক্ত নিতে রাজী হলেন না। হায়রে মানুষ, হায়রে তার ধর্ম। কিন্তু কোনো হিন্দু যুবক আজো রক্ত দিলে না। লোকটা মরছে, তবুও নেবে না ‘নেড়ে’র রক্ত।’

